Showing posts with label সম্পাদকীয়. Show all posts
Showing posts with label সম্পাদকীয়. Show all posts

Friday, September 18, 2020

২৯ সেপ্টেম্বরঃ বিশ্ব শিশু অধিকার দিবস। ইসলামের আলোকে শিশুদের নামকরণ।

২৯ সেপ্টেম্বরঃ বিশ্ব শিশু অধিকার দিবস।

ইসলামের আলোকে শিশুদের নামকরণ।

২৯ সেপ্টেম্বরঃ বিশ্ব শিশু অধিকার দিবস। ইসলামের আলোকে শিশুদের নামকরণ।
শিশুদের অধিকার


ভূমিকা 

আরবীতে একটা প্রবাদ আছে যার বাংলা অর্থ হলো “প্রত্যেক ব্যক্তির নাম অনুযায়ী তার নসীব।” আর শেক্রপীয়ারের উক্তি হলো “ভাল নাম নর-নারীর মনের মুকুরের প্রত্যক্ষ মণি।” প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের নাম গুলো সুন্দর রাখো।” ইসলামী ভাবধারা সম্বলিত নামকরণ ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নামকরণ অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তা, চেতনা ও মানসিকতার উপর প্রভাব ফেলে এবং নামের দ্বারা মানুষের ব্যক্তিত্বেরও বিকাশ ঘটে। তাই শিশু জন্মলাভের পর তার জন্যে ভাল ও সুন্দর নামকরণ করা উচিত।


নাম নিয়ে রম্য কথা 

আমাদের দেশে অনেক পিতা-মাতাই সন্তান জন্মলাভের পর তার জন্যে একটি ভাল সুন্দর নামের জন্যে পেরেশানী ভোগ করেন। বিভিন্ন বই পত্রে খুজতে থাকেন একটি সুন্দর নাম। বিভিন্ন ব্যক্তিদের নিকট বলে থাকেন আমাকে একটি সুন্দর নাম দিন। ইদানীং আমাদের কারো মধ্যে এমন প্রবণতাও দেখা দিয়েছে যে, সন্তানের জন্যে এমন একটি নাম হওয়া চাই, যা অত্র মহল্লায়, গ্রামে, ইউনিয়নে, থানায় কারোর নেই। এ প্রবণতার বশবর্তী হয়ে কেউ কেউ সন্তানের জন্যে এমন অদ্ভুত ও বিচিত্র নামকরণ করে থাকেন, যে নাম মহল্লায় বা গ্রামে পাওয়া তো দূরের কথা কেবল নাম শুনে বুঝার কোনো উপায় নেই যে, এটা কোন মানুষের নাম, নাকি জীবজন্তু বা পশু-পাখির নাম। আর মানুষের নাম হলে সে কি ছেলে না মেয়ে? মুসলিম নাকি অমুসলিম। যেমন


প্রচলিত কিছ ু ভুল নামের নমুনা

(দুঃখিত) আব্দুন্নববী, আব্দুর রাসূল, গোলাম নবী, গোলাম রসূল, গোলাম মুহাম্মাদ, গোলাম আহমাদ, গোলাম মুছতফা, গোলাম মুরতযা, নূর মুহাম্মাদ, নূর আহমাদ, মাদার বখ্শ, পীর বখ্শ, রূহুল আমীন, সুলতানুল আওলিয়া প্রভৃতি। এতদ্ব্যতীত (১) অহংকার মূলক নাম, যেমন খায়রুল বাশার, শাহজাহান, শাহ আলম, শাহানশাহ প্রভৃতি; (২) নবীগণের উপাধি, যেমন আবুল বাশার, নবীউল্লাহ, খলীলুল্লাহ, কালীমুল্লাহ, রূহুল্লাহ, মুহাম্মাদ আবুল কাসেম; (৩) কুরআনের আয়াতসমূহ, যেমন আলিফ লাম মীম, ত্বোয়াহা, ইয়াসীন, হা-মীম, লেতুনযেরা; (৪) অনর্থক নাম, যেমন লায়লুন নাহার, ক্বামারুন নাহার, আলিফ লায়লা ইত্যাদি। (৫) কুখ্যাত যালেমদের নাম, যেমন নমরূদ, ফেরাঊন, হামান, শাদ্দাদ, ক্বারূণ, মীরজাফর প্রমুখ । (৬) এতদ্ব্যতীত শী‘আদের অনুকরণে নামের আগে বা পিছে আলী, হাসান বা হোসায়েন নাম যোগ করা। (৭) এছাড়াও ঝন্টু, মন্টু, পিন্টু, মিন্টু, হাবলু, জিবলু, বেল্টু, শিপলু, ইতি, মিতি, খেন্তী, বিন্তী, মলী, নিভা, টিটো, ময়না, পাখি, চাপা, কেয়া, পপি, ডলি, পলি, বেবী, দিপ্তী, রিতা, টিংকু, সেতু, রিংকু, পিংকু, চঞ্চল, রেনুকা, লতা, পাতা, নাট, বল্টু, স্ক্রু ইত্যাদি অর্থহীন নামসমূহ।

আবার কেউ কেউ সন্তানের জন্যে দু’টি নাম নির্বাচন করে থাকেন। একটি হচ্ছে ‘ডাক নাম’। এ নামটি রাখা হয় অতি সংক্ষিপ্ত। এটি অনেক ক্ষেত্রে হয় অর্থহীন নাম। সবাই তাকে এ নামে ডাকে এবং এ নামে সে পরিচিতি লাভ করে। অপরটি হচ্ছে ‘আসল নাম’। এ নামটি প্রায় সবাই একটু বড় করে অর্থবহ নাম করণের চেষ্টা করেন। আসল নামটি কেবল কাগজে কলমে অর্থাৎ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, সার্টিফিকেট, চাকুরী ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আসলে, যে নামে সন্তান পরিচিতি লাভ করবে এবং যে নামে সবাই সন্তানকে আজীবন ডাকবে সে নামটি অবশ্য হওয়া উচিত ভালো ও সন্দুর নাম।


ইসলামে নামকরণের গুরুত্ব 

ইসলামে নামকরণের গুরুত্ব অপরিসীম। যে কোন জিনিসকেই চিহ্নিতকরণ বা শনাক্তকরণের জন্যে এর নামকরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু চিহ্নিতকরণ বা শনাক্তকরণেই নামকরণের আসল বা একমাত্র উদ্দেশ্য নয়; বরং ইসলামী ভাবধারা সম্বলিত নামকরণ হচ্ছে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামে নামকরণ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম তাকে বিভিন্ন জিনিসের নাম শিক্ষা দিয়ে বলেন, 

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَٰؤُلَاءِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَۖ قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ ﴿البقرة: ٣١-٣٢﴾

“আর আল্লাহ শিখালেন আদমকে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীর নাম। তারপর সে সমস্ত বস্তু-সামগ্রী ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক। তাঁরা বলল, আপনি পবিত্র! আমরা কোন কিছুই জানি না, তবে আপনি আমাদেরকে যা কিছু শিখিয়েছেন (সেগুলো ব্যতীত)। নিশ্চয় আপনি প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন, বিজ্ঞ ।” -সূরা বাক্বারা ঃ ৩১-৩২

পবিত্র কুরআনের যে আয়াতটি সর্ব প্রথম নাযিল করা হয়েছে, সেখানেও আল্লাহ তা’আলা নামের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বলা হয়েছে,               

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ﴿العلق: ١﴾

“পাঠ করুন ! আপনার পালনকর্তার নামে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন।” -সূরা আলাক্ব ঃ ১

নাম করণের মূল উদ্দেশ্য যদি কেবলমাত্র শনাক্তকরণই হতো, তাহলে সন্তান ভ‚মিষ্ঠ হবার পর পিতা-মাতা হয়তো সন্তানকে চিহ্নিত বা শনাক্তকরণের জন্যে ১,২,৩ বা অন্য কোন সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করতেন এবং সে অংক সংখ্যা বা চিহ্ন দিয়েই সন্তানকে ডাকতেন, আর সন্তানের ভাল নামকরণের জন্যে পিতা-মাতা পেরেশানী ভোগ করতেন না। অন্যদিকে নামকরণের দ্বারা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তা, চেতনা ও মানসিকতারও উন্নতি ঘটে। তাই সন্তানের নামকরণ যেমন উত্তম হতে হবে, তেমনি তা হতে হবে ইসলামী ভাবধারায় পরিপূর্ণ, যাতে নামের দ্বারাই বুঝা যায় যে, লোকটি মুসলমান।


সন্তানের নামকরণের সময়কাল 

সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে অথবা এর পূর্বে যে কোন দিন শিশুর নামকরণ করা যায়। এ ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম প্রসারিত। এমনকি কোন কারণে তিন বা সাত দিনে শিশুর নামকরণ করা না হলে পরেও করা জায়েয। এতে ইসলামী শরীয়ায় কোন বাঁধা-নিষেধ নেই বলে কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন। তবে বিলম্ব না করে জন্মের পর পরই তাড়াতাড়ি নামকরণ করা সুন্নত বা উত্তম। এতে তাকে শনাক্তকরণে বা চিহ্নিতকরণে সুবিধা হয়। আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: ্রعَقَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ حَسَنٍ وَحُسَيْنٍ يَوْمَ السَّابِعِ وَسَمَّاهُمَا، وَأَمَرَ أَنْ يُمَاطَ عَنْ رَأْسِهِ الْأَذَىগ্ধ (صحيح ابن حبان)

“রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাসান (রাঃ) ও হোসাইনের (রাঃ) আকীকা করলেন জন্মের সপ্তম দিনে এবং তাদের দু’ জনের নাম রাখলেন।” -সহীহ ইবন হিব্বান ঃ ৫৩১১


 আমর ইবন শুয়াইব তার পিতা হতে তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন,

عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِتَسْمِيَةِ الْمَوْلُودِ يَوْمَ سَابِعِهِ وَوَضْعِ الأَذَى عَنْهُ وَالعَقِّ. (ترمذي)

“রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে নামকরণ করতে, মাথা মন্ডন করতে এবং আকীকা দিতে আদেশ দিয়েছেন।” -তিরমিযী ঃ ২৮৩২


 সালেম ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,

عَنْ سَالِمِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: ্রإِذَا كَانَ يَوْمُ سَابِعِهِ، فَأَهْرِيقُوا عَنْهُ دَمًا، وَأَمِيطُوا عَنْهُ الْأَذَى، وَسَمُّوهُগ্ধ (المعجم الاوسط) 

“সন্তানের জন্মের সপ্তম দিনে তার নামে রক্ত প্রবাহিত কর, তার শরীরের ময়লা দূর কর এবং তার নামকরণ কর।” -মু‘জামুল আওসাত ঃ ১৮৮৩

عَنْ أَبِي مُوسَى، قَالَ: وُلِدَ لِي غُلاَمٌ، فَأَتَيْتُ بِهِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ্রفَسَمَّاهُ إِبْرَاهِيمَ، فَحَنَّكَهُ بِتَمْرَةٍ، وَدَعَا لَهُ بِالْبَرَكَةِ، وَدَفَعَهُ إِلَيَّগ্ধ، وَكَانَ أَكْبَرَ وَلَدِ أَبِي مُوسَى (بخاري)

“ আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলে আমি তাকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইবরাহীম এবং একটি খেজুর দিয়ে তিনি তার “তাহনিক” করলেন। আর তার জন্যে বরকতের দু‘আ করলেন। অতপর তাকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিলেন। ইবরাহীম ছিল আবূ মূসা (রাঃ) এর বড় সন্তান।” -সহীহ বুখারী ঃ ৫৪৬৭, ৬১৯৮


মুসলমানেদের জন্যে আরবী নামের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 

পৃথিবীতে যত ভাষা আছে সব ভাষারই মর্যাদা রয়েছে। মানুষ যে ভাষাতেই কথা বলুক এবং যে ভাষাতেই আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করুক না কেন, আল্লাহ তা’আলা সব জানেন এবং শোনেন।  তদুপরি পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বিশেষভাবে আরবী ভাষার মাহত্ম্য, গুরুত্ব ও ফজীলত বর্ণনা করা হয়েছে। আর তাই আমরা বলতে পারি, যেহেতু পবিত্র কুরআনের ভাষা আরবী,  রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ভাষা ছিল আরবী এবং জান্নাতের ভাষাও হবে আরবী। সেহেতু আরবী ভাষার মাধ্যমে গড়ে উঠে বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব। আমেরিকা থেকে অষ্ট্রেলিয়া, পামীর থেকে পিরেনীজ, কাশ্মীর থেকে কন্যা কুমারী যেখানেই এ মুসলিম বাস করুক না কেন, তাদের মাঝে যত বৈচিত্র্যই থাকুক না কেন, আরবী নামের মাধ্যমে তাদের ঐক্য-সংহতি খুজে পাওয়া যায়। যেমনঃ কোন মুসলিম বিশ্বের যে কোন দেশে যে কোন অঞ্চলেই বাস করুক না কেন, তার নামটি শুনেই বুঝা যায় সে আল্লাহর বান্দা মুসলমান। আরবী নাম গ্রহণের বদৌলতেই তিনি পরিচিত হন মুসলিম হিসেবে এবং এরই বদৌলতে জোরদার হয় বিশ্ব মুসলিম ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ। মুসলিম বিশ্বের এ ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে আরো জোরদার করার জন্যে প্রয়োজন আরবী নামকরণের ব্যাপক প্রচলন।


মনে রাখতে হবে যে, আরবী ভাষায় সব নাম ইসলামী নাম নয়। যে সকল আরবী নামের অর্থের মধ্যে শিরক লুক্বায়িত থাকে কিংবা যে সকল আরবী নামের অর্থ আপত্তিকর বা যার কোন যথার্থ অর্থ নেই, সেই সকল আরবী নামগুলো অবশ্যই পরিত্যাজ্য। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) নির্দেশিত পন্থায় নামকরণই হচ্ছে ইসলামী নাম।

ইসলামে নামের যে রত্ম ভান্ডার আছে তা বর্জন করে অন্য ভাষায় নামকরণ ইহুদীদের “মান্না ও সালওয়ার”

(المن والسلوي) মতো বরকতপূর্ণ জান্নাতী খাদ্য পরিত্যাগ করে মাটি থেকে উৎপন্ন খাদ্যাদি পছন্দ করার মতোই সর্বনাশা হঠকারি সিদ্ধান্ত। এ প্রসঙ্গে কুরআন শরীফে তাদের উদ্দেশ্যে যা বলা হয়েছে তা সর্বকালেই সর্বলোকের জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 

قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَىٰ بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ ۚ﴿البقرة: ٦١﴾

“তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্টতর বস্তুর সাথে বদল করতে চাও”? -সূরা বাক্বারা ঃ ৬১


পিতার নামে সন্তানের পরিচিতি 

সন্তান পরিচিতি লাভ করবে পিতার নামে। আমরা কারো সঠিক পরিচয় দানের ক্ষেত্রে কিংবা শনাক্তকরণের জন্যে পিতার নাম ব্যবহার করে থাকি। এটা কিন্তু আমাদের মনগড়া নয়; বরং তা ইসলামের নির্দেশ। কারো পরিচয় দানের ক্ষেত্রে পিতার নাম যুক্ত হওয়া আল্লাহ তা’আলার নিকট পছন্দনীয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, 

ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ ﴿الأحزاب: ٥﴾

“তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহ কাছে ন্যায়সঙ্গত।’’ -সূরা আহযাব ঃ ৫

নামের শেষে পিতার নাম যুক্ত করে পরিচয় দেয়াই কুরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত শিক্ষা। আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, 

عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রإِنَّكُمْ تُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ، وَأَسْمَاءِ آبَائِكُمْ، فَأَحْسِنُوا أَسْمَاءَكُمْগ্ধ (ابو داؤد)

‘‘তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন তোমাদের নাম ধরে এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদের নাম ধরে ডাকা হবে, কাজেই তোমরা তোমাদের নামকে সুন্দর দেখে রাখ।’’ -আবূ দাঊদ ঃ ৪৯৪৮


সন্তানের ভাল নাম রাখা পিতার কর্তব্য 

সন্তানের নামকরণ করা পিতার দায়িত্ব এবং পিতাই এর প্রকৃত হকদার। সন্তানের জন্য ভাল নাম রাখা এটা ইসলামের দেয়া পিতার ওপর এক আমানত। তাই প্রত্যেক পিতার কর্তব্য হলো সে আমানত সুন্দর ও সুচারু ভাবে পালন করা। 


এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, যা ইবন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, সাহাবারা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ)! আমরা পিতা-মাতার হক সম্পর্কে অবগত হয়েছি। কিন্তু সন্তানের হক কি? তিনি (রাসূলুল্লাহ (সাঃ)) বললেন, “পিতা (সন্তানকে) সুন্দর নাম ও সুশিক্ষা দান করবে।” বায়হাকী

ইবন আব্বাস (রাঃ) ও আবূ সায়ীদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যার সন্তান জন্মগ্রহণ করে সে যেন তার সুন্দর নাম ও সুশিক্ষা দেয় এবং সাবালিক হলে তার বিবাহ দেয়। প্রাপ্ত বয়স্ক হলে বিবাহ না দেয়ার কারণে গুনাহ হলে সে গুনাহ তার পিতার ওপর বর্তাবে। -বায়হাকী


ভাল ও সন্দুর নাম বলতে ঐ সমস্ত নামকেই বুঝায়, যে নাম অর্থবহ এবং ইসলামী ভাবধরায় পরিপূর্ণ। যে নামের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় আল্লাহর দাসত্ব ও তাওহীদের সাক্ষ্যবহন করে এবং যে নাম ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী নয়। নবী-রাসূলগণের নাম, সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীনদের নাম, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ, আল্লাহওয়ালাদের নাম, হক্কানী ওলামায়ে কিরামের নাম, বুযুর্গানে দ্বীন এবং নেককার বিভিন্ন মুসলিম মনীষীর নামে নামকরণ করা ভাল।


পূর্বের নাম পরিবর্তন করার বিধান 

আমাদের দেশে অনেকের ধারণা, সন্তানের নামকরণের পর তা আর পরিবর্তন করা যায় না। শিশুকালের নাম পরিবর্তন করা অশুভ। আসলে তা ঠিক নয়। নাম যদি ভাল, সুন্দর ও অর্থবহ না হয়, তাহলে তা অবশ্যই পরিবর্তন করে ইসলামী ভাল নাম রাখা যায় এবং রাখা উচিত। আল্লাহর  রাসূল (সাঃ)-এর নিকট কেউ আসলে তিনি তার নাম জিজ্ঞেস করতেন। নাম সুন্দর, অর্থবহ ও পছন্দ হলে তিনি খুশী হতেন। আর অপছন্দ, অশুভ, ঘৃণ্য, অর্থহীন নাম হলে তার মুখমন্ডলে বিরক্তির ভাব প্রকাশ পেত এবং অধিকাংশ সময় তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেই নাম পরিবর্তন করে দিতেন।

 রায়তা বিনতে মুসলিম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তার পিতা বলেন, “হুনায়নের যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম, “গুরাব (কাক)”। তিনি বললেন, না, তুমি “মুসলিম”। সহীহ বুখারী ও আবূ দাঊদ। 

এমনিভাবে হিজরতের পূর্বে মদীনার নাম ছিল “ইয়াছরিব” (দোষ দেয়া)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হিজরত করে মদীনায় আসার পর এর নাম রাখা হয় “মদীনাতুন নবী” অর্থাৎ নবীর নগর বা দেশ।


ভাল নামের সুফল 

মানব জীবনে তার নাম ও নামের অর্থ গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। ভাল নামের বদৌলতে অনেক সময় মানুষের চরিত্র, চালচলন ও আচার-ব্যবহার হয় উন্নত এবং জীবন হয় সুন্দর। নাম সুন্দর ও অর্থবহ হলে কেউ যদি কাউকে তার নাম জিজ্ঞেস করে তখন সে জোরে তার নামটি বলতে লজ্জাবোধ করে না; বরং সে মনে আনন্দ পায়। অন্যদিকে কেউ যদি কাউকে ভাল নামে ডাকে, তাহলে তার সে ডাকটিও হয়তো দু‘আয় পরিণত হয়ে যেতে পারে। যেমন কেউ যদি কাউকে নাম নিয়ে ডাক দেয় “ওহে খাদিমুল ইসলাম’। অর্থাৎ “হে ইসলামের সেবক” এবং এ নামে যদি বারবার ডাকে, তাহলে এরই বিনিময়ে আল্লাহর মেহেরবানীত হয়তো একদিন সে সত্যিই ইসলামের একজন সেবক হয়ে যেতে পারে।


মন্দ নামের পরিণতি বা কুফল 

পূর্বেই বলা হয়েছে, মানব জীবনে নাম ও নামের অর্থ গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তাই একদিকে যেমন ভাল নাম জীবনকে যেমন সুন্দর করে, অন্যদিকে খারাপ নাম মানব জীবনে অনেক ক্ষেত্রে বয়ে আনে দুঃখ, দুর্দশা ও অশুভ পরিণতি। নাম অসুন্দর ও খারাপ অর্থের হলে তা কারো নিকট বলতেও নামধারী লোক লজ্জাবোধ করে। মন্দ নাম যে মানব জীবনে করুণ পরিণতি ডেকে আনে এর একটি বাস্তব ঘটনা হলো ঃ 

উহুদের যুদ্ধে বিশ্বনবী (সাঃ)-এর চাচা হামযা (রাঃ) শহীদ হয়েছিলেন ওয়াহ্শী নামক এক নিগ্রো ক্রীতদাসের হাতে। ওয়াহ্শী অর্থ হচ্ছে অসভ্য, বর্বর। তার নামটি যেমন ঘৃণ্য, তদ্র“রূপ তার কাজও ছিল ঘৃণ্য। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করায় আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন বটে; কিন্তু বলে দিয়েছিলেন, তুমি আমার চোখের সামনে আসবে না। কারণ তোমাকে দেখলে আমার প্রাণপ্রিয় চাচা হামযার কথা মনে পড়ে যায়। ওয়াহ্শী কোন দিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর চোখের সামনে আসতেন না। কিন্তু ইসলাম কবুল করার পর অনুতপ্ত হয়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি এমন কিছু কাজ করবেন যা তার পূর্বের কৃতকর্মের ক্ষতিপূরন হয়। আল্লাহ  তা’আলা তার অনুশোচনা ও প্রতিজ্ঞা কবুল করলেন। আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর খিলাফতের সময় ইয়ামামার যুদ্ধে নুবুয়্যতের মিথ্যা দাবীদার মুসাইলামাতুল কায্যাব-কে ওয়াহ্শী হত্যা করেছিলেন। জানা যায়, ওয়াহ্শী মন্তব্য করেছিলেন, “ইসলাম কবুল করার পূর্বে আমার হাতে ইসলামের এক মহান বীর শহীদ হন, আর ইসলাম কবুল করার পর ইসলামের এক জঘন্যতম নিকৃষ্ট দুশমনকে হত্যা করে সে ক্ষতি পূরণ করার চেষ্ট করলাম। 

এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, মন্দ নাম মানুষের চালচলন, কথাবার্তা, চরিত্র ও জীবনের উপর মন্দ প্রভাব ফেলে।

আল্লাহ পাকের নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় নাম 

 আব্দুল­াহ ইবন মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, اِنَّ اللهَ حُسْنٌ يُحِبُّ الْحُسْنَ “নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সুন্দরকে ভালবাসেন।” -সহীহ বুখারী ও মুসলিম

নামের ক্ষেত্রে আল্লাহ পাকের নিকট সবচেয়ে সুন্দর ও পছন্দনীয় নাম হচ্ছে আল্লাহ পাকের নামের সাথে “আবদ” (বান্দা, দাস, গোলাম) সংযুক্ত নাম। যেমন আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান, আব্দুর রহীম, আব্দুল কাদির, আবদুল মালিক ইত্যাদি। হাদীস শরীফে আছে, 

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِنَّ أَحَبَّ أَسْمَائِكُمْ إِلَى اللَّهِ: عَبْدُ اللَّهِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ " رَوَاهُ مُسلم

“ ইবন উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, নিশ্চয় মহিমান্বিত ও সম্মানিত আল্লাহর নিকট তোমাদের নামগুলোর মধ্যে প্রিয়তম হলো ঃ “আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।” -সহীহ মুসলিম; মিশকাত ঃ ৪৭৫২

 আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রإِنَّ لِلَّهِ تَعَالَى تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَগ্ধ . وَفِي رِوَايَة: ্রوَهُوَ وتر يحب الْوترগ্ধ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

“রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলার নিরানব্বই- এক কম একশতটি (প্রসিদ্ধ গুণবাচক) নাম রয়েছে। যে তা মুখস্থ (স্মরণ) করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”-বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ২২৮৭


শিশুদের একাধিক নামকরণের বিধান 

নাম করণের ক্ষেত্রে মানুষের নাম একটিই থাকতে হবে, নাকি একাধিক হতে পারে? পবিত্র কুরআনে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ তা’আলার একাধিক গুণবাচক নাম রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা নিজেই বলেছেন,

 وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا ﴿الأعراف: ١٨٠﴾ 

“আল্লাহর অনেক সুন্দর (গুণবাচক) নাম রয়েছে, তোমরা সে নামগুলোতে তাঁকে ডাকো।” -সূরা আরাফ ঃ১৮০ 

আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এরও একাধিক নাম রয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা তার হাবীব মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুণবাচক নামে সম্বোধন করেছেন। যেমন আহমদ, মবাশ্শির, মুঝ্জাম্মিল, মুদ্দাস্সির ইত্যাদি। 

পবিত্র কুরআন ও বিভিন্ন সূরারও রয়েছে একের অধিক নাম। যেমন, ফুরক্বান, হুদা, বায়্যিনাহ।” সূরা ফাতিহাকে বলা হয় সূরা শিফা, দু’আ ইত্যাদি। 

সুতরাং মানুষের নামের ক্ষেত্রেও একাধিক নাম হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিভিন্ন কারণে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পরিবেশে, বিভিন্ন অবদানের কারণে কোন মানুষ বা সত্তার গুণগত বৈচিত্রে, সুকীর্তির মহিমায় এবং বৈশিষ্ট্যের উৎকর্ষতায় বিভিন্ন উপাধিতে ভ‚ষিত হতে পারে। কাজেই একই ব্যক্তির একাধিক নাম হতে পারে, এতে আপত্তি থাকার কিছু নেই।

সনাক্তকরণই যদি নামকরণের উদ্দেশ্য হয় তবে একটা নামে যথেষ্ট; বরং তাই উত্তম। তবে কোন শিশুর একের অধিক নাম রাখা যেতে পারে কিন্তু শর্ত হলো আসল এবং ডাক নাম উভয়টিই অর্থবহ ইসলামী ভাবধারা সম্পন্ন ভালো ও সন্দুর নাম হতে হবে যা তাওহীদবাদের সাক্ষ্য বহন করে। তবে সচরাচর একাধিক নামের লোকদের নাম নিয়ে প্রায়ই বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। এ  বিষয়টি ভেবে দেখা একান্ত দরকার। 


নামের প্রথমে মুহাম্মদ / মুসাম্মৎ ব্যবহার 

আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলিম পুরুষ তাদের নামের পূর্বে ‘মুহাম্মদ’ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। আর অধিকাংশ নারী নামের পূর্বে ব্যবহার করেন ‘মুসাম্মৎ’। ‘মুহাম্মদ’ শব্দটির সঠিক বানান ও উচ্চারণ হচ্ছে ‘মুহাম্মাদ’(محمد)। এর অর্থ হচ্ছে ‘প্রশংসিত’। বিশ্ব নবীর নাম ছিল ‘মুহাম্মদ’ (সাঃ)। ‘মুহাম্মদ’ শব্দটি হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ অর্থবোধক শব্দ এবং নাম। অধিকাংশ মুসলিম ‘মুহাম্মদ’ (সাঃ) এর নামের বরকত লাভের জন্যে উম্মত হিসেবে তাঁর প্রতি তাদের গভীর ভালবাসা, ভক্তি, শ্রদ্ধা, আনুগত্য প্রকাশ এবং তাওহীদবাদের ঘোষণাস্বরূপ নামের প্রথমে ‘মুহাম্মদ’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

কিন্তু মুসলিম নারীগণের নামের প্রথমে ‘মুসাম্মৎ’ ব্যবহার করার কোন যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয় না। কারণ ‘মুসাম্মৎ’ শব্দটির সঠিক বানান ও উচ্চারণ হচ্ছে‘ মুসাম্মৎ’ (مسمة)। এর অর্থ হচ্ছে ‘নামধারিণী’। এ শব্দটির দ্বারা মানুষের মুসলমানিত্ব প্রকাশ পায় না এবং এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্যও প্রকাশ পায় না। সুতরাং মুসলিম নারীদের নামের পূর্বে মুসাম্মৎ শব্দটি ব্যবহার নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়।


উপসংহার 

উপরোক্ত আলোচনাকে পর্যালোচনা করলে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, অন্ধ অনুকরনে গা ভাসিয়ে না দিয়ে ইসলামী সংস্কৃতিতে আস্থা রেখে সন্তান জন্ম গ্রহণ করার পর পিতা-মাতার উপর দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানের জন্য একটি সুন্দর অর্থবোধক, মার্জিত, রূচিসম্পন্ন ইসলামী নাম নির্বাচন করা। 

Tuesday, September 15, 2020

২৯ সেপ্টেম্বরঃ বিশ্ব শিশু অধিকার দিবস। (শিশু অধিকার) সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার কর্তব্য।

২৯ সেপ্টেম্বরঃ বিশ্ব শিশু অধিকার দিবস।
(শিশু অধিকার) সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার কর্তব্য।



ভূমিকা 
শিশুই হল, দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। শিশুদের বাল্য কালের শিক্ষা-দীক্ষা যদি ভালো হয়, তবে তাদের আগামী দিন ও ভবিষ্যৎ ভালো হবে। তাতে দেশ, জাতি ও সমাজ তাদের দ্বারা হবে লাভবান ও উপকৃত। এ জন্য শিশুদের শিক্ষা, তা‘লীম, তরবিয়ত ও তদের চরিত্রবান করে গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্ব দেয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব কর্তব্যের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আলোচনা।

সন্তান লাভের জন্য স্বামী-স্ত্রীর প্রার্থনা 
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا ﴿الفرقان: ٧٤﴾ 
“এবং যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন। যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ নেতা বানিয়ে দিন।’’ -সূরা ফুরকান ঃ ৭৪ 

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ ﴿الصافات: ١٠٠﴾
‘‘হে আমার পরওয়ারদেগার। আমাকে এক সৎপুত্র দান কর।’’ -সূরা ছফ্ফাতঃ ১০০
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُ قَالَ رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ ﴿آل‌عمران: ٣٨﴾

‘‘সেখানেই যাকারিয়া তার পালনকর্তার নিকট প্রার্থনা করলেন। বললেন, হে, আমার প্রতিপালক! তোমার নিকট থেকে আমাকে পূত-পবিত্র সন্তান দান কর-নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থনা শ্রবণকারী।’’ -সূরা আলে ইমরানঃ ৩৮

সন্তান ও সম্পদ পরীক্ষা স্বরূপ 
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللَّهُ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ ﴿التغابن: ١٥﴾
“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষাস্বরূপ। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে মহা পুরস্কার।’’ -সূরা তাগাবুন ঃ ১৫

সন্তান ও সম্পদ ইবাদতের অন্তরায় 
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ ﴿المنافقون: ٩﴾
“হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” -সূরা মুনাফিকুন ঃ ৯

সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব কর্তব্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য 
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার কর্তব্য  বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ের উপর জানা বা জ্ঞান থাকার সাথে পিতা-মাতা ও সন্তান উভয়ের কল্যাণ জড়িত। শুধু তাই নয়, একটি সমাজের উন্নতি ও জাতির ভবিষ্যৎ শিশুদের শিক্ষা ও লালন- পালনের উপর নির্ভর করে। আজকের শিশুরাই হলো জাতির কর্ণধার ও আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এ কারণেই ইসলাম ও মনীষীগণ বিশেষ করে সমস্ত মনীষীদের সরদার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষা ও সঠিকভাবে লালন-পালন করার  বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। 

আমরা কুরআনুল কারীমে দেখতে পাই যে, আল্লাহ তা‘আলা শিক্ষণীয় ও উপদেশমূলক অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যাতে সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। অথচ বর্তমান বিশ্বের অসংখ্য শিশু মৌলিক অধিকারসহ বিভিন্ন প্রকার অধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অত্যাচার-নির্যাতন ও অমানুষিক শিশু শ্রমের কারণে সম্ভাব্য কুঁড়ি অকালেই ঝরে যাচ্ছে। এ অধিকার বঞ্চিত মানুষ অন্যায়-অত্যাচার, মাদকাসক্তি ও সন্ত্রাসের মত জঘন্যতম কাজে জড়িয়ে সমাজে সমস্যা সৃষ্টি করছে। 

নবজাতক শিশু ফলবান বৃক্ষের সাথে তুল্য। একটি চারাকে উত্তমরূপে পরিচর্চা করলে যেমন মজবুত কান্ড ও পত্র পল¬বে সুশোভিত পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে পরিণত হয়ে কাংক্সিক্ষতরূপে ফলদান করতে সক্ষম হয়। তেমনি উত্তমরূপে পরিচর্যা করলে প্রতিটি শিশু সুস্থ্য সবল এবং সুঠাম দেহের অধিকারী, পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। যাদের দ্বারা আমরা আগামী দিনে সোনালী ভবিষ্যৎ গড়তে পারি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  বিষয় হলো মাতৃগর্ভ থেকে শিশু অধিকার নিশ্চিত করা। 

মানব সভ্যতায় পিতা-মাতা ও সন্তানের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়, তাছাড়া পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যধিক। তাই শৈশব থেকে সন্তানকে প্রাপ্য অধিকার প্রদান ও উত্তম আচার-আচারণের দ্বারা আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কেননা মানব সন্তানের শৈশব হলো কাঁদা মাটির ন্যায়, শৈশবে তাকে যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে গড়ে তোলা যায়। স্থায়ীত্ব ও প্রভাব বিস্তারের দিক থেকেও শৈশবকালীন শিক্ষা মানব জীবনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে। শৈশবকালীন শিক্ষা সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে,
الْعِلْمُ فِي الصِّغَرِ كَالنَّقْشِ عَلَى الْحَجَر 
“শৈশবে বিদ্যার্জন (স্থায়ীত্বের দিক থেকে) পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্যের ন্যায়।”-বাইহাকী ঃ ৬৪০

ইসলাম যে শুধু শিশুর জন্ম মূহুর্ত থেকেই তার অধিকারের কথা ঘোষণা করেছে তা নয়, বরং তার জন্মের পূর্ব থেকেই তার অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিতে শৈশব হচ্ছে সৌন্দর্য, আনন্দ, সৌভাগ্য ও ভালোবাসার পরিপূর্ণ এক চমৎকার জগত। সন্তানকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যের উপকরণ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 
الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا﴿الكهف: ٤٦﴾
“ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য এবং স্থায়ী সৎকর্মসমুহ আপনার পালনকর্তার কাছে প্রতিদান প্রাপ্তি ও আশা লাভের জন্যে উত্তম।’’ -সূরা কাহাফ ঃ ৪৬

সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য
বৈধভাবে জন্মগ্রহণ করার অধিকার 
জুন্মগত বৈধতা ইসলামের পরিবার গঠনের ভিত্তি এবং শিশুর ন্যায্য অধিকার। এ ক্ষেত্রে অবৈধ যৌনমিলন থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা অবৈধ যৌনমিলনের ফলে মাবনদেহে নানারকম রোগ-ব্যধির সৃষ্টি হয়। উপরন্তু এতে অবৈধ সন্তান জন্মের আশংকা থাকে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “যে পিতার শয্যায় (বা সংসারে) সন্তান জন্ম গ্রহণ করে, শিশু সেই শয্যারই।” সহীহ বুখারী, পৃ ঃ ৭৮৭

নব জাতকের পিতাকে সুসংবাদ দেয়া বা অভিবাদন জানানো 
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا زَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَامٍ اسْمُهُ يَحْيَىٰ لَمْ نَجْعَل لَّهُ مِن قَبْلُ سَمِيًّا ﴿مريم: ٧﴾
“হে যাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম হবে ইয়াহ্হিয়া। ইতিপূর্বে এ নামে আমি কারও নামকরণ করিনি।’’ -সূরা মারইয়াম ঃ ৭- 
আল­াহ্ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,
وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَىٰ قَالُوا سَلَامًا ۖ قَالَ سَلَامٌ ۖ فَمَا لَبِثَ أَن جَاءَ بِعِجْلٍ حَنِيذٍ فَلَمَّا رَأَىٰ أَيْدِيَهُمْ لَا تَصِلُ إِلَيْهِ نَكِرَهُمْ وَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً ۚ قَالُوا لَا تَخَفْ إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَىٰ قَوْمِ لُوطٍ  َامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَاقَ وَمِن وَرَاءِ إِسْحَاقَ يَعْقُوبَ قَالَتْ يَا وَيْلَتَىٰ أَأَلِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهَٰذَا بَعْلِي شَيْخًا ۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيْءٌ عَجِيبٌ قَالُوا أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ ۖ رَحْمَتُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ ۚ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَّجِيدٌٖفَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَىٰ يُجَادِلُنَا فِي قَوْمِ لُوطٍ﴿هود: ٦٩-٧٤﴾

“আর অবশ্যই প্রেরিত ফেরেশতারা ইব্রাহীমের কাছে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল তারা বলল, সালাম, তিনিও বললেন, সালাম। অতঃপর অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি একটি ভুনা বাছুর নিয়ে এলেন। কিন্তু যখন দেখলেন যে, আহার্যের দিকে তাদের হস্ত প্রসারিত হচ্ছে না, তখন তিনি সন্ধিগ্ধ হলেন এবং মনে মনে তাদের সম্পর্কে ভয় অনুভব করতে লাগলেন। তারা বলল, ভয় পাবেন না। আমরা লুতের কওমের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তার স্ত্রীও নিকটেই দাড়িয়েছিল, সে হেসে ফেলল। অতঃপর আমি তাকে ইসহাকের জন্মের সুখবর দিলাম এবং ইসহাকের পরের ইয়াকুবেরও। সে বলল, কি দুর্ভাগ্য আমার। আমি সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছি আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ, এতো ভারী আশ্চর্য কথা। তারা বলল, তুমি আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে বিস্ময়বোধ করছ? হে গৃহবাসীরা, তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত ও প্রভূত বরকত রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রশংসিত মহিমায়। অতঃপর যখন ইব্রাহীম (সাঃ)-এর আতঙ্ক দূর হল এবং তিনি সুসংবাদ প্রাপ্ত হলেন, তখন তিনি আমার সাথে তর্ক শুরু করলেন কওমে লুত সম্পর্কে।’’ -সূরা হুদঃ ৬৯-৭৪


নবজাতকের কানে আযান দেয়া 
আবূ রাফে (রাঃ) বলেন,
عَن أبي رافعٍ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أذَّنَ فِي أُذُنِ الحسنِ ابنِ عليٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلَاةِ. (رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ)
“ফাতেমা (রাঃ) হাসান ইবন আলীকে প্রসব করার পর আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে দেখেছি তার কানে সালাতের আযানের ন্যায় আযান দিলেন।” -তিরমিযী ঃ ১৫১৪; আবূ দাঊদ; মিশকাত ঃ ৪১৫৭

সুন্দর নাম পাবার অধিকার 
নাম একটি জাতির স্বকীয়তা ও পরিচয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক। একটি সুন্দর বা উত্তম নাম পাওয়া প্রতিটি সন্তানের অধিকার হিসেবে শরী’য়ত স্বীকৃতি দেয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ وَابْنِ عَبَّاسٍ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمن وُلِدَ لَهُ وَلَدٌ فَلْيُحْسِنِ اسْمَهُ وَأَدَبَهُ فَإِذَا بَلَغَ فَلْيُزَوِّجْهُ فَإِنْ بَلَغَ وَلَمْ يُزَوِّجْهُ فَأَصَابَ إِثْمًا فَإِنَّمَا إثمه على أَبِيهগ্ধ (رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ)
“কারো সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে তার কর্তব্য হলো সে যেন তার জন্য একটি উত্তম ও সুন্দর নাম রাখে। জ্ঞান বুদ্ধি হলে তাকে উত্তম আদব শিক্ষা দেয়। যখন সে বয়:প্রাপ্ত হবে তখন তার বিবাহ দিবে। কেননা যদি সে বয়:প্রাপ্ত হয় আর পিতা যদি বিবাহ না দেয় তখন সন্তান কোন গুনাহের কাজ করলে সে গুনাহ তার পিতার হবে।’’ -বাইহাকী; মিশকাত ঃ ৩১৩৮

এ প্রসঙ্গে উইলিয়াম হাজলিটের (William Hajlitt) সাবলীল বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, A mane fast anchored in the deep abyss of time is like a star twinkling in the firmament cold, distant, silent, but eternal and sublime.” Willian Hajlitt. 
নাম কালের অতল তলে আবদ্ধ নোঙর, যেন দূর নীলিমায় মিটিমিটি তারকা, শান্ত, সুদূর সমাহিত, কিন্তু শাশ্বত সুউন্নত। 

সন্তানকে তাহনীক করানো 
সামান্য খেজুর চিবিয়ে নব জাতকের মুখে খানিকটা ঘষে দেয়াকে তাহনীক বলে। আবূ মূসা (রাঃ) বলেন,
عَنْ أَبِي مُوسَى، قَالَ: وُلِدَ لِي غُلاَمٌ، فَأَتَيْتُ بِهِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ্রفَسَمَّاهُ إِبْرَاهِيمَ، فَحَنَّكَهُ بِتَمْرَةٍ، وَدَعَا لَهُ بِالْبَرَكَةِ، وَدَفَعَهُ إِلَيَّগ্ধ، وَكَانَ أَكْبَرَ وَلَدِ أَبِي مُوسَى (بخاري)
“আমার একটি সন্তান জন্ম নিল। তাকে নিয়ে আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইব্রাহীম। তারপর খেজুর দিয়ে তাকে তাহনীক করেন। তিনি তার জন্য বরকতের দু’আ করেন এবং আমার কাছে তাকে ফিরিয়ে দেন। এটি ছিল আবূ মূসার বড় সন্তানের ঘটনা।’’ -বুখারী ঃ ৫৪৬৭, ৬১৯৮

সন্তান বেঁচে থাকার অধিকার এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ ۚ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْئًا كَبِيرًا ﴿الإسراء: ٣١﴾
“দারিদ্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ।’’ -সূরা বনী ইসরাঈল ঃ ৩১

সুস্থ্যতার অধিকার 
প্রত্যেকটি মানব শিশুরই সুস্থ্য শরীর নিয়ে জন্মগ্রহণ করার মানবিক অধিকার রয়েছে। একথা খুবই স্বাভাবিক যে, একজন পুষ্টিহীন মা কখনই সুস্থ্য শিশুর গর্বিত মা হতে পারে না। এ জন্যে মায়ের পুষ্টির ব্যাপারে অধিরিক্ত যতœ নেয়া প্রয়োজন। তাছাড়া গর্ভস্থিত ভ্র“ণের ঠিকমত গঠন ও বৃদ্ধির জন্য মাকে সুষম ও বাড়তি খাবার দিতে হবে। এ বাড়তি খাবার মায়ের স্বাভাবিক খাদ্য হতে ২০০ থেকে ৩০০ ক্যালোরী বেশী যোগাবার উপযোগী হবে।

মাতৃদুগ্ধ পান করার অধিকার 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ ۖ لِمَنْ أَرَادَ أَن يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ ۚ ﴿البقرة: ٢٣٣﴾
“আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ন দু'বছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়াবার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়।’’ -সূরা বাক্বারা ঃ ২৩৩

মাতৃদুগ্ধ শিশুর প্রথম আদর্শ খাবার
“মায়ের দুধের বিকল্প নেই”-এ কথাটি সর্বজনবিদিত। চিকিৎসা বিজ্ঞান বহু গবেষণার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, শিশুর জন্য মায়ের দুধই সর্বোত্তম ও নিরাপদ খাবার। মায়ের দুধে রয়েছে এমন সব উপাদান যা সব ধরনের সংক্রামণ থেকে শিশুকে রক্ষা করতে পারে। পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি ছাড়াও মায়ের দুধ শিশুর সুস্থ্য মানসিক বিকাশে সাহায্য করে। পাঁচ মাস বয়স পুরো হওয়া পর্যন্ত শিশুর জন্য যা প্রয়োজন তার সবই মায়ের দুধে আছে। শিশু খুব তাড়াতাড়ি ও সহজেই বুকের দুধ হজম করতে পারে। -ইসলাম ও মায়ের দুধ, মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, প্রজন্ম, ১৫ শ বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, ডিসেম্বর-১৯৯৫, পৃ ঃ ৭

স্বতন্ত্র শয্যায় নিদ্রা যাবার অধিকার 
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ سِنِين وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِগ্ধ (رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ)
“সাত বছর বয়সে শিশুকে সালাত পড়ার নির্দেশ দাও, দশ বছর হয়ে গেলে সালাত না পড়লে তাদেরকে শাস্তি দাও এবং তাদের জন্য পৃথক শয্যার ব্যবস্থা কর।’’ -আবূ দাঊদ; মিশকাত ঃ ৫৭২

ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার অধিকার 
আল্লাহ তা‘আলা এ প্রসঙ্গে বলেন,
وَلْيَخْشَ الَّذِينَ لَوْ تَرَكُوا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعَافًا خَافُوا عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللَّهَ وَلْيَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا ﴿النساء: ٩﴾
“তাদের ভয় করা উচিত, যারা নিজেদের পশ্চাতে দুর্বল,অক্ষম, সন্তান-সন্ততি ছেড়ে যায়। তবে মৃত্যুর সময় সন্তানদের জন্যে তারাও আশঙ্কা উদ্বিগ্ন করবে। সুতরাং তারা যেন আল্লাহকে  ভয় করে এবং সঙ্গত কথা বলে।” -সূরা নিসা ঃ ৯
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
 إِنَّكَ إِنْ تَذَرْ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
“নিজের সন্তানকে অন্যের দায়-দাক্ষ্যিণের উপর ফেলে যাবার চেয়ে অভাবমুক্ত রেখে যাওয়া উত্তম।” -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ৩০৭১

মতামত প্রদানের অধিকার 
শিশুর মতামত একেবারে নিম্নমানের সাধাসিধে বা মূল সমস্যা থেকে বহু দূরেই হোক না কেন, বিভিন্ন সমস্যার সময় তাদের মতামত গ্রহণ করা। তার মতামতকে তুচ্ছ জ্ঞান করা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা উচিত নয়, বরং তাতে কোন ভুল ভ্রান্তি থাকলে তা দেখিয়ে দেয়া ও সঠিক সমস্যা তার সামনে প্রকাশ করা। পিতা-মাতার এভাবে শিশুকে মতামত প্রদানের সুযোগদান শিশুকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং তাকে যথাযথ দিক-নির্দেশনা দানে সহয়তা করে।- 

বৈধ আয় থেকে প্রতিপালিত হবার অধিকার 
নিজে যেমন হালাল উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা ওয়াজিব, তেমনি সন্তান প্রতিপালন বৈধ উপার্জন থেকে খরচ করা কর্তব্য। তাই অবৈধ আয় যথা ঘুষ, চুরি, সুদ, প্রতারণা, অসৎকর্ম, নেশা, জুয়া ইত্যাদি উপায়ে অর্থ উপার্জন করে সন্তান প্রতিপালনের বিধান ইসলামে নেই। এ ধরনের অপকর্মের জন্যে সন্তানের কোন দায়িত্ব নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ لَا تُكَلَّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا ﴿البقرة: ٢٣٣﴾
“আর সন্তানের অধিকারী অর্থাৎ জনকের কর্তব্য হলো যথারীতি তাদের (মাতাগণের) খোর-পোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আদায় করা। কাউকে তার সাধ্যাতীত কার্যভারের সম্মুখীন করা হয় না।’’ -সূরা বাক্বারা ঃ ২৩৩

পিতা-মাতা, শিক্ষকসহ সকলেই সন্তান প্রতিপালনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা, এ দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। হাদীস শরীফে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: ্রأَلا كلُّكُمْ راعٍ وكلُّكُمْ مسؤولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
“তোমরা প্রত্যেকেই (রাখালের মত) দেখাশুনাকারী, আর এ দেখাশুনার ব্যাপারে প্রত্যেকেই জবাবদিহি করতে হবে।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ৩৬৮৫

শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে উঠার অধিকার 
হাদীস শরীফে এসেছে, আবূ রাফের মুনিব আবূ সালমান হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এরশাদ করেন, পিতা-মাতার উপর সন্তানের যেমন অধিকার রয়েছে তেমনি সন্তানের নিকটও পিতা-মাতার প্রাপ্য অধিকার রয়েছে। পিতা-মাতা হতে সন্তানের অধিকার হলো লিখতে শিক্ষা দেবে, সাঁতার শিক্ষা দেবে এবং তীরন্দাজী শিক্ষা দেবে। তাদের এমন কিছু শিক্ষা দেবে না, যা সন্তানকে ন্যায়িনিষ্ঠা করে না।’’-ইসলামী ঐতিহ্য পরিবার পরিকল্পনা, পৃ ঃ ৫৪; শিশু পরিচর্চা, পৃ ঃ ৫৬) 

আদব আখলাক শিক্ষা দেয়া 
শিশুকে মূলতঃ ভালো-মন্দ উভয় চরিত্রের মিশ্রণে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার পিতা-মাতাই তাকে ভালো-মন্দের যে কোনোটির দিকে ধাবিত করেন। আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, 
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنهُ كَانَ يحدث قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ كَمَا تُنْتَجُ الْبَهِيمَةُ بَهِيمَةً جَمْعَاءَ هَلْ تُحِسُّونَ فِيهَا مِنْ جَدْعَاءَ ثُمَّ يَقُول أَبُو هُرَيْرَة رَضِي الله عَنهُ (فطْرَة الله الَّتِي فطر النَّاس عَلَيْهَا) الْآيَةগ্ধ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
“প্রতিটি নবজাত শিশু ফিতরাত তথা ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। তারপর তার পিতা-মাতাই তাকে ইয়াহুদী বানায়, খ্রিস্টান বানায় অথবা অগ্নিপূজক বানায়। যেমন চতুষ্পদ জন্তু সে একটি জন্তু জন্ম দেয়, কিন্তু তার মধ্যে কোনটিকেই তুমি কান কাটা দেখতে পাবে না।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ৯০

অতএব হে অভিভাবক বা শিক্ষক ! রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বাণী আপনাদের জন্য সুখবর ! কারণ, তিনি বলেছেন,
فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِي اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
“তোমার দ্বারা যদি একজন মানুষকেও হিদায়াত দেয়া হয়, তা তোমার জন্য আরবের সবচেয়ে মূল্যবান উট লাল উট হতেও উত্তম।” -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ৬০৮৯

কন্যা জন্ম গ্রহণে নাখোশ হওয়ার নিন্দা 
অনেকে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তারা বেজায় নাখোশ হন। কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাতে রুষ্ট হওয়া মূলত জাহেলী চরিত্রের প্রকাশ। যার সমালোচনা করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ يَتَوَارَىٰ مِنَ الْقَوْمِ مِن سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ ۚ أَيُمْسِكُهُ عَلَىٰ هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ ۗ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ﴿النحل: ٥٨-٥٩﴾
“আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তনের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তার চেহারা (মুখ) কালো হয়ে যায়। আর সে অসহ্য মনকষ্টে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে (আত্মগোপন) থাকে। সে চিন্তা করে, অপমান সহ্য করে তাকে রেখে দেবে, না তাকে মাটির নীচে পুঁতে ফেলবে। শুনে রাখ, তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট।’’ -সূরা নাহল ঃ ৫৮-৫৯
এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, 
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَنْ كَانَتْ لَهُ أُنْثَى فَلَمْ يَئِدْهَا وَلَمْ يُهِنْهَا وَلَمْ يُؤْثِرْ وَلَدَهُ عَلَيْهَا - يَعْنِي الذُّكُورَ - أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَগ্ধ (رَوَاهُ أَبُو دَاوُد)
“যার কন্যা সন্তান হয়েছে, অথচ তাকে সে জীবন্ত কবর দেয় নি, তাকে লাঞ্ছিত করে নি কিংবা তার তুলনায় পুত্র সন্তানকে বেশী স্নেহ করে নি, আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’’ -আবূ দাঊদ; মিশকাত ঃ ৪৯৭৯

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন, 
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ هَكَذَاগ্ধ وضمَّ أصابعَه (رَوَاهُ مُسلم)
“যে ব্যক্তি সাবালক হওয়া পর্যন্ত দু’টি কন্যার ভার বহন করবে, ক্বিয়ামতের দিন আমি আর সে আবির্ভূত হব। একথা বলে তিনি তার হাতের দু’ আঙ্গুল একসঙ্গে করে দেখান।’’ -মুসলিম; মিশকাত ঃ ৪৯৫০ 

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, 
্রلَا يَكُونُ لِأَحَدٍ ثَلَاثُ بَنَاتٍ، أَوْ ثَلَاثُ أَخَوَاتٍ، أَوْ ابْنَتَانِ، أَوْ أُخْتَانِ، فَيَتَّقِي اللهَ فِيهِنَّ وَيُحْسِنُ إِلَيْهِنَّ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَগ্ধ 
“কারও যদি তিনটি মেয়ে কিংবা বোন থাকে অথবা দু’টি মেয়ে বা বোন থাকে আর সে তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে এবং তাদের সঙ্গে সদাচরণ করে, তবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।’’ -বুখারী; আদাবুল মুফরাদ; মুসনাদে আহমদ; মিশকাত ঃ ৪৯৭৫

ছেলে-মেয়ে সমব্যবহারের অধিকার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ ব্যাপারে বলেছেন,
اتَّقُوا اللهَ، وَاعْدِلُوا فِي أَوْلَادِكُمْগ্ধ (رَوَاهُ مُسلم)
“তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর এবং সন্তানদের ব্যাপারে ইনসাফ কায়েম কর।’’ -মুসলিম; মিশকাত ঃ ৩০১৯

হাদীসে বর্ণিত নিম্মোক্ত ঘটনা দ্বারা এ  বিষয়টি প্রমাণিত হয়। 
عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلًا كَانَ جَالِسًا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَجَاءَ بُنَيٌّ لَهُ، " فَأَخَذَهُ فَقَبَّلَهُ وَأَجْلَسَهُ فِي حَجْرِهِ، ثُمَّ جَاءَتْ بُنَيَّةٌ لَهُ، فَأَخَذَهَا وَأَجْلَسَهَا إِلَى جَنْبِهِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " فَمَا عَدَلَتْ بَيْنَهُمَا " (البيهقي)
“আনাস ইবন মালেক  বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। তার শিশু পুত্র তার নিকট এল। উক্ত সাহাবী তাকে চুম্বুন করলেন এবং কোলে বসালেন। একটু পরে তার কন্যা এলো। তাকে তিনি তার সামনে বসালেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবীকে বলেলেন তোমার কি উচিত ছিল না দুজনের প্রতি সমআচরণ করা।’’ -বাইহাকী ঃ ৮৩২৭- 

আদর্শবান সন্তান দুনিয়াতে যেমন সুখ ও শান্তির কারণ, তেমনি মৃত্যুর পরে ধন, বাহুবল ও প্রভাব প্রতিপত্তি যখন কোন কাজে লাগবে না তখন সৎ সন্তানই পরকালীন কল্যাণে আসবে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أوعلم ينْتَفع بِهِ أوولد صَالح يَدْعُو لَهُ (رَوَاهُ مُسلم)
“মানুষ যখন মারা যায় তখন তিনটি আমল ছাড়া (যা ইন্তেকালের পরেও পেতে থাকে) আর সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তিনটি আমল হলো, ১. সদকায়ে জারিয়া অর্থাৎ এমন সদকা যার কল্যাণকারীতা চলতে থাকে, ২. এমন ইলম যার দ্বারা জাতি উপকৃত হয়, ৩. এমন নেক (সৎ) সন্তান যারা তার মৃত্যুর পার তার জন্য দু‘আ করে।’’ -মুসলিম; মিশকাত ঃ ২০৩

উপসংহার 
পিতা-মাতার কাছে সন্তান পৃথিবীর মধ্যে সর্বোত্তম সম্পদ। এ সম্পদ আল্লাহর পক্ষ হতে মহৎ আমানত। সন্তানের হক বা অধিকার আদায় করে আল্লাহর  আমানত রক্ষা করা পিতা-মাতার উপর ফরয বা একান্ত কর্তব্য। সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে দেশ, জাতি ও ধর্মের কল্যাণে জন সম্পদ তৈরী করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে পার্থিব জগতে কল্যাণ ও পরকালীণ জীবনে মুক্তি অর্জন করার তাওফিক আল্লাহ  আমাদের সকল পিতা-মাতাদেরকে দান করুন।’’ -আমিন!!