Wednesday, April 28, 2021

রমজানের শেষ দশক ও লাইলাতুল কদরের আমল

 



রমজানের শেষ দশক ও লাইলাতুল কদরের আমল


প্রিয় মুসলমানগণ! 

এই শেষ দশক সম্পর্কে প্রিয়নবি রসুলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামবলেছেন :

 أوله رحمة وأوسطه مغفرة وآخره عتق من النار

রমজানের শেষ ভাগ দোজখের আগুন থেমে মুক্তি বার।

শেষ দশকের মর্যাদা ও গুরুত্ব অন্য দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ইবাদাতের বসন্তকাল মাহে রমজানের উকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠাংশ হচ্ছে তার শেষ দশক। একে রমজানের সারাংশ ও তার শীর্ষ চূড়া বলেও অভিহিত করা যায়।

রমজানের শেষ দশ দিনের মর্যাদার কথা আমাদের কারোরই অজানা নয়। এ দিনগুলোতে দয়াময়ের পক্ষ থেকে করুণার বারিধারা ও মার্জনার প্রতিশ্রুতি এবং মুক্তির কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা মুমিন হৃদয়কে ব্যাকুল করে তোলে। এ জন্যই মহানবী (সা.) সাহাবায়ে কেরাম ও বুযুর্গানেদ্বীন এই দশকে ইবাদাতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ যত্নবান থাকতেন যেমনটি অন্য দিনকে করতেন না। 

عائشة -رضي الله عنها- قالت: "كانَ رَسولُ اللهِ -صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ- يَجْتَهِدُ في العَشْرِ الأوَاخِرِ، ما لا يَجْتَهِدُ في غيرِهِ" 

হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) রমজানের শেষ দশকে এতো পরিমাণ ইবাদত করতেন, যেমনটি তিনি অন্য সময় করতেন না।  (মুসলিম: ১১৭৫) 

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: «كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ العَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ»

অন্য এক হাদিসে হজরত আয়েশা (রাজি.) হতে বর্ণিত, যখন রমজানের শেষ দশকের আগমন হতো, রাসুল (সা.) সেসব রাত্রিগুলোতে বিনিদ্র থাকতেন, পরিবারের লোকদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতেন এবং (অধিক আমলের জন্য) শক্তভাবে কোমর বেঁধে নিতেন।  (বুখারী: ২০২৪)

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا، قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، «إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ، أَحْيَا اللَّيْلَ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ، وَجَدَّ وَشَدَّ الْمِئْزَرَ»

আয়েশা (রা.) বলেন, রমজানের শেষ দশক শুরু হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) সারা রাত জাগতেন, নিজের পরিবারবর্গকেও জাগিয়ে দিতেন। আর ইবাদাতে প্রচুর সাধনা ও অধিক পরিশ্রম করতেন। (মুসলিম, ২৬৬৩)

তাই, আমাদের জন্য অধিকতর সমীচিন হলো শেষ দশকের দিন-রাতের পুরো সময়কে কাজে লাগানো।

রমজানের শেষ দশকে রয়েছে লাইলাতুল কদর নামে একটি মহিমন্বিত রাত, তা হাজারো মাস অপেক্ষা উত্তম। শুধু এ রাতটির কারণেই এ দশককে অনায়াসে রমজানের রাজমুকুট বলা যায়। কুরআনে মহিমান্বিত এ রজনীর মর্যাদা ও মহাত্ম বর্ণনা করে স্বতন্ত্র একটি সূরাহ অবতীর্ণ হয়েছে।

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ (1) وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ (2) لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ (3) تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ (4) سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ (5)

আল্লাহ বলেন, শবে ক্বদর হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এ রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (অর্থা জিবরাঈল আ.) প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হন। সে রাত আদ্যোপান্ত শান্তি- ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরাহ আল ক্বাদর)

তাই এই রাতকে পেতে যথাযথভাবে রোজা পালন, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, কল্যানমূলক কাজ, দান-সদকা এবং দোয়ার মাধ্যমে এ সময়গুলোকে মূল্যবান করতে হবে। 

শেষ দশ দিনে আমরা যেন বেশি বেশি দোয়ায় আগ্রহী হই। 

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ أَرَأَيْتَ إِنْ عَلِمْتُ أَيُّ لَيْلَةٍ لَيْلَةُ القَدْرِ مَا أَقُولُ فِيهَا؟ قَالَ: قُولِي: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي.

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কোন রাতটি লাইলাতুল কদর আমি যদি তা বুঝতে পারি; তাহলে সে রাতে আমি কি দোয়া করব? রাসুল (সা.) বললেন, তুমি এই দোয়া করবে, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন, তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নী। অর্থা হে আল্লাহ! নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল-মহানুভব। আপনি ক্ষমা কতে ভালোবাসেন; তাই (অনুগ্রহপূবর্ক) আমাকে ক্ষমা করে দিন।  (তিরমিজী: ৩৫১৩) 

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। এই দোয়াটি অধিক পরিমাণে পাঠ করা উচিত। আর আমাদের উচিত হলো নিজেদের জন্য দোয়া করা এবং সব মুসলমানদের জন্য দোয়া করা; যাতে আমাদের উপর আপতিত এ মুসিবত বিদায় নেয়।

হে মুসলিমগণ!

বরকতের এ দিনগুলোতে আমাদের উচিত হলো সময়ের প্রতি যত্মবান হওয়া। কারণ সময় হলো সংরক্ষণের বিবেচনায় অতি মূল্যবান বস্তু। আর আমরা খুব সহজেই তা বিনষ্ট করে ফেলি। 

আজ সবচেয়ে প্রবঞ্চনা ও দূর্ভাগ্যের কারণ হলো, লোকজন আজ এমন কাজে নিজেদের সময় নষ্ট করে, যাতে তার কোন লাভ নেই। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ব্যবহারে আমাদের আরো সতর্ক থাকা উচিত।

তাই আমাদের কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, তাওবা, ইসতেগফার এবং দোয়ার প্রতি মনোনিবেশ করা দরকার। 

আল্লাহর ইরশাদ,

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ (186)

‘(হে নবী) আর আমার বান্দারা যখন আমার ব্যাপারে আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, বস্তুত আমি তাদের সন্নিকটেই আছি।  প্রার্থনাকারী যখন প্রার্থনা করে, তখন আমি তার প্রার্থনা কবুল করে থাকি। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা স পথে আসতে পারে।’ (সূরা বাকারা: ১৮৬) 

দোয়া মুমিনের মহান হাতিয়ার। বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে চলমান করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকট হতে উত্তরণের জন্য।

এছাড়া এ দশকে ইতিকাফ করার কথা বলা হয়েছে। যদিও বছরের যেকোনো সময় ইতিকাফ করা যায়। তবে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের ফজিলত ভিন্ন। এটা মহানবী সা, এর প্রিয় সুন্নাত।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রমজানের শেষ দশকে নবী করীম (সা.) ইতিকাফ করতেন। (বুখারী, হাদীস নং ২৪৯)

কোন স্থানে আটকে পড়া অথবা কোন স্থানে থেমে যাওয়াকে ইতিকাফ বলে। ইসলামী শরীয়াতের ভাষায় ইতিকাফের অর্থ কোনো লোকের দুনিয়ার সংস্রব, সম্বন্ধ ও বিবি বাচ্চা থেকে আলাদা হয়ে মসজিদে অবস্থান করা।

ইতিকাফের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ দুনিয়াবী কারবার ও সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সাংসারিক কর্মব্যস্ততা ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চিন্তা ও কাজের শক্তি এবং যোগ্যতাকে আল্লাহর স্মরণ এবং ইবাদতে লাগিয়ে দেবে। তারপর সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর প্রতিবেশি হয়ে পড়বে। এ কাজের দ্বারা একদিকে সে ব্যক্তি সব প্রকার বেহুদা কথাবার্তা ও মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকতে পারবে এবং অন্যদিকে আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক মজবুত হবে। তাঁর নৈকট্যলাভ করবে এবং তাঁর ইয়াদ ও ইবাদতের মনে শান্তি লাভ করবে।

কয়েকদিনের এ আমল তাঁর মনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে যে, চারদিকে দুনিয়ার রং তামাশা ও মন ভুলানো বস্তুসমূহ দেখার পরও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক মজুবত রাখতে পারবে। আল্লাহর নাফরমানি থেকে বাঁচতে পারবে এবং তার হুকুম পালন করে মনে আনন্দ অনুভব করবে। এমনিভাবে সমগ্র জীবন আল্লাহর বন্দেগীতে কাটিয়ে দেবে।

 

আমি নিজেকে এবং সকলকে খোদাভীতি এবং বরকতের এই দিন-রাতগুলোতে অধিক পরিমাণে ইবাদতের অসিয়ত করছি। 

 

 

 

No comments:

Post a Comment