Friday, February 19, 2021

ইসলাম ও মাতৃভাষা


২১ শে ফেব্রুয়ারিঃ শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।


ইসলামে মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্ব ও তাৎপর্য।

 

ভূমিকা

আল্লাহ মানুষকে যত নিয়ামত দিয়েছেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের ভাষা বা কথা বলার ক্ষমতা। এ বৈচিত্র্যময় ভাষা আর নিরূপম বাক প্রতিভার গুণে মানুষ অন্য সব প্রাণী থেকে পৃথক, বৈশিষ্ট্যমন্ডিত, উত্তম ও শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম মূল বুনিয়াদ হচ্ছে তার এ ভাব প্রকাশের শক্তি অর্থাৎ, ভাষা। মানুষ তার মনের আবেগ, অনুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা, অনুরাগ-বিরাগ, ক্রোধ-হিংসা, সবকিছই এ ভাষার মাধ্যমে ব্যক্ত করে। এখানেই মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ব্যবধান। মানুষের মত তাদেরও আবেগ আছে, ইচ্ছা আছে, আকাক্ষা আছে, প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে, অনুরাগ-বিরাগ আছে, ক্ষুদা-তৃষ্ণা আছে, কিন্তু নেই শুধু এগুলো ব্যক্ত করার বাহনশক্তি অর্থাৎ, ভাষা। خَـلَـقَ الْإِنْـسَـانَ ۚعَـلَّـمَـهُ الْـبَـيَـانَআল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে শিখিয়েছেন বয়ান।

 

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব

এই বয়ান ও বর্ণনা শক্তি কত বড় নিআমত তা তাদের কাছে জিজ্ঞেস করুন যাদের বাকশক্তি নেই। যারা মূক-বোবা-বাকশক্তিহীন; যারা কথা বলতে পারেনা। তারা তাদের মনের ভাবকে কত কষ্টে, ইশারা-ইঙ্গিতে বুঝাতে চায়, তবু মানুষ বুঝে না। দুঃখ, কষ্টে, ক্ষোভে তাদের কলিজাটা যেন ফেঁটে যায়। বহু ধনাঢ্য পরিবারে কোটিপতির ঘরেও বোবা সন্তানের জন্ম হয়। যদি টাকা পয়সা খরচ করে মুখে বুলি ফুটানো যেতো, তা হলে অনেক মানুষই তাদের বিত্তবৈভবের দ্বারা বোবাদের মুখে ভাষা ফুটাতে চেষ্টা করতো, কিন্তু কেউ তা করতে পারে না। সবাই জানে, ভাষা আল্লাহর দান। তারই প্রদত্ত নিআমত। মায়ের সাথে শিশুর সম্পর্ক যেমন প্রগাঢ়, মাতৃভাষার সাথে মানুষের সম্পর্ক তেমনই। এটা হলো তার স্বভাবের চাহিদা। তাই ইসলাম তার এ স্বভাবগত ও জন্মগত চাহিদাকে অস্বীকার করেনি; বরং এর প্রয়োজনীয়তার উপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছে এবং এর বিকাশের সর্বোত্তম ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

 

মাতৃভাষা আল্লাহর সেরা দান

আল্লাহ তাআলা আদি মানব আদম (আঃ)-কে ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন। অতএব ভাষার আদি স্রষ্টাও আল্লাহ তাআলা। তাই ভাষার এ নিয়ামতের প্রতি ইঙ্গিতে আল্লাহ তাআলা বলেন,

الـرَّحْـمٰـنُ ۚ عَـلَّـمَ الْـقُـرْآنَ ۚخَـلَـقَ الْإِنْـسَـانَ ۚعَـلَّـمَـهُ الْـبَـيَـانَ ﴿الرحمن: ٤-١﴾

পরম করুণাময় ও দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিক্ষা দিয়েছেন ভাব প্রকাশের ক্ষমতা বা কথা বলার ক্ষমতা তথা ভাষা।” -সূরা আর-রাহমানঃ ১-৪

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَٰؤُلَاءِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ ﴿البقرة: ٣١﴾

আর আল্লাহ্ শিখালেন আদমকে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীর নাম। তারপর সে সমস্ত বস্তু-সামগ্রি ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক।” -সূরা বাক্বারাঃ ৩১

 

ভাষার উৎস

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের পবিত্র উল্লেখিত বাণীতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, আল্লাহর অন্যান্য নিয়ামতের মত ভাষাও একটা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত বা আল্লাহর দান। সন্দেহ নেই যে আদম স-এর ভাষা ছিল একটি, কিন্তু পৃথিবীতে আদম সন্তানের বংশ বিস্তারের সাথে সাথে আদি মানুষের আদি ভাষাও স্বভাবতঃ কারণে নানা শাখা-প্রশাখায় বিস্তার লাভ করেছে। ফলে বিস্তীর্ণ পৃথিবীর বিচিত্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজ হাজার হাজার ভাষার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

 

ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র আল্লাহর কুদরত

নিপুণ শিল্পকুশলতায় আল্লাহ যেমন অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বসুন্ধরা সৃষ্টি করেছেন, তেমনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নানা বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের প্রতীক বানিয়ে। মানুষের গোত্র ও গাত্রবর্ণ, স্বরের রুক্ষ্মতা-কোমলতা, দৈহিক উচ্চতা-খর্বতা আর রুচি-অভিরুচির ভিন্নতার মতো তার ভাষায়ও দিয়েছেন নান্দনিক বিভিন্নতা। তাই আলকুরআনুল কারীমে মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি আর রকমারি সৃষ্টির এ বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে বিভিন্ন জনপদে নানা প্রকৃতি, ভাষা, বর্ণ, গোত্রে বিভক্ত মানুষের ভাষার বিভিন্নতাকেও মূলত আল্লাহর অসীম কুদরতের মহা নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। -সূরা হুজুরাতঃ ১৩ () ; সূরা জুখরুফঃ ৩২ (২) 

এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمِـنْ اٰيَـاتِـهِ خَـلْـقُ الـسَّـمَـاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْـتِـلَافُ اَلْـسِـنَـتِـكُمْ وَاَلْـوَانِـكُمْ إِنَّ فِـيْ ذٰلِـكَ لَآيَـاتٍ لِّـلْـعَـالِـمِـيْـنَ ﴿الروم: ٢٢﴾

আর তাঁর (আল্লাহ) নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য বা ভিন্নতা। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।”-সূরা রূমঃ ২২

 

পৃথিবীর সকল মানুষ যেমন আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি, সকল ভাষাও তেমনি আল্লাহর প্রিয়। কাজেই কোনো ভাষাকে অন্য ভাষা থেকে অধিক মর্যাদাময় বা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় বা কোনো ভাষাকে আল্লাহর দৃষ্টিতে ঘৃণ্য বলে মনে করার কোনো অবকাশ নেই।

 

মাতৃভাষার পরিচিতি

বাগযন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানব জাতির মনের ভাব বা ইচ্ছা বা অভিপ্রায় প্রকাশের মাধ্যমকে ভাষা বলে। আর মাতৃভাষার অর্থ হলো স্বজাতীয় ভাষা, মায়ের মুখ থেকে বাল্যকাল হতে যে ভাষা শিক্ষা করা হয় বা মায়ের অনুসরণে যেসব কথা বলা হয় বা নিজ নিজ দেশের প্রচলিত ভাষা বা মায়ের মুখের ভাষাই মাতৃভাষা।

সে হিসেবে মানুষ জন্ম গ্রহণ করার পর যেখানকার আলো বাতাসে সে বেঁচে থাকে, ফল-ফসল, খাদ্য-পানি তার দেহে পুষ্টি যোগায়, ভূখন্ড, প্রকৃতি, মানুষ, কৃষ্টি-কালচার সর্বোপরি যে দেশের (মায়ের) কাছে বড় হওয়ার পাশা-পাশি বাগযন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর সাথে ভাব প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে মাতৃভাষা।

 

ভাষার পরিসংখ্যান

বর্তমানে পৃথিবীতে ঠিক কতগুলো ভাষা রয়েছে তা অনুমান খুব কঠিন। তবে ধারণা করা হয় এর সংখ্যা প্রায় ৩,০০০ থেকে ৮,০০০ হবে। ঈথনোলোগ (ঊঃযহড়ষড়মঁব) নামের ভাষা বিশ্বকোষের ২০০৯ সালে প্রকাশিত ১৬ তম সংস্কারণের হিসেব মতে জীবিত ভাষার সংখ্যা প্রায় ৬৯০৯। ইউকিপিডিয়ার তথ্যমতে, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত ৭৩৩০ টি ভাষার সন্ধান পাওয়া গেছে। তার মধ্যে বাংলা একটি ভাষা। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় চব্বিশ কোটি লোকের মুখের ভাষা বাংলা।

 

আল-কুরআন ও আল-হাদীসের আলোকে মাতৃভাষা

যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মানুষদেরকে সুপথ দেখাতে আসা সব মহামানবই গুরুত্ব দিয়েছেন মাতৃভাষার প্রতি; কেননা স্বজাতির হৃদয় স্পর্শ করতে এর চেয়ে উত্তম ভাষা আর হয় না। সেহেতু এ সব সম্মানিত বার্তাবাহক যিনি যে এলাকার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন, সে এলাকার ভাষাই ছিল তাঁর মাতৃভাষা। তাঁরা তাঁদের মাতৃভাষায় কথা বলেছেন, প্রচার করেছেন, আল্লাহর দেয়া নুবুওয়্যাতের দায়িত্ব পালনে মাতৃভাষাকেই বাহন হিসেবে ব্যাবহার করেছেন এবং প্রেরিত কিতাবসমূহও আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলদের মাতৃভাষায় নাযিল করেছেন। এ সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহপাক বলেছেন,

وَمَـا اَرْسَـلْـنَـا مِـنْ رَّسُـوْلٍ اِلَّا بِـلِـسَـانِ قَـوْمِـهِ لِـيُـبَـيِّـنَ لَـهُـمْ فَـيُـضِـلُّ الـلّٰـهُ مَـنْ يَّـشَـآءُ وَيَـهْـدِيْ مَـنْ يَّـشَـآءُ وَهُـوَ الْـعَـزِيْـزُ الْـحَـكِـيْـمُ ﴿ابراهيم: ٤﴾

আর আমি প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে সে তাঁদের নিকট পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা দেয়, সুতরাং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ দেখান। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” -সূরা ইব্রাহীমঃ ৪

 

এজন্য হযরত দাউদ আ. এর মাতৃভাষা ইউনানী বা আরমাইক ভাষায় যাবুর কিতাব, মুসা আ. এর মাতৃভাষা ইবরানী বা হিব্রু ভাষায় তাওরাত, ইসা আ. এর মাতৃভাষা সুরইয়ানী বা সিরিয়ার ভাষায় ইঞ্জিল ও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাতৃভাষা আরবীতে আলকুরআন নাযিল করা হয়েছে।

 

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَـقَـدْ مَـنَّ الـلّٰـهُ عَـلَى الْـمُـؤْمِـنِـيْـنَ اِذْ بَـعَـثَ فِـيْـهِـمْ رَسُـوْلًا مِّـنْ اَنْـفُـسِـهِـمْ يَـتْـلُـوْ عَـلَـيْـهِـمْ اٰيَـاتِـهِ وَيُـزَكِّـيْـهِـمْ وَيُـعَـلِّـمُـهُـمُ الْـكِـتَـابَ وَالْـحِـكْـمَـةَ وَاِنْ كَـانُـوْا مِـنْ قَـبْـلُ لَـفِـي ضَـلَالٍ مُّـبِـيْـنٍ ﴿ال‌عـمـران: ١٦٤﴾

নিশ্চয় আল্লাহর মহা অনুগ্রহ হয়েছে মুমিনদের উপর, তাদের মধ্যে থেকে তাদের জন্য একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে পবিত্র করেন। আর তাঁদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দান করেন এবং তারা নিশ্চয় পূর্বে সুস্পষ্ট গুমরাহীতে ছিল।” -সূরা আলে ইমরানঃ ১৬৪

 

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ পয়গম্বর আল্লাহর দূত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মাতৃভাষাও ছিল আরবী। আল্লাহর বিশেষ হিকমতের কারণে উম্মী তথা নিরক্ষর থাকা এ নবীও দেখা যায় দাওয়াত তথা স্বজাতির কাছে রবের বার্তা প্রচারে মাতৃভাষার প্রতি গুরুত্বের ইঙ্গিত করেছেন। অন্যসব ক্ষেত্রের মতো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যবাদী লোকটিও মাতৃভাষা সম্পর্কে সচেতন এবং শ্রেষ্ঠ আরব ছিলেন। তিনি নিজে আরবদের মধ্যে সব চেয়ে শুদ্ধভাষী ব্যক্তি ছিলেন; কারণ, তিনি কুরাইশ বংশীয় সন্তান আর তিনি বেড়ে উঠেছিলেন ভাষার দিক থেকে প্রসিদ্ধ আরবের তৎকালীন সাদ ইবন বকর গোত্রে। আলকুরআন পৃথিবীর সর্বকালের সমস্ত মানব জাতির উদ্দেশ্যে নাযিলকৃত কিতাব। এ মহাগ্রন্থও যে মহামানবের নিকটে নাযিল হয়েছে তা তাঁর মাতৃভাষা আরবীতে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন,

وَكَـذٰلِـكَ اَوْحَـيْـنَـا اِلَـيْـكَ قُـرْاٰنًـا عَـرَبِـيًّـا لِّـتُـنْـذِرَ اُمَّ الْـقُـرٰى وَمَـنْ حَـوْلَـهَـا وَتُـنْـذِرَ يَـوْمَ الْـجَـمْـعِ لَا رَيْـبَ فِـيْـهِ فَـرِيْـقٌ فِـي الْـجَـنَّـةِ وَفَـرِيْـقٌ فِـي الـسَّـعِـيْـرِ ﴿الـشـورى: ٧﴾

এভাবে আমি আপনার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি আরবী ভাষায়, যাতে আপনি সতর্ক করেন সমস্ত শহরের মূল মক্কা ও তার চতুর্দিকের জনগণকে এবং আপনি সতর্ক করবেন কিয়ামত দিবস সম্পর্কে, যাতে কোন সন্দেহ নেই। সেদিন একদল জান্নাতে যাবে একদল দোযখে।সূরা শুরাঃ ৭

আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন,

وَمِـنْ قَـبْـلِـهِ كِـتَـابُ مُـوْسٰى اِمَـامًـا وَّرَحْـمَـةً وَّهٰـذَا كِـتَـابٌ مُّـصَـدِّقٌ لِّـسَـانًـا عَـرَبِـيًّـا لِّـيُـنْـذِرَ الَّـذِيْـنَ ظَـلَـمُـوْا وَبُـشْـرٰى لِـلْـمُـحْـسِـنِـيْـنَ ﴿الأحـقـاف: ١٢﴾

এর আগে মূসার কিতাব ছিল পথপ্রদর্শক ও রহমতস্বরূপ। আর এ কিতাব তার সমর্থক আরবী ভাষায়, যাতে যালেমদেরকে সতর্ক করে এবং সৎকর্মপরায়ণদেরকে সুসংবাদ দেয়।” -সূরা আহকাফঃ ১২

আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন,

اِنَّـآ اَنْـزَلْـنَـاهُ قُـرْاٰنًـا عَـرَبِـيًّـا لَّـعَـلَّـكُمْ تَـعْـقِـلُـوْنَ ﴿يوسف: ٢﴾

নিশ্চয় আমি সেটাকে (কুরআন) নাযিল করেছি আরবী ভাষায়, যাতে তোমরা বুঝতে পার।” -সূরা ইউসুফঃ ২

 

আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

اِنَّـا جَـعَـلْـنَـاهُ قُـرْاٰنًـا عَـرَبِـيًّـا لَّـعَـلَّـكُمْ تَـعْـقِـلُـوْنَ ﴿الزخرف: ٣﴾

নিশ্চয় আমি সেটাকে (কুরআন) নাযিল করেছি আরবী ভাষায়, যাতে তোমরা বুঝতে পার।” -সূরা জুখরুফঃ ৩

আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

وَكَـذٰلِـكَ اَنْـزَلْـنَـاهُ حُـكْـمًـا عَـرَبِـيًّـا وَلَـئِـنِ اتَّـبَـعْـتَ اَهْـوَائَـهُـمْ بَـعْـدَمَـا جَـآئَـكَ مِـنَ الْـعِـلْـمِ مَـا لَـكَ مِـنَ الـلّٰـهِ مِـنْ وَّلِـيٍّ وَلَا وَاقٍ ﴿الـرعـد : ٣٧﴾

এমনিভাবেই আমি এ কুরআনকে আরবী ভাষায় নির্দেশরূপে নাযিল করেছি। যদি আপনি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন আপনার কাছে জ্ঞান পৌঁছার পর, তবে আল্লাহর কবল থেকে আপনার না কোন সাহায্যকারী আছে এবং না কোন রক্ষাকারী।” -সূরা রাদঃ ৩৭

 

আল্লাহ আরো বলেন,

كِـتَـابٌ فُـصِّـلَـتْ اٰيَـاتُـهُ قُـرْاٰنًـا عَـرَبِـيًّـا لِّـقَـوْمٍ يَّـعْـلَـمُـوْنَ ﴿فصلت: ٣﴾

এটা এমন কিতাব যাতে বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে এর আয়াতসমূহ, আরবী ভাষায় কুরআন বোধশক্তিসম্পন্নদের জন্য।” -সূরা ফুছ্ছিলাতঃ ৩

 

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَكَـذٰلِـكَ اَنْـزَلْـنَـاهُ قُـرْاٰنًـا عَـرَبِـيًّـا وَصَـرَّفْـنَـا فِـيْـهِ مِـنَ الْـوَعِـيْـدِ لَـعَـلَّـهُـمْ يَـتَّـقُـوْنَ اَوْ يُـحْـدِثُ لَـهُـمْ ذِكْـرًا ﴿طـه: ١١٣﴾

এমনিভাবে আমি আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করেছি এবং তাতে বিশদভাবে সতর্কবাণী বিবৃত করেছি যাতে তারা ভয় করে কিংবা তাদের অন্তরে কিছু চিন্তা-ভাবনা সৃষ্টি করে।” -সূরা ত্ব-হাঃ ১১৩

 

আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُرْآنًا عَرَبِيًّا غَيْرَ ذِي عِوَجٍ لَّعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ ﴿الزمر: ٢٨﴾

আরবী ভাষায় এ কুরআন বক্রতামুক্ত, যাতে মানুষ সাবধানতা অবলম্বন করে।” -সূরা যুমারঃ ২৮

আল্লাহ আরো বলেন,

وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهٰذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ ﴿النحل: ١٠٣﴾

আমি তো ভালভাবেই জানি যে, তারা বলে তাকে জনৈক ব্যক্তি শিক্ষা দেয়। যার দিকে তারা ইঙ্গিত করে, তার ভাষা তো আরবী নয় এবং এ কুরআন পরিস্কার আরবী ভাষায়।” -সূরা নাহালঃ ১০৩

 

এ সমস্ত বাণী দ্বারা বোঝা যায় যে, মক্কা ও তার চারপাশের জনগণ ছিল আরবী ভাষাভাষী, তাই তাদের মাতৃভাষায় মহাগ্রন্থ আলকুরআন নাযিল করা হয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মহানবী (সাঃ) যাতে তাঁর নিজের জন্মভূমির অধিবাসীদের কাছে মাতৃভাষায় অতি সহজভাবে আল্লাহর দীন প্রচার করতে পারেন। আর সেখানকার মানুষেরাও যাতে জেনে, শুনে এবং বুঝে হিদায়াত লাভ করে অন্যায়, অসত্য পথ থেকে বিরত থেকে ন্যায় ও কল্যাণ লাভে সমর্থ হতে পারে। বস্তুত এর দ্বারা অন্য কোন ভাষার প্রতি অবজ্ঞা করা হয়নি।

 

কোনো বক্তব্য ভাল করে বুঝা ও বুঝানো কেবল মাতৃভাষাতেই সম্ভব। এর বিপরীত যদি হতো যেমন: উম্মত এক ভাষায় কথা বলে আর নবী আরেক ভাষায় কথা বলেন, তাহলে কেউ কারোও কথা বুঝতো না। ফলে যে উদ্দেশ্যে এগুলো নাযিল করা হয়েছে তা ব্যর্থ হতো। কাফিররা আপত্তি উত্থাপন করতো। সুরা হামীম সাজদা এর ৪৪ নং আয়াতে ঘোষণা হচ্ছে-

وَلَوْ جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا أَعْجَمِيًّا لَّقَالُوا لَوْلَا فُصِّلَتْ آيَاتُهُ أَأَعْجَمِيٌّ وَعَرَبِيٌّ ﴿فصلت: ٤٤﴾

আর যদি আমি কুরআনকে অনারব ভাষায় নাযিল করতাম তবে তারা অবশ্যই বলত এর আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বিবৃত হলো না কেন। এ কেমন কথা- অনারবী কিতাব আর আরবী ভাষাভাষী রাসুল।

 

ইসলাম শুধু মাতৃভাষা নয়, মাতৃভাষার আঞ্চলিক উপভাষাও সমর্থন করেছে মজবুতভাবে। খেয়াল রাখা হয়েছে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতি। বুখারী শরীফের ২৪১৯ নং হাদীসে এসেছে-

إِنَّ القُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ

কুরআনকে সাতটি উপভাষায় নাযিল করা হয়েছে। সুতরাং মাতৃভাষাকে গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়ার মতো ইসলাম ছাড়া আর কোথাও এমন উৎকৃষ্ট উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 

 

ইসলাম যেহেতু কোন স্থান-কাল ও সম্প্রদায়ের নয় সেহেতু ইসলামের দৃষ্টিতে কোন ভাষাই ইতরবিশেষ নয়। সকল মানুষের মাতৃভাষার মর্যাদাই সমান। তা যে ভাষাই হোক না কেন। তবে পৃথিবীতে সকল মানুষ যেমন সমান নয়, সকল ভাষাও তেমনি সমান উন্নত নয়। মানুষ নেক আমলের দ্বারা যেমনি মহৎ ও মর্যাদাবান হতে পারে, ভাষাও তেমনি চর্চা ও অনুশীলনের দ্বারা উৎকর্ষ লাভ করতে পারে। তাই বলে উন্নত ভাষার প্রতি সম্মান দেখাতে গিয়ে মাতৃভাষার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন কোনক্রমেই সঙ্গত নয়।

 

মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা ও মর্যাদা

মানুষের মানবিক মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে মাতৃভাষা অন্যতম। ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল বা অন্য কোন কারণে কোনো জনগোষ্ঠীকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার বা শোষণ করার অধিকার কারো নেই। জুলুম, বঞ্চনা বা শোষণ থেকে আত্মরক্ষা করা এবং নিজের অধিকার আদায় করার জন্য সক্রিয় ও সচেষ্ট হওয়া মমিনের দায়িত্ব ও অধিকার বলে কুরআন-হাদীসে ঘোষণা করা হয়েছে। (৩) কাজেই মাতৃভাষা ছাড়া মনের ভাব সম্যকরূপে প্রকাশ করা দুরহ ব্যাপার। পৃথিবীতে কোন কবি বা লেখকই তার মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় অমর সাহিত্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হননি। যেমন যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামের মাইকেল মধূসুদন দত্তের ন্যায় বিরাট প্রতিভা সম্পন্ন ব্যক্তি আজন্ম ইংরেজি ভাষা চর্চা করা সত্তে¡ও ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করে খ্যাতি অর্জনে সক্ষম হন নি। অবশেষে যে মাতৃভাষাকে চরম অবজ্ঞা করেছিলেন, সেই মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্য চর্চা করেই খ্যাতিমান হতে পেরেছিলেন। এ জন্য মাতৃভাষাকে ভালবাসা মানুষের এক সহজাত প্রবণতা। ইসলাম সর্বক্ষেত্রে এ সহজাত প্রবণতারই সপক্ষে। তাই ইসলামকে বলা হয় ফিতরাতের (স্বভাবের) ধর্ম। বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে Law of Nature। তাই এ সহজাত প্রবণতাকে অস্বীকার করা কেবল অবাস্তবই নয় বরং আত্মঘাতির নামান্তর।

 

মাতৃভাষার প্রতি মানুষের অনুরাগ সহজাত। স্বকীয় প্রতিভা বিকাশের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম মাতৃভাষা। কিন্তু তাই বলে অন্য কোন ভাষা ঘৃণা করা, শেখা বা চর্চা করা যাবে না এমন নয়; বরং প্রয়োজন অনুসারে নিজের জ্ঞান-বুদ্ধির এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিদেশী ভাষাসহ যে কোন ভাষা সাধ্য অনুসারে শেখা যেতে পারে। এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অতিশয় উদার ও বিশ্বজনীন। অর্থাৎ ইসলাম মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্ব প্রদানের পাশা পাশি মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ, শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মনোভাব প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়।

 

প্রসিদ্ধ সাহাবী যাইদ ইবন সাবিত আনসারী য বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন মদীনায় হিজরত করে আসলেন তখন আমি ১১/১২ বৎসরের তরুণ। ইতোমধ্যেই আমি কুরআনের অনেকগুলো সূরা মুখস্থ করেছি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-সূরাগুলো শুনে চমৎকৃত হন। আমার মেধা দেখে তিনি বলেন, যাইদ! তুমি ইহুদীদের ভাষা, হিব্রভাষা (Hebrew language) ও সিরীয় ভাষা (Syriac language, Christian Aramaic, usually called Syriac) শিক্ষা কর। তারা কি লিখে ও বলে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত হতে চাই। তখন আমি মাত্র ১৫ বা ১৭ দিনের মধ্যে তাদের ভাষা শিক্ষা করি। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইহুদীদেরকে কিছু লিখতে চাইলে অমি তা লিখে দিতাম এবং ইহুদী-খৃস্টানগণ কিছু লিখলে আমি তা তাঁকে পড়ে শুনাতাম।  কাজেই দেখা যায় ইসলাম মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্ব প্রদানের পাশা-পাশি মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ, শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মনোভাব প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়।

 

এ বিষয়ে ফুরফুরার পীর মাওলানা আবূ বাকর সিদ্দীকীর (র:)  একটি ওসীয়ত প্রণিধানযোগ্য। ১৯২৯-৩০ সালে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর ওসীয়ত ছাপেন। এতে তিনি উর্দু, ফার্সীকে অন্যান্য ভাষার কাতারে রেখে আরবী, বাংলা ও ইংরেজী ভাষা শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি লিখেন, “সেই জন্য মোছলমান মাত্রকেই দ্বীনের এলম আরবী শিক্ষা করা অবশ্য প্রয়োজন। ইংরেজী, বাংলা, উর্দু, ফারছী প্রভৃতি ভাষার দ্বারাও এছলামের খেদমত এবং উহা জেন্দা রাখিতে পারা যায়। কিন্তু উহার মূলে আরবী শিক্ষার নেহায়াত জরুরৎ। কেননা আরবী না হইলে এছলামকে যথার্থরূপে বুঝিতে পারা যাইবে না। ......দেশীয় ভাষা বাংলা, রাজ ভাষা ইংরেজী খুব আবশ্যক। 

 

আল্লাহ প্রেম, রাসূল প্রেম, সৃষ্টি প্রেম, আত্ম প্রেম প্রভৃতি প্রেম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, মাতৃভাষার প্রতি প্রেমের গুরুত্বও প্রায় এমনি রকমের। যেমন বহুল প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ একটি আরবি প্রবাদ যা জ্ঞানীরা বলেছেন,

 اُطْلُبُوْا الْعِلْمَ وَلَوْ كَانَ فِي السِّيْنِ / الصين

বিদ্যার্জনে প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে যাও।অর্থাৎ জ্ঞান অন্বেষণে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে গিয়ে যে কোন ভাষা শেখার জন্য ইসলাম উৎসাহ প্রদান করেছে। এ গুরুত্ববহ প্রবাদটি ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে জুড়ে এত বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে যে, তাদের কেউ কেউ এটিকে হাদীস বা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বাণী বলেও অভিহিত করেছেন। কিন্তু প্রবাদটি হাদীস বা কোন সাহাবীর উক্তি নয়, তা সন্দেহাতীতভাবে সত্য। তাই বলে প্রবাদটি ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষার ব্যতিক্রমও নয়, নয় আড়াআড়ি বিপরীতও।

 

দ্বীন ইসলাম প্রচারে মাতৃভাষার গুরুত্ব বা ভূমিকা    

মাতৃভাষার গুরুত্ব শুধু ভৌগলিক বা ঐতিহাসিক কারণ অবধি সীমিত নয়; ধর্মীয়ভাবেও মাতৃভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। দ্বীন ইসলাম প্রচারে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, মাতৃভাষার মাধ্যমে যেভাবে ইসলামের সুমহান বাণী ও আদর্শকে মানুষের অন্তরের গভীরে পেীছে দেয়া যায়, অন্য কোন ভাষার মাধ্যমে তা কিছুতেই সম্ভবপর নয়। আর এ কারণেই পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল প্রেরিত হয়েছেন সবাইকে আল্লাহ তাআলা স্বীয় কওমের ভাষাজ্ঞান দিয়ে প্রেরণ করেছেন।  আর তাই সমস্ত নবীগণ ছিলেন মাতৃভাষায় পারদর্শী। এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজেকে اَنَــا اَفْــصَــحُ الْــعَــرَبَ তথা আমি আরবের সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষাভাষীবলে ঘোষণা দিয়েছেন।

 

বিশ্ব বিখ্যাত ঐতিহাসিক পর্যটক ইবন খালদুন মাতৃভাষার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেন, “প্রত্যেক দেশের শিক্ষা তাদের মাতৃভাষায় হওয়া আবশ্যক।কেননা, অপরিচিত ভাষায় শিক্ষা লাভ করা অশিক্ষারই নামান্তর।

 

বিশ্ব বিখ্যাত সাহিত্যিক সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র:) বলেন,“ মাতৃভাষার প্রতি বিমাতাসূলভ আচরণ বা কোন প্রকার অবজ্ঞা প্রকাশ করা জাতি হত্যারই নামান্তার।

 

ইসলাম প্রচারে মাতৃভাষায় প্রয়োজনীয়তা

দ্বীন ইসলাম প্রচার ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা অনবদ্য ও অপ্রতিদ্বদ্বী। কারণ আমি যে ভাষায় কাক্সিক্ষত বিষয় প্রচার করছি, যে পদ্ধতিতে প্রচার করছি, যার নিকট করছি এ মহামূল্যবান পবিত্র ধর্ম ইসলাম। সেই পবিত্র ইসলাম প্রচারে কাক্সিক্ষত সফলতা পুরো মাত্রায় অর্জিত হচ্ছে কি না তা এ মাতৃভাষাকে যথোচিত মর্যাদার মাধ্যমে সম্ভব।

 

ধর্ম প্রচারে ভাষার গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা ধর্মের সূচনাকাল থেকেই লক্ষ্য করা যায়। যেমন সহিফায়ে ইবরাহিম এবং সহিফায়ে মুসা সহ যে সব আসমানি কিতাব বিশ্বকল্যাণে আল্লাহ নাযিল করেছেন। তন্মধ্যে উলে¬যোগ্য হলো তাওরাত, যাবুর, ইন্জিল এবং কুরআন। এসব কিতাব প্রত্যেক জাতির জন্য নিজ নিজ ভাষায় স্বগোত্রীয়দের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নিকট নাযিল হয়েছে। এমনকি মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় কোনো নবী-রাসূলও তিঁনি প্রেরণ করেননি।

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ ﴿فصلت: ٣٣﴾

যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার?” -সূরা ফস্সিলাতঃ ৩৩

 

অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের প্রতি আহবানকারী হলো সবার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।’’ -তাফসিরে ইবন কাসির : ১/৬৭। আর যুক্তির দাবি হলো, শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হবেন আদর্শবান ও অনুসরণযোগ্য। চরিত্র-মাধুর্য, ভাষা-সাহিত্যে এবং সার্বিক লেন-দেনে তিনি হবেন অনুকরণীয়। তাই দেখা যায় সব ভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও সুপণ্ডিত নত শিরে স্বীকার করেছেন নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব। কোমল চরিত্র ও অন্যান্য বিষয়ের মতো তাঁর ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং সাহিত্যালঙ্কারগত অলৌকিকত্বের স্বীকৃতিও দিয়েছেন তারা সর্বযুগে সর্বকালে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا......................... فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ ﴿الأعراف: ١٥٨﴾

হে মানুষ, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। ..............সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহর উপর, তার প্রেরিত উম্মী নবীর উপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহর এবং তার সমস্ত কালামের উপর। তার অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার।’’ -সূরা আরাফঃ ১৫৮

মুজাহিদ রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রেরিত হয়েছিলেন আরব-অনারব সকলের জন্য। -ইবন কাসির : ৬/৫১৮)

 

এখানে বুঝতে হবে, কুরআন নির্দিষ্ট একটি ভাষায় নাযিল হওয়া আর অন্য ভাষায় অনূদিত হয়ে উপস্থাপিত হওয়াটাই সঙ্গত। যার কারণে কিয়ামত পর্যন্ত এতে বিকৃতি-বিবর্তন ও ঝগড়া-বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। পক্ষান্তরে যদি সব ভাষায় আলাদা আলাদাভাবে নাযিল করা হত তাহলে আঞ্চলিক ভাষাবিদগণ এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিতেন। তখন তা আর অবিকৃত থাকত না।’’ -ফাতহুল কাদির : ৪/১২৭

 

এ থেকে প্রতীয়মান হয় প্রচারের সুবিধার্থে বহুবিধ ভাষার ব্যবহার, অনুবাদ সাহিত্য বা ইসলামের মূল আরবি ভাষাকে ভিন্ন ভাষায় উপস্থাপন নবী (সাঃ)-এর দাওয়াত রীতির অংশ।

 

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, মনে করি বর্তমানে আমার সামনে ১৬ (২০১৪ ইং) কোটি জনতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আমার ভাষণ শোনার জন্য। বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষা তারা বুঝে না। এখন আমি ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষায় তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিচ্ছি। তাহলে এ হবে পণ্ডশ্রম। কারণ তারা সংখ্যায় বেশি। আর আমি যদি তাদের বুঝানোর ইচ্ছে করে থাকি তাহলে যে কোনো মূল্যে তাদের মায়ের ভাষা, রক্তস্নাত বাংলা ভাষা আমাকে অবশ্যই আয়ত্ত করতে হবে। যে অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি ওই অঞ্চলের ভাষা আমাকে আয়ত্ত করতেই হবে। এটিই বাস্তবানুগ কথা। জোর করে অন্য ভাষা গিলতে তাদের বাধ্য করবো; তা হবে না। এ উপলব্ধি থেকে পৃথিবীর বহু দেশের ইসলাম প্রচারকগণ স্বদেশীয় ভাষা-সাহিত্যে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখলেও আমরা বাংলাভাষাভাষী মাতৃভাষায় এখনো অনগ্রসর। বিশ্ব বরেণ্য আলেম আল¬ামা ইউসুফ কারজাবি ও সাইয়েদ আবূল হাসান আলী নদভীসহ (র:) আরো অনেকে এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সাইয়েদ আবূল হাসান আলী নদভী (র:) বাংলা আলেম সমাজকে লক্ষ করে বলেন,“বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করুণ। হিন্দুস্থানী আলেমদের দেখুন সাহিত্যের সর্ব শাখায় তাদের রয়েছে দৃপ্ত পদচারণা। সেখানে কেউ বলতে পারে না যে, মাওলানারা উর্দু জানে না।একি আমাদের অভাব বৈ অন্য কিছু? ১৬ কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হওয়ার পরও ভাষা জ্ঞানের দৈন্যতার দরুণ আমরা ইসলাম প্রচারকগণ তথা আলেম সমাজ তাদের হৃদয়ে স্থান পাচ্ছি না। আমাদের অনগ্রসরতার এটাই বড় প্রমাণ।

ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা মানুষের স্বভাবজাত। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও মানুষ তাই ইসলামকে জানতে, এর অনুশীলন ও চর্চা করতে চায়। আলেম সমাজ ইসলামের মৌলিক গ্রন্থসমূহ যত গভীরভাবে বুঝেন, তা যদি আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী মাতৃভাষায় উপস্থাপন করা যায়। তাহলে খুব অল্প সময়ে সাহিত্যের নামে বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও নোংরামী বিদায় নিবে। যেমন নিয়েছিল ইসলামের পূর্ব যুগের নোংরা আরবি সাহিত্য থেকে। আর শেষ মুহূর্তে হলেও ফিরে আসবে মানুষ তাদের স্বভাবজাত ইসলামি জীবনে।

 

দাওয়াতি ময়দানে আমরা অহরহ এ অভিযোগের মুখোমুখি হই যে, ইসলাম যারা প্রচার করেন তাদের ভাষা নাকি অনুন্নত। তাদের অনুবাদ-রচনায় সাহিত্যরস বা ভাষাগত সৌন্দর্য নাকি অনুপস্থিত। তারা আধুনিক প্রচার-মাধ্যম ও তথ্য-প্রযুক্তি থেকে নাকি অনেক দূরে। এ কারণে শিক্ষিত, সাহিত্যজ্ঞ ও সুশীল সমাজ ইসলামি বই-পুস্তক পড়েন না। বসেন না তারা ইসলামী আলোচনার আসরে। বিশুদ্ধ, সাবলীল, সময়োপযোগী গ্রহণযোগ্য ভাষায় ইসলাম প্রচারে সক্ষম হলে আমাদের নির্ণয় করতে সহজ হবে কে বিদ্বেষপ্রসূত আর কে ভাষা না বুঝার কারণে আগ্রহ থাকার পরও ইসলাম কবুল করছেন না, ইসলাম মানছেন না। এতে দাওয়াতি তৎপরতা চালানো অনেক সহজ ও ফলপ্রসূ হবে। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।

 

বাংলাভাষার (বাংলা) উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:

বৌদ্ধ পাল রাজাদের আমলে বাংলাভাষার উৎপত্তি। বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ সকলেই তখন এ ভাষায় কথা বলেতো। এটাই ছিল তাদের মাতৃভাষা। পাল রাজাদের পরাস্ত করে আর্য ব্রাহ্মণ সেনগণ বাংলার রাজশক্তি অধিকার করে নেবার পর বাংলা ভাষার চরম দুর্দিন শুরু হয়। আর্য ব্রাহ্মণ শক্তি বৌদ্ধ, ধর্ম, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও প্রচলিত বাংলাভাষার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শরু করে। বৌদ্ধদের ব্যাপকহারে হত্যা অথবা ধর্মান্তরিত করা হয় এবং তাদের ধর্ম, স্থাপত্য ও সংস্কৃতি সমূলে ধ্বংস করা হয়। এ সময় প্রচলিত বাংলা ভাষাকে ম্লেচ্ছ ও ইতরজনদের ভাষারূপে আখ্যায়িত করা হতো এবং মহাভারত ও পুরাণে। বাঙালীদেরকে ম্লেচ্ছ, সর্প, দাস, অসুর ইত্যাদি বলা হয়েছিল। এমনকি এ ভাষায় কথা বললে রৌরব (হিন্দুমতে অতি পাপীদের জন্য নির্দিষ্ট নরক, অসহনীয় যাতনা) নামক নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো। ঐ তমস্য যুগের নিকষ কালো অন্ধকাররাশি বিদূরীত করে মৃতপ্রায় বাঙালি সমাজ ও বাংলা ভাষাকে নতুন জীবন দান করেছিলেন ইসলামের সার্বজনীন উদার ও শাশ্বত মানবিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ বহিরাগত তুর্কি মুসলমানগণ। সুদীর্ঘ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক তথা সর্বক্ষেত্রে চরম উন্নতি সাধিত হবার সাথে সাথে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নতুন প্রাণবেগে পূর্ণ হয়ে চরোমৎকর্ষ লাভ করে। বাংলা ভাষার ইতিহাসে এটাকে স্বর্ণযুগবলা হয়।

কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ বিধান এক চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করে। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশী প্রান্তরে বাংলা-বিহার উড়িষ্যার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হবার সাথে সাথে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে বাংলা ভাষার উপরও কষাঘাত পরে। একদিকে বেনিয়া ইংরেজ অন্যদিকে বাংলার সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা ক্ষয়িষ্ণু আর্য-ব্রাহ্মণ্য শক্তি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সূ² ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। অপরপক্ষে সেন আমলে ব্রাহ্মণরা বাংলা ভাষাকে সমূলে উৎখাত করে বৈদেশিক ভাষা-সংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে এর স্বাভাবিক বিকাশের পথকে রুদ্ধ করার সুগভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এ সময় রাজ ভাষা হয় ইংরেজি। বাঙালিদেরকে ইংরেজি ভাষা শেখানোর জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। বাংলা ভাষা হয় অপাঙ্ক্তেয়, (এক সারিতে বা পংক্তিতে বসার অযোগ্য) অনাদৃত। দীর্ঘ অনাদর অযত্নে ধীরে ধীরে তাই বাংলা এক রকম বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। আমরা আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ থেকে হই বঞ্চিত। উল্লেখ্য যে, ইংরেজ পূর্ব আমলে রচিত বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল অংশকে পুথি সাহিত্যবা বটতলার সাহিত্যনামে আখ্যায়িত করে তা অপাঙক্তেয় (এক সারিতে বা পংক্তিতে বসার অযোগ্য) করা হয়।

বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সর্বশেষ ষড়যন্ত্র চলে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে। এবার বাংলা ভাষাকে উৎখাত বা অস্বীকার করা হয়নি। কিন্তু বাংলাভাষীদের উপর বিদেশী ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা চলে। (অথচ উর্দু ভাষা পাকিস্তানের কোন এলাকার মাতৃভাষা ছিল না। বরং উর্দু ভাষা ছিল দিল্লীর মুসলিম শাসকদের আরবী, ফার্সি, তুর্কি এবং স্থানীয় বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রন।) বাংলার মানুষ এটা মেনে নেয়নি। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রয়ারী (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ) ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক সকলেই এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এ সময় রফিক উদ্দীন আহমদ, আব্দুল জব্বার, আবূল বরকত এবং আব্দুস সালাম সহ নাম না জানা অনেকে শহীদ হন এবং আরো অনেকে আহত হন। দীর্ঘ আপোসহীন সংগ্রাম এবং চরম আতœত্যাগের বিনিময়ে অবশেষে ১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার এ মর্যাদা আরও সুদৃঢ় ও তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। কিন্তু এ সর্বশেষ ও চুড়ান্ত পর্যায়কেই যারা আমাদের ভাষা আন্দোলনের সমগ্র ইতিহাস বলে গণ্য করেন তাদের ইতিহাস জ্ঞান সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। (অর্থাৎ মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম শুরু হয়েছিল মূলত হাজার বছর আগে এ ভাষার জন্ম লাভের অব্যবহিত পরেই) ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ২১শে ফেব্রয়ারীকে মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রয়ারী থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।

 

আমাদের করণীয়

হাদীস শরীফে বলা হয়েছে যে নিজের সম্পদ, প্রাণ, পরিবার বা বৈধ অধিকার আদায়ের জন্য কথা বলে, দাবি করে বা চেষ্টা করে যদি কেউ নিহত হন তবে তিনি শহীদ বলে গণ্য হবেন। ইবন আব্বাস রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন,

مَنْ قُتِلَ دُوْنَ مَظْلَمَتِهِ فَهُوَ شَهِيْدٌ

যে ব্যক্তি নিজের অধিকার রক্ষা করতে নিহত হয় সে শহীদ।” -নাসাঈ ৭/১১৬, হাইসামী ১১৭; ৬/২৪৪; সহীহুত তারগীব ২/৭৬

عن سعيد بن زيد عن النبى -صلى الله عليه وسلم- قال : ্র من قتل دون ماله فهو شهيد ومن قتل دون أهله أو دون دمه أو دون دينه فهو شهيد

সাঈদ বিন যায়েদ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি নিজ সম্পতি রক্ষায় নিহত হয় সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজ পরিবার রক্ষায় নিহত হয় সেও শহীদ। অথবা প্রাণ রক্ষায় কিংবা দ্বীন রক্ষায় নিহত হয় সেও শহীদ।” -আবূ দাঊদঃ ৪৭৭৪; মুসনাদে আহমদঃ ১৬৫২

 

অন্য হাদীসে সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন,

نِعْمَ الْمَيْتَةُ اَنْ يَّمُوْتَ الرَّجُلُ دُوْنَ حَقِّهِ

ব্যক্তি নিজের অধিকার বা হক্ক প্রতিষ্ঠা বা রক্ষা করতে মৃত্যুবরণ করে তার মৃত্যু খুবই ভাল মৃত্যু।আহমদঃ ১/১৮৪; মাজমাউয যাওয়ায়িদ ৬/২৪৪

তাই এসকল হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, মাতৃভাষা রক্ষার জন্য কথা বলে যারা নিহত হয়েছেন তাদের মৃত্যু শহীদী মৃত্যু।

 

এ সকল শহীদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব হলো

প্রথমত, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। দ্বিতীয়ত, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তৃতীয়ত, তাঁদের জন্য দুআ করা এবং চতুর্থত, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া।

 

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রথম পর্যায়

যে কোন নিয়ামত স্থায়িত্বের এবং বৃদ্ধির প্রথম শর্ত হলো মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। মহান আল্লাহ বনী ইসরাঈলদেরকে ফেরাউনের শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি প্রদান করে বলেন,

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ ﴿ابراهيم: ٧﴾

এবং যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য আমার নিয়ামত বাড়িয়ে দিব। আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’’ -সূরা ইব্রাহীমঃ ৭

 

কিন্তু মানবীয় প্রকৃতির একটি দূর্বল দিক হলো মানুষ আল্লাহর নিয়ামত লাভ করার পরে তা নিজেদের যোগ্যতায় অর্জিত বলে দাবি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَإِذَا مَسَّ الْإِنسَانَ ضُرٌّ دَعَانَا ثُمَّ إِذَا خَوَّلْنَاهُ نِعْمَةً مِّنَّا قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَىٰ عِلْمٍ بَلْ هِيَ فِتْنَةٌ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ﴿الزمر: ٤٩﴾

যখন কষ্ট-দৈন্য মানুষকে স্পর্শ করে তখন সে আমাকে ডাকে। অতপর যখন আমি তাকে কোন নিয়ামত প্রদান করি তখন সে বলে, আমি তো তা লাভ করেছি নিজের জ্ঞানের মাধ্যমে। বস্তুত এটি একটি পরীক্ষা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।’’ -সূরা যুমারঃ ৪৯

 

জীবনের সকল নিয়ামত ও সফলতাই আল্লাহর দান। আবার প্রত্যেক নিয়ামত, সৌভাগ্য ও সফলতার পিছনে কোন না কোন ব্যক্তির নিজের ও অন্য অনেক মানুষের অবদান থাকে। সকলের অবদানের স্বীকৃতি অত্যাবশ্যকীয়। তবে আমাদের সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, নিজের যোগ্যতা, শ্রম বা অন্যান্য সকলের কষ্ট সবই ব্যর্থ হতো যদি আল্লাহর দয়া না থাকতো।

 

সর্বান্তকরণে এ উপলব্ধি না থাকা বা নিয়ামতটি নিজেদের ত্যাগ, কষ্ট বা বুদ্ধি-কৌশলের মাধ্যমে অর্জিত বলে বিশ্বাস করার অর্থ আল্লাহর প্রতি কঠিনতম অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

 

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়

আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হলো যে সকল মানুষের চেষ্টা ও ত্যাগের মাধ্যমে এ নিয়ামত অর্জিত হয়েছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, তাদের অবদানের কথা স্মরণ ও আলোচনা করা, তাদের প্রশংসা করা এবং তাদের জন্য দুআ করা।

এ বিষয়ে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত রয়েছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللَّهَগ্ধ . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ

যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও অকৃতজ্ঞ।” -আহমদ; তিরমিযী; মিশকাতঃ ৩০২৫

অন্য বর্ণনায় এসেছে,

عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ قَيْسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রإِنَّ أَشْكَرَ النَّاسِ لِلَّهِ أَشْكَرُهُمْ لِلنَّاسِগ্ধ

সে আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বেশী কৃতজ্ঞ যে মানুষের প্রতি সবচেয়ে বেশী কৃতজ্ঞ।” -মুসনাদে আহমদঃ ২১৮৪৬

وَمَنْ صَنَعَ اِلَيْكُمْ مَعْرُوْفًا فَكَاْفِئُوْهُ فَاِنْ لَمْ تَجِدُوْا مَا تُكَاْفِئُوْنَهُ فَادْعُوْا لَهُ حَتَّي تَرَوْا أَنَّكُمْ قَدْ كَاْفَاْتُمُوْهُ (رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ)

যদি কেউ তোমাদের কোন উপকার করে তবে তাকে প্রতিদান দিবে। প্রতিদান দিতে না পারলে তার জন্য এমনভাবে দুআ করবে যেন তোমরা অনুভব কর যে, তোমরা তার প্রতিদান দিয়েছ।” -আহমদ; আবূ দাঊদ; নাসাঈ; মিশকাতঃ ১৯৪৩

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَنْ أُعْطِيَ عَطَاءً فَوَجَدَ فَلْيَجْزِ بِهِ، فَإِنْ لَمْ يَجِدْ فَلْيُثْنِ بِهِ، فَمَنْ أَثْنَى بِهِ فَقَدْ شَكَرَهُ، وَمَنْ كَتَمَهُ فَقَدْ كَفَرَهُগ্ধ (رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد)

কাউকে যদি কিছু প্রদান করা হয় তবে সে যেন তাকে প্রতিদান দেয়। যদি প্রতিদান দিতে না পারে তবে সে যেন তার গুণকীর্তন ও প্রশংসা করে। যে ব্যক্তি উপকারীর গুণকীর্তন ও প্রশংসা করল সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। আর যে উপকারীর উপকারের কথা গোপন করল সে অকৃতজ্ঞ।” -আবূ দাঊদ; তিরমিযী; মিশকাতঃ ৩০২৩

عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ্রمَنْ أُتِيَ إِلَيْهِ مَعْرُوفٌ، فَلْيُكَافِئْ بِهِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ، فَلْيَذْكُرْهُ، فَمَنْ ذَكَرَهُ، فَقَدْ شَكَرَهُ ( احمد)

যদি কাউকে কোনভাবে উপকার করা হয় তবে সে যেন তাকে প্রতিদান দেয়। যদি প্রতিদান দিতে না পারে তবে সে যেন তার কথা স্মরণ করে ও উল্লেখ করে। এতে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে।” -মুসনাদে আহমদঃ ২৪৫৯৩

 

এ সকল হাদীসের আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে, জাতি, ধমর্, বণর্, দল, মত নির্বিশেষে মাতৃভাষা অর্জনের পিছনে যাদেরই আবদান রয়েছে তাদের সকলের প্রতি ব্যক্তিগত ও জাতীয়ভাবে হৃদয়, মন ও মুখ দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এ জন্য সকল প্রকার পক্ষপাতিত্ব পরিত্যাগ করে তাদের ত্যাগের প্রকৃত তথ্য পরবর্তী প্রজন্ম ও বিশ্বকে জানানো, তাদের স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা, তাদের অবদানের সঠিক তথ্য উল্লেখ করা, স্মরণ করা, আলোচনা করা, লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষন করা, তাদের মধ্যে যারা জীবিত রয়েছেন তাদের প্রতিদানের চেষ্টা করা ও তাদের কল্যাণের জন্য দুআ করা এবং তাদের মধ্যে যারা তাওহীদ ও রিসালাতের ঈমান নিয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন, তাদের জন্য আখিরাতের মুক্তি ও কল্যাণের দুআ করা আমাদের ঈমানী ও দীনী দায়িত্ব।

 

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চতুর্থ পর্যায়

মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,

الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ- ﴿الحج: ٤١﴾

আমি যদি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করি তবে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, ন্যায় (সৎ) কাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করবে।’’ -সূরা হাজ্জঃ ৪১

 

এখানে আল্লাহ তাআলা কোন জিনিস লাভকারীদের (পরবর্তী শাসকদের) জন্য চারটি মৌলিক দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত: সালাত কায়েম করা। দ্বিতীয়ত: যাকাত প্রদান করা। তৃতীয় ও চতুর্থত: ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ, তথা দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন।

বস্তুত, সমাজের অধিকাংশ মানুষই সততা পছন্দ করেন এবং ঝামেলা, দুর্নীতি, অন্যায় ও জুলুম থেকে দূরে থাকতে চান। কিন্তু সমাজে যদি আইনের শাসন না থাকে, দুষ্ট ব্যক্তি তার অন্যায় কর্মের শাস্তি না পেয়ে অন্যায়ের মাধ্যমে লাভবান হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি তার যোগ্যতার মূল্যায়ন ও পুরস্কার না পাওয়ার কারণে সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও দুর্নীতির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। আর এটি হলো দেশ ও সমাজ ধ্বংসের একটি বড় পথ।

 

এজন্য কোন জিনিস লাভকারী জনগোষ্ঠীর অন্যতম দায়িত্ব হলো সমাজের সর্বস্তরে আইনের শাসন, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের শক্তিশালী ধারা তৈরী করা। এটি সকল নাগরিকের দায়িত্ব। এ বিষয়ে অবহেলা করা, অবহেলার পরিবেশ তৈরী করা বা অবহেলা মেনে নেয়া সবই আমাদের জাগতিক ক্ষয়ক্ষতি ও আখিরাতের শাস্তির মুখোমুখি করবে। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَالٍ ﴿الرعد: ١١﴾

আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোন জাতির উপর বিপদ চান, তখন তা রদ হওয়ার নয় এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোন সাহায্যকারী নেই।’’ -সূরা রাদঃ ১১

 

এ জন্য আল্লাহর ভয় ছাড়া প্রকৃত সততা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সমাজ, পৃথিবীর আইন বা রাষ্ট্রের কাছে নিন্দিত বা নন্দিত হওয়ার ভয় বা লোভ মানুষকে দুর্নীতির প্ররোচনা থেকে কিছুটা রক্ষা করে। কিন্তু সকলেই জানে সমাজ, রাষ্ট্র বা পৃথিবীর আইনকে ফাঁকি দেওয়া যায়। আর সমাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সততার সঠিক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। এজন্য প্রকৃত সততা তৈরি করতে আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে আতœরক্ষার অনুভূতি। অর্থাৎ দুর্নীতি, অসততা, অবৈধ উপার্জন, মানুষের ক্ষতি, জনগণের বা রাষ্ট্রের সম্পদ অপব্যবহার বা অপচয়, মানুষের অধিকার নষ্ট করা, অশ্লীলতা, মাদকতা ও অন্যান্য সকল হারাম কর্ম বর্জন করা এবং সকল ফরয ইবাদত ও দায়িত্ব পালন করাই তাকওয়া। আর এ তাকওয়া অর্জন করতে পারলে জাগতিক উন্নতি ও বরকত উভয় লাভ করা অতি সহজ হবে বলে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন,

وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ﴿الأعراف: ٩٦﴾

আর যদি কোন জনপদের অধিবাসীরা (মানুষেরা) ঈমান আনত এবং তাকওয়া (পরহেযগারী) অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আসমানী ও পার্থিব নিয়ামত সমূহ উম্মুক্ত করে দিতাম।” -সূরা আরাফঃ ৯৬

 

মাতৃভাষার পাশাপাশি যে ভাষাটি শিক্ষা করা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় তা হলো আরবী ভাষা। আমরা আমাদের পিতামাতাকে ভালবাসি। কিন্তু এ ভালবাসা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর প্রতি ভালবাসার অন্তরায় নয়। আমরা আমাদের দেশ বা গ্রামকে ভালবাসি। কিন্তু এ জন্য মক্কা ও মদীনার প্রতি ভালবাসার ঘাটতি হতে পারে না। ঠিক তেমনিভাবে মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসা আরবীর প্রতি ভালবাসার অন্তরায় হতে পারে না। আরবী কোনো বিদেশী ভাষা নয় আরবী আমাদের প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ের ভাষা, ঈমানের ভাষা ও দীনের ভাষা। প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব অন্তত কুরআন কারীম বা নামাযে পঠিত কুরআনের সূরাগুলো ও যিক্র-দুআগুলো বুঝার মত আরবী ভাষা শিক্ষা করা। নিজের সন্তানদেরকেও এভাবে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরী। সাধারণ জ্ঞান বা অসাধারণ জ্ঞানের নামে আমরা আমাদের সন্তানদেরকে এমন অনেক কিছু শিক্ষা দেই যা তাদের অধিকাংশের জন্যই দুনিয়া বা আখিরাতে কখনোই কোনো কাজে লাগবে না।

 

আমরা অধিকাংশ মুসলিম দৈনিক, সাপ্তাহিক ও ঈদের নামাযে সর্বদা কুরআন শুনি। এছাড়া অনেকেই কুরআন পড়ি। কিন্তু আরবী না বুঝার কারণে কুরআনে বর্ণিত বারংবার উল্লেখিত ভয়াবহ দুর্নীতিতে আমরা লিপ্ত। অপরদিকে আমাদের দেশের অনেক ধার্মিক মানুষ মদ, ব্যভিচার ইত্যাদি পরিত্যাগ করেন, কিন্তু সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, যৌতুক, কর্মে অবহেলা, মানবাধিকার নষ্ট, অবৈধ সম্পদ অর্জন ইত্যাদি অন্যায়ে লিপ্ত হন। এর কারণ দ্বিতীয় পর্যায়ের অন্যায়গুলো সম্পর্কে তার সচেতনতার অভাব। আবার ধর্ম  বিষয়ক কুসংস্কার আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম সমস্যা। দরগা-মাজারগুলোর দিকে তাকান। মাদকতা ও অনাচারের প্রসার ছাড়াও এ সকল স্থানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ কর্মঘন্টা ও টাকা নষ্ট হচ্ছে ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে। যদি পৃথিবীর মানুষেরা কুরআন কিছুটা বুঝতেন তাহলে প্রতিদিন নামাযে বা নামাযের বাইরে যা কুরআন পড়েন বা শুনেন তাতেই তার মধ্যে এ সকল অন্যায়ের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হতো এবং অধিকাংশ মানুষ এ সকল কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, মাজার পূজা, মাজারে অলস সময় যাপন, মাদকতা, পাগলভক্তি থেক দূরে থাকতেন এবং ক্রমান্বয়ে এগুলো থেকে মুক্ত হতেন। আর তাই কুরআন না বুঝার কারণে মানেুষের মধ্যে রয়েই যাচ্ছে পশু প্রবৃত্তি।

 

তাছাড়া উপরের আলোচনাকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, আল্লাহ মাতৃভাষা ছাড়া কোনো নবী-রাসূল এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেন নি। সর্বোপরি আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য ছিল ভাষার উচ্চাঙ্গতা ও চিত্তকর্ষণীয়তা। কাজেই মাতৃভাষায় বুৎপত্তি অর্জন করা, মাতৃভাষায় উচ্চাঙ্গের সাহিত্যিক মান অর্জন করা দীনের দাওয়াতে আত্মনিয়োজিত প্রতিটি (আলিমের) ব্যক্তির অন্যতম দায়িত্ব। যাতে করে তিনি তার জাতির মন মানসিকতা, সুবিধা, অসুবিধা, সন্দেহ, সমস্যা ইত্যাদি ভালভাবে অনুভব করতে পারেন এবং তার বক্তব্য, ওয়াজ, লেখনি ইত্যাদি সকল বাঙালী শ্রোতার হৃদয় আলোড়িত করতে পারেন। নইলে নায়েবে নবী বা ওয়ারিসে নবী অর্থাৎ নবীর উত্তরাধিকারী হতে পারা যাবে না।

 

উপসংহার

বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষা, আত্মপ্রতিষ্ঠা ও বিকাশ এবং সর্বোপরি এর যথার্থ মর্যাদা লাভের সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা স্মরণ করলে আমরা যথার্থই আবেগাপ্লুত ও উদ্দীপ্ত হই। বাংলা ভাষার ব্যাপক চর্চা ও উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে বিশ্ব ভাষার দরবারে এর গৌরবময় আসন সুপ্রতিষ্ঠিত হোক এ প্রত্যাশা নিয়েই কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়-

মাতৃভাষা, বাংলাভাষা, খোদার সেরা দান

বিশ্বসভায় এ ভাষারই আসন মহীয়ান।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মাতৃভাষার মতো নিয়ামতের যথার্থ কদর করার তাওফীক দান করুন। ভাষার অপপ্রয়োগ ও অপভাষা থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন !!

 


No comments:

Post a Comment