Tuesday, October 20, 2020

১২ ই রবিউল আউয়ালঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্ম ও ওফাত দিবসঃ মহানবী সা:-এর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা

 


প্রিয় নবী সা:-এর জীবনে রাজনীতির প্রকৃতি, গতিধারা, প্রয়োজনীয়তা এবং তাঁর প্রভাব আলোচনা করতে গেলেই প্রশ্ন জাগে এই ধরার বুকে মানব সমাজের প্রতি তাঁর দায়িত্ব কি ছিল? আল্লাহ তায়ালাই পবিত্র কুরআনে এর জবাব দিয়েছেন এভাবে,

 

তিনিই তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছেন যাতে একে অন্য সব ধর্মের ওপর বিজয়ী করেন। সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা ফাতাহ : ২৮)।

এ ছাড়া আল্লাহ তায়ালা সূরা তাওবার ৩৩ এবং সূরা আসসফের ৯ নম্বর আয়াতে রাসূলুল্লাহ সা:-এর দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই দায়িত্বের পূর্ণতা বিধানের জন্য ৪০ বছর বয়সে আল্লাহ তাঁর হাবিবকে নবুয়তি দান করেন। তখন তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। জাগতিক উপায়-উপকরণ বলতেও তেমন কিছু তাঁর হাতে ছিল না। এমতাবস্থায়ও ১৩ বছরের মক্কী জীবনে হজরত আবু বকর রা:, হজরত উমর রা:, হজরত উসমান রা:, হজরত আলী রা: এবং হজরত আবুযর গিফারীর রা:-এর মতো সমাজের বেশ কিছু সেরা মানুষসহ মক্কার ৪৩৫, মদিনার ২০০ এবং হাবশায় হিজরতকারী প্রায় ১০০ লোকসহ মোট সাড়ে সাত শতাধিক ব্যক্তিকে তিনি ইসলামের ছায়াতলে শামিল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই সংখ্যাই মদিনায় হিজরতের পর এক বছরের মধ্যে প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে তিন হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়। এর দ্বারাও তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


বুখারি শরিফের কিতাবুল জিহাদে উল্লেখ আছে যে, দ্বিতীয় হিজরিতে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রিয় নবী সা: মুসলিম জনগণের একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে একটি দফতরের মধ্যে তা সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেন। সম্ভবত এটাই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিপিবদ্ধ আদমশুমারি। এ ছাড়া মক্কী জীবনে তাঁর কর্মকাণ্ডের সুবিধার জন্য পবিত্র কাবা শরীফের পাশেই হজরত আরকাম ইবনে আবুল আরকাম রা:-এর বাড়িতে একটা কেন্দ্রীয় দফতর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১২ রবিউল আউয়াল ৬২২ ঈসায়ী সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রিয়নবী সা: মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে সর্বপ্রথম মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। এটা এক দিকে ছিল যেমন ইবাদাতের ঘর, তেমনি ছিল পারস্পরিক সম্মিলন ও মিল-মুহাব্বাতেরও একটি কেন্দ্র।

আল্লামা ইবনে কাইয়েম লিখেছেন, অতপর প্রিয়নবী সা: হজরত আনাস রা:-এর গৃহে মোহাজের ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করে মানব ইতিহাসে এক অসাধারণ কাজ সম্পন্ন করেন।

পরবর্তীকালে আওস ও খাজরাজ গোত্রের বহু দিনের বিবাদ মিটিয়ে মদিনায় বসবাসকারী তিন শ্রেণীর মধ্যে ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মদিনার সনদ প্রণয়ন করেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটাই পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান। মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বলের চতুর্থ খণ্ডে উল্লিখিত বিশিষ্ট সাহাবী হজরত রাফে ইবনে খাদিজা রা:-এর বর্ণনা অনুসারে মসৃণ পাতলা চামড়ায় লিখিত এ সনদটি দীর্ঘকাল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নেতাদের কাছে ছিল। পরে তা হাদিস গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত হয়েছে।


প্রিয়নবী সা:-এর ১০ বছরের মাদানি জীবন পর্যালোচনা করলে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হবে রাষ্ট্রনেতা হিসাবেও তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। বিভিন্ন বিবদমান গোত্রগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় শাসনের আওতায় নিয়ে আসা, বিভিন্ন এলাকা এবং গোত্রের সর্বমোট ২০৯টি প্রতিনিধিদলকে সাক্ষাৎদান, রাজনৈতিক লক্ষ্যে ১০০রও বেশি দূত প্রেরণ, তৎকালীন সময়ের দুই পরাশক্তি পারস্য এবং রোম সম্রাটসহ চার শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে দাওয়াতিপত্র প্রেরণ, বিদ্রোহীদের দমন, বৈরী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা, আভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর অধিকার প্রদান, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি তাঁর সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড, তিনি যে একাধারে শ্রেষ্ঠ নবী, শ্রেষ্ঠ সংস্কারক, শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। প্রিয়নবী সা:-এর এই অনন্য-অসাধারণ রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণেই মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই মুসলিম জনসংখ্যা ৭০০ থেকে ১০ লাখে উন্নীত হয়। মাত্র ছয় বর্গমাইলের ইসলামী রাষ্ট্রের পরিধি পৌনে ১২ লাখ বর্গমাইলে বিস্তৃতি লাভ করে। বিদায় হজেই অংশগ্রহণকারী সাহাবিদের সংখ্যা ছিল সোয়া লাখের ওপরে।


প্রিয়নবী সা: ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ রাজনীতিবিদ, তাঁর প্রমাণ পাই আমরা তাঁকে অনুসরণকারী সাহাবিদের জীবনে। প্রকৃত রাজনীতিবিদেরা হবেন দেশ ও জনগণের খাদেম তথা সেবক। প্রিয় নবী সা: তাঁর অনুসারীদের এভাবেই তৈরি করেছিলেন। ফলে প্রসাশনের বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত ব্যক্তিরা নিজেদের জনগণের সেবকের ভূমিকায় উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মহানবী সা:-এর রাজনীতি ছিল ইসলামের জন্য। দেশ ও জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য। মানুষের হৃদয় মুকুরে ধর্মীয় চেতনাকে বদ্ধমূল করে আল্লাহ ভীরু চরিত্রবান মানুষ তৈরি করাই ছিল তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য। কারণ ধর্মীয় বিধান মূল চালিকাশক্তি হিসাবে যখন কাজ করে তখনই সমাজের বর্বরতা ও নৈরাজ্য দূর করা সম্ভব।

 

আজকের রাজনীতিবিদেরা যদি রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শে আদর্শবান হতে পারেন- তাহলে সমাজে শান্তি ফিরে আসবে সুনিশ্চিত। কারণ ধর্মহীন রাষ্ট্রনীতির দ্বারা মানুষের কল্যাণ হতে পারে না, এটা চরম সত্য।
আল্লামা ইকবাল বলেছেন, হোক না রাজনীতি, রাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রের রূপে যদি এই রাষ্ট্রনীতি থেকে দ্বীনকে আলাদা করে দেয়া হয় তবে ওই রাজনীতিতে শুধু চেংগিজি বর্বরতাই অবশিষ্ট থাকে।

 

No comments:

Post a Comment