Monday, October 19, 2020

১২ ই রবিউল আউয়ালঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্ম ও ওফাত দিবসঃ নবী-রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য বা রহস্য এবং বৈশিষ্ট্য।



ভূমিকা

আল্লাহ্ তাআলা এ পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন মানুষের বসবাসের জন্য। পৃথিবীর আদিকাল থেকে বিশ্ব মানবতার হিদায়াতকল্পে আল্লাহ্ তাআলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। আল্লাহ্ তাআলা বলেন,

وَلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ ﴿الرعد: ٧﴾

প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যে পথপ্রদর্শক রয়েছে। -সূরা রাআদঃ ৭

 

আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে আরো বলেন,

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًاَ ﴿الأعراف: ١٥٨﴾

বলে দাও, হে মানব মন্ডলী। তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহর প্রেরিত রসূল। -সূরা আরাফঃ ১৫৮

কোন গোত্র বা জাতি রাসূল ছাড়া অতিবাহিত করেনি।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا ........ ﴿النحل: ٣٦﴾

আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি..................। -সূরা নাহলঃ ৩৬

আল্লাহ্ তা’আলা এ প্রসংগে বলেন,

إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَإِن مِّنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ ﴿فاطر: ٢٤﴾

আমি আপনাকে সত্যধর্মসহ পাঠিয়েছি, সংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। এমন কোন সম্প্রদায় নেই যাতে সতর্ককারী আসেনি। -সূরা ফাতিরঃ ২৪

 

রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য

আল্লাহ্ তাআলা সৃষ্টির সূচনা থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির নিকট বিভিন্ন উদ্দেশ্যে নবী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। তন্মধ্যে উলে­খযোগ্য বিষয়গুলো নিম্মরূপ।

 

তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

وَإِلَىٰ مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا ۗ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ﴿الأعراف: ٨٥﴾ 

আমি মাদইয়ানের প্রতি তাদের ভাই শোয়ায়েবকে প্রেরণ করেছি। সে বলল: হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। -সূরা আরাফঃ ৮৫

 

তাগুতকে উত্খাত করার জন্য

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ۖ ﴿النحل: ٣٦﴾

আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাক। -সূরা নাহালঃ ৩৬

 

সৃষ্টি জগতের প্রতি আশির্বাদ স্বরূপ

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ ﴿الأنبياء: ١٠٧﴾

আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।'' -সূরা আম্বিয়াঃ ১০৭

 

মুমিনদের জন্য আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ স্বরূপ

দয়া-পরবশ হয়ে আল্লাহর রাসূল প্রেরণ করার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে (ক) ঐশী বাণী শিক্ষা দেয়া, (খ) সে আলোকে তার উম্মতদের ঈমান ও নৈতিক সংশোধন করা, (গ) আসমানী কিতাব ও ইসলামী জীবন ব্যবস্থার যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কলা-কৌশলের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরকে পথভ্রষ্টতা হতে রক্ষা করা। আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ ﴿آل‌عمران: ١٦٤﴾

আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তূত: তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট। -সূরা আলে ইমরানঃ ১৬৪

সাক্ষ্যদাতা, বেহেস্তের সুসংবাদ দাতা এবং দোযখের ভীতি প্রদর্শন কারী হিসেবে

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا﴿الأحزاب: ٤٥﴾

হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। -সূরা আহযাবঃ ৪৫

رُّسُلًا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا ﴿النساء: ١٦٥﴾

সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মত কোন অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে। আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশীল, প্রাজ্ঞ। -সূরা নিসাঃ ১৬৫

وَمَا نُرْسِلُ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ ۖ فَمَنْ آمَنَ وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴿الأنعام: ٤٨﴾

আমি পয়গম্বরদেরকে প্রেরণ করি না, কিন্তূ সুসংবাদাতা ও ভীতি প্রদর্শকরূপে অত:পর যে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সংশোধিত হয়, তাদের কোন শঙ্কা নেই এবং তারা দু:খিত হবে না। -সূরা আনআমঃ ৪৮

আলোকিত সমাজ গড়ার জন্য

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ﴿البقرة: ٢٥٧﴾

যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ্ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। -সূরা বাকারাঃ ২৫৭

 

আল্লাহর আইন অনুযায়ী বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ ۚ ﴿النساء: ١٠٥﴾

নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হƒদয়ঙ্গম করান। -সূরা নিসাঃ ১০৫

 

আল-কুরআন পাঠ, পরিশুদ্ধকরণ ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষাদান করার জন্য

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ﴿الجمعة: ٢﴾

তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। -সূরা জুমুআঃ ২

শিক্ষক হিসেবে

এ প্রসংগে প্রিয় নবী বলেন,

্রوَإِنَّمَا بُعِثْتُ مُعَلِّمًاগ্ধ (رَوَاهُ الدَّارمِيّ ,مشكوة : ২৫৭)                   

আর আমি তো শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। -দারেমী; মিশকাতঃ ২৫৭

মানব জাতির চারিত্রিক সংশোধন ও পরিপূর্ণতা দানের জন্য  

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ ﴿القلم: ٤﴾

আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।-সূরা কলমঃ ৪

রাসূলুল্লাহ বলেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রإِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِগ্ধ (كنز العمال-৩১৯৬৯)

আমি সচ্চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি। -কানযুল উম্মালঃ ৩১৯৬৯

ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ ﴿الحديد: ٢٥﴾

আমি আমার রসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিন্ঠা করে। -সূরা হাদীদঃ ২৫

পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে বিজয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ ﴿الصف: ٩﴾

তিনি তাঁর রাসূলকে পথ নির্দেশ ও সত্যধর্ম নিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে একে সব ধর্মের উপর প্রবল করে দেন যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। -সূরা সফঃ ৯

কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য

আল্লাহ্ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ﴿الأعراف: ١٥٧﴾

তারা সে সমস্ত লোক, যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রসূলের, যিনি উম্মী নবী, যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীলে লেখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসকর্ম থেকে। -সূরা আরাফঃ ১৫৭

আল্লাহ তাআলার রঙে রঙীন করতে

এ প্রসংগে আল্লাহ্ তাআলা বলেন,

صِبْغَةَ اللَّهِ ۖ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً ۖ وَنَحْنُ لَهُ عَابِدُونَ ﴿البقرة: ١٣٨﴾

আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রং এর চাইতে উত্তম রং আর কার হতে পারে? আমরা তাঁরই ইবাদত করি। -সূরা বাকারাঃ ১৩৮

উপসংহার

কালের চক্রে ভ্রান্ত মানব সমাজকে হিদায়াতের জন্যে আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং অবাধ্য মানুষকে বসে রাখার জন্যে তাঁদেরকে মুজিযা ও আসমানী কিতাব প্রদান করেছেন। আল্লাহ তাআলা সকল ক্ষেত্রে রাসূলের আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার তাওফীক দান করুন। -আমিন!!

                                              

নবী করিম -এর বৈশিষ্ট্য


ভূমিকা

আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে কতিপয় বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রেরণ করেছেন। তন্মধ্যে শেষ নবী মুহাম্মদ -কে এমন কতিপয় বৈশিষ্ট্য দ্বারা অভিষিক্ত করেছেন, যা অন্য নবী-রাসূলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে বলেন,

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ﴿الأحزاب: ٢١﴾

যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স¥রণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল­াহ -এর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।’’ -সূরা আহ্যাবঃ ২১

 

মুহাম্মদ -এর কতিপয় বৈশিষ্ট্য নিম্মে উলে­খ করা হলো :

নবী-রাসূলুল্লাহদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ

আল্লাহ তাআলা আদম (আঃ) হতে ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলুল্লাহদের থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, কারো যামানায় মুহাম্মদ -এর আবির্ভাব ঘটলে তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। নিজেদের ইমল ও নুবুয়্যাত এর কারণে তাঁর আনুগত্য ও সাহায্য থেকে বিরত থাকবে না। আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে কুরআনে বলেন,

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ ۚ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَىٰ ذَٰلِكُمْ إِصْرِي ۖ قَالُوا أَقْرَرْنَا ۚ قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ﴿آل‌عمران: ٨١﴾

আর আল্লাহ যখন নবীগনের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন যে, আমি যা কিছু তোমাদের দান করেছি কিতাব ও জ্ঞান এবং অত:পর তোমাদের নিকট কোন রসূল আসেন তোমাদের কিতাবকে সত্য বলে ঘোষণা দেয়ার জন্য, তখন সে রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তার সাহায্য করবে। তিনি বললেন, তোমরা কি অঙ্গীকার করছো এবং এ শর্তে আমার ওয়াদা গ্রহণ করে নিয়েছ? তারা বললো, আমরা অঙ্গীকার করেছি'। তিনি বললেন, তাহলে এবার সাক্ষী থাক। আর আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম।’’ -সূরা আলে-ইমরানঃ ৮১

বিশ্বব্যাপী রিসালাতের দাওয়াত

পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলুল্লাহ বিশেষ কওম ও গোত্রের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,

لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ﴿الأعراف: ٥٩﴾

নিশ্চয় আমি নুহকে তার সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠিয়েছি। সে বলল: হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্যে একটি মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করি।’’ -সূরা আরাফঃ ৫৯

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

وَإِلَىٰ عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا ۗ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۚ أَفَلَا تَتَّقُونَ﴿الأعراف: ٦٥﴾

আদ সম্প্রপ্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই হুদকে। সে বলল: হে আমার স¤প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতিত তোমাদের কোন উপাস্য নেই।’’-সূরা আরাফঃ ৬৫

وَإِلَىٰ ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا ۗ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖقَدْ جَاءَتْكُم بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ﴿الأعراف: ٧٣﴾

সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই সালেহ্কে। সে বলল: হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতিত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একটি প্রমাণ এসে গেছে।’’-সূরা আরাফঃ ৭৩

وَإِلَىٰ مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا ۗ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ قَدْ جَاءَتْكُم بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ ﴿الأعراف: ٨٥﴾

আমি মাদইয়ানের প্রতি তাদের ভাই শোয়ায়েবকে প্রেরণ করেছি। সে বলল: হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রমাণ এসে গেছে।’’ -সূরা আরাফঃ ৮৫

আর আমাদের নবী সমস্ত মানুষ ও জিন জাতীর প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বলেন,

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ ﴿الأعراف: ١٥٨﴾

বলে দাও, হে মানব মন্ডলী। তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহর প্রেরিত রসূল, সমগ্র আসমান ও যমীনে তার রাজত্ব।’’ -সূরা আরাফঃ ১৫৮

নবী করিম সমস্ত জিনদের নবী। আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে আল-কুরআনে বলেন,

وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَرًا مِّنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ فَلَمَّا حَضَرُوهُ قَالُوا أَنصِتُوا ۖ فَلَمَّا قُضِيَ وَلَّوْا إِلَىٰ قَوْمِهِم مُّنذِرِينَ ﴿الأحقاف: ٢٩﴾

যখন আমি একদল জিনকে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম, তারা কুরআন পাঠ শুনছিল। তারা যখন কুরআন পাঠের জায়গায় উপস্থিত হল, তখন পরস্পর বলল, চুপ থাক। অত:পর যখন পাঠ সমাপ্ত হল, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল।’’ -সূরা আরাফঃ ২৯

খতমে নুবুয়্যাত

আমাদের নবী মুহাম্মদ হচ্ছেন সর্বশেষ নবী, তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে আল-কুরআনে বলেন,

مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا ﴿الأحزاب: ٤٠﴾

মুহাম্মদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।’’ -সূরা আহ্যাবঃ ৪০

 

বিশ্বজগতের জন্য রহমত

মুমিন, কাফির, জিন এবং ইনসান সবার জন্য রহমত স্বরূপ। আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ ﴿الأنبياء: ١٠٧﴾

আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত ¯¦রূপই প্রেরণ করেছি।’’ -সূরা আম্বিয়াঃ ১০৭

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ادْعُ عَلَى الْمُشْرِكِينَ قَالَ ্র إِنِّى لَمْ أُبْعَثْ لَعَّانًا وَإِنَّمَا بُعِثْتُ رَحْمَةً (مسلم-৬৭৭৮(

আবূ হুরাইরা  বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ -কে বলা হলো হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের জন্য বদ দুআ করুন। তখন নবীজী বললেন, “আমি লানতকারী হিসেবে প্রেরিত হইনি। আমি তো রহমত স্বরূপ প্রেরিত হয়েছি।’’ -মুসলিমঃ ৬৭৭৮

 

উম্মতের জন্য নিরাপত্তা স্বরূপ

আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ -এর অস্তিত্বকে তার উম্মতের জন্য আযাব থেকে বাঁচার রক্ষাকবচ বানিয়েছেন। অথচ পূর্ববর্তী উম্মতদের অনেককে তাদের নবীর জীদ্দশায়ই শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। আনাস  হতে বর্ণিত, একদা আবূ জাহল বলল, হে মুহাম্মদ যদি তুমি আল্লাহর পক্ষ হতে সত্য নবী হয়ে থাকো তবে আমাদের উপর আকাশ হতে প্রস্তর বর্ষণ কর কিংবা আমাদের মর্মান্তিক শাস্তি দাও। তখন নাযিল হলো-

وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنتَ فِيهِمْ ۚ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ ﴿الأنفال: ٣٣﴾

অথচ আল্লাহ কখনই তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন না যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ কখনও তাদের উপর আযাব দেবেন না।’’ -সূরা আনফালঃ ৩৩

রাসূলুল্লাহ -এর জীবন ও সত্তার শপথ গ্রহণ

আল্লাহ তাআলা তার বক্তব্য সুদৃঢ় করার জন্য সৃষ্টির বহু কিছুর শপথ করেছেন। চন্দ্র, সুর্য, ফজর, আকাশ ইত্যাদির শপথ করছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ছাড়া কোন মানুষের শপথ আল্লাহ তাআলা করেননি। আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বলেন,

لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ ﴿الحجر: ٧٢﴾

আপনার প্রাণের কসম, তারা আপন নেশায় প্রমত্ত ছিল। -সূরা আল-হিজরঃ ৭২

শপথের দ্বারা এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, শপথকারীর নিকট যার জীবনের শপথ করা হয় তিনি মহা সম্মানিত। কাজেই রাসূলুল্লাহ -এর জীবনের শপথ করা দ্বারা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাসূলুল্লাহ -কে নবী বা রাসূল বলে সম্বোধন

আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি সম্মান প্রদর্শণার্থে কুরআনে নবী বা রাসূলুল্লাহ বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁর নাম ধরে সম্বোধন করেননি। পক্ষান্তরে অন্যান্য রাসূলুল্লাহকে তাঁদের নাম নিয়ে সম্বোধন করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে আল-কুরআনে বলেন,

يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ ۚ ﴿المائدة: ٦٧﴾

হে রসূল, পৌছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌছালেন না। -সূরা মায়িদাহ্ঃ ৬৭

وَقُلْنَا يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللَّهُ وَمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ﴿الأنفال: ٦٤﴾

হে নবী, আপনার জন্য এবং যেসব মুসলমান আপনার সাথে রয়েছে তাদের সবার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট। -সূরা আনফালঃ ৬৪

পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা অন্যান্য নবী-রাসূলগণের ব্যাপারে বলেছেন,

يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا ﴿البقرة: ٣٥﴾

এবং আমি আদমকে হুকুম করলাম যে, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং ওখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তিসহ খেতে থাক। -সূরা বাকারাঃ ৩৫

قِيلَ يَا نُوحُ اهْبِطْ بِسَلَامٍ مِّنَّا وَبَرَكَاتٍ عَلَيْكَ وَعَلَىٰ أُمَمٍ مِّمَّن مَّعَكَ ۚ وَأُمَمٌ سَنُمَتِّعُهُمْ ثُمَّ يَمَسُّهُم مِّنَّا عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴿هود: ٤٨﴾

হুকুম হল-হে নূহ (আঃ)! আমার পক্ষ হতে নিরাপত্তা এবং আপনার নিজের ও সঙ্গীয় সম্প্রদায়গুলির উপর বরকত সহকারে অবতরণ করুণ। আর অন্যান্য যেসব সম্প্রদায় রয়েছে আমি তাদেরকেও উপকৃত হতে দেব। অত:পর তাদের উপর আমার ভয়ংকর আযাব আপতিত হবে।-সূরা হুদঃ ৪৮

قَالَ يَا مُوسَىٰ إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَالَاتِي وَبِكَلَامِي فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُن مِّنَ الشَّاكِرِينَ ﴿الأعراف: ١٤٤﴾

(পরওয়ারদেগার) বললেন, হে মূসা, আমি তোমাকে আমার বার্তা পাঠানোর এবং কথা বলার মাধ্যমে লোকদের উপর বিশিষ্টতা দান করেছি। সুতরাং যা কিছু আমি তোমাকে দান করলাম, গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ থাক। -সূরা আরাফঃ ১৪৪

وَنَادَيْنَاهُ أَن يَا إِبْرَاهِيمُ * قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ ﴿الصافات: ١٠٤-١٠٥﴾

তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।-সূরা ছাফ্ফাতঃ ১০৪-১০৫

إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَىٰ وَالِدَتِكَ﴿المائدة: ١١٠﴾

যখন আল্লাহ বলবেন, হে ঈসা ইবন মরিয়ম, তোমার প্রতি ও তোমার মাতার প্রতি আমার অনুগ্রহ স¥রণ কর -সূরা মায়িদাহ্ঃ ১১০

পরিচিতির জন্য যেখানে মুহাম্মদ -এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে রাসূলুল্লাহ শব্দটিও যোগ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বলেন,

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ﴿آل‌عمران: ١٤٤﴾

আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। -

সূরা আলে-ইমরানঃ ১৪৪    

مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ ﴿الفتح: ٢٩﴾

মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল। -সূরা ফাতাহঃ ২৯

রাসূলুল্লাহ কে নাম নিয়ে ডাকা নিষেধ - এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বলেন,

لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا ۚ﴿النور: ٦٣﴾

রসূলের আহবানকে তোমরা তোমাদের একে অপরকে আহবানের মত গণ্য করো না। -সূরা নূরঃ ৬০

এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَنَسٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي السُّوقِ فَقَالَ رَجُلٌ: يَا أَبَا الْقَاسِمِ فَالْتَفَتَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنَّمَا دَعَوْتَ هَذَا. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم: ্রسموا باسمي وَلَا تكنوا بكنيتيগ্ধ (مُتَّفق عَلَيْهِ ,مشكوة-১/১৩৪৪-৪৭৫০)

আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ বাজারে ছিলেন, সে সময় এক ব্যক্তি (তাঁকে) হে আবূল কাসেম বলে সম্বোধন করল। তার দিকে রাসূলুল্লাহ তাকিয়ে বললেন, তুমি আমাকে এ নামে ডাকলে! আল্লাহর নবী তাকে শিক্ষা দিলেন। তুমি আমার নাম নিয়ে ডাকো, আমার উপনাম নিয়ে ডেকো না।’’ -বুখারী, মুসলিম, মিশকাত; মিশকাতঃ ৪৭৫০

অথচ পূর্ববর্তী উম্মতগণ তাদের নবীদেরকে নাম ধরেই সম্বোধন করতো। যেমন

إِذْ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَن يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ ۖ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ﴿المائدة: ١١٢﴾

যখন হাওয়ারীরা বলল: হে মরিয়ম তনয় ঈসা, আপনার পালনকর্তা কি এরূপ করতে পারেন যে, আমাদের জন্যে আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্জা অবতরণ করে দেবেন? তিনি বললেন: যদি তোমরা ঈমানদার হও, তবে আল্লাহকে ভয় কর।’’ -সূরা মায়িদাহ্ঃ ১১২

ব্যাপক অর্থবোধক বক্তব্য

আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ -কে ব্যাপক অর্থবোধক বক্তব্য দান করেছেন। ভাষার অলংকার, সাহিত্যের লালিত্য, বক্তব্যের গভীরতা এবং প্রয়োগের পান্ডিত্যে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ -কে শীর্ষে স্থান দিয়েছেন। যাবতীয় কল্যাণের হুকুম এবং যাবতীয় অকল্যাণ থেকে নিষেধকৃত ছোট্ট আয়াতটি নিম্মরূপঃ

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ﴿النحل: ٩٠﴾

আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্বরণ রাখ। -সূরা আন-নাহলঃ ৯০

أُعْطِيتُ جَوَامِعَ الْكَلِم (رَوَاهُ مُسلم ,مشكوة-৩/১৬০১- ৫৭৪৮)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলে করীম বলেন, আমাকে ভাষার কুঞ্জি তথা জামিউল কালিম (কথা বলার পারদর্শীতা) এবং সাহিত্য ও বাক্য জ্ঞান দান করা হয়েছে।’’ -মুসলিম, মিশকাতঃ ৫৭৪৮

 

ভীতির মাধ্যমে সাহায্যকরণ

আল্লাহ তাআলা ভালোবাসা মিশ্রিত ভীতির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -কে সাহায্য করেছেন। অর্থা আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ -এর শত্রদের হৃদয়ে ভয় ঢেলে দিতেন। ফলে রাসূলুল্লাহ ও শত্রদের মধ্যে এক মাস অথবা দু মাসের পথের দূরত্ব থাকা অবস্থায়ই তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যেত।

 

পৃথিবীর ধণ ভান্ডারের চাবি তাঁরই হাতে

আবূ হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أنه قال: ্রنُصِرْتُ بِالرُّعْبِ عَلَى الْعَدُوِّ، وَأُوتِيتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ، وَبَيْنَمَا أَنَا نَائِمٌ أُتِيتُ بِمَفَاتِيحِ خَزَائِنِ الْأَرْضِ، فَوُضِعَتْ فِي يَدَيَّগ্ধ (رواه المسلم-১/৩৭২-৫২৩)

যাবতীয় কল্যাণ দিয়ে আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে, ভীতির দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। একদা আমি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম তখন আমাকে পৃথিবীর ধণভান্ডারের চাবি প্রদান করে তা আমার হাতে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর উম্মতের জন্য রাজ্য জয়, পৃথিবীর ধণ-ভান্ডার হস্তগত করা, গনীমতের মাল প্রাপ্ত হওয়া ইত্যাদিকে সহজ করা হয়েছে। -মুসলিম খ. ১, পৃ. ৩৭২, হাঃ নং-৫২৩

রাসূলুল্লাহ -এর যাবতীয় গুনাহ মাফ

আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ -কে পূর্বাপর যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন এবং তাঁর জীবদ্দশায়ই আল্লাহ তাঁকে মাগফিরাতের সুসংবাদ জানিয়েছেন। অন্য কোন নবী সম্বোন্ধে এ জাতীয় সুসংবাদ প্রদান করা হয়নি। আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে আল-কুরআনে বলেন,

إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا* لِّيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُّسْتَقِيمًا* وَيَنصُرَكَ اللَّهُ نَصْرًا عَزِيزًا﴿الفتح: ١-٣﴾

নিশ্চয় আমি আপনার জন্যে এমন একটা ফয়সালা করে দিয়েছি, যা সু¯পষ্ট। যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। এবং আপনাকে দান করেন বলিন্ঠ সাহায্য।’’ -সূরা ফাতাহ্ঃ ১-৩

 

রাসূলুল্লাহ -কে চিরন্তন কিতাব দেওয়া হয়েছে

আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নবীকেই কমবেশী কিছু মুযিজা বা অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছেন। তাদের জীবদ্দশায়ই ঐ সব মুযিজার সময়কাল শেষ হয়েছে। আর নবী করীম -এর মুযিজা হচ্ছে আলকুরআন। যার প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও হরক্বত সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। যেমন আল্লাহ তাআলা এ প্রসংগে আল-কুরআনে বলেন,

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ ﴿الحجر: ٩﴾

আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ নাযিল করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’’ -সূরা হিজরঃ ৯

এতে পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারো নেই, অন্যত্রে আরো বলা হয়েছে,

لَّا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِن بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ ۖ تَنزِيلٌ مِّنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ﴿فصلت: ٤٢﴾

এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।’’ -সূরা হা-মীম আস্ সাজদাহ্ঃ ৪২

ইসরা ও মিরাজ

নবী করীম -এর ইসরা ও মিরাজ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বলেন,

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴿الإسراء: ١﴾

পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত-যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয় তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল। -সূরা বানী-ইসরাঈলঃ ১

 

উপসংহার

আমাদের নবী মুহাম্মদ -এর ঐতিহ্য শৌর্যবীর্যের প্রতি মুগ্ধ হয়ে অনেক অমুসলিম ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। রাসূলের সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হয়েছেন। আমরাও যেন রাসূলের সুন্নতের উপর আমল করে উভয় জাহানে সফলকাম হতে পারি। আমীন!!

No comments:

Post a Comment