Monday, October 19, 2020

১২ই রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্ম ও ওফাত দিবসঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জীবন, কর্ম, সম্মান, মর্যাদা ও ভালবাসা।

         


                   
 

ভূমিকা

রিসালাতের সাক্ষ্যর অবিচ্ছেদ্য অংশ মুহাম্মদ -এর মর্যাদায় বিশ্বাস করা ও তাঁকে সম্মান করা। তিনি সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মানবজাতির নেতা, নবী-রাসূলদের প্রধান। তিনি আল্লাহ প্রিয়তম বান্দা, তাঁর হাবীব, তাঁর সবচেয়ে সম্মানিত বান্দা, সর্বযুগের সকল মানুষের নেতা। অন্যান্য নবী রাসূলের সাধারণ মর্যাদা সবই তিনি লাভ করেছেন। তিনি নিষ্পাপ, মনোনীত ও সকল কলুষতা থেকে মুক্ত ছিলেন। নুবুয়্যত প্রাপ্তির আগে ও নুবুয়্যতের পরে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাকে সকল পাপ, অন্যায় ও কালিমা থেকে রক্ষা করেছেন। এছাড়াও আল্লাহ তাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন।

জন্ম ও মৃত্যু

প্রসিদ্ধ মতে ১২ রবিউল আওয়্যাল ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে মরুময় মক্কায় আরবের বিখ্যাত কুরাইশ বংশে আব্দুল্লাহর ওরশে মা আমিনার ঘরে প্রত্যুষে জন্ম গ্রহণ (শুভ আগমন) করেন। আবার বিশ্বনবী মুহাম্ম দুনিয়ার মিশন শেষ করে এ দিনেই দুনিয়া থেকে ইন্তিকাল করেছেন। একদিকে এ দিনটি খুশির দিন যেহেতু তার জন্ম দিন। অন্য দিকে দুঃখের দিন যেহেতু তিনি উম্মতকে ইয়াতিম করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমরা অনেকেই কিন্তুু খুশীর দিন হিসেবেই পালন করে থাকি।

 

ঈদ--মিলাদুন্নবী কথাটার অর্থ

ঈদে মিলাদুন্নবী কথাটার অর্থ হচ্ছে নবীর জন্মদিন উপলক্ষে খুশি বা উসব। নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ -এর দুনিয়াতে আগমন (জন্ম) আমাদের জন্য বরকতের ও খুশির  বিষয়। কিন্তুু খুশি ব্যক্ত করার তরিকা কি? তার তরিকা হলঃ রাসূলুল্লাহ -এর আদর্শ (সুন্নাত) কে ভালবাসা, রাসূলুল্লাহ -এর আদর্শের উপর থাকতে পেরে আনন্দ বোধ করা।

 

রাসূলুল্লাহ -এর জীবন

রাসূলুল্লাহ -এর পুরোজীবন (সিরাত) ছিল কুরআন। অর্থা কুরআনুল কারীমে যত আদর্শ বর্ণনা করা হয়েছে তা কিভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, কিভাবে সেটা জিন্দেগীর আমলে আনতে হবে, তার বাস্তবরূপ কেমন হবে রাসূলুল্লাহ তা আমাদেরকে দেখিয়ে গেছেন। তাই রাসূলুল্লাহ -এর জীবন হল কুরআনের ব্যাখ্যা। আর রাসূলুল্লাহ হলেন জীবন্ত কুরআন। রাসূলুল্লাহ -এর মিশনই ছিল কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা দিয়ে যাওয়া, তিনি তার কথা, কাজ ও সমর্থনের মাধ্যমে এ ব্যাখ্যা দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করে গেছেন। তিনি পুরো জীবন দিয়ে আমাদেরকে কুরআন বুঝিয়ে গেছেন। তিনি হলেন কুরআনী আদর্শের নমুনা। তাঁর জীবন (সীরাত) হল কুরআনের জীবন।

 

রাসূলুল্লাহ -এর সীরাতের আরো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে

আমরা অনেক মনীষীর জীবনী পাঠ করি, কিন্তুু সে ক্ষেত্রে আমরা তাদের জীবনের বিশেষ কিছু দিকের আলোচনা পাই। তা হলো সমাজের জন্য তিনি কি করেছেন, রাষ্ট্রোর জন্য কি করেছেন ইত্যাদি। অর্থা তাদের মধ্যে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা আদর্শ খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তুু জীবনের সব ক্ষেত্রের জন্য তাদের জীবনীতে আদর্শের নমুনা খুজে পাওয়া যায় না।

পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ -এর জীবনীতে জীবনের সমস্ত খুটি-নাটি বিয়য় এমনকি জীবনের গোপনীয় ক্ষেত্র পর্যন্ত সব কিছুর আদর্শের নুমনা পাওয়া যায়। দুনিয়ায় অন্য কোন মনীষীর ব্যক্তি জীবন কেমন ছিল, তার পরিবারের সাথে তিনি কেমন ছিলেন তার গোপন জীবনের অধ্যায় কেমন ছিল, সে অধ্যায়ে তার আদর্শ কি ছিল। এগুলো মানুষ আলোচনা করে না। কারণ আলোচনা করতে গেলে অনেক দোষ-ক্রটি বেরিয়ে আসবে। আর রাসূলুল্লাহ -এর জীবনের ঐসব গোপন বিষয়ও বর্ণিত হয়েছে। কারণ তার জীবনে সব কিছুর আদর্শ খুঁজে পাওয়া যেতে হবে। আর যদি গোপন  বিষয়গুলো বর্ণনা না করা হত তাহলে ঐ সব বিষয়ে আমরা তাকে অনুকরণ করতে পারতাম না। তার জীবনের সকল কিছু মানুষের সামনে পরিস্কার।

আল্লাহ পাক বলেন,

قُل لَّوْ شَاءَ اللَّهُ مَا تَلَوْتُهُ عَلَيْكُمْ وَلَا أَدْرَاكُم بِهِ ۖ فَقَدْ لَبِثْتُ فِيكُمْ عُمُرًا مِّن قَبْلِهِ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ ﴿يونس: ١٦﴾

 হে নবী নুবুয়্যত লাভ করার পর যারা সমালোচনা করছে তাদের বলে দিন, নবী হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার দীর্ঘ জীবন তোমাদের ভিতরে অতিবাহিত হয়েছে। আমার জীবনের সবকিছু তোমাদের সামনে আছে, তবুও কি বুঝনা যে আমি একজন আদর্শ মানুষ কি না?”-সূরা ইউনুছ- ১৬

 

রাসূলুল্লাহ -এর কর্ম

রাসূলুল্লাহ -এর প্রথম ও প্রধান কর্ম ছিল দীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠা। আল্লাহ তাআলা বলেন,

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ ﴿التوبة: ٣٣﴾ ﴿الفتح: ٢٨﴾ ﴿الصف: ٩﴾

 তিনিই (মহান আল্লাহ) যিনি তোমাদের নিকট সুস্পষ্ট হিদায়াত ও সঠিক জীবন বিধান সহকারে তার রাসূলকে পাঠিয়েছেন, যেন সে এ বিধানকে দুনিয়ার (মানব রচিত) সবকয়টি বিধানের উপর বিজয়ী করতে পারে। -সূরা তাওবা- ৩৩; -সূরা ফাতহ- ২৮; -সূরা সাফ- ৯

দীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ যে সকল ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। সেই অবদান গুলোকে বিশ্লে¬ষণ করলে তার কর্মজীবনকে প্রধান পাঁচটি স্তরে বিন্যাস করা যায়-

ক. ব্যক্তিগত জীবন ও কর্ম

খ. পারিবারিক জীবন ও কর্ম

গ. সামাজিক জীবন ও কর্ম

ঘ. রাষ্ট্রীয় জীবন ও কর্ম

ঙ. আর্ন্তজাতিক জীবন ও কর্ম

 

ব্যক্তিগত জীবন ও কর্ম

রাসূলুল্লাহ -এরব্যক্তিগত জীবন ও কর্মের মাঝে যে সকল গুণাবলী বিদ্যমান ছিলো সেগুলোর মধ্যে থেকে উলে­খ্যযোগ্য গুণাবলী হচ্ছে- খোদাভীরুতা ও পরকালের চিন্তা, বেশী বেশী আল্লাহর ধ্যান, সত্যবাদিতা, পরোপকার, লজ্জাশীলতা ও শালীলতা, আমানতদারী, ওয়াদা পালন, দানশীলতা, ক্ষমা, সহনশীলতা, দয়া ও কোমলতা, বিনয় ও নম্রতা, ন্যায় পরায়ণতা ও সুবিচার, সৃষ্টির সেবা, অন্যের প্রতি ভাল ধারনা পোষন করা, অল্পে তুষ্ট থাকা, ত্যাগ ও বদান্যতা, উদারতা ও মহানুভবতা, শোকর ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা, বড়কে শ্রদ্ধা ও ছোটকে স্নেহ করা, পরিস্কারও পরিচ্ছন্নতা এবং দেশ প্রেম ইত্যাদি সকল গুণাবলী ও কর্ম তার জীবনে বিদ্যমান ছিল।


পারিবারিক জীবন ও কর্ম

প্রত্যেক নবীই মানুষ ছিলেন, পারিবারিক জীবন তাঁদের থেকে কোন আলাদা  বিষয় ছিল না। রাসূলুল্লাহ -এর পারিবারিক জীবন ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও দৃষ্টান্ত স্বরূপ। স্ত্রী-সন্তানদের সাথে ছিলো তাঁর সুসর্ম্পক। যার দরুন তার স্ত্রী সন্তানগণ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি তার সকল স্ত্রীদের সাথে ইনসাফ প্রতিষ্টা করেছেন। যে সমাজে নারীর কোন সামাজিক মর্যাদা ছিলো না, সেখানে তিনি নারীকে সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। যা বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরনীয় আদর্শ।

সামাজিক জীবন ও কর্ম

রাসূলুল্লাহ -এর সামাজিক জীবনে রয়েছে মানুষের জন্য অনেক আদর্শ। তিনি সমাজের সর্বস্তরে শিক্ষা, ইনসাফ, যেনা-ব্যাভিচার প্রতিরোধ, নারীর সামাজিক মর্যাদা প্রদান, হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করা, বংশীয় বড়াই ও বর্ণবাদ উচ্ছেদ, কৃতদাস প্রথার বিলোপ সাধন, মদ-জুয়া নিষিদ্ধকরণ, সুদ-ঘুষ নিষিদ্ধ, কন্যা সন্তান জীবিত প্রথিতকরণ বিলোপ ও নারীর অধিকার স্থাপন, যুলুম নির্যাতন বন্ধকরণ এবং অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ দখল ও ভোগ ইত্যাদি বিষয়ে সামাজিক সংস্কার সাধন করেন।

রাষ্ট্রীয় জীবন

রাষ্ট্রীয় জীবনে রাসূলুল্লাহ আল্লাহর বিধান অনুসারে মদীনা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন এবং মদীনার সনদ বা সংবিধান প্রণয়ন করেন, যা পৃথিবীর সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত ও পরিচিত। তিনি মদীনা রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা, শত্র মুক্ত করণ, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সহাবস্থান নিশ্চিত করা, যাকাত প্রতিষ্ঠা, বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় ভান্ডার এবং যুদ্ধ বিগ্রহসহ একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন।


আন্তর্জাতিক জীবন

রাসূলুল্লাহ বিশ্বের বিভিন্ন রাজা-বাদশার নিকট দূত মারফতে চিঠিতে ইসলামের (শান্তির) বার্তা পাঠান যা রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক বার্তা বলা যায়। তাতে তিনি তাদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিয়ে শান্তির ছায়াতলে আনার আহবান জানান। এতে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার অবদান স্বীকৃত। যার মাধ্যমে কুটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার লক্ষণীয়।

 

রাসূলুল্লাহ -এর সম্মান ও মর্যাদা

আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ বিশ্ব মানবগোষ্ঠীর জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি সকল নবী ও রাসূলের নেতাও। আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ ﴿آل‌عمران: ١٦٤﴾

আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে সংশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তূত: তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট।-সূরা আলে-ইমরান- ১৬৪

 

মুহাম্মাদ -এর সম্মান ও মর্যাদা স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই নির্ধারণ করেছেন। তাই ইচ্ছা করে তার মর্যাদা কেউ বাড়াতে বা কমাতে পারবে না। ইসলাম বিদ্বেষীরা নবীকে নিয়ে যতই কটুক্তি করুক না কেন এবং তাকে যতই অবমাননা করুক না কেন আল্লাহ ততই তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। আল্লাহ বলেন,

وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ ﴿الشرح: ٤﴾

আমি আপনার আলোচনাকে সমুচ্চ করেছি।-সূরা আল-ইন্শিরাহ্- ৪

 

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আযানে বিশ্বব্যাপী মসজিদে মসজিদে তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে। মুয়াজ্জিন ঘোষণা দিচ্ছে,

أشهد أن محمدا رسول الله

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ  আল্লাহর রাসূল।

তাঁর উপর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ গ্রন্থ কুরআন নাযিল করা হয়েছে

আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে মানবতার হিদায়াতের জন্য যেসব কিতাব নাযিল করেছেন, তার মধ্যে আলকুরআন হলো সর্বশেষ আসমানী কিতাব, যা মুহাম্মাদ -এর উপর নাযিল করা হয়েছে। কুরআন মাজীদ নাযিল হওয়ায় তাঁর সম্মান ও মর্যাদাকে আরো সমুন্নত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَهُوَ الْحَقُّ مِن رَّبِّهِمْ ۙ كَفَّرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ ﴿محمد: ٢﴾

আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, কর্ম সম্পাদন করে এবং তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে মুহাম্মদের প্রতি নাযিলকৃত (গ্রন্থ) সত্যে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কর্মসমূহ মার্জনা করেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দেন। -সূরা মুহাম্মাদ- ২

 

আল্লাহ তাআলা কর্তৃক চারিত্রিক গুণাবলীর স্বীকৃতি

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ছিলেন উত্তম চরিত্র ও মাধুর্যপূর্ণ আচরণের অধিকারী। এ বিষয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা প্রশংসা করে বলেন, 

 وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ ﴿القلم: ٤﴾

আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।-সূরা কলম- ৪

আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুুল্লাহ্ ইরশাদ করেন,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- :«إِنَّمَا بُعِثْتُ لأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الأَخْلاَقِ (رواه البيهقي ,مشكوة-3/254- 5770)

 নিশ্চয় আমি চরিত্রের উকৃষ্ট দিকগুলোর পূর্ণতা দান করার উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছি-সুনান বায়হাকী- ২০৫৭১; মিশকাত-খ. ৩, পৃ. ২৫৪, হা- নং ৫৭৭০।

 

তিনি বিশ্ববাসীর জন্য রহমাত স্বরূপ

আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ -কে শুধু মানবমন্ডলী নয়, বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনে উলে­খ হয়েছে,

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ ﴿الأنبياء: ١٠٧﴾

আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত ¯¦রূপই প্রেরণ করেছি।-সূরা আম্বিয়া- ১০৭

রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «إِنَّمَا أَنَا رَحْمَةٌ مُهْدَاةٌ» (رَوَاهُ الدَّارِمِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ ,مشكوة-3/261- 5800)

 হে মানবমন্ডলী আমি রহমতের সওগাত স্বরূপ।-মুসতাদরাক লিল হাকিম- ১০০, মিশকাত-খ. ২, পৃ. ২৬১, হা- নং ৫৮০০।


তাঁর মাধ্যমে নুবুওয়্যাতের পরিসমাপ্তি

তাঁর সম্মান ও মর্যাদার অন্যতম দিক হলো, তাঁর মাধ্যমে নুবুওয়্যাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। তারপর আর কোন নবী বা রাসূল আসবে না। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে,

مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا ﴿الأحزاب: ٤٠﴾

মুহাম্মদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।-সূরা আল-আহ্যাব- ৪০

 

সকল নবী-রাসূলদের উপর তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে

যুগে যুগে যে সব নবী ও রাসূল আগমন করেছেন তাদের উপর মুহাম্মাদ -কে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। আবূ হুরায়রা  বর্ণিত হাদীসে নবী করীম ইরশাদ করেছেন,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ « فُضِّلْتُ عَلَى الأَنْبِيَاءِ بِسِتٍّ أُعْطِيتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ وَنُصِرْتُ بِالرُّعْبِ وَأُحِلَّتْ لِىَ الْغَنَائِمُ وَجُعِلَتْ لِىَ الأَرْضُ طَهُورًا وَمَسْجِدًا وَأُرْسِلْتُ إِلَى الْخَلْقِ كَافَّةً وَخُتِمَ بِىَ النَّبِيُّونَ (رواه مسلم ,مشكوة-3/249- 5748)

 ছয়টি দিক থেকে সকল নবীর উপর আামাকে শ্রেষ্টত্ব দান করা হয়েছে। আমাকে জাওয়ামিউল কালিম তথা ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য বলার যোগ্যতা দেয়া হয়েছে, আমাকে রুউব (ভীতিপূর্ণ গুরুগম্ভীর) দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে, গনীমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) আমার জন্যে বৈধ করা হয়েছে, আমার জন্যে যমীনকে পবিত্র ও সিজদার উপযুক্ত করা হয়েছে, আমি সকল মানুষের জন্যে প্রেরিত হয়েছি এবং আমার মাধ্যমে নবুওয়াত পর®পরা শেষ করা হয়েছে। ”-মুসলিম- ১১৯৫; মিশকাত-খ. ৩, পৃ. ২৪৯, হা- নং ৫৭৪৮।

 

তিনি সর্বপ্রথম শাফায়াত করবেন এবং সর্বপ্রথম তাঁর শাফায়াত কবুল করা হবে

কিয়ামতের কঠিন মুসিবতের দিনে আল্লাহ তাআলার অনুমতিক্রমে তিনি গুনাহগার উম্মাতের জন্য শাফায়াত করবেন। আবূ সাঈদ খুদরী  বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন,

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ، وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ تَنْشَقُّ الْأَرْضُ عَنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ، وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ، وَلَا فَخْرَ، وَلِوَاءُ الْحَمْدِ بِيَدِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا فَخْرَ» (ابن ماجه-2/1440- 4308)

 কিয়ামতের দিন আমি সকল আদম সন্তানের নেতা। এতে কোন গর্ব-অহঙ্কার নেই। সেদিন আমার হাতে প্রশংসার ঝান্ডা থাকবে তাতে কোন গর্ব-অহঙ্কার নেই। আদম থেকে নিয়ে যত নবী-রাসূল আছেন সকলেই আমার ঝান্ডার নীচে থাকবেন। আমি হচ্ছি প্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সর্ব প্রথম কবুল করা হবে। এতে কোন গর্ব-অহঙ্কার নেই আর প্রশংসার ঝান্ডা কিয়ামতের দিন আমার সামনে এতে কোন প্রকার গর্ব নেই।-ইবন মাজাহ্- ৪৩০৮


তিনিই সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি হবেন

এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « آتِى بَابَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَسْتَفْتِحُ فَيَقُولُ الْخَازِنُ مَنْ أَنْتَ فَأَقُولُ مُحَمَّدٌ. فَيَقُولُ بِكَ أُمِرْتُ لاَ أَفْتَحُ لأَحَدٍ قَبْلَكَ (رواه مسلم ,مشكوة-3/248- 5743)

 জান্নাতের দরজায় আমি সর্বপ্রথম করাঘাত করব, তখন জান্নাতের প্রহরী জিজ্ঞেস করবে, কে আপনি? আমি বলব, মুহাম্মাদ। সে বলবে, উঠছি এবং আপনার জন্য খুলে দিতে আমি নির্দেশিত হয়েছি। আপনার পূর্বে কারো জন্যে এ দরজা খুলব না।-মুসলিম- ৫০৭; মিশকাত-খ. ৩, পৃ. ২৪৮, হা- নং ৫৭৪৩

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ﴿الأحزاب: ٢١﴾

যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্বরণ করে, তাদের জন্যে রাসূলুল­াহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।-সূরা আল-আহযাব- ২১

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿الأحزاب: ٥٦﴾

আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের জন্যে দুআ কর এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ কর।-সূরা আল-আহযাব- ৫৬

عن أنس (رض) قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرُ خَطِيئَاتٍ وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ (رواه النسائي ,مشكوة-1/201-922)

 যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তার উপর দশটি রহমাত নাযিল করবেন, দশটি গুনাহ মুছে দেবেন এবং দশটি মর্যাদায় ভূষিত করবেন-নাছায়ী- ১২৯৭; মিশকাত-খ. ১, পৃ. ২০১, হা- নং ৯২২

 

ভালবাসার মানদন্ড

রাসূলুল্লাহ -এর সম্মান ও মর্যাদা অবগত হওয়া মুমিনের ঈমানের অংশ ও মৌলিক  বিষয়। সকল মুমিন যেন সহজেই জানতে পারে সে জন্য  বিষয়টি আল্লাহ কুরআন কারীমে সহজভাবে সকলের বোধগম্য করেই বর্ণনা করেছেন। এছাড়া রাসূলুল্লাহ   বিষয়টি তাঁর সাহাবীগণকে জানিয়েছেন। তাঁরাও মুমিনের ঈমানের বিশুদ্ধতার জন্য এভাবেই গুরুত্বের সাথে তা তাবিয়ীগণকে শিখিয়েছেন। এভাবে  বিষয়গুলো অবশ্যই কুরআনে বা মুতাওয়াতির, মাশহুর, সহীহ হাদীস সমূহে স্পষ্ট ও সর্বজনবোধগম্যভাবে বর্ণিত হয়েছে। মুসলিমের দায়িত্ব হলো তাঁর ব্যাপারে কুরআনুল কারীমে বা সহীহ হাদীসে যা বলা হয়েছে তা সব কিছু পরিপূর্ণভাবে সর্বান্ত-করনে বিশ্বাস করা, নিজের থেকে কোন কিছু বাড়িয়ে বলা ঠিক নয়।

 

ভালবাসার অতিশয্য ধ্বংসের কারণ

পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মত এরূপ বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘনের কারনে বিভ্রান্ত হয়েছে বলে আমরা কুরআন ও হাদীস থেকে জানতে পারি। নবীগণের প্রতি অবিশ্বাস যেমন মানুষদেরকে ধ্বংস করেছে, তেমনি ধ্বংস করেছে নবীগণের প্রতি ভক্তিতে সীমালঙ্ঘন। এ জন্য রাসূলুল্লাহ তাঁর উম্মতকে এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন,

عَنْ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا: عبدُ الله ورسولُه " (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ ,مشكوة-৪৮৯৭)

খৃষ্টানগণ যেরূপ ঈসা ইবন মারিয়ামকে বাড়িয়ে প্রশংসা করেছে, তোমরা সেভাবে আমায় বাড়িয়ে প্রশংসা করবে না। তারা তো তাঁর বান্দা মাত্র। অতএব তোমরা বলবেআল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত-হা- নং-৪৮৯৭

হাদীসে আরো উলে­খ রয়েছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ رَجُلًا قَالَ يَا مُحَمَّدُ يَا سَيِّدَنَا وَابْنَ سَيِّدِنَا وَخَيْرَنَا وَابْنَ خَيْرِنَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ عَلَيْكُمْ بِتَقْوَاكُمْ وَلَا يَسْتَهْوِيَنَّكُمْ الشَّيْطَانُ أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ وَاللَّهِ مَا أُحِبُّ أَنْ تَرْفَعُونِي فَوْقَ مَنْزِلَتِي الَّتِي أَنْزَلَنِي اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ (مسند احمد-১২৫৫১)

আনাস ইবন মালিক  বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ -কে বলেন, হে মুহাম্মদ! হে আমাদের নেতা (সাইয়্যেদ) আমাদের নেতার পুত্র, আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম, আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তির পুত্র। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন, হে মানুষেরা! তোমরা আল­াহ্কে ভয় করে চল। শয়তান যেন তোমাদের বিভ্রান্ত না করে। আমি আব্দুল­াহ্র ছেলে মুহাম্মদ, আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর কসম, আমি ভালবাসি না যে, আল্লাহ আমাকে যে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন তোমরা আমাকে তাঁর ঊর্ধে ওঠাবে। -মুসনাদে আহমদ, খ. ৩, পৃ. ১৫৩

 

রাসূলুল্লাহ -কে ভালবাসার মানদন্ড সম্পর্কে হাদীসে উল্লেখ রয়েছে,

عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রلَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَগ্ধ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ ,مشكوة-৭)

যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, তোমাদের কেউ ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে আমাকে তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে বেশি ভালবাসবে। বুখারী; মুসলিম; মিশকাত-হা- নং-৭

এ প্রসংগে প্রিয় নবী আরো বলেন,

أَبُو عَقِيلٍ زُهْرَةُ بْنُ مَعْبَدٍ أَنَّهُ سَمِعَ جَدَّهُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ هِشَامٍ قَالَ كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ آخِذٌ بِيَدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مِنْ نَفْسِي فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ فَإِنَّهُ الْآنَ وَاللَّهِ لَأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ نَفْسِي فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْآنَ يَا عُمَرُ (بخاري-২৪৪৫)

একদিন উমর  বলেন, হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবন ছাড়া দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে প্রিয়। তখন তিনি বলেন, ‘হলো না উমর!, যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, অবশ্যই আমাকে তোমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসতে হবে। তখন উমর  বলেনআল্লাহর কসম!, আপনি এখন আমার কাছে আমার জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন হাঁ, উমর !, এখন (তোমার ঈমান পূর্ণতা পেল)। বুখারী, খ.৬, পৃ.২৪৪৫

 

ভালবাসার দাবি

রাসূলুল্লাহ -এর ভালবাসা কোনো মুখের দাবির ব্যাপার নয়। তাঁর নির্দেশিত পথে চলা অর্থা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলা, তাঁর শরীয়াতকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পালন করা। তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকাই হলো তার মুহাব্বতের প্রকাশ। যে যত বেশী তার শরীয়াতকে মেনে চলবেন এবং তার সুন্নত মত জীবন যাপন করবেন, তার ভালবাসাও তত গভীর হবে। সাহাবীগণ, তাবিয়ীগণ, ইমামগণ এভাবে কর্ম ও অনুসরণের মাধ্যমে তাকে ভালবেসেছেন।

 

রাসূলুল্লাহ -এর কারণে ভালবাসার যোগ্য ব্যক্তিবর্গ

রাসূলুল্লাহ -এর সাহাবীগণ, তাঁর পরিবার, তাঁর একনিষ্ঠ অনুসারীগণ এবং তাঁর সকল উম্মতকে তাঁর কারণে সম্মান করা ও ভালবাসা তাঁরই ভালবাসার প্রকাশ। বিশেষত তাঁর সাহাবী ও আহল বাইয়াতের  বিষয়টি কুরআন ও হাদীসে বিশেষভাবে উলে­খ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَىٰ ۗ ﴿الشورى: ٢٣﴾

বলুন, আমি আমার দাওয়াতের জন্যে তোমাদের কাছে কেবল আতœীয়তাজনিত সৌহার্দ চাই। -সূরা আশ-শুরা- ২৩

রাসূলুল্লাহ একদিন বক্তৃতায় বলেন,

أمّا بَعْدُ ألا أيُّها النَّاسُ فإنَّما أنا بَشَرٌ يُوشِكُ أنْ يأْتِيَنِي رَسُولُ رَبّي فأُجِيبَ وأنا تارِكٌ فِيكمْ ثَقَلَيْنِ أوَّلهُما كِتابُ اللَّهِ فِيهِ الهُدَى والنُّورُ منِ اسْتَمْسكَ بِهِ وأخذَ بِهِ كانَ على الهُدَى وَمَنْ أَخْطأَهُ ضَلَّ فَخُذُوا بِكِتابِ اللَّهِ تَعَالى واسْتَمْسِكُوا بِهِ وأَهْلُ بَيْتِي أَذْكِّرِكُمُ اللَّهَ في أهلِ بَيْتِي أذْكِّرِكُمُ اللَّهَ في أهْلِ بَيْتِي" (رواه مسلم : ২৪০৮ ,مشكوة-৩/৩৩৮-৬১৩১)

তারপর বললেন, হে লোক সকল! আমি একজন মানুষআল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফিরিশতা আসবে, আর আমিও তাঁর ডাকে সাড়া দেব। আমি তোমাদের কাছে ভারী দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব। এতে হিদায়াত এবং নূর রয়েছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে অবলম্বন কর, একে শক্ত করে ধরে রাখো। এরপর কুরআনের প্রতি আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। তারপর বলেন, আর হলো আমার আহলে বায়ত। আর আমি আহলে বায়তের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বায়তের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। -মুসলিম- ২৪০৮; ৬১৩১

রাসূলুল্লাহ আরো বলেন,

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ "أَحِبُّوا اللَّهَ لِمَا يَغْذُوكُمْ مِنْ نِعَمِهِ وَأَحِبُّونِي بِحُبِّ اللَّهِ وَأَحِبُّوا أَهْلَ بَيْتِي بِحُبِّي" (رواه الترمذي ,مشكوة-৩/৩৪৭-৬১৭৩)

তোমরা আল্লাহর ভালবাসায় আমাকে ভালবাসবে এবং আমার ভালবাসায় আমার বাড়ির মানুষদের (পরিবার, বংশধর ও আত্মীয়দের) ভালবাসবে। -তিরমিযী; মিশকাত, খ.৩, পৃ. ৩৩৮, হা- নং-৬১৩১

 

রাসূলুল্লাহ -এর সাহচর্যের কারণে বিশেষ মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গের মধ্যে হচ্ছেন

সাহাবীগণ

প্রথম অগ্রবর্তী মুহাজির ও আনসারগণের জন্য আল্লাহ জান্নাত প্রস্তুত রেখেছেন এবং নিষ্ঠার সাথে তাঁদের অনুসরণ করাই অন্যদের জন্য জান্নাতের পথ বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿التوبة: ١٠٠﴾

আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনছারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কাননকুঞ্জ। যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা। -সূরা তাওবাহ্- ১০০

 

অগ্রবর্তীদের মর্যাদার পাশাপাশি অন্যত্র সকল সাহাবীর জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ لَا يَسْتَوِي مِنكُم مَّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ ۚ أُولَٰئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِينَ أَنفَقُوا مِن بَعْدُ وَقَاتَلُوا ۚ وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ﴿الحديد: ١٠﴾

তোমাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে কিসে বাধা দেয়, যখন আল্লাহই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উত্তরাধিকারী? তোমাদের মধ্যে যে মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জেহাদ করেছে, সে সমান নয়। এরূপ লোকদের মর্যাদা বড় তাদের অপেক্ষা, যার পরে ব্যয় করেছে ও জেহাদ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়কে কল্যাণের ওয়াদা দিয়েছেন। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।-সূরা হাদীদ- ১০

অগণিত হাদীসে সাহাবীগণের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে এবং জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। এক হাদীসে উমর ইবনুল খাত্তাব  বলেন, রাসূলুল্লাহ - বলেছেন,

عَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রأَكْرِمُوا أَصْحَابِي فَإِنَّهُمْ خِيَارُكُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ يَظْهَرُ الْكَذِبُ (رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ ,كوة-৩/ ১৬৯৫- ৬০১২)

তোমরা আমার সাহবীগণকে সম্মান করবে, কারণ তারাই তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাদের পরে তাদের পরবর্তী যুগের মানুষেরা এবং এরপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষেরা। এরপর মিথ্যা প্রকাশিত হবে। -তিরমিযী; মিশকাত, খ. ৩, পৃ. ৩০৮, হা- নং-৬০০৩

আবূ হুরাইরা ও আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন,

عن أبي سعيد الخدري و ابي هريرة رضي الله عنهما قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- "لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِى لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِى فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيفَهُ " (متفق عليه ,مشكوة-৩/ ৩০৭- ৫৯৯৮)

তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালি দেবে না। কারণ তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমান স্বর্ণ দান করে তবুও সে তাদের কারো এক মুদ্দ (প্রায় আধা কেজি) বা তার অর্ধেক পরিমান দানের সমপর্যায়ে পৌছাতে পারবে না। -বুখারী ; মুসলিম ও মিশকাত, খ. ৩, পৃ. ৩০৭, হা- নং-৫৯৯৮

 

আল্লাহ কুরআনে মুমিনগণকে তিনভাগে বিভক্ত করে উলে­খ করেছেন। প্রথম মুহাজির এবং আনসারগণের উলে­খ করে তাঁদের প্রশংসা করেন। এরপর পরবর্তী মুমিনদের বিষয়ে বলেন,

وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴿الحشر: ١٠﴾

আর এ সম্পদ তাদের জন্যে, যারা তাদের পরে আগমন করেছে। তারা বলে: হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে এবং ঈমানে আগ্রহী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, তুমি দয়ালু, পরম করুণাময়। -সূরা হাশর- ১০

 

উপসংহার

কুরআনের নির্দেশ অনুসারে পরবর্তী সকল প্রজন্মের মুমিনদের দায়িত্ব হলো সকল আনসার ও মুহাজির সাহাবীর জন্য দুআ করা এবং তাদেরকে অন্তর দিয়ে ভালবাসা। অন্তরে কোন সাহাবীর প্রতি হিংসা, বিরাগ, বিরক্তি বা বিদ্বেষভাব ঈমানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আরো অনেক আয়াত ও হাদীসে সাহাবীদের মর্যাদা ও ভালবাসার নির্দেশ রয়েছে। কুরআন ও হাদীসের এ সকল নির্দেশনার আলোকে রিসালাতের বিশ্বাসের অংশ হিসেবে মুমিন বিশ্বাস করেন যে, মানব জাতির মধ্যে নবীগণের পরেই রাসূলুল্লাহ -এর সাহাবীগণের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব। কোনো সাহাবীকেই কোনো মুমিন সামান্যতম অমর্যাদা, অবজ্ঞা বা ঘৃণা করতে পারেন না। তাঁদের কারো বিষয়েই কোনো অমর্যাদাকর কথা কোনো মুমিন কখনো বলেন না। কুরআনে ও হাদীসের সুষ্পষ্ট নির্দেশনার বিপরীতে অষ্পষ্ট কথা, ইতিহাসের ভিত্তিহীন কাহিনী বা ইসলামের শত্রদের অপপ্রচার ও মিথ্যাচারে কান দিতে পারেন না কোনো মুমিন। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে হিফাযত করুন। -আমিন!!

                                       

No comments:

Post a Comment