Tuesday, October 20, 2020

১২ ই রবিউল আউয়ালঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্ম ও ওফাত দিবসঃ সমাজ সংস্কারে মুহাম্মদ (সাঃ)


ভূমিকা

মহানবী আগমনের পূর্বে আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। অন্যায়-অবিচার এবং পরস্পর কলহ-দ্বন্দ ছিল আরবদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বস্তু-পুজা, অগ্নি-পুজা, মূর্তি-পুজা ইত্যাদির ছদ্মাবরণে ধর্ম চর্চা, সামাজিক অসাম্যতা, নারী জাতির অবমাননা-অবমূল্যায়ন, মদ্যপান, ব্যভিচার, সুদ, ঘুষ, জুয়া, স্বাধীন মানুষের ক্রয়-বিক্রয় এবং রক্তলিপ্সা প্রভৃতি নিকষ্টতম অপরাধ ছিল আরবের স্বাভাবিক চরিত্র। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সমাজের সকল স্তর থেকে এসব অনাচার ও দূরাচারের বিলুপ্তি সাধন করে বিশ্ববাসীর দরবারে একজন সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক হিসেবে ইতিহাস রচনা করেছেন। সামাজিক সংস্কারের অংশ হিসেবে রাসূলুল্লাহ যে সব যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তা নিম্মরূপঃ

ক। তাওহীদের ভিত্তিতে ধর্মীয় সংস্কার

খ। বর্ণ-বৈষম্য দূরীকরণ ও বিশ্বসাম্য প্রতিষ্ঠা

গ। আইনের শাসন ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন

ঘ। নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা

ঙ। দাস প্রথার বিলুপ্তি

চ। অর্থনৈতিক সংস্কার

ছ। শিক্ষার বিস্তার

জ। মাদকদ্রব্যের প্রতিরোধ

ঝ। শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা

নিম্মে বিষয়গুলোর উপর সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা উপস্থাপন করা হলঃ

 

১. তাওহীদের ভিত্তিতে ধর্মীয় সংস্কার

ধর্ম মানুষের আভিজাত্যের প্রতীক। ইসলাম পূর্ব যুগে আরবগণ ধর্মীয় দিক থেকে ছিল চরম কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তাদের কেউ অগ্নি উপাসক, কেউ পৌত্তলিক। তারা আখিরাতকে বিশ্বাস করত না এবং এক আল্লাহর ইবাদাতের পরিবর্তে একাধিক দেব-দেবীর উপাসনা করত। কেউ যখন মারা যেত তখন তারা তাদের সেই সব প্রিয় ভাজন ব্যক্তিদের একটি প্রতিমূর্তি তৈরী করে তার পূজা আর্চনা করত এবং তা কাবা শরীফেই সংরক্ষণ করত। এমনিভাবে বৃদ্ধি পেতে পেতে সে মূর্তি গুলোর সংখ্যা দাড়িয়েছিল ৩৬০ টি। মহানবী সর্বপ্রথম তাদের সামনে পৌত্তলিকতা ও অগ্নিপূজার অসারতা এবং আল্লাহ তাআলার প্রভুত্বের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

مَثَلُ الَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ أَوْلِيَاءَ كَمَثَلِ الْعَنكَبُوتِ اتَّخَذَتْ بَيْتًا ۖ وَإِنَّ أَوْهَنَ الْبُيُوتِ لَبَيْتُ الْعَنكَبُوتِ ۖ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ ﴿العنكبوت: ٤١﴾

যারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে সাহায্যকারীরূপে (প্রভু রূপে) গ্রহণ করে তাদের উদাহরণ মাকড়সার ন্যায়। সে ঘর বানায়। আর সব ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো অধিক দুর্বল, যদি তারা জানত।’’ -সূরা আনকাবুতঃ ৪১

রাসূলুল্লাহ বলেন

مَنْ شَهِدَ أنَّ لا إلهَ إلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ ، وَأنَّ مُحَمداً عَبْدهُ ورَسُولُهُ ، وَأنَّ عِيسى عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ وَكَلِمَتُهُ ألْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ ورُوحٌ مِنْهُ ، وَأنَّ الجَنَّةَ حَقٌّ ، وَالنَّارَ حَقٌّ ، أدْخَلَهُ اللهُ الجَنَّةَ عَلَى مَا كَانَ مِنَ العَمَلِ-(متفق عليه, مشكوة-১/৬- ২৭)

যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তার কোন শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল, (আরও বিশ্বাস রাখল যে) ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূলুল্লাহ এবং তার কালিমা যা তিনি মারইয়ামের গর্ভে নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তার রূহ, জান্নাত সত্য ও জাহান্নাম সত্য তাহলে তার আমল যাই হোক না কেন আল্লাহ তাকে জান্নাতে দিবেন।’’ - -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত- খ. ১, পৃ. ৬, হাঃ নং ২৭।

 

তবে আল্লাহর একত্ববাদ গ্রহণের ব্যাপারে তিনি কারও প্রতি জোর-জবরদস্তি করতেন না। সবাই এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করত। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ﴿البقرة: ٢٥٦﴾

ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। সঠিক পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। ” -সূরা বাকারাঃ ২৫৬

 

২. বর্ণ-বৈষম্য দূরীকরণ ও বিশ্বসাম্য প্রতিষ্ঠা

তৎকালীন সমাজে আরব-অনারব, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, স্বাধীন-দাস, ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা ইত্যাদি শ্রেণীর মধ্যে বৈষম্য স্থাপন করা হত। রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করলেন জন্মগত ভাবে মানুষ সবাই সমান। সকল প্রকার বৈষম্যের ভিত্তিমূলে তিনি কুঠারাঘাত করেন। তাকওয়া-পরহেযগারী তথা আল্লাহ ভীতিকেই তিনি শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি, মানদন্ড হিসেবে নির্ধারণ করলেন। তাই তো তিনি আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ বিলাল (-কে দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত করে মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব প্রদান করলেন, উসামা ইবন যায়েদ (রাঃ)-কে দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত করে নিজের পুত্র øেহে লালন-পালন করলেন, নিজের দাসী সাফিয়্যা -কে মুক্ত করে স্ত্রীর মর্যাদা প্রদান করলেন। আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ ﴿الحجرات: ١٣﴾

হে মানব সম্প্রদায়! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পর¯পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।’’ -সূরা হুজুরাতঃ ১৩

মহানবী নিজেও এ সম্পর্কে বলেছেন,

عَنْ أَبِي ذَرٍّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: ্রإِنَّكَ لَسْتَ بِخَيْرٍ مِنْ أَحْمَرَ وَلَا أَسْوَدَ إِلَّا أَنْ تفضلَه بتقوىগ্ধ (رَوَاهُ أَحْمد)

তুমি সাদা বা কাল এর ভিত্তিতে উত্তম হতে পারবে না, যদি তাকওয়ার দিক থেকে তুমি এগিয়ে না থাক।’’ -আহমদ; মিশকাতঃ ৫১৯৮


৩. আইনের শাসন ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন

তৎকালে আইনের শাসন বলতে কিছু ছিল না, সরকার পদ্ধতিও ছিল গোত্র কেন্দ্রীক। কোন কেন্দ্রীয় শাসন ব্যাবস্থা ছিল না। নবীজিই প্রথম মদীনা ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদ সমূহের মুসলমান, ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সকলের অধিকার নিশ্চিত করে ৪৭ ধারা বিশিষ্ট একটি রাজনৈতিক সংবিধান (মদীনা সনদ) প্রণয়ন করেন। যাকে পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান বলে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি গোত্রীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে তাদের মাঝে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা জারী করেন।

 

৪. নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা

জাহিলী যুগে নারীকে বলা হত শয়তানের ষষ্টি, অমঙ্গলের অগ্রদূত সমাজের মূল ধারার অংশ হিসেবে নারীদেরকে মনে করা হত না। তাই ওয়ারিশী সম্পত্তিতেও তাদের অধিকার স্বীকার করা হত না। কন্যা সন্তানের জনক হওয়াটা তাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক একটা বিষয় ছিল। তাই তারা জন্মের পরই কন্যা সন্তানকে জীবিত মাটিতে কবর দিত। আল্লাহ তাআলা নারীদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তিনি বহুবিধ নির্দেশনা দিয়েছেন:

 

ক। খোরপোষের ব্যবস্থা

এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ বলেন,

عَنْ حَكِيمِ بْنِ مُعَاوِيَةَ الْقُشَيْرِيِّ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا حَقُّ زَوْجَةِ أَحَدِنَا عَلَيْهِ؟ قَالَ: ্রأَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ وَتَكْسُوَهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ وَلَا تَضْرِبِ الْوَجْهَ وَلَا تُقَبِّحْ وَلَا تَهْجُرْ إِلَّا فِي الْبَيْتِগ্ধ (رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه)

মুয়াবিয়াহ ইবন হাইদাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কোন ব্যক্তির উপর তার স্ত্রীর কি অধিকার রয়েছে? তিনি বললেন: তুমি যখন আহার কর, তাকেও আহার করাও, তুমি যখন পরিধান কর, তাকেও পরিধান করাও, কখনও মুখমন্ডলে প্রহার করো না, কখনও অশ্লীল ভাষায় গালি দিও না এবং ঘরের মধ্যে (বিছানা) ছাড়া তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’’ -আহমদ; আবূ দাঊদ; ইবন মাজাহ; মিশকাতঃ ৩২৫৯

খ। একাধিক স্ত্রীর মাঝে সমতা রক্ষা

এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ বলেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ্রإِذَا كَانَتْ عِنْدَ الرَّجُلِ امْرَأَتَانِ فَلَمْ يَعْدِلْ بَيْنَهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ سَاقِطٌগ্ধ (رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ والدارمي)

যখন কোন ব্যক্তির দু স্ত্রী থাকে, আর তাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করে না, তাহলে কিয়ামতের দিন সে শরীরের অর্ধাংশ পক্ষাঘাত অবস্থায় উঠবে।’’ -তিরমিযী, আবূ দাঊদ; নাসাঈ; ইবন মাজাহ; দারেমী; মিশকাতঃ ৩২৩৬

 

গ। দাস দাসীর ন্যায় প্রহার না করা

এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ বলেন,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَمَعَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রلَا يَجْلِدْ أَحَدُكُمُ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ ثُمَّ يُجَامِعْهَا فِي آخِرِ الْيَوْمِগ্ধ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে দাস-দাসীর ন্যায় প্রহার না করে, অতঃপর দিন শেষে তার সাথে আবার সহবাস না করে।’’ -বুখারী,-৫২৫৯

ঘ। দেন মোহর আদায়ের ব্যবস্থা

এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ বলেন,

্রأَيُّمَا رَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةً بِمَا قَلَّ مِنَ الْمَهْرِ أَوْ كَثُرَ لَيْسَ فِي نَفْسِهِ أَنْ يُؤَدِّيَ إِلَيْهَا حَقَّهَا، خَدَعَهَا، فَمَاتَ وَلَمْ يُؤَدِّ إِلَيْهَا حَقَّهَا، لَقِيَ اللَّهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَهُوَ زَانٍগ্ধ (المعجم الاوسط)

যে ব্যক্তি কোন মহিলাকে স্বল্প কিংবা বেশি মহরের বিনিময়ে বিবাহ করে, মনে মনে যদি তা আদায়ের নিয়ত না থাকে; তবে সে তার স্ত্রীকে ধোকা দিল। অতঃপর সে যদি মোহর আদায় না করেই মরে যায়, তবে কিয়ামতের দিন সে ব্যভিচারী হিসেবে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে।’’ -মুজামুল আওসাতঃ ১৮৫১

ঙ। পরিত্যাক্ত সম্পদে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা

এ প্রসংগে আল্লাহ তাআলা বলেন,

لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا ﴿النساء: ٧﴾

পিতামাতা ও নিকটজনদের পরিত্যাক্ত সম্পদে পুরুষদের অধিকার রয়েছে, অনুরূপভাবে পিতামাতা ও নিকটজনদের পরিত্যাক্ত সম্পদে নারীদেরও অধিকার রয়েছে।’’ -সূরা নিছাঃ ৭

 

চ। কন্যা সন্তান প্রতিপালনের ফজীলত

এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ বলেন,

عَن عائشةَ قَالَتْ: جَاءَتْنِي امْرَأَةٌ وَمَعَهَا ابْنَتَانِ لَهَا تَسْأَلُنِي فَلَمْ تَجِدْ عِنْدِي غَيْرَ تَمْرَةٍ وَاحِدَةٍ فَأَعْطَيْتُهَا إِيَّاهَا فَقَسَمَتْهَا بَيْنَ ابْنَتَيْهَا وَلَمْ تَأْكُلْ مِنْهَا ثُمَّ قَامَتْ فَخَرَجَتْ. فَدَخَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَحَدَّثْتُهُ فَقَالَ: ্রمَنِ ابْتُلِيَ مِنْ هَذِهِ الْبَنَاتِ بِشَيْءٍ فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِগ্ধ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমার নিকট এক মহিলা আসল এবং তার সাথে তার দুটি মেয়েও ছিল। সে কিছু চাইল কিন্তু আমার কাছে একটি খেজুর ছাড়া আর কিছুই পেল না। আমি খেজুরটা তাকে দিলাম। সে খেজুরটি তার দু কন্যার মধ্যে বন্টন করল, কিন্তু সে নিজে তা থেকে খেল না। অতঃপর উঠে চলে গেল। নবী করীম আমাদের কাছে আসলে আমি তাকে ব্যাপারটা অবহিত করলাম। তিনি বললেন: যে ব্যক্তিই এরূপ কন্যা সন্তানদের নিয়ে পরীক্ষার সম্মুখিন হবে এবং তাদের সাথে সুন্দর ব্যবহার করবে, তারা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নামের আগুনের সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাতঃ ৪৯৪৯

 

ছ। তালাক প্রাপ্তা কন্যার প্রতিপালন করা

এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ বলেন,

عَن سراقَة بْنِ مَالِكٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ্রأَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ؟ ابْنَتُكَ مَرْدُودَةً إِلَيْكَ لَيْسَ لَهَا كَاسِبٌ غَيْرُكَগ্ধ (رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ)

তোমাদেরকে সবচেয়ে উত্তম সদকার সংবাদ জানিয়ে দিব কি? (আর তা হল) তোমার তালাক প্রাপ্তা মেয়ে তোমার কাছে যদি ফিরে আসে; তুমি ছাড়া তার জন্য উপার্জনের দ্বিতীয় কেউ নেই আর তুমি তার ভরণ পোষণের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছো।’’ -ইবন মাজাহ


৫. দাস প্রথার বিলুপ্তি

রাসূলুল্লাহ শুধু মাত্র উপদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি নিজেও ৬৩ (তেষট্রি) জন দাসকে মুক্ত করে দেন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাঃ) ৬৭ জন দাসকে মুক্তি দেন। উমর  মুক্ত করেন ১০০০ (এক হাজার) দাস। আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রাঃ) মুক্ত করেন ৩০ হাজার দাস। বিভিন্ন ইবাদাতের কাফ্ফারাতে তিনি দাস মুক্তির বিষয়টি সংযোজন করেছেন। যেমন

ক। শপথের কাফ্ফারা

কেউ আল্লাহর নামে শপথ করার পর যদি তা ভঙ্গ করে তাহলে তাকে কাফ্ফারা আদায় করতে হয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ﴿المائدة: ٨٩﴾

তার কাফ্ফারা হল দশ জন মিসকীনকে এমন মধ্যম মানের খাবারের ব্যবস্থা করবে যা তোমরা তোমাদের পরিবার-পরিজনকে দিয়ে থাক। অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করবে কিংবা একটি কৃতদাস মুক্ত করবে।’’ -সূরা মায়েদাঃ ৮৯

খ। মানুষ খুনের কাফ্ফারা

এ প্রসংগে আল­াহ্ তাআলা বলেন,

وَمَن قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَئًا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُّسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ ﴿النساء: ٩٢﴾

যে ব্যক্তি ভুলক্রমে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, সে (এর কাফ্ফারা হিসেবে) একজন মুমিন কৃতদাসকে মুক্ত করে দিবে অথবা তার পরিবারকে দিয়াত বা রক্তপণ দিবে।’’ -সূরা নিসাঃ ৯২

গ। জিহারের কাফ্ফারা

এ প্রসংগে আল­াহ্ তাআলা বলেন,

وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِن نِّسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِّن قَبْلِ أَن يَتَمَاسَّا ﴿المجادلة: ٣﴾

যারা তাদের স্ত্রীগণের সাথে জেহার করে (স্ত্রীকে মায়ের সমতুল্য বলে ফেলে), অত:পর নিজেদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাদের কাফফারা হচ্ছে, একে অপরকে ¯পর্শ করার পূর্বে একটি দাসকে মুক্তি দিবে।’’ -সূরা মুজাদালাহঃ ৩

ঘ। রোজার কাফ্ফারা

হাদীসে এসেছে,

عَن أبي هُرَيْرَة قَالَ: بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُول الله هَلَكت. قَالَ: ্রمَالك؟গ্ধ قَالَ: وَقَعْتُ عَلَى امْرَأَتِي وَأَنَا صَائِمٌ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রهَلْ تَجِدُ رَقَبَةً تُعْتِقُهَا؟গ্ধ(مُتَّفق عَلَيْهِ)

(এক লোক নবীজির নিকট এসে আরয করল, ইয়া রাসূলাল¬াহ!) আমি রোজা থাকা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে মেলামেশা (সহবাস) করেছি। রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন: তুমি কি একটি ক্রীতদাস মুক্ত করতে পারবে?” -বুখারী; মুসলিম; মিশকাতঃ ২০০৪


৬. অর্থনৈতিক সংস্কার

তৎকালে আরবদের অর্থনৈতিক জীবন ছিল চরম বিশৃংখলা ও অরাজকতাপূর্ণ। সুদ, ঘুষ, মজুতদারী, মুনাফাখুরী, জুলুম, শোষণ ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিনত হয়েছিল। সুদি লেন-দেনের মাধ্যমে ধনীরা দিন দিন ধনীই হতে থাকত আর গরীবরা নি:স্ব ও সর্বশান্ত হয়ে যেত। তাই রাসূলুল্লাহ সমাজ থেকে সুদ প্রথার বিলোপ সাধন করলেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা করেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴿آل‌عمران: ١٣٠﴾

ওহে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ ভক্ষন কর না বরং আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর তাহলে তোমরা সফল কাম হতে পারবে।’’ -সূরা আলে-ইমরানঃ ১৩০

ক। ঘুষের নিষেধাজ্ঞা

عَن عبد الله بن عَمْرو قَالَ: لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ. (رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ)‏

রাসূলুল্লাহ উৎকোচ গ্রহণকারী ও উৎকোচ প্রদানকারী উভয়ের উপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।’’ -আবূ দাঊদ; ইবন মাজাহ; মিশকাতঃ ৩৭৫৩


৭. শিক্ষার বিস্তার

একটি জাতির আশা-আকাঙ্খার রুপায়ণ ও ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনের প্রধান হাতিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা। জাতির সামগ্রিক কল্যাণ নির্ভর করে একটি সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। তাই তিনি শিক্ষার প্রতি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করেন।


৮. মাদকদ্রব্যের প্রতিরোধ

মাদকাসক্তি একটি সামাজিক ব্যধি। জাহিলী যুগে তা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্র্রে ছড়িয়ে পড়েছিল। তৎকালীন আরব সভ্যতায় মাদকদ্রব্য ছিল মর্যাদার প্রতীক। মহানবী পর্যায়ক্রমে তা সমাজ থেকে নির্মুল করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا ﴿البقرة: ٢١٩﴾

তারা তোমাকে মদ ও জুয়া স¤পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়। ” -সূরা বাকারাঃ ২১৯

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَقْرَبُواْ الصَّلاَةَ وَأَنتُمْ سُكَارَى حَتَّىَ تَعْلَمُواْ مَا تَقُولُونَ ﴿النساء: ٤٣﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ’’ -সূরা নিসাঃ ৪৩

 

আল্লাহ্ তাআলা আরো বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلاَمُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴿المائدة: ٩٠﴾

হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।’’ -সূরা মায়েদাঃ ৯০

 

৯. শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা

শ্রমিকরা আমাদের মতই মানুষ। অভাবের তাড়নায় তারা অন্যের বাড়িতে মজুর খাটে। তাদের অসহায়ত্বের সুযোগে কেউ যেন তাদের প্রতি অসম্মান না করে, তাদের প্রতি অবিচার না করে। তাদের অধিকার হরণ না করে এ বিষয়গুলো মহানবী নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: ্রأعْطوا الْأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُগ্ধ (رَوَاهُ ابْن مَاجَه)

তোমরা শ্রমিকের পাওনা বা মজুরী তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই আদায় করে দাও।’’ - ইবন মাজাহ; মিশকাতঃ ২৯৮৭

 

উপসংহার

রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর আদর্শিত পথে পরিচালিত হলে সমাজে বৈষম্য দূরীভূত হবে। সমাজে শান্তি শৃংখলা বিরাজমান হবে। আখিরাতেও নাজাতের ব্যবস্থা হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমীন!!

x

No comments:

Post a Comment