অশান্তির আগুন জ্বলছে বিশ্বব্যাপী। যুদ্ধের দাবানলে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা মানবতার। শান্তি প্রতিষ্ঠার গালভরা বুলি আওড়ে যারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে, তারাই অশান্তির জনক। সঙ্ঘাত, সংঘর্ষ আর হানাহানিই তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার অস্ত্র। তাদের ভোগবিলাসিতার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তাদের অপরাজনীতির কারণে বিকশিত হচ্ছে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। সঙ্ঘাত আর হানাহানি আজ নিত্যনৈমিত্যিক বিষয়।
দুনিয়াকে পুঁজিবাদী, সমাজবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শিবিরে
ভাগ করে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সব শিবিরের সব মানুষ যেন শান্তি নামক পায়রাটির
পেছনে রকেটের গতিতে ধাবমান। শান্তি মায়া-মরীচিকার রূপ ধারণ করেছে। পুঁজিবাদী
শিবিরের নৈতিকতাবিবর্জিত সামাজিক যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শান্তির আশায় মজলুম মানুষের
মুক্তিপাগল অগ্রবাহিনী মিছিল করে পাড়ি দিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক জগতে। সেই
সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বৈষম্যমুক্ত সর্বহারার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্লোগানের পরিণতি
‘ডাঙ্গায় বাঘ জলে কুমির’-এর বেদনাদায়ক অবস্থা বৈ কিছুই ছিল না,
সমাজতন্ত্রের স্বর্গরাজ্য
রাশিয়ার ভাঙন আর চীনের মুক্তবাণিজ্য অর্থনীতি গ্রহণই তার প্রমাণ। পুঁজিবাদী
বিশ্বের শান্তির স্লোগান কত যে বীভৎস তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ বর্তমান পশ্চিমা বিশ্বের
মানবিক, সামাজিক ও
চারিত্রিক অধঃপতনের চলমান করুণ চিত্র। তাদের আগ্রাসী চরিত্রই বিশ্ব অশান্তির
অন্যতম কারণ।
ইসলাম ও মুসলিম নামেই প্রমাণ :
ইসলাম শুধু তত্ত্বগত দিক থেকেই শান্তির উৎস নয়, বাস্তব ও প্রয়োগক্ষেত্রেও শান্তির কেন্দ্রবিন্দু।
সালামুন থেকে ইসলাম। মহান আল্লাহর গুণবাচক একটি নাম সালামুন। ইসলাম শব্দের আরেকটি
অর্থ হলো, আত্মসমর্পণ
ও আনুগত্য। মুসলিম মানে শান্তিপ্রিয় আল্লাহর কাছে আত্মসমপর্ণকারী এবং অনুগত।
অর্থাৎ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁর অনুগত হয়ে চললেই শান্তি পাওয়া যায়। আরবের
বর্বর জাতটা যখন ইমান এনে মুসলিম তথা আল্লাহর অনুগত হয়ে প্রিয়নবী সা:-এর কথামতো
চলা শুরু করেছিল, তখন
তারা সব দিক থেকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছিল। তারা শুধু নিজেরা শান্তিতে
ছিল না, অন্যদেরকেও
শান্তি দিয়েছিল। আর এখন বেঈমানি, মুনাফিকি, ভোগবাদী চিন্তা ও বিলাসিতার কারণে সেই মুসলমানেরাই দুনিয়ায়
সবচেয়ে লাঞ্ছিত জাতি।
প্রিয়নবী সা:-এর আদর্শের সুফল :
যখন আত্মকলহে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সঙ্ঘাত-সংঘর্ষে তলিয়ে যাওয়া,
সন্ত্রাস,
জঙ্গিবাদ,
দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার
কারণে আরব বিশ্ব তার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে; নৈতিকতা ও মানবতাবিবর্জিত বর্বর আরববাসী
যখন ইসলামি আদর্শকে জীবন চলার পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করল,
তখন তারাই বিশ্ববাসীর
অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় হওয়ার সম্মানজনক আসনটি দখলে নিতে সক্ষম হয়েছিল। আরবের দুই
গোত্র আউস-খারাজ যারা ছিল চিরদিনের জানের শত্রু, ইসলামি কলেমার বদৌলতে তারা প্রাণাধিক
প্রিয় হয়েছিল একে অপরের কাছে। নারীসমাজ ভোগ্যপণ্যের মতো ছিল অবহেলিত,
মায়ের পদতলে সন্তানের
বেহেশত- রাসূলের এই ঘোষণার বদৌলতে মাতৃত্বের সম্মানজনক হারানো সিংহাসন পুনরুদ্ধারে
সক্ষম হয়েছিল তারা। নিরক্ষর গণমানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান করা যুদ্ধবন্দী মুক্তির শর্ত
এবং প্রত্যেক নর-নারীর ওপর জ্ঞানার্জন ফরজ- ঘোষণা করে শিক্ষার গুরুত্বকে যথাযথ
মর্যাদা দিয়েছে ইসলাম। প্রতিবেশী উপোষ থাকলে তুমি মুমিন নও। মুসলিম গণমানুষ যার
হাত ও মুখের নিরাপত্তা লাভ করে সেই মুসলমান। অমুসলমানকে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
করে যদি কোনো মুসলিম, তার
বিরুদ্ধে আমি আল্লাহর আদালতে বিচার দায়ের করব। অমুসলমানদের রক্ত ও সম্পদ আমাদের
সম্পদ ও রক্তের মতোই মর্যাদার অধিকারী।
মানবতার মুক্তির জন্য ইসলাম :
ইসলাম তার নীতিমালা ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সমগ্র মানবতার জন্য যেমন
একমাত্র জীবনবিধান- তেমনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পূর্ণজ্ঞানসমৃদ্ধ স্রষ্টার অনুমোদিত ও
নিরপেক্ষ জীবনবিধান হওয়ার কারণে মজলুম মানুষের মুক্তি ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায়
ইসলামের আর কোনো বিকল্প হতে পারে না। এ কথারই বাস্তব প্রমাণ মেলে কুরআনের বাণীতে,
الْيَوْمَ
أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ
عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴿المائدة: ٣﴾
‘আজ
তোমাদের জন্য তোমাদের জীবনাদর্শ ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের
জীবনাদর্শ হিসেবে অনুমোদন দিলাম।’
অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ
الْخَاسِرِينَ ﴿آلعمران: ٨٥﴾
‘যে লোক
ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং
আখেরাতে সে ক্ষতি গ্রস্ত।’
মানে ভিন্ন কোনো পথে দুনিয়ার মানুষ শান্তি ও মুক্তি লাভ করতে পারবে না। কুরআনি সংবিধানই পারে কুরআনকে সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে নবী মুহাম্মদ সা:-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মদিনায় যে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্র তার অধিবাসীদের মাঝে পারস্পরিক সুসম্পর্ক সৃষ্টি করে, যে প্রেমপ্রীতিপূর্ণ সমাজ, মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, নিরপেক্ষ বিচার ও শাসনব্যবস্থা, মর্যাদাপূর্ণ সহবস্থানের মানসিকতা, ধর্মীয় সামাজিক আর নাগরিক অধিকারে মুসলিম, অমুসলিম ও রাজা-প্রজায় ভেদাভেদ না থাকার যে সোনালি যুগের সূচনা করেছিল- তা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। তার যুদ্ধ ও সন্ধিনীতি, তার স্বরাষ্ট্রনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি, আন্তঃধর্মীয় সহ-অবস্থানের নীতিমালা, দুনিয়াবাসীর জন্য ম্যাগনাকার্টার ভূমিকা পালনে এখনো সক্ষম।
মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর মদপাগল মদিনাবাসী মদিনার নালা-নর্দমায় যেভাবে মদের বন্যা প্রবাহিত করেছিল, হজরত উমর রা: ন্যায়বিচারের ঝাণ্ডা সমুচিত রাখার জন্য যেভাবে নিজ হাতে নিজেরই ঔরসজাত সন্তানকে বেত্রাঘাত করেছিলেন, হজরত আবুবকর সিদ্দীক রা: তাবুক যুদ্ধের সময় দ্বীন ও মিল্লাতের জন্য স্বর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার নজিরবিহীন যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, গোলামকে উটের পিঠে বসিয়ে অর্ধপৃথিবীর শাসক উটের রশি টেনে নেয়ার যে আকর্ষণীয় চিত্র ইসলামের বদৌলতে মুসলমানদের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়, তার দ্বিতীয় কোনো নজির কোনো ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে কি? মসজিদে খুতবারত অবস্থায় মুসলিম বিশ্বের খলিফাকে তার জামা কিভাবে বড় হলো প্রশ্ন করার এবং প্রয়োজনে তরবারির আঘাতে খলিফাকে সংশোধনের কথা বলার মতো বাকস্বাধীনতার যে বিচিত্র দিগন্তের সন্ধান ইসলামে মেলে, তা আর কারো ইতিহাসে কল্পনাতীত।
মুসলিম-অমুসলিম বিবেকবান সবার চিন্তা করে দেখা উচিত, প্রিয়নবী সা:-এর শিক্ষা এবং কুরআনি সংবিধান ছাড়া আর কোনো জিনিস দুনিয়াকে এ রকম নেতা উপহার দিতে পারে? ইসলামের উদারনীতি সম্পর্কে একজন নিরপেক্ষ ইউরোপীয় খ্রিষ্টান স্যার টি ডব্লিউ আরনল্ড বলেন, ‘খ্রিষ্টান ও মুসলিম আরবদের মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল তা থেকে বোঝা যায় ইসলাম প্রচারে শক্তি প্রয়োগ করা হয়নি। খ্রিষ্টানদের যাজক শ্রেণীকেও আগেকার ক্ষমতা ও অধিকারে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল।’ যখন বিজয়ী মুসলিম সেনাবাহিনী জর্দান উপত্যকায় উপস্থিত হয়েছিল, তখন মুসলিম সেনাপতি আবু উবাইদার কাছে খ্রিষ্টান অধিবাসীরা এই মর্মে পত্র প্রেরণ করেছিলেন যে, ‘হে মুসলমানগণ! আমরা আমাদের শাসকদের চেয়ে আপনাদেরকে বেশি পছন্দ করি। কারণ যদিও তারা ধর্মবিশ্বাসে আমাদের সাথে এক, আপনারা কিন্তু বিশ্বস্ততা ও সততার দিক দিয়ে অনেক ভালো। আপনারা দয়াশীল ও ন্যায়বিচারক। তারা আমাদের ঘরবাড়ি লুট করেছে, আপনারা ছিলেন আমাদের ধনসম্পদ, জান, প্রাণ ও ইজ্জত-সম্মানের পাহারাদার।’
রাশিয়ার এককালের প্রেসিডেন্ট গর্ভাচেভ সেদিন বলেই দিলেন,
‘বিশ্ব যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য
প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ এ
অবস্থায় মানবতার মুক্তি এবং বিশ্বশান্তির জন্য সব সঙ্কীর্ণতা ও বিভ্রান্তি পায়ে দলে
ইসলামের পতাকার নিচে সমবেত হতে হবে। কারণ আল্লাহ বলেন,
مَن
قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي
الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ
أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا ﴿المائدة:
٣٢﴾
যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে
প্রাণ অথবাপৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই
হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন
রক্ষা করে।
বস্তুতপক্ষে ইসলামের জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা, পরামর্শভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা,
নিরপেক্ষ বিচারপদ্ধতি এবং
কুরআনভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে
সব শ্রেণীর মানুষের জন্যই মুক্তির সনদ।
তাই বার্নার্ডশর মতো পশ্চিমা জাঁদরেল দার্শনিক বলতে বাধ্য হয়েছিলেন,
‘মুহাম্মদ (সা:)-কে অশান্ত বিশ্বের এক নায়ক
হিসেবে গ্রহণ করলে বিশ্ব শান্তি খুঁজে পাবে।’
এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র পথ- প্রিয়নবীর
রাজনৈতিক আদর্শকে ব্যক্তিজীবনের ক্ষুদ্র পরিসর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে
পর্যন্ত পূর্ণ অনুসরণ ও বাস্তবায়ন। মুসলিম বিশ্ব যদি হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে চায়,
তাকে তওবা করে পুনরায়
রাসূলের আদর্শের পূর্ণ অনুসরণ ও বাস্তবায়নের পথে ফিরে আসতে হবে। এই জন্য আল্লামা
ইকবাল বিশ্ব মুসলিমকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘হে মুসলমানেরা তোমরা যদি সততা আর ন্যায়নীতির পথে ফিরে আসতে
পারো, তাহলে দুনিয়া
তোমাদেরকে নেতৃত্বের আসনে বসাবে।’


No comments:
Post a Comment