Showing posts with label সীরাত. Show all posts
Showing posts with label সীরাত. Show all posts

Wednesday, October 20, 2021

রাসূলের সংক্ষিপ্ত আচরণ (ঈদে মিলাদুন্নাবী (সাঃ)

 


রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন বিশ্বনবী হিসেবে সকলের স্নেহের, স্বামী হিসেবে প্রেমময়, পিতা হিসেবে স্নেহের আধার, বন্ধু হিসেবে বিশ্বস্ত, উপরন্তু তিনি ছিলেন সফল আদর্শ ব্যবসায়ী, দূরদর্শী শ্রেষ্ঠ সংস্কারক, বীর যোদ্ধা, নিপুন সেনানায়ক, নিরপেক্ষ বিচারক, মহান রাজনীতিক এবং অপরাপর মহৎ গুণের অধিকারী। সর্বক্ষেত্রে তিনি সততা, নিষ্ঠা ও অপুর্ব সাফল্য সহকারে তার কর্তব্য সম্পাদন করে্ছেন।

একদিন আলী (রাঃ) প্রিয় নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সাধারণ আচার-ব্যবহার কোন নীতিগুলো দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে? প্রিয়নবী (সাঃ) বললেন, জ্ঞান আমার সম্পদ, যুক্তি আমার ধর্মের ভিত্তি, ভালোবাসা আমার বুনিয়াদ, ইচ্ছা আমার চালিকা শক্তি, আল্লাহর স্মরণ আমার নিত্য সহচর, বিশ্বাস আমার পুঁজি, উৎকণ্ঠা আমার সাথী, বিজ্ঞান আমার শক্তি, সবর আমার আবরণ, পরিতৃপ্তি আমার অমূল্য সম্পদ, সংযম আমার অহংকার, আরাম-আয়েশ পরিহার করাই আমার কাজ, বিশ্বাসের দৃঢ়তা আমার পাথেয়, আনুগত্য আমার পরিতৃপ্তি, জিহাদ আমার জীবনের বৈশিষ্ট্য, ইবাদত আমার অন্তরের আলো। (সূত্রঃ বিভিন্ন হাদীসের সংক্ষিপ্তরূপ)

কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা তাকে রহমাতুল্লিল আলামিন (সমগ্র জগতের রহমত), সাইয়েদুল মুরসালিন (সমস্ত নবীদের সরদার), উসওয়াতুন হাসানাহ (উত্তম আদর্শ ও চরিত্রের অধিকারী) বলে উল্লেখ করেছেন। দুনিয়াতে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন সিরাজুম মুনিরা (হেদায়েতের সুস্পষ্ট প্রদীপ) হিসেবে।

তিনি সমাজ থেকে অন্যায়, অনাচার, অসত্য, অন্ধকার দূরীভূত করে সত্য-সাম্য ও ন্যায় ভিত্তিক সমাজ গড়ে গেছেন মানবজাতির জন্য। তার ৬৩ বছরে সংক্ষিপ্ত জীবনের অনুপম শিক্ষা ও জীবন আদর্শ আমাদের ধর্মীয়, পার্থিব ও সামরিক জীবনে অনুসরণের মাধ্যমে শান্তি ও কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ঈদ-ই-মিলাদুন্নবীর (সাঃ) শিক্ষায় উদ্দীপ্ত হয়ে পরবর্তী দিনগুলো অতিবাহিত করার তৌফিক দান করুন।

Tuesday, October 27, 2020

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর প্রতি মুমিনের ভালবাসা : কিছু বর্ণনা, কিছু দৃষ্টান্ত


 

নবীজীর প্রতি ভালবাসা মুমিনের ঈমান

মুমিনের জীবনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মহব্বতের গুরুত্ব অপরিসীম। মহব্বতে রাসূল তো ঈমানের রূহ, মুমিনের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। এই ইশ্ক ও মহব্বত ছাড়া না ঈমানের পূর্ণতা আসে, আর না তার স্বাদ অনুভূত হয়। আর নিছক ভালবাসাই যথেষ্ট নয়, বরং পার্থিব সমস্ত কিছুর উপর এই ভালবাসাকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে ভালবাসার প্রকাশ ঘটতে হবে। হযরত আনাস রা. বলেছেনÑ

قَالَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتّى أَكُونَ أَحَبّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنّاسِ أَجْمَعِينَ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সমস্ত মানুষ থেকে প্রিয় হব। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ১৫

এ শুধু নীতিবাক্য নয়; বাস্তবেই মুমিনকে পৌঁছাতে হবে নবীপ্রেমের এ স্তরে। সকলের উপর, সবকিছুর উপর প্রাধান্য দিতে হবে আল্লাহ-আল্লাহর রাসূলকে; এমনকি নিজের জানের উপরও। শুনুন ওমর রা.-এর ঘটনাÑ আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম রা. বলেনÑ

كُنّا مَعَ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ وَهُوَ آخِذٌ بِيَدِ عُمَرَ بْنِ الخَطّابِ، فَقَالَ لَهُ عُمَرُ: يَا رَسُولَ اللهِ، لَأَنْتَ أَحَبّ إِلَيّ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِلّا مِنْ نَفْسِي، فَقَالَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: لاَ، وَالَذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، حَتّى أَكُونَ أَحَبّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ، فَقَالَ لَهُ عُمَرُ: فَإِنّهُ الآنَ، وَاللهِ، لَأَنْتَ أَحَبّ إِلَيّ مِنْ نَفْسِي، فَقَالَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: الآنَ يَا عُمَرُ!

একদিন আমরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। নবীজী ওমর রা.-এর হাত ধরা ছিলেন। ওমর রা. বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার কাছে সবকিছু থেকে প্রিয়, তবে আমার জান ছাড়া। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না ওমর, এতে হবে না। যে সত্তার হাতে আমার জান তাঁর কসম! (ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না,) যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার জানের চেয়েও প্রিয় না হই। পরক্ষণেই ওমর রা. বললেন, হাঁ এখন তা হয়েছে; আল্লাহর কসম! (এখন থেকে) আপনি আমার কাছে আমার জানের চেয়েও প্রিয়। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ ওমর! এখন হয়েছে। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ৬৬৩২

আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূলের ভালোবাসা যদি সবকিছুর উপরে না হয় তাহলে মুমিন পথ চলবে কীভাবে? আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূলের আদেশের সামনে সমর্পিত হবে কীভাবে? আজ বাধা হবে সন্তান, কাল স্ত্রী, পরশু পিতা। কখনো বা জানের মায়ায় লংঘিত হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ। আর মুমিন তো সেই, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মহব্বত ও নির্দেশের সামনে সবকিছু পিছে ঠেলতে জানে।

 

নবীজীর প্রতি ভালবাসা মুমিনের সম্বল

মুমিনের সবচে বড় দৌলত ঈমান। এই মহা দৌলতের স্বাদ যার নসীব হয়, সমস্ত দুঃখ কষ্ট তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়।

از  محبت  تلخہا  شیریں  شود

মহব্বতের কারণে সকল তিক্ত মিষ্টে পরিণত হয়।

আর এই স্বাদ সে-ই পায়, যার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে থাকে। হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনÑ

ثَلَاثٌ مَنْ كُنّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: مَنْ كَانَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبّ إِلَيْهِ مِمّا سِوَاهُمَا...

অর্থাৎ, তিনটি গুণের অধিকারী ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। তন্মধ্যে প্রথম হল, যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সবচেয়ে প্রিয় হবে। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৭

ঈমানের স্বাদ আস্বাদনের নগদ ও সবচেয়ে বড় ফায়দা হল ইবাদত ও আনুগত্যে আগ্রহ লাভ হওয়া। বরং ইবাদতই তখন প্রশান্তির কারণ হয়ে যায়।

إذا حلت الحلاوة قلبا

نشطت في العبادة الأعضاء

অর্থাৎ, হৃদয়ে যখন ঈমানের মিষ্টতা সঞ্চারিত হয়, তখন ইবাদতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উদ্যমী হয়ে ওঠে।

নবীজীর প্রতি ভালবাসা যেমনিভাবে ঈমান ও আমলে উৎকর্ষ লাভের উপায়, তেমনি তা আখিরাতে মহাসাফল্য অর্জনের সম্বল। আর প্রত্যেক মুমিনের কাক্সিক্ষত সে সাফল্য হল আখিরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গলাভ। স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেনÑ

المَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبّ

অর্থাৎ, ব্যক্তি যাকে ভালবাসে তার সাথেই তার হাশর হবে। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৪০

এ সম্পর্কে বড়ই শিক্ষণীয় ও চমৎকার একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন হযরত আনাস রা.। তিনি বলেছেনÑ

جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ مَتَى السّاعَةُ؟ قَالَ: وَمَا أَعْدَدْتَ لِلسّاعَةِ؟ قَالَ: حُبّ اللهِ وَرَسُولِهِ، قَالَ: فَإِنّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ.

قَالَ أَنَسٌ: فَمَا فَرِحْنَا، بَعْدَ الْإِسْلَامِ فَرَحًا أَشَدّ مِنْ قَوْلِ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَمَ: فَإِنّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ.

قَالَ أَنَسٌ: فَأَنَا أُحِبّ اللهَ وَرَسُولَهُ، وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ، فَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ مَعَهُمْ، وَإِنْ لَمْ أَعْمَلْ بِأَعْمَالِهِمْ.

অর্থাৎ, এক ব্যক্তি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল : ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিয়ামত কবে? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কী প্রস্তুতি নিয়েছ কিয়ামতের? সে জবাব দিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালবাসা। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘নিশ্চয়ই যাকে তুমি ভালবাস, (কিয়ামতের দিন) তার সাথেই থাকবে।

হযরত আনাস রা. বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর আমাদের কাছে সবচে’ খুশির বিষয় ছিল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই কথাÑ ‘নিশ্চয়ই যাকে তুমি ভালবাস, (কিয়ামতের দিন) তার সাথেই থাকবে।’

আনাস রা. বলেন, আর আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। আবু বকর ও উমরকেও। তাই আশা রাখি, আখেরাতে আমি তাঁদের সাথেই থাকব, যদিও তাঁদের মতো আমল আমি করতে পারিনি। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৩৯

আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে আখিরাতে তাঁর  রাসূলের সঙ্গ দান করেনÑ আমীন।

 

আনুগত্যই ভালবাসার দাবি

ভালবাসার সারকথাই হচ্ছে, আমি যাকে ভালবাসি তাঁর চিন্তা-চেতনা, চাওয়া-পাওয়ার সাথে একাত্ম থাকা। রুওয়াইম ইবনে আহমাদ আল বাগদাদী রাহ. মহব্বতকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেনÑ

المحبة الموافقة في جميع الأحوال  (كلمة الإخلاص للحافظ ابن رجب ص৩২)

অর্থাৎ, ভালোবাসা হল প্রেমাষ্পদের সাথে সর্বাবস্থায় একাত্ম থাকা।

সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মহব্বতের প্রকাশ হচ্ছে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ করা। যদি তা অগ্রাহ্য করা হয় তাহলে মহব্বতের দাবি করা অযৈাক্তিক। হাকীম মাহমূদ ওয়াররাক রাহ. বলেছেনÑ

لو كان حبك صادقا لأطعته

إن المحب لمن يحب مطيع

অর্থাৎ, যদি তোমার প্রেম খাঁটি হতো তবে তো তুমি তার অনুগত হতে। কারণ প্রেমিক তো প্রেমাষ্পদের অনুগত থাকে। Ñশরহুয যুরকানী আলাল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যাহ, পৃ. ১১৮

 

দরূদ পাঠ ভালবাসার প্রকাশ

স্বীকৃত বাস্তবতা হলÑ

من أحب شيئا أكثر ذكره.

অর্থাৎ, যে যাকে ভালোবাসে সে তার কথা বেশি বলে। বারবার তার আলোচনা করতে থাকে।

সুতরাং নবীপ্রেমিকের কাজই হবে তাঁর আনুগত্য, আর শ্বাস-প্রশ্বাস হবে তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ। সে যত বেশি তাঁর স্মরণ করবে ততই তার অন্তরে তাঁর প্রতি মহব্বতের প্লাবন হতে থাকবে। ইবনুল কায়্যিম রাহ. দরূদের সুফল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনÑ

أنها سبب لدوام محبته للرسول صلى الله عليه وسلم وزيادتها وتضاعفها

অর্থাৎ, দরূদপাঠ হল ইশকে রাসূলের স্থায়িত্ব ও প্রবৃদ্ধির কারণ।

তাছাড়া দরূদ পাঠ তো এমনিতেই অনেক সাওয়াব ও ফযিলতের বিষয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদেরকে দরূদ পাঠের আদেশ করে বলেছেনÑ

إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا .

অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি বিশেষ রহমত নাযিল করেন এবং তাঁর জন্য রহমতের দুআ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি অধিক পরিমাণে সালাত ও সালাম পেশ কর। Ñসূরা আহযাব (৩৩) : ৫৬

কোনও এক কবি বলেছেনÑ

اس دور سکوں سوز میں تسکیں نہ ملیگی                        کیف دل و جاں ذکر پیمبر سے ملیگا

অর্থাৎ, এ অশান্তির কালে শান্তি কোথাও নেই। শান্তি তো পয়গম্বর মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্মরণে।

 

সাহাবীগণের নবীপ্রেমের কিছু নমুনা

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালবাসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম রিযওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন। তাঁরা সত্যিকারের নবীপ্রেমের বেনজীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

হযরত আবু সুফিয়ান রা. ইসলাম গ্রহণের আগেই এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেনÑ

ما رأيت من الناس أحدا يحب أحدا كحب أصحاب محمد صلى الله عليه وسلم محمدا

অর্থাৎ, আমি কাউকে এতটা ভালবাসতে দেখিনি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর সঙ্গীরা যতটা ভালবাসে। Ñসীরাতে ইবনে হিশাম ২/১৭২; আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/৬৫

এমনিভাবে হযরত উরওয়া ইবনে মাসঊদ রা. ইসলাম গ্রহণের আগে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মুশরিকদের পক্ষ হয়ে কথা বলতে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর তিনি নিজ কওমের নিকট এই অনুভূতি পেশ করেছিলেনÑ

وَاللهِ لَقَدْ وَفَدْتُ عَلَى المُلُوكِ، وَوَفَدْتُ عَلَى قَيْصَرَ، وَكِسْرَى، وَالنّجَاشِيِّ، وَاللهِ إِنْ رَأَيْتُ مَلِكًا قَطّ يُعَظِّمُهُ أَصْحَابُهُ مَا يُعَظِّمُ أَصْحَابُ مُحَمّدٍ مُحَمّدًا، وَاللهِ إِنْ تَنَخّمَ نُخَامَةً إِلّا وَقَعَتْ فِي كَفِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ، فَدَلَكَ بِهَا وَجْهَهُ وَجِلْدَهُ، وَإِذَا أَمَرَهُمْ ابْتَدَرُوا أَمْرَهُ، وَإِذَا تَوَضَأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوئِهِ.

অর্থাৎ, আমি অনেক রাজা বাদশাহদের কাছে প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছি। কায়সার কিসরা ও নাজাশীর কাছেও গিয়েছি। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে তার সঙ্গীরা যেভাবে ভক্তি করে সেভাবে আমি আর কাউকে দেখিনি তাদের বাদশাহকে ভক্তি করতে। আল্লাহর কসম! তিনি থুথু ফেললেই তাদের কেউ না কেউ তা হাতে নিয়ে নেয় এবং তা চেহারায় ও শরীরে মাখে। তিনি যখন তাদেরকে আদেশ করেন তখন তারা তাঁর আদেশ পালনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর যখন তিনি অযু করেন তখন তাঁর ওযুতে ব্যবহৃত পানি পাওয়ার জন্য লড়াই করার উপক্রম হয়। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ২৫৮১    

হযরত আনাস রা. বলেনÑ

لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ وَالْحَلّاقُ يَحْلِقُهُ، وَأَطَافَ بِهِ أَصْحَابُهُ، فَمَا يُرِيدُونَ أَنْ تَقَعَ شَعْرَةٌ إِلّا فِي يَدِ رَجُلٍ.

অর্থাৎ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তাঁর চুল মুবারক মু-ন করা হচ্ছে আর তাঁর সাহাবীরা তাঁকে ঘিরে আছে। তাঁরা চাইছিলেন তাঁর একটি চুলও যেন মাটিতে না পড়ে। বরং কারো না কারো হাতেই পড়ে। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস  ২৩২৫

হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. মৃত্যুশয্যায় আয়েশা সিদ্দীকা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞাসা করলেনÑ

فِي أَيِّ يَوْمٍ تُوُفِّيَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ؟ قَالَتْ: يَوْمَ الِاثْنَيْنِ، قَالَ: فَأَيّ يَوْمٍ هَذَا؟ قَالَتْ: يَوْمُ الِاثْنَيْنِ، قَالَ: أَرْجُو فِيمَا بَيْنِي وَبَيْنَ اللّيْلِ.

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন্ দিন ইন্তেকাল করেছেন? আয়েশা রা. জানালেন, সোমবার। তিনি বললেন, আজ কী বার? জবাব দিলেন, সোমবার। তখন তিনি বললেন, হায় যদি আমার মওত রাতের আগেই হতো! Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ১৩৮৭

ভালবাসার দৃষ্টান্ত দেখুন। আমার মৃত্যুও যেন হয় সে দিনে, যে দিনে প্রেমাষ্পদের মৃত্যু হয়েছিল।

হযরত আম্র ইবনুল আস রা. মৃত্যুশয্যায় বলেছেনÑ

وَمَا كَانَ أَحَدٌ أَحَبّ إِلَيّ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، وَلَا أَجَلّ فِي عَيْنِي مِنْهُ، وَمَا كُنْتُ أُطِيقُ أَنْ أَمْلَأَ عَيْنَيّ مِنْهُ إِجْلَالًا لَهُ، وَلَوْ سُئِلْتُ أَنْ أَصِفَهُ مَا أَطَقْتُ؛ لِأَنِّي لَمْ أَكُنْ أَمْلَأُ عَيْنَيّ مِنْهُ.

এই পৃথিবীতে আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই-এর চেয়ে অধিক প্রিয় ও মহান আর কেউ নেই। আমার হৃদয়ে তাঁর সম্মান ও মর্যাদার এ অবস্থা ছিল যে, আমি তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারতাম না। আমাকে যদি তাঁর দেহাবয়বের বর্ণনা দিতে বলা হয়, আমি পারব না। কারণ, আমি দুচোখ ভরে তাঁকে দেখতে পারিনি। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯২  

হযরত জাবের রা. বলেন, উহুদ যুদ্ধের সময় রাতে আমার আব্বা আমাকে ডেকে বললেনÑ

مَا أُرَانِي إِلّا مَقْتُولًا فِي أَوّلِ مَنْ يُقْتَلُ مِنْ أَصْحَابِ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، وَإِنِّي لاَ أَتْرُكُ بَعْدِي أَعَزّ عَلَيّ مِنْكَ، غَيْرَ نَفْسِ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ.

আমার প্রবল ধারণা, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গীদের মধ্যে আগেভাগেই শহীদ হবো। আর আমি তোমাকেই সবচেয়ে প্রিয় হিসেবে রেখে যাচ্ছি, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া (কারণ, তিনিই আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়)। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ১৩৫১

এই উহুদ যুদ্ধেরই ভয়াবহ মুহূর্তে আরেক সাহাবী হযরত আবু তালহা রা. নিজে ঢাল হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আক্রমণ প্রতিহত করছিলেন। একপর্যায়ে যখন নবীজী উঁকি দিয়ে দেখতে উদ্যত হলেন তখন আবু তালহা রা. বলে উঠলেনÑ

يَا نَبِيّ اللهِ، بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي، لاَ تُشْرِفْ يُصِيبُكَ سَهْمٌ مِنْ سِهَامِ القَوْمِ، نَحْرِي دُونَ نَحْرِكَ.

ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনি উঁকি দেবেন না; পাছে আপনার গায়ে কোনো তীর এসে লাগে। আমার বুক আপনার জন্য উৎসর্গিত। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ৩৮১১

কবির ভাষায়Ñ

تمنا یہی ہے یہی آرزو ہے

یہ جان حزیں کاش تجھ  پر فدا ہو

আশা-আকাক্সক্ষা এই তো ছিল শুধু, জীবন যদি হতো তোমাতে বিলীন।

আরেক নারী সাহাবীর ঘটনা তো আরও বিস্ময়কর। উহুদ যুদ্ধেরই ঘটনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ দীনারের এক নারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার স্বামী ও ভাই উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। লোকেরা যখন তাকে সমবেদনা জানাতে গেল তখন তিনি জানতে চাইলেন, নবীজী কেমন আছেন?। তারা বলল, ভালো আছেন আলহামদু লিল্লাহ। (তাতেও তাঁর মন শান্ত হল না। বললেনÑ)

أَرُونِيهِ حَتّى أَنْظُرَ إِلَيْهِ.

তবুও আমি নিজে দেখতে চাই; আমাকে দেখাও। অতপর যখন তাকে দেখানো হল তিনি বললেনÑ

كُلّ مُصِيبَةٍ بَعْدَكَ جَلَلٌ.

(আল্লাহ্র রাসূল, আপনি নিরাপদ আছেন!) আপনার (নিরাপত্তার) পরে সমস্ত বিপদ তুচ্ছ। Ñদালাইলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকী ৩/৩০২; সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৯৯

এরকম আরও বহু দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন সাহাবায়ে কিরাম রিযওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তীরাও নবীপ্রেমের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারে। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবার হৃদয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দেন। তাঁর সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করার তাওফীক দান করুনÑ আমীন। কবির ভাষায়Ñ

کوئی طلب ہے مجھے زیست  میں تو اتنی ہے

نبی کی چاہ ملے اور بے پناہ ملے

অর্থাৎ, আমার জীবনে যদি কেনো চাওয়া থাকে তবে তা এতটুকুই, যেন নবীর ভালোবাসা অফুরন্ত পাই।

মুমিনের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ভালোবাসাঃ কিছু বর্ণনা, কিছু দিষ্টান্ত।

 আমরা ছিলাম পথহারা, দিশেহারা। হেদায়াত ও সফলতার পথ সম্পর্কে ছিলাম অজ্ঞ। অতপর মহান রাব্বুল আলামীন হেদায়েতের বার্তা দিয়ে প্রেরণ করলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। তিনি এসে আমাদেরকে সত্য-মিথ্যা চিনিয়েছেন। আমাদের নিকট সত্য দ্বীন নিয়ে এসেছেন। নাজাতের পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পন্থা শিখিয়েছেন। এ ছিল আমাদের প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহের বর্ণনা পবিত্র কুরআনে মাজীদে এভাবে এসেছেÑ

لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ اِذْ بَعَثَ فِیْهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ اَنْفُسِهِمْ یَتْلُوْا عَلَیْهِمْ اٰیٰتِهٖ وَ یُزَكِّیْهِمْ وَ یُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِكْمَةَ وَ اِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ.



আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বড় অনুগ্রহ করেছেন; তিনি তাদেরই নিজেদের মধ্য হতে তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন, যদিও তারা এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল। Ñসূরা আলে ইমরান (৩) : ১৬৪
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমনিভাবে নবীগণের সর্দার তেমনিভাবে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবেও তিনি সকলের চেয়ে মহান। তিনি এমন এক উৎকৃষ্ট সমাজ রেখে গেছেন, যার নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তীরাও উৎকর্ষের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে। কারণ তিনি সমাজ বিনির্মাণ করেছেন ওহীর ভিত্তিতে, যে ওহী মানব সভ্যতার প্রকৃত উৎকর্ষ নিশ্চিত করে। আর তাই এই উম্মতের জন্য তাঁকে মনোনীত করা উম্মতের প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ। তবে এই অনুগ্রহ থেকে তারাই মূলত উপকৃত হয়, যারা ঈমান আনে। তাই আয়াতে ব্যাপকভাবে উম্মতের বদলে শুধু মুমিনদের কথা বলা হয়েছে।
তিনি এসেছেন রহমত হয়ে
তিনি জগদ্বাসীর জন্য রহমত হয়ে এসেছেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেনÑ
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ.
(হে নবী!) আমি তোমাকে বিশ্ব জগতের জন্য কেবল রহমত করেই পাঠিয়েছি। Ñসূরা আম্বিয়া (২১) : ১০৭
ইমাম ত্ববারী রাহ. বলেছেনÑ
أن الله أرسل نبيه محمدا صلى الله عليه وسلم رحمة لجميع العالم، مؤمنهم وكافرهم. فأما مؤمنهم فإن الله هداه به، وأدخله بالإيمان به، وبالعمل بما جاء من عند الله الجنة. وأما كافرهم فإنه دفع به عنه عاجل البلاء الذي كان ينزل بالأمم المكذّبة رسلها من قبله.
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জগতের সকলের প্রতি আল্লাহ পাকের রহমত। মুমিন-কাফির নির্বিশেষে সকল মাখলুকই কিয়ামত পর্যন্ত এই মহান রহমতের মাধ্যমে উপকৃত হতে থাকবে। মুমিনকে তো আল্লাহ তাআলা তাঁর মাধ্যমে হিদায়াত দান করেছেন। তাঁর উপর ঈমান আনা এবং তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে পয়গাম নিয়ে এসেছেন সে অনুযায়ী আমল করার কারণে তাকে জান্নাত দেবেন। আর এই উম্মতের অবিশ্বাসীকে তাঁর কারণে পূর্ববর্তী উম্মতের অবিশ্বাসীর মতো নগদ শাস্তি দেবেন না। Ñতাফসীরে ত্ববারী ১৮/৫৫২
মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী রাহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, কাফেরদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জিহাদ করেছেন সেটাও ব্যাপকার্থে প্রকাশ্য রহমত ছিল। কেননা এর মাধ্যমে বড় রহমত, যা তিনি আল্লাহর তরফ থেকে নিয়ে এসেছিলেন তার হেফাজত হয়েছিল। তাছাড়া এর ফলে এমন অনেকের ঈমানের প্রতি অন্তর্দৃষ্টি খুলে গিয়েছিল, যে ব্যাপারে তারা স্বেচ্ছায় অন্ধত্ব বয়ে বেড়াচ্ছিল। (দ্র. তাফসীরে উসমানী)
উম্মতের প্রতি নবীজীর দরদ
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন দয়া-মমতার সাগর। উম্মতের প্রতি ছিল তাঁর গভীর মায়া, সীমাহীন মমতা এবং তাদের কল্যাণ সাধনে ছিলেন সদা ব্যাকুল, ব্যতিব্যস্ত। তাদেরকে তিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসতেন। তিনি তাদের থেকে না এর কোনো প্রতিদান চাইতেন, আর না কৃতজ্ঞতা কামনা করতেন। চাইতেন শুধু তাদের নাজাত ও সফলতা। চাইতেন যেন উম্মত হেদায়েতের পথ হারিয়ে না ফেলে, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো আযাব তাদেরকে আক্রান্ত না করে। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রা. বলেছেনÑ
أَنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: تَلَا قَوْلَ اللهِ عَزّ وَجَلّ فِي إِبْرَاهِيمَ: رَبِّ اِنَّهُنَّ اَضْلَلْنَ كَثِیْرًا مِّنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِیْ فَاِنَّهٗ مِنِّیْ، وَقَالَ عِيسَى عَلَيْهِ السّلَامُ: اِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَاِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَ اِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَاِنَّكَ اَنْتَ الْعَزِیْزُ الْحَكِیْمُ، فَرَفَعَ يَدَيْهِ وَقَالَ: اللهُمّ أُمّتِي أُمّتِي، وَبَكَى، فَقَالَ اللهُ عَزّ وَجَلّ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ إِلَى مُحَمّدٍ، وَرَبّكَ أَعْلَمُ، فَسَلْهُ مَا يُبْكِيكَ؟ فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ الصّلَاةُ وَالسّلَامُ، فَسَأَلَهُ فَأَخْبَرَهُ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ بِمَا قَالَ، وَهُوَ أَعْلَمُ، فَقَالَ اللهُ: يَا جِبْرِيلُ، اذْهَبْ إِلَى مُحَمّدٍ، فَقُلْ: إِنّا سَنُرْضِيكَ فِي أُمّتِكَ، وَلَا نَسُوءُكَ.
অর্থাৎ, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াত পাঠ করলেন, যাতে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কথা উল্লেখ আছে : (তরজমা) “হে আমার রব! এসব প্রতীমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত হবে।” (আর সেই আয়াতও পড়লেন যেখানে আছে) (তরজমা) “(এবং ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন,) যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে তারা তো আপনারই বান্দা। আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে নিশ্চয়ই আপনার ক্ষমতাও পরিপূর্ণ এবং হিকমতও পরিপূর্ণ।” অতপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’হাত তুলে কেঁদে কেঁদে বললেনÑ
اللهُمّ أُمّتِي أُمّتِي.
‘হে আল্লাহ, আমার উম্মত! আমার উম্মত!!’ তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, হে জিবরাঈল! মুহাম্মাদকে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর সে কেন কাঁদে? যদিও তোমার রবই ভালো জানেন। অতপর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম নবীজীর কাছে এসে তা জিজ্ঞাসা করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব খুলে বললেন। যদিও আল্লাহ তাআলা সব জানেন। অতপর আল্লাহ তাআলা বললেন, হে জিবরাঈল! মুহাম্মাদকে গিয়ে বলো, আমি অচিরেই তোমার উম্মতের ব্যাপারে তোমাকে সন্তুষ্ট করব, ব্যথিত করব না। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ২০২
আরেক হাদীছে উদাহরণ টেনে নবীজী উম্মতের প্রতি তাঁর দরদকে এভাবে বুঝিয়েছেনÑ
مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَثَلِ رَجُلٍ أَوْقَدَ نَارًا، فَجَعَلَ الْجَنَادِبُ وَالْفَرَاشُ يَقَعْنَ فِيهَا، وَهُوَ يَذُبُّهُنَّ عَنْهَا، وَأَنَا آخِذٌ بِحُجَزِكُمْ عَنِ النَّارِ، وَأَنْتُمْ تَفَلَّتُونَ مِنْ يَدِي.
অর্থাৎ, আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সে ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত, যে আগুন জ্বালালো, ফলে ফড়িংদল পতঙ্গরাজি তাতে পড়তে লাগল। আর সে ব্যক্তি তাদের তা থেকে তাড়াতে লাগল। অনুরূপ আমিও আগুন থেকে রক্ষার জন্য তোমাদের কোমর ধরে টানছি, আর তোমরা আমার হাত থেকে ছুটে যাচ্ছ। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৮৫
উম্মতের হেদায়েত লাভে তাঁর দরদ ও আত্মত্যাগের মাত্রা বুঝবার জন্য কুরআন কারীমের এই একটি আয়াতই যথেষ্টÑ
فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلٰۤی اٰثَارِهِمْ اِنْ لَّمْ یُؤْمِنُوْا بِهٰذَا الْحَدِیْثِ اَسَفًا
অর্থাৎ, মনে হয় যেন আপনি ওদের পিছনে পরিতাপ করতে করতে স্বীয় প্রাণ নাশ করে ফেলবেন, যদি ওরা এই বাণীর প্রতি ঈমান না আনে। Ñসূরা কাহ্ফ (১৮) : ৬
এমনকি অকৃতজ্ঞ উম্মতের ধৃষ্টতার সামনেও তাঁর দয়ার বাঁধ ছিল অটল। তায়েফবাসীর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন তাওহীদের বাণী, হেদায়েতের পয়গাম। তাদেরকে দেখাতে চেয়েছিলেন মুক্তির পথ। কিন্তু তাদের অজ্ঞতা তাদের উপর চেপে বসল। চরম ধৃষ্টতা দেখিয়ে তারা নবীজীর উপর চড়াও হল। পাথরের আঘাতে তাঁকে জর্জরিত করল। আঘাতে আঘাতে তাঁকে রক্তাক্ত করে ফেলল। কেঁপে উঠল আল্লাহর আরশ। পাঠালেন জিবরীল আমীনকে। জিবরীল বললেনÑ
إِنّ اللهَ عَزّ وَجَلّ قَدْ سَمِعَ قَوْلَ قَوْمِكَ لَكَ، وَمَا رَدّوا عَلَيْكَ، وَقَدْ بَعَثَ إِلَيْكَ مَلَكَ الْجِبَالِ لِتَأْمُرَهُ بِمَا شِئْتَ فِيهِمْ، قَالَ: فَنَادَانِي مَلَكُ الْجِبَالِ وَسَلّمَ عَلَيّ، ثُمّ قَالَ: يَا مُحَمّدُ، إِنّ اللهَ قَدْ سَمِعَ قَوْلَ قَوْمِكَ لَكَ، وَأَنَا مَلَكُ الْجِبَالِ وَقَدْ بَعَثَنِي رَبّكَ إِلَيْكَ لِتَأْمُرَنِي بِأَمْرِكَ، فَمَا شِئْتَ، إِنْ شِئْتَ أَنْ أُطْبِقَ عَلَيْهِمُ الْأَخْشَبَيْنِ
আপনার কওম আপনার উদ্দেশে যা বলেছে এবং আপনার সাথে যে আচরণ করেছে আল্লাহ তা দেখেছেন। আপনার আদেশ পালনে পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতাকে পাঠিয়েছেন। তখন পাহাড়ের ফিরিশতা আমাকে সম্বোধন করে সালাম দিল এবং বলল, আমি পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতা। হে মুহাম্মাদ! আপনার কওমের বক্তব্য আল্লাহ শুনেছেন। আমাকে পাঠিয়েছেন আপনার আদেশ পালন করতে। আপনি আমাকে কী আদেশ করবেন করুন। আপনি যদি আদেশ করেন তাহলে আমি দুই পাহাড়ের মাঝে এদেরকে পিষে ফেলব।
কিন্তু দয়ার সাগর নবীজী জবাব দিলেনÑ
بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ وَحْدَهُ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا.
(আমি এটা চাই না;) বরং আমি আশা রাখি, আল্লাহ তাআলা এদের বংশধরদের মাঝে এমন মানুষ বের করবেন, যারা এক আল্লাহ্র ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ১৭৯৫; সহীহ বুখারী, হাদীস ৩২৩১
একান্ত জাগতিক বিষয়েও উম্মতের বিপদাপদে নবীজী ছিলেন নিঃস্বার্থ সহযোগিতার আধার। সাহাবী হযরত আবূ হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনÑ
مَا مِنْ مُؤْمِنٍ إِلّا وَأَنَا أَوْلَى النّاسِ بِهِ فِي الدّنْيَا وَالآخِرَةِ، اقْرَءُوا إِنْ شِئْتُمْ: اَلنَّبِیُّ اَوْلٰی بِالْمُؤْمِنِیْنَ مِنْ اَنْفُسِهِمْ فَأَيّمَا مُؤْمِنٍ تَرَكَ مَالًا فَلْيَرِثْهُ عَصَبَتُهُ مَنْ كَانُوا، فَإِنْ تَرَكَ دَيْنًا، أَوْ ضَيَاعًا فَلْيَأْتِنِي فَأَنَا مَوْلاَهُ.
অর্থাৎ, দুনিয়া ও আখেরাতে আমি প্রত্যেক মুমিনেরই সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতর। ইচ্ছা হলে তোমরা এ আয়াতটি তিলাওয়াত করÑ
اَلنَّبِیُّ اَوْلٰی بِالْمُؤْمِنِیْنَ مِنْ اَنْفُسِهِمْ.
(মুমিনদের পক্ষে নবী তাদের প্রাণ অপেক্ষাও বেশি ঘনিষ্ঠ।) তাই সম্পদ রেখে কোনো মুমিন মারা গেলে আত্মীয়-স্বজন তার ওয়ারিস হবে। আর যদি সে ঋণ কিংবা অসহায় পরিজন রেখে যায়, তবে তারা যেন আমার নিকট আসে। আমিই তাদের অভিভাবক। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ৪৭৮১
দেখুন, স্বার্থহীনতার কেমন আদর্শ ছিলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। একদিকে অসহায় উম্মতের অভিভাবক তিনি। কিন্তু অপরদিকে তাদের বিত্ত বৈভবের দাবিদার নন। আর তাই তো অন্যত্র নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনÑ
إِنّمَا أَنَا لَكُمْ مِثْلُ الْوَالِد.
অর্থাৎ, আমি তোমাদের জন্য পিতৃতুল্য। Ñসহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ৮০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ১৪৩১
বরং তিনি কি জন্মদাতা পিতার চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ নন?
ইহলোক পাড়ি দিয়ে আখিরাতের কঠিন মুহূর্তেও এ উম্মতের মুক্তির সুপারিশ করবেন তিনি। এই প্রসঙ্গে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনÑ
لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ يَدْعُو بِهَا فَيُسْتَجَابُ لَهُ، فَيُؤْتَاهَا، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
অর্থাৎ, প্রত্যেক নবীকে এমন একটি বিশেষ দুআর অধিকার দেয়া হয়েছে, যা কবুল করা হবে। তারা (দুনিয়াতে) সে দুআ করেছেন এবং তা কবুলও করা হয়েছে। আর আমি আমার দুআ কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফাআতের উদ্দেশ্যে মূলতবী রেখেছি। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৯
ইমাম নববী রাহ. এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেনÑ
في هذا الحديث بيان كمال شفقة النبي صلى الله عليه وسلم على أمته، ورأفته بهم، واعتنائه بالنظر في مصالحهم المهمة، فأخر النبي صلى الله عليه وسلم دعوته لأمته إلى أهم أوقات حاجاتهم.
অর্থাৎ, এই হাদীসে উম্মতের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণ মায়া-মমতা ও দরদের কথা এবং তাদের কল্যাণসাধনে তাঁর প্রচেষ্টার কথা ফুটে উঠেছে। তাইতো তিনি এই উম্মতের জন্য তাঁর বিশেষ দুআ তাদের সবচে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য তুলে রেখেছেন।
যার মমতার বিস্তৃতি এত তাঁর জন্য তো মনের চাওয়াÑ
نکل جاۓ جاں تیرے قدموں کے نیچے یہی دل کی حسرت یہی آرزو ہے
তোমার চরণতলে জীবন সঁপে দিই, এই তো হৃদয়ের আশা আকুলতা ।
উম্মতের প্রতি নবীজী কী পরিমাণ দয়ার্দ্র ও অনুগ্রহশীল ছিলেনÑ এখানে তার কিঞ্চিতই বিবৃত হল। আল্লাহ তাআলা এককথায় বড় সুন্দরভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেনÑ
لَقَدْ جَآءَكُمْ رَسُوْلٌ مِّنْ اَنْفُسِكُمْ عَزِیْزٌ عَلَیْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِیْصٌ عَلَیْكُمْ بِالْمُؤْمِنِیْنَ رَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ.
(হে মানুষ!) তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে এক রাসূল এসেছে। তোমাদের যেকোন কষ্ট তার জন্য অতি পীড়াদায়ক। সে সতত তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত সদয়, পরম দয়ালু। Ñসূরা তাওবা (৯) : ১২৮
তো যেই নবী উম্মতের জন্য এতটা মহানুভব ছিলেন; সেই নবীর প্রতি উম্মতের আচরণ কেমন হওয়া চাই!

মহানবী (সা.) মানবতার জন্য কীভাবে কষ্ট ভোগ করেছিলেন
মানবজাতির জন্য মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসার একটি নিদর্শন হলো এই যে, তিনি তাঁর বিরোধীদের হাতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের স্বীকার হয়েও তাদেরকে তাঁর বিজয়ের পর অবলীলায় ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
মহানবী (সা.) যখন তাঁর নবুওয়াতি মিশনের কাজ শুরু করেন, তখন তাঁর শহরের প্রায় সকল লোকই তাঁর বিরোধিতা করে যদিও তারা তাঁর জীবনের শুরু থেকেই তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী সৎ এবং বুদ্ধিমান লোক হিসেবেই জানত। প্রথমদিকে তারা মৌখিকভাবে তাঁকে আক্রমণ এবং তিরস্কার ও অপমান করতে থাকে। পরে তারা মৌখিক আক্রমণের সাথে দৈহিক আগ্রাসনও যুক্ত করে দেয়। তারা তাঁর পথের ওপর কাঁটা ছড়িয়ে দিত, তাঁর গায়ে ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করত। একবার তিনি যখন ঘরে ফিরলেন তখনও তাঁর মাথায় ধুলোমাটি লেগেই ছিল। তাঁর মেয়ে অশ্রুসজল নেত্রে সেই ধুলোবালি মুছে দিয়েছিলেন। মহানবী (সা.) তাঁর সমাজের মানুষেরা তাঁর সাথে যে আচরণ করেছে সেজন্য যতটা না কষ্ট পেয়েছিলেন তার চেয়ে অধিক কষ্ট পেয়েছিলেন নিজ কন্যার চোখে অশ্রু দেখে। তিনি এই বলে কন্যাকে সান্ত¡না দেন : ‘কেঁদো না, মা আমার! আল্লাহই তোমার বাবার সহায় হবেন।’
একবার তাঁর শহরের লোকজন নবী করীম (সা.)-এর ওপর ভিন্ন এক ধরনের আঘাত হানার চেষ্টা করল। একদিন নবীজী (সা.) কাজের লোক খুঁজতে বের হলেন। একটা লোকও তাঁর দিকে তাকালো না, কিংবা কথাও বলল না বা তাঁকে তিরস্কার বা অপমানও করল না। বাকহীন ভাষায় তারা নবীজীকে বুঝাতে চাইল : ‘তুমি আমাদের কেউ নও, কারণ, তুমি আমাদের ঐতিহ্যগত প্রথার বিরুদ্ধে কথা বল।’ আগে থেকে তিনি যেসব তিরস্কার ও অপমান সয়ে অভ্যস্ত ছিলেন এই ব্যাপারটাতে তিনি তার চেয়েও বেশি আহত হলেন।
মহানবী (সা.) যখন অনুভব করলেন যে, তিনি মক্কাবাসীদের সাথে পেরে উঠছেন না, তখন তিনি হজ উপলক্ষে মক্কায় আসা বাইরের লোকদের দিকে অধিকহারে নজর দিতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু আবু লাহাবের মতো লোকদের কারণে মক্কায় আগত তীর্থ যাত্রীদের মধ্যে তাঁর তৎপরতা বিফল হতে লাগল। আবু লাহাব নবীজীর পিছনে পিছনে যেত আর চিৎকার করে বলত : ‘এই লোককে বিশ্বাস করো না, সে মিথ্যাবাদী, বিশ্বাসঘাতক।’ একদিন নবীজী বিশেষভবে দুঃখভারাক্রান্ত হলেন। কিন্তু তিনি কিছুই করলেন না, শুধু ওপরের দিকে তাকিয়ে বললেন : ‘হে প্রভু! আপনি না চাইলে এমন হতে পারত না!’
৬২০ খ্রিস্টাব্দে নবীজী (সা.) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি মক্কার বাইরে গিয়ে তাঁর বাণী প্রচার করবেন যাতে মক্কার বাসিন্দারা তাঁকে অনুসরণ করতে না পারে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি তায়েফকেই তাঁর প্রথম পছন্দ হিসেবে নির্বাচন করে। মক্কা থেকে ৬০ মাইল পূর্বে অবস্থিত এই তায়েফ ছিল নিকটতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। তায়েফের পথে ভ্রমণে যায়েদ ছিল তাঁর একমাত্র সঙ্গী। উঁচু-নিচু, পাহাড়-পর্বতসহ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে নবীজী (সা.) এক ক্লান্তিকর ভ্রমণে বের হলেন। তায়েফে তিনি ১০ দিন থাকলেন। গোত্রপ্রধান এবং সাধারণ মানুষের নিকট তাঁর বাণী পৌঁছালেন। কিন্তু তারা সবাই এ বলে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল যে, নতুন এক ধর্মের জন্য তারা মক্কাবাসীদের সাথে স¤পর্ক নষ্ট করতে চায় না। যতই দিন যেতে লাগলো তায়েফবাসী ততই তাঁর ওপর চড়াও হতে থাকল। অবশেষে ১০ম দিনে তারা তাঁকে পথে পথে তাড়া করতে আর তাঁর ওপর প্রস্তর নিক্ষেপ করতে লাগল। এমনকি তিনি যখন শহর ছেড়ে চলে আসছিলেন, উত্তেজিত জনতা তাঁর পিছু নিল এবং তাঁকে তপ্ত মরু-বালুর মধ্য দিয়ে তাড়া করে মাইল তিনেক দূরে পাহাড়ের পাদদেশে না পৌঁছা পর্যন্ত ধাওয়া করতে থাকল। তখন তাঁর দুই পা থেকে রক্ত ঝরছিল। ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় রক্তমাখা পায়ে তিনি একটা বাগানে আশ্রয় নিলেন। যায়েদ নবীজীর প্রতি নিক্ষিপ্ত পাথর থেকে নবীজীকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করতে করতে অবশেষে নিজেই মাথায় পাথরের আঘাতে আহত হলেন।
কয়েক বছর পর নবীজী আরবের অন্যতম শহর মদিনায় যথেষ্ট সমর্থন লাভে সক্ষম হলেন। তিনি সেখানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেললেন। কিন্তু মক্কাস্থ তাঁর শত্রুরা তাঁকে মদিনায় হিজরতের আগেই জানে মারার ষড়যন্ত্র করল, যা সফলতার দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এমনকি শত্রুতাপূর্ণ মক্কা থেকে তুলনামূলক বন্ধুভাবাপন্ন মদিনায় হিজরতের পরও মহানবীর দুর্ভোগ চলতেই থাকল। কুরাইশ বংশ এবং তাদের প্রভাবাধীন অন্যান্য আরব গোত্র তাঁর ও
তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই যুদ্ধ বাধাতে থাকল। মদিনাতেও ইহুদিরা তাঁর ওপর ক্ষেপে গেল এবং তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে লাগল, এমনকি এক সময় নবীজীকে বিষ প্রয়োগে হত্যার উদ্যোগ নিতেও কুণ্ঠিত হলো না। মুনাফিকরা ছিল নবীজীর গোপন শত্রু; তারা মুসলমান হওয়ার ভান করত মাত্র। তারাও ষড়যন্ত্র এবং নবীজীর বিরুদ্ধে কানাকানি শুরু করে দিল। এসবের একটি নোংরা উদাহরণ হলো তারা নবীজীর স্ত্রী হযরত আয়েশার বিরুদ্ধে চরিত্রগত অভিযোগ তুলল, যা নবীজীর জন্য যেমন বেদনাদায়ক ছিল তেমনি ছিল হযরত আয়েশার জন্যও। কখনো কখনো মুমিনগণও অনিচ্ছাসত্ত্বেও নবীজীর জন্য কষ্টের কারণ ঘটাত। দৃষ্টান্তস্বরূপ, তারা কখনো কখনো অভদ্রজনোচিতভাবে নবীজিকে একা ফেলে রেখে তাঁর কাছ থেকে চলে যেত আর তিনি একা একা দাঁড়িয়ে থাকতেন। আল-কোরআনের নি¤েœাক্ত আয়াতই এ কথার সাক্ষ্য বহন করে:
‘তারা যখন কোন ব্যবসাবাণিজ্য কিংবা ক্রীড়াকৌতুক দেখে, তখন আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে সেদিকে ছুটে যায়…’ (সূরা জুমআ : ১১)
অনেক বছর ধরেই মহানবী (সা.) এই সকল এবং এ রকম আরও বহু দুর্ভোগের স্বীকার হয়েছেন। নবুওয়াতি মিশন শুরুর আগে মানুষ সাধারণভাবে যা আশা করতে পারে এমন সবকিছুই তাঁর ছিল। সুস্বাস্থ্য, সমৃদ্ধ ব্যবসা, সুন্দরী স্ত্রী, সুন্দর সুন্দর সন্তানাদি, বিশ্বস্ত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব এবং সে সাথে ছিল নিজ এলাকাবাসীর আস্থা ও শ্রদ্ধা। চাইলেই তিনি মক্কায় অন্য যে কারো মতো আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কষ্ট আর দুর্ভোগের রাস্তাই বেছে নিয়েছিলেন। আর তিনি তা করেছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য এবং তাদের জন্য যারা অজ্ঞতাবশত তাঁকে নির্যাতন-নিপীড়নের স্বীকার বানিয়েছিল।