Wednesday, June 16, 2021

আখলাকে হাসানা বা উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব ও ফযীলত

 ভূমিকা :

আল্লাহ বলেন,

 يَوْمَ لاَ يَنْفَعُ مَالٌ وَلاَ بَنُوْنَ، إِلاَّ مَنْ أَتَى اللهَ بِقَلْبٍ سَلِيْمٍ- 

সেদিন সন্তানাদি ও মাল-সম্পদ কোন উপকারে আসবে না। উপকৃত হবে কেবল সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিকট আসবে ক্বালবে সালীমবা নিরাপদ অন্তর নিয়ে (শুআরা ৮৮, ৮৯)

 

বস্ত্তত ক্বালবে সালীমের বহিঃপ্রকাশই আখলাকে হাসানা বা উত্তম চরিত্র। আখলাকে হাসানা মানব চরিত্রের প্রতিটি বাঁকে ঈমানময় আভা বিকিরণ করে। ফলে মানব চরিত্র হয়ে ওঠে শরীআত নির্ভর ও সৌন্দর্যের প্রতিভূ/প্রতিনিধি।

আখলাকে হাসানার পরিচয় :

أخلاق শব্দটি বহুবচন। একবচনে خُلْقٌ বা خُلُقٌশাব্দিক অর্থ স্বভাব, ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, অভ্যাস, বৈশিষ্ট্য, শিষ্টাচার প্রভৃতি।


حسنة শব্দের অর্থ সুন্দর, উৎকৃষ্ট, ভাল প্রভৃতি। সুতরাং আল- আখলাকুল হাসানা অর্থ : সুন্দর স্বভাব, উৎকৃষ্ট ব্যক্তিত্ব, ভাল অভ্যাস, উত্তম চরিত্র প্রভৃতি। পরিভাষায়, কথায়-কাজে নিরহংকার ও উত্তম আচরণ ফুটে ওঠার নাম আখলাকে হাসানা।

Oxford dictionary তে বলা হয়েছে- Character is the particular combination of qualities in a person that makes him different from other. It is such a quality which leads a man to be determined and able to bear difficulties.

চরিত্র হচ্ছে কোন মানুষের মধ্যে এমন কতগুলো স্বতন্ত্র গুণাবলীর সমাবেশ, যা মানুষকে অন্যদের থেকে পৃথক করে। এগুলো এমন কিছু গুণ, যা মানুষকে সংকল্পবদ্ধ হতে ও কঠিন কাজ সম্পাদনে সাহায্য করে।

আখলাকের প্রকারভেদ :

আখলাক বা চরিত্র দুই প্রকার। যেমন

(১) আখলাকে হাসানা/হামীদাহ বা সচ্চরিত্র

(২) আখলাকে সায়্যিয়াহ/যামীমাহ বা মন্দ চরিত্র (সম্পাদনা পরিষদ, দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৬ইং), পৃঃ ৭১৫)

শরীআত যে সমস্ত স্বভাব-কর্মের জন্য মানুষকে প্রশংসিত ও উৎসাহিত করে তাকে আখলাকে হাসানা বলে। আর যে সমস্ত স্বভাব-কর্মের জন্য নিন্দিত ও তিরষ্কৃত করেছে তাকে আখলাকে সায়্যিয়াহ বলে।

আখলাকে হাসানার গুরুত্ব ও ফযীলত :

ইংরেজীতে একটি প্রবাদ আছে

Money is lost nothing is lost,

Health is lost something is lost,

But character is lost everything is lost.

 আর ইসলামের প্রশংসনীয় চরিত্র হচ্ছে সর্বোত্তম সম্পদ ।

 আল্লাহ তায়ালা বলেন

1.صِبْغَةَ اللَّهِ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً وَنَحْنُ لَهُ عَابِدُونَ -

আল্লাহর রং ধারণ কর এর চাইতে উত্তম রং কার হতে পারে ? (সুরা বাক্বারা-১৩৮)

আল্লাহর গুণে গুনান্বিত হও কেননা আল্লাহ কোন অন্যায় কাজ করেন না । সুতরাং মানুষ তার প্রতিনিধি হিসেবে কোন অন্যায় করবে না বরং সর্বদা থাকবে সৃষ্টির কল্যানের চিন্তা । মহানবী (সাঃ) বলেছেন

أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا

মুমিন পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী যার চরিত্র উত্তম  । (তিরমিযি-১১৬২) ।

 

আখলাকে হাসানার প্রতি শরীআত যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছে। ইনজেকশনের মাধ্যমে ঔষধ প্রয়োগ করলে যেমন তা সহজেই শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যায়, তেমন আখলাকে হাসানা নামের সজীব বৃক্ষটির মযবুত পরশে মানব জীবনের প্রতিটি পরত হয়ে ওঠে ক্লেশমুক্ত, নির্ঝঞ্ঝট ও পরিচ্ছন্ন। তাই উভয় জাহানে সফলতা লাভের মানদন্ড নিরূপণ করা হয়েছে আখলাকে হাসানাকে। সচ্চরিত্রবান ব্যক্তিকে প্রর্বোত্তম মানুষ হিসাবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।


রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمُ أَحْسَنَكُمْ أَخْلاَقًا

তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যার চরিত্র সবচেয়ে ভাল (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৮৫৪, ৯/১৬৮, ‘কোমলতা, লাজুকতা ও সচ্চরিত্রতাঅনুচ্ছেদ)


তিনি বলেন, 

مَا شَيْئٌ اَثْقَلَ فِىْ مِيْزَانِ المُؤْمِنِ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ خُلْقٍ حَسَنٍ

ক্বিয়ামতের দিন মুমিনের দাঁড়িপাল্লায় সর্বাপেক্ষা ভারী যে জিনিসটি রাখা হবে তা হচ্ছে উত্তম চরিত্র (তাহক্বীক্ব তিরমিযী হা/২০০২, সনদ ছহীহ; তাহক্বীক্ব আবূদাঊদ হা/৪৭৯৯, ‘সচ্চরিত্রঅধ্যায়)

 

আবূ দারদা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,

 مَا مِنْ شَيْئٍ يُوْضَعُ فِى المِيْزَانِ اَثْقَلُ مِنْ حُسْنِ الخُلْقِ، شَأنَ صَاحِبِ حُسْنِ الخُلْقِ لَيَبْلُغُ دَرَجَةَ صَاحِبِ الصَّوْمِ وَالصَّلاَةِ. 

মুমিনের মিযানের পাল্লায় সচ্চরিত্র অপেক্ষা ভারী কোন কিছুই রাখা হবে না। সচ্চরিত্রবান ব্যক্তি সর্বদা (দিনে) ছিয়াম পালনকারী ও (রাতে) ছালাত আদায়কারীর ন্যায় (তাহক্বীক্ব তিরমিযী হা/২০০৩, সনদ ছহীহ; তাহক্বীক্ব আবূ দাঊদ হা/৪৭৯৮)

 

দিনভর ছিয়াম রেখে, রাতভর ছালাত আদায় করে কোন ব্যক্তি যে নেকী পাবেন, সচ্চরিত্রবান ব্যক্তি তার সচ্চরিত্রের কারণে সে পরিমাণ নেকীর ভাগীদার হবেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

«أَنَا زَعِيمٌ ..........وَبِبَيْتٍ فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسَّنَ خُلُقَهُ»

যে তার চরিত্রকে সুন্দর করেছে, আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে প্রাসাদ নির্মাণের জন্য যামিন হব (তাহক্বীক্ব আবূদাঊদ, হা/৪৮০০, সনদ ছহীহ)


আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

 اكْمَلُ الْمُؤْمِنِيْنَ اِيْمَامًا اَحْسَنُكُمْ خُلُقًا، وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ خُلُقًا- 

ঈমানের দিক দিয়ে সর্বাধিক কামিল সে ব্যক্তি, যার চরিত্র সর্বোত্তম। তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা স্ত্রীদের সাথে সর্বোত্তম আচরণকারী (তাহক্বীক্ব তিরমিযী হা/১১৬২; সনদ হাসান ছহীহ; তাহক্বীক্ব আবূ দাঊদ হা/৪৬৮২)

কামিল মুমিন হওয়ার জন্য অত্র হাদীছে চরিত্রের কামালিয়াত শর্তারোপ করা হয়েছে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন,

سُئِلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ الجَنَّةَ، فَقَالَ: تَقْوَى اللهِ وَحُسْنُ الخُلُقِ، وَسُئِلَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ، فَقَالَ: الفَمُ وَالفَرْجُ.

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল কোন জিনিস মানুষকে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি বলেন, আল্লাহভীতি ও সচ্চরিত্র। আবারও জিজ্ঞাসা করা হল, কোন জিনিস বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাবে? তিনি বলেন, মুখ ও লজ্জাস্থান (তাহক্বীক্ব তিরমিযী হা/২০০৪, সনদ হাসান)

«الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ، وَالْإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ»

রাসূল (ছাঃ) বলেন, সৎ কাজ হল উত্তম স্বভাব। আর পাপ কাজ হল,  যে কাজ তোমার অন্তরে সন্দেহের সৃষ্টি করে। তুমি ঐ কাজটি জনসমাজে প্রকাশ পাওয়াটা অপছন্দ কর (মুসলিম হা/2553  মিশকাত হা/ 5073)



রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

 إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَىَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّى مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلاَقًا  

তোমাদের মধ্যে যার স্বভাব-চরিত্র সর্বোত্তম সে আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। আর ক্বিয়ামত দিবসেও সে আমার কাছাকাছি অবস্থান করবে (তাহক্বীক্ব তিরমিযী হা/২০১৮, সনদ ছহীহ)

 

এমন আশাব্যঞ্জক হাদীছ গভীরভাবে পড়লে নিশ্চয়ই তাক্বওয়াশীল হৃদয় উত্তম চরিত্র অর্জনে উদ্বুদ্ধ হবে।

عَنْ رَجُلٍ مِنْ مُزَيْنَةَ قَالَ: قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا خَيْرُ مَا أُعْطِيَ الْإِنْسَانُ؟ قَالَ: «الْخُلُقُ الْحَسَنُ» رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَان»

মুযায়না গোত্রের এক ব্যক্তি বলেন, সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন জিনিসটি সর্বোত্তম যা মানব জাতিকে দেয়া হয়েছে? তিনি বলেন, সচ্চরিত্র (তাহক্বীক্ব মিশকাত হা/৫০৭৮, বাইহাকী সনদ ছহীহ;)

 

রাসূল (ছাঃ) বলেন,

 بُعِثْتُ لِاُتَمِّمَ حُسْنَ الاخلاقِ 

আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি (তাহক্বীক্ব মিশকাত হা/৫০৯৭, সনদ হাসান, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৮৭০, ৯/১৭২)

রাসূল (ছাঃ) ছিলেন সচ্চরিত্রের মূর্তিমান আদর্শ। তাঁর চরিত্রের প্রশংসায় আল্লাহ বলেন,

 

 واِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيْم 

নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী (ক্বলাম ৪)

 

তিনিও তার চরিত্রকে আরও সৌন্দর্যমন্ডিত করার জন্য বলতেন,

 اللهم حَسَّنْتَ خَلْقِىْ فَاَحْسِنْ خُلُقِىْ 

হে আল্লাহ তুমি আমার গঠন সুন্দর করেছ, সুতরাং আমার চরিত্রকে সুন্দর কর (আহমাদ, তাহক্বীক্ব মিশকাত হা/৫০৯৯, সনদ ছহীহ; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৮৭২, ৯/১৭৩)

সুতরাং সচ্চরিত্র মানব জীবনের জন্য কতটা প্রয়োজন ও গুরুত্বপূর্ণ, তা এই হাদীছ থেকে সহজেই অনুমেয়।


রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অন্যত্র বলেন,

 

আমি কি তোমাদেরকে বলব না, তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি কে? তাঁরা বললেন, অবশ্যই। তিনি (ছাঃ) বলেন, তোমাদের মধ্যে তিনিই সর্বোত্তম, যিনি বয়সে বড় এবং স্বভাব-চরিত্রে ভাল (আহমাদ, মিশকাত হা/৫১০০, সনদ ছহীহ

 

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا أُنْبِئُكُمْ بِخِيَارِكُمْ؟» قَالُوا: بَلَى. قَالَ: «خِيَارُكُمْ أَطْوَلُكُمْ أَعْمَارًا وَأَحْسَنُكُمْ أَخْلَاقًا» رَوَاهُ أَحْمد

আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দিব না, যার উপর জাহান্নাম হারাম আর জাহান্নাম যার জন্য হারাম? তারা হচ্ছে এমন ব্যক্তি যার মেজায নরম, কোমল স্বভাব, মানুষের সাথে মিশুক এবং সহজ-সরল (আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৫০৮৪, সনদ ছহীহ)

 

উল্লিখিত হাদীছগুলো থেকে আমরা সচ্চরিত্রের ফযীলত জানতে পেরেছি। সচ্চরিত্রের কারণে একজন মানুষকে সর্বোত্তম ঘোষণা করা হয়েছে। বিভীষিকাময় ক্বিয়ামত কালে আল্লাহ যখন চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ চুকাতে মানব আমল মিযানের পাল্লায় তুলবেন, তখন সচ্চরিত্র সেŠভাগ্যের স্বপ্নকাঠি হয়ে সবচেয়ে বেশি ভারী হবে। ব্যক্তির উত্তম-ভাল স্বভাবগুলো তার দুর্দিনে কতটা ফলদায়ক হবে, তা সে কল্পনাও করতে পারবে না। সচ্চরিত্রের জন্য সে ছাহেবুছ ছাওমঅর্থাৎ সারা বছর ছিয়াম পালনকারী ও ছাহেবুছ ছালাতঅর্থাৎ সারারাত ছালাত আদায়কারীর ন্যায় ছওয়াব পাবে। হাদীছে সচ্চরিত্রের জন্য এত এত নেকী ও মর্যাদা ঘোষণা করাতে সচ্চরিত্রের গুরুত্ব ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা ফুটে ওঠেছে। বস্ত্তত সচ্চরিত্র সামাজিক শৃংখলার হাতিয়ার। এটি ব্যতীত সুখ-শান্তির কল্পনা অবান্তর। সচ্চরিত্র অর্জনে আমাদের অনুপ্রাণিত হওয়া, প্রচেষ্টা চালানো একান্ত কর্তব্য।

আখলাকে হাসানার উপাদান :

মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আখলাক বিস্তৃত। আমলনামা শুরু হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এটি পরিব্যপ্ত। সে দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের আখলাক তার প্রতিটি কাজই। ফলে মানুষের ভাল-মন্দ গুণাগুণের শেষ নেই। তথাপি কিছু ভাল বা মন্দগুণের কারণে সে সমাজে উত্তম চরিত্র বা মন্দ চরিত্রে অভিহিত হয়। এমন কিছু উল্লেখযোগ্য উত্তম চরিত্রের

 

উপাদান হচ্ছে- তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি, বিনয়-নম্রতা, সত্যবাদিতা, মিতভাষিতা, দানশীলতা, ছবর বা ধৈর্য, ক্ষমা-উদারতা, শোকর ও যিকির-আযকার, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, লজ্জাশীলতা, আমানতদারিতা, সুধারণা পোষণ, সৃষ্টিজীবের সকলের প্রতি সহনশীল হওয়া, আদল-ইনছাফ প্রভৃতি।


সমাপনী :
আনাস (রাঃ) বলেন,

 عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كُنَّا عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- فَضَحِكَ فَقَالَ « هَلْ تَدْرُونَ مِمَّ أَضْحَكُ ». قَالَ قُلْنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ « مِنْ مُخَاطَبَةِ الْعَبْدِ رَبَّهُ يَقُولُ يَا رَبِّ أَلَمْ تُجِرْنِى مِنَ الظُّلْمِ قَالَ يَقُولُ بَلَى. قَالَ فَيَقُولُ فَإِنِّى لاَ أُجِيزُ عَلَى نَفْسِى إِلاَّ شَاهِدًا مِنِّى قَالَ فَيَقُولُ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ شَهِيدًا وَبِالْكِرَامِ الْكَاتِبِينَ شُهُودًا – قَالَ – فَيُخْتَمُ عَلَى فِيهِ فَيُقَالُ لِأَرْكَانِهِ انْطِقِى. قَالَ فَتَنْطِقُ بِأَعْمَالِهِ – قَالَ – ثُمَّ يُخَلَّى بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْكَلاَمِ -قَالَ – فَيَقُولُ بُعْدًا لَكُنَّ وَسُحْقًا. فَعَنْكُنَّ كُنْتُ أُنَاضِلُ- 

একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট ছিলাম, হঠাৎ তিনি হেসে ওঠলেন, এমনকি তাঁর দাঁতের মাড়ি পর্যন্ত প্রকাশিত হয়ে পড়ল। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি জান আমি কেন হাসলাম? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক অবগত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ক্বিয়ামত দিবসে বান্দা তার প্রতিপালকের সাথে তর্কে লিপ্ত হবে; একারণে আমি হেসেছি। সে বলবে হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমাকে যুলুম থেকে রক্ষা করেননি? আল্লাহ বলবেন, কেন নয়, অবশ্যই। সে বলবে, আমার জন্য আমি ব্যতীত অন্য কাউকে সাক্ষী হিসাবে গ্রহণ করব না। আল্লাহ বলবেন, আজকের দিনে তোমার হিসাবের জন্য তুমিই যথেষ্ট। আর সম্মানিত ফেরেশতাগণ সাক্ষী হিসাবে থাকবে। অতঃপর তার মুখে মোহর মেরে দেয়া হবে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলা হবে, কথা বল। অতঃপর তারা তার আমল সম্পর্কে বলে দেবে। অতঃপর তার যবান খুলে দেয়া হবে। সে বলবে, দূর হও, অভিশাপ তোমাদের জন্য। তোমরা আমার শত্রু হয়ে গেলে? অথচ তোমাদের জন্যই আমি ঝগড়া-বিবাদ করছিলাম (মুসলিম, মিশকাত/ ৫৫৫৪)


কি ভয়ংকর হাদীছ! আদর-যত্নে লালিত, বিলাস-ব্যসনে পরিবেষ্টিত, সুদৃষ্টিতে সংরক্ষিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের এই আচরণ! সার্বক্ষণিক সাথী দেহের এই নিষ্ঠুর নির্দয় ও বিরুদ্ধ সাক্ষ্য প্রদান কতই না মর্মান্তিক। আর তা বান্দার অস্বীকার করার কোন উপায় থাকবে না।

দুশ্চরিত্রের সাঁড়াশি যেভাবে মানব জাতির শ্বাসরোধ করে রেখেছে তাতে সেদিন অবস্থাটা কি দাঁড়াবে? নিজ ঘরের নীরব কোণে একাকী বসে সে ব্লু ফিল্ম দেখেছে, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ই-মেইল প্রভৃতি প্রযুক্তি ব্যবহার করে কত মন্দ কাজে জড়িত হয়েছে, মোবাইলে কত পাপ বিজড়িত কথা বলেছে, কত ভ্রান্ত-বাতিল পরিকল্পনা করেছে! কেউ দেখেনি, কেউ শুনেনি। কারো দেখার বা শুনার অধিকারও ছিল না। আজ কি-না তা বিশ্ববাসীর নিকট ওপেন সিক্রেট! এমন অনিবার্য, অলংঘণীয় কঠিন দিনের উপস্থিতির স্মরণে মুমিন হৃদয় ডুকরে না কেঁদে পারে? যে স্বভাব-বৈশিষ্ট্য, আমল মানুষকে এমনতর বিপদ ও অপমানের বদ্ধভূমিতে নিক্ষেপ করবে, আমরা তা থেকে হাতজোড় করে আমাদের রবের নিকট পানাহ চাই।

 

আর যে চরিত্র ক্বিয়ামতের দিন মিযানকে হেলিয়ে দিয়ে বান্দার মুখ উজ্জ্বল করবে, অনাবিল জান্নাতী সুখানুভূতিতে অবগাহন করাবে, আমরা সে চরিত্র অর্জনের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি। আল্লাহ তুমি সহায় হও। আমীন!!

 

No comments:

Post a Comment