
বক্তৃতার আধুনিক কলাকৌশল।
(Modern
technique of speech) Islam is not only a religion, but also a complete code of
life.
অর্থাৎ, ইসলাম শুধু একটি ধর্মই নয়, বরং এতে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সুতরাং ইসলাম মানবজীবনের সকল বিষয়ে সুসমন্বিত
ও সুচারুরূপে দিকনির্দেশনা দয়েছে। আর ইসলামের প্রতিটি বিধিবিধানই সর্বাধুনিক ও বাস্তবসম্মত।
বক্তৃতারও ইসলামি রীতিনীতি রয়েছে। সভা-সমাবেশ বা অনুষ্ঠানে সমাগত দর্শকশ্রোতাদের
উদ্দেশে কোনো বিষয়ে বা কোনো প্রসঙ্গে বক্তব্য প্রদানকেই বলা হয় বক্তৃতা বা ভাষণ।
বক্তৃতাকে আরবিতে ১ (খুতবা) আর ইংরেজিতে Speech স্পীচ) বলা হয়। বক্ততা এক ধরনের বাকশিল্প। সুসভ্য সমাজে গণজ্ঞাপনের এ
এক আনুষ্ঠানিক মাধ্যম।
আধুনিককালে বাগ্মিতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ বলে স্বীকার করা হয়। প্রাচীন গ্রীস
এবং রোমে বাগ্মিতার বিশেষ চর্চা করা হতো।
বক্তৃতা মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। অতীতে যারা বিভিন্ন আন্দোলনে
নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের বক্তৃতা শুনেই মানুষ উজ্জীবিত হয়েছে, জীবন বিলিয়ে
দিয়েছে। সাধারণ মানুষ তাত্ত্বিক বই পড়ে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় না, তারা
আদর্শ প্রচারকদের বক্তব্য শুনেই আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মহানবি হযরত মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ আলোর মশাল হয়ে
সমগ্র বিশ্ববাসীকে পথ দেখাচ্ছে।
মহান আল্লাহ তাআলা বক্তৃতার যোগ্যতা সকলকে সমানভাবে দান করেননি। কেউ সাধারণ
একটি কথাও অল্প কথায়,
মিষ্টি ভাষায় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। আর কেউ অতি
গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে গিয়েও জড়তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
নবী রাসুলদের ইতিহাস পর্যালোচনা
করলে দেখা যায়, সকল নবি-রাসুলকে একই দীনের দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানোর পরও সকলের বক্তৃতা
রাখার যোগ্যতা এক ধরনের ছিল না। হযরত দাউদ আ.-এর কথা শোনার জন্য মাছেরাও নদীর
কূলে ভিড় জমাতো। অপরদিকে হযরত মুসা আ.-এর মুখের জড়তার কারনে আল্লাহপাক তাঁর ভাই
হযরত হারুন আ.-কে তাঁর সহযোগী নবি করেন। হযরত মুসা আ. তাঁর জিহ্বার জড়তা দূর করার
জন্য মহান আল্লাহর কাছে এভাবে করেছিলেন
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي* وَيَسِّرْ لِي
أَمْرِي* وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي * يَفْقَهُوا قَوْلِي
অর্থ : আমার প্রভু, আমার
বক্ষ প্রসারিত করে দিন। আমার কাজগুলো সহজ করে দিন এবং আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে
দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। (সুরা তোয়াহা, আয়াত নং ২৫-২৮)
পবিত্র কুরআন মাজিদে উল্লিখিত হযরত মুসা আ.-এর উপযুক্ত দোয়া থেকে বোঝা যায়, উত্তমভাবে
দীনের কথা তুলে ধরার জন্য বক্তৃতা দেয়ার চেষ্টা করা ভালো, সুবক্তা
হওয়া ভালো গুণ। সুবক্তা হওয়ার কতিপয় আদব ও কৌশল নিম্নে তুলে ধরা হলো।
১। প্রথমে
সালাম দেয়া :
বিভিন্ন সভা-সমাবেশে
বক্তৃতা করার ক্ষেত্রে দেখা যায়, বক্তাগণ মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সুদীর্ঘ
বন্দনার অবতারণা করার পর সালাম দেন। যেমন- ‘মঞ্চে উপবিষ্ট শ্রদ্ধেয় সভাপতি, মাননীয়
পরিচালক, মান্যগণ্য।অমুক অমুক সাহেব ও আমার শ্রোতা বন্ধুরা, আসসালামু
আলাইকুম।' এ | রীতিটা ভুল। নিয়ম হলো,
শ্রোতাদের মুখোমুখি হওয়ার সাথে সাথে সালাম দেয়া। হাদিস
অনুযায়ী কারো সঙ্গে কথা শুরুর আগে সালাম বিনিময় হওয়া সুন্নাত।
২। হাসিমুখে কথা বলা :
শ্রোতারা বক্তার
হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি দেখতে চান। বক্তব্যের বিষয় গুরুগম্ভীর হলেও বক্তার মুখে
যেন একটি স্মিত হাসি লেগেই থাকে। হাদিস অনুযায়ী কারো সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা
সাদকার সমতুল্য।
৩। সম্বোধন দিয়ে শুরু করা
:
ভাষণে সম্বোধনপূর্বক
বক্তব্য পেশ রীতিসম্মত। প্রত্যেক সভারই একজন সভাপতি থাকেন। প্রথমে তাকে সম্বোধন
করুন। এরপর মঞ্চে উপবিষ্ট অন্য অতিথিবৃন্দ এবং শ্রোতাদের। খেয়াল রাখবেন, সম্বোধনপর্ব
যেন খুব বেশি দীর্ঘ না হয়।
৪। সময়ের প্রতি খেয়াল
রাখা :
সুবক্তার একটি বড় গুণ, নির্ধারিত
সময়ের মধ্যে
বক্তব্য শেষ করা। নির্ধারিত সময়ে বক্তৃতা শেষ না করলে, শ্রোতাদের
মধ্যে বিরক্তিভাব আসে। কোনো সভা, সমাবেশ ও সেমিনারে বক্তৃতা রাখার সময় সময়ের গুরুত্ব দেয়া
খুবই জরুরি।
৫। তথ্য জোগাড় করা :
যে বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন, সে
বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য জোগাড় করুন। মনে মনে ভাষণের একটি কাঠামো দাঁড় করান। এ জন্য বক্তৃতার নির্ধারিত সময় জেনে নিন। কারণ ১৫ মিনিটের ভাষণের জন্য ৪০ মিনিটের
ভাষণ প্রস্তুত করে রাখলে বক্তৃতা দেয়ার সময় অধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বাদ দিয়ে
কম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বলার সম্ভাবনা থাকে। আবার ৪০ মিনিটের
ভাষণের জন্য ১৫ মিনিটের ভাষণ প্রস্তুত করে রাখলে বক্তৃতা দেয়ার সময় কথা খুঁজে
পাওয়া কষ্ট হয়। তাই সময় অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয়া উচিত।
৬। বক্তৃতা মুখস্থ না করা
:
মুখস্থ বক্তৃতা শ্রোতারা
শুনতে চায় না, তাদের কাছে একঘেয়ে মনে হয়। শ্রোতারা বক্তার হৃদয় নিংড়ানো কথা শুনতেই ভালোবাসেন।
মুখস্থ বক্তৃতা শুনতে কৃত্রিম মনে হয়। অপরদিকে একাডেমিক প্রোগ্রামে মুখস্থ
বক্তৃতা বেমানান। তাই বক্তৃতা মুখস্থ করার পরিবর্তে মূল উপাদান ও পয়েন্টগুলো
হৃদয়ঙ্গম করে নিজ আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে হবে।
৭। আবেগময়ী ভাষায়
সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেয়া :
বক্তৃতা বেশি দীর্ঘ করার
চেয়ে সংক্ষিপ্ত ও অর্থবহ করা দরকার। প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম খুব সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ বক্তৃতা পেশ করতেন। তাঁর বক্তৃতা হতো
অতিশয় উদ্দীপনা দানকারী,
যা শ্রোতাদের মনে আবেগ সঞ্চার করতো। ফলে হযরত
ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ত্যাগ ও কুরবানীর জন্য উজ্জীবিত হতেন।
৮। নোট ব্যবহার করা:
সাধারণত বক্তব্যের বিষয়বস্তু অনুসারে বক্তব্যের আউটলাইন নির্ধারণ করা হয় এবং
সংক্ষিপ্ত নোট প্রস্তুত করা হয়। এ কাজে আজকাল অনেক মোবাইল, ল্যাপটপ,
মাল্টিমিডিয়াসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে থাকেন। বক্তৃতা দেয়ার সময় অনুসরণ করা
ভালো। এজন্য মাঝে মধ্যে চোখ বুলাতে হয়। তবে দেখে দেখে পড়া উচিত নয়। নোট দেখে
দেখে পড়লে শ্রোতাদের শোনার আগ্রহ কমে যায়। অবশ্য রিসার্চ স্টুডেন্টদের প্রবন্ধ
দেখে দেখে পড়তে হয়। প্রয়োজনানুযায়ী বিষয়বস্তু নির্ধারণ:
হাজরত মূহম্মদ
সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্রোতাদের প্রয়োজন এর প্রতি খেয়াল রেখে কথা
বলতেন।
তাকে একবার
প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, কোন আমল সর্বোত্তম?
তিনি জবাব দিলেন,
জিহাদ ফি
সাবিলিল্লাহ। আরেক সময় একই প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাব দিলেন,
পারস্পরিক
সম্পর্ক। হাদিছ বিশারদ গান বলেন, প্রশ্নকারী কিংবা যে স্থানে বক্তৃতা দিয়েছেন তাদের প্রতি
খেয়াল রেখেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই প্রশ্নের
কয়েক ধরনের উত্তর দিয়েছেন।
৯। শ্রোতাদের মন
থাকলেই কথা বলা:
শ্রোতাদের
মনোযোগের প্রতি খেয়াল রেখে বক্তৃতা দেয়া উচিত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ
রাযিআল্লাহু তা'আলা আনহু প্রত্যেক বৃহস্পতিবার ওয়াজ-নসিহত করতেন।
জনৈক ব্যক্তি তাঁকে বললেন| ‘হে আবু আবদুর রহমান, আমি চাই আপনি প্রতিদিনই ওয়াজ-নসিহত
করুন।' জবাবে
তিনি বলেন- “আমি প্রতিদিন ওয়াজ-নসিহত করা অপছন্দ করি। আমি কয়েকদিন
বিরতি দিয়ে তোমাদের ওয়াজ-নসিহত করে থাকি। যেমন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরতি দিয়ে আমাদের ওয়াজ-নসিহত করতেন। আর আমাদের বিরক্ত হয়ে
যাওয়ার ভয়ে তিনি এরূপ করতেন।' (বুখারি ও মুসলিম)।
১০। শ্রোতাদের
বয়স ও যোগ্যতার প্রতি লক্ষ রেখে কথা বলা :
শ্রোতাদের বয়স
ও যোগ্যতার প্রতি লক্ষ রেখে কথা বলা উচিত। এ প্রসঙ্গে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- كلموا
الناس على قدر عقولهم
অর্থ : মানুষের সাথে তাদের বুদ্ধি অনুপাতে কথা বলো।
১১। প্রাঞ্জল ভাষায়
কথা বলা:
শ্রোতাদের
বোধগম্য ভাষায় কথা বলা এবং কঠিন শব্দ পরিহার করা উচিত। কেউ কেউ মনে করেন,
খুব কঠিন শব্দ প্রয়োগ
করলেই বক্তৃতা সুন্দর হয়; বিষয়টি তা নয়। শ্রোতারা কোনো কথা বুঝতে অপারগ হলে বক্তৃতা
শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। শেষনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
يَسِّرُوا
وَلاَ تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلاَ تُنَفِّرُوا
অর্থ
: সহজ করে দাও, কঠিন করে তুলো না। সুখবর শোনাও,
বিদ্বেষ ও ঘৃণাভাব
সৃষ্টি করো না।
১২। আঞ্চলিক ভাষা
এড়িয়ে চলা :
আঞ্চলিক ভাষা যথাসম্ভব
এড়িয়ে চলুন। | ভাষণে-বক্তৃতায় প্রমিত ভাষাই সঙ্গত। ব্যতিক্রমও আছে। অভিজ্ঞ
বক্তারা | ভাষণে বৈচিত্র্য ও রসসৃষ্টিতে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেন। বক্ততা
বা ভাষণ যেহেতু আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, যিনি আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া আর কিছুই জানেন না,
তিনি আঞ্চলিক ভাষায়
বক্তৃতা দিবেন।
১৩। সঠিক উচ্চারণ
করা :
লেখার ক্ষেত্রে যেমন
বানান ভুল, বক্তৃতায়-ভাষণে তেমনি ভুল উচ্চারণ গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো শব্দের
শুদ্ধ উচ্চারণ সম্পর্কে | সংশয় থাকলে উচ্চারণ অভিধানের সাহায্য নিন।
১৪। মুদ্রাদোষ ত্যাগ
করা :
কিছু মানুষের মুদ্রাদোষ
থাকে। কথার মাঝে একটু পর পর একই শব্দ কিংবা বাক্য উচ্চারণ করে। যেমন- ঠিক আছে’,
‘মানে,
‘বুঝছেন’,
‘মনে করেন,
“ইয়ে'
ইত্যাদি। মুদ্রাদোষ
যেমন শ্রুতিকটু, তেমন বিরক্তিকর। আপনার কোনো মুদ্রাদোষ আছে কিনা,
খেয়াল করুন এবং
তা পরিত্যাগ করুন।
১৫। মূল পয়েন্ট পুণর্ব্যক্ত করা :
প্রত্যেক বক্তাই বক্তৃতা দেয়ার সময় অনেক কথা বলেন। এর মধ্যে কিছু মূল পয়েন্ট
থাকে, আর কিছু কথা মূল পয়েন্ট ব্যাখ্যা করার জন্য বলা হয়। বক্তৃতা শেষ করার আগে মূল
পয়েন্ট পুনরায় ব্যক্ত করা ভালো। তাহলে শ্রোতার মনে মূল কথা বদ্ধমূল হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মূল কথা মাঝেমধ্যে তিনবার উচ্চারণ করতেন। হযরত আনাস
রাযি. বলেন- 'আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কথা বলতেন তখন তিনবার
পুনরাবৃত্তি করতেন,
যেন মানুষ| তাঁর কথা ভালোভাবে বুঝতে পারে।' (বুখারি)
১৬। উদাহরণ দেয়া :
শুধু তত্ত্বকথা বেশিক্ষণ শুনতে ভালো লাগে না। এ কারণে বক্তব্যের মাঝে কিছু উদাহরণ
দেয়া ভালো। আমরা মহাগ্রন্থ কুরআনুল কারিম অধ্যয়ন করার সময় দেখতে পাই যে, আল্লাহ তাআলা
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় উদাহরণ দিয়ে অনেক কথা বলেছেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর সামনে নসিহত পেশ করার সময় উদাহরণ, কাহিনি, ঘটনা, কৌতুক অথবা
দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বক্তৃতা বোঝাতেন। কখনো কখনো বিপরীত কথার সঙ্গে তুলনা করে ভালো
ও মন্দের পার্থক্য ভালোভাবে বোঝাতেন।
১৭। শ্রোতাদের অংশীদার করা :
আলোচনায় শ্রোতাদের মাঝেমধ্যে অংশীদার করা ভালো। এতে তাদের মধ্যে মনেযোগ বেশি থাকে।
প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বক্তৃতা দেয়ার সময় শ্রোতাদের
বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করতেন। বিদায় হজের ভাষণে উপস্থিত জনতাকে প্রশ্ন করেছেন, ‘আমি কি দীনের
দাওয়াত সঠিকভাবে পৌঁছিয়েছি?’ সকলেই জবাব দিয়েছেন, | হ্যা, আপনি যথাযথভাবে
দীনের দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন।
১৮। সকলেই শুনতে পায় এমন আওয়াজে কথা বলা :
জনসভা, সেমিনার, মসজিদ, সিম্পোজিয়ামে সাধারণত লাউড স্পিকার থাকে। আবার কখনো কখনো ছোট হলরুমে প্রোগ্রাম
হলে বিশেষত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক প্রেজেন্টেশানের সময় লাউড স্পিকার থাকে না। এ ধরনের
প্রোগ্রামে সকলে শুনতে পায় এমন আওয়াজে কথা বলা দরকার। তবে খুব চিৎকার করে কথা বলা
কিংবা মুখের ভেতর কথা রেখে নিম্নস্বরে কথা বলা ঠিক না। আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যম পর্যায়ের আওয়াজে কথা
বলতেন। তিনি পুরো বক্তৃতা পরিষ্কারভাবে পেশ করতেন। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন বাক্যগুলোর
শেষ বর্ণ পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে শোনা যেতো। প্রয়োজন মাফিক তাঁর গলার আওয়াজ ওঠানামা
করতো। সুতরাং তার কথায় অসাধারণ আকর্ষণ সৃষ্টি হতো।
১৯। অনর্থক
কথা না বলা :
প্রিয়নবি
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বক্তৃতা দেয়ার সময় প্রয়োজন পরিমাণ কথা বলতেন, শব্দ চয়ন করতেন। হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম ইরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অন্যাথায় চুপ থাকে।
২০। সর্বশেষ
কথা বারবার না বলা :
সর্বশেষ কথা
বলার পরই উপসংহার টানা উচিত। কেউ কেউ ভাষণের শেষে বলেন, 'আমি এখন সর্বশেষ কথা বলতে চাই'-এ কথা বলে অনেকক্ষণ বক্তৃতা দেয়ার পর আবার বলেন, “আমার সর্বশেষ কথা হচ্ছে’-এ কথা বলার পরও দীর্ঘক্ষণ বক্তৃতা করেন। এরপর যতবারই বলেন, শ্রোতারা আর বিশ্বাস করতে পারে না। তাই সর্বশেষ কথা বক্তৃতা
দেয়ার শেষ লগ্নে একবারই দেয়া উচিত।
২১। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ঠিক রাখা
:
আল্লাহর রাসুল হযরত মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যের মধ্যে যে ধরনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি
করতে চাইতেন, সর্বপ্রথম তার প্রভাব নিজের মধ্যে উপলদ্ধি করতেন। তাঁর অনুরূপ অবস্থার প্রভাব শ্রোতাদের
মধ্যে রেখাপাত করতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবয়ব, জযবা, বাচনভঙ্গি, কণ্ঠস্বরের
ওঠানামা ও শব্দ কিংবা বাক্যের প্রতি জোর দেয়ার ফলে বক্তব্যের গুরুত্ব শ্রোতাদের হৃদয়পটে
অঙ্কিত হয়ে যেতো।
২২। মানানসই
পোশাক পরা :
অনুষ্ঠানের সঙ্গে মানানসই পোশাক
পরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে বক্তার রুচিবোধ ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। সুতরাং অনুষ্ঠানের
সঙ্গে মানানসই পোশাক পরুন,
ফুরফুরে মেজাজে অনুষ্ঠানে আসুন।
২৩। নিশ্চিত
হয়ে কথা বলা :
সংশয় বা সন্দেহ নিয়ে কিছু
বলবেন না। যা বলবেন পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে বলুন। এ ব্যাপারে আপনারা আমার
চেয়ে ভালো জানেন’,
‘আমি কি বলতে চাইছি, আশাকরি আপনারা তা বুঝতে পেরেছেন। এ
জাতীয় সংশয়সূচক উক্তি বক্তার মনের অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে। মনে রাখবেন, আপনার কাছ
থেকে শ্রোতারা অনিশ্চিত কথা শুনতে আসেননি, এসেছেন নিশ্চিত সমাধানের কথা শুনতে।
২৪। ইতিবাচক
কথা বলা :
নেতিবাচন নয়, ইতিবাচক বক্তব্য
পেশ করুন। অন্যের ভুল না ধরে, নিজের কথা বলুন। হাজার সমস্যা নিয়ে খেদোক্তি না করে, কোনো একটি
সমস্যা থেকে উদ্ধারের এক বা একাধিক উপায় নিয়ে কথা বলুন।
২৫। সত্য কথা বলা :
সত্য মুক্তি দেয়, মিথ্যা ধ্বংস করে। সুতরাং স্বার্থসিদ্ধি বা শ্রোতাদের আকৃষ্ট
করার জন্য কখনোই অসত্য, বানায়াট, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা তথ্য তুলে ধরা যাবে না। মহান আল্লাহ তাআলা
বলেন- অর্থ : তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা
বলো। (সুরা | আহযাব, আয়াত নং ৭০) তাইতো বলা হয়- Honesty is
the best policy.
অর্থ : সততা
মানব চরিত্রের একটি মহৎ গুণ।
২৬। আত্মবিশ্বাস রাখা :
অনেকেই বিশেষত
শিক্ষার্থীরা বক্তৃতা দেয়ার জন্য দাঁড়ালে নার্ভাস হয়ে পড়েন। এর ফলে জানা অনেক কথাই
বলা সম্ভব হয় না। ইতোপূর্বে সাজানো বক্তৃতা গুছিয়ে বলতে পারেন না। সুতরাং বক্তৃতা
রাখার সময় নার্ভাস হওয়া যাবে না, নিজের প্রতি প্রবল বিশ্বাস রাখতে হবে।
২৭। তথ্য যাচাই করা :
সুবক্তার
একটি বড় গুণ, তথ্য যাচাই করে কথা বলা। কোনো কথা
কিংবা ঘটনা শুনলেই প্রচার করা যাবে না, আগে সত্যতা যাচাই করতে হবে। মিথ্যা ও গুজব প্রচার করা ভয়াবহ অন্যায়। হাদিস অনুযায়ী
শোনা কথা সত্য-মিথ্যা যাচাই ছাড়া বর্ণনা করা মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
২৮। ইখতিলাফ না বলা :
মাসায়েল
বলার ক্ষেত্রে বিরোধপূর্ণ মাসআলা না বলা। | যদি বলার প্রয়োজন হয় তাহলে সবচেয়ে উত্তম ও গ্রহণযোগ্য মত, যার ওপর ফতোয়া; শুধু সেই মতটাই বলা। ইমামদের ইখতিলাফ বা মতানৈক্য বক্তৃতার মজলিসে বর্ণনা করলে
শ্রোতারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন, কোনটার ওপর আমল করবেন।
এ ছাড়া ফিতনা ও গুজব ছড়ানোরও সমূহ সম্ভাবনা থাকে।
২৯। বক্তৃতা পর্যালোচনা করা :
আপনি কোথাও
বক্তৃতা রাখার পর শ্রোতাদের কারো মাধ্যমে বা নিজেই রেকর্ডিং করে নিজের বক্তৃতা পর্যালোচনা
করতে পারেন। ভবিষ্যতে আরও ভালো ও সুন্দরভাবে বক্তৃতা করার জন্য আত্মপর্যালোচনা জরুরি।
৩০। দুটি গুণ অর্জন করা :
সুবক্তার
মধ্যে দুটি গুণ অবশ্যই থাকতে হবে।
(১) অন্যকে
উপদেশ দেয়ার পূর্বে নিজে আল্লাহর পথে চলা এবং
(২) ওয়াজনসিহতের
বিনিময়ে মানুষের সাথে টাকার চুক্তি না করা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
অর্থ : তোমরা
তাদের অনসরণ করো, যারা তোমাদের কাছে
কোনো প্রতিদান চায় না। | উপরন্তু তারা সঠিক
পথে পরিচালিত। (সুরা ইয়াসিন, আয়াত নং ২১)।
ফাইলটি ডাউনলোড করুন।
ডাউনলোড


No comments:
Post a Comment