Saturday, February 20, 2021

ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় সুন্নাতের অনুসরণের গুরুত্ব ও পদ্ধতি

 


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি রব্বুল আলামীন। দুরুদ ও সালাম রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি, তার পরিবারবর্গ, বংশধর, সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ও সালেহীণ (রহমাতুল্লাহি আলাইহিম)-গণের প্রতি। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ (স) আল্লাহর বান্দা ও রসূল। নিশ্চয়ই শুভ পরিণতি কেবলমাত্র রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খুলাফায়ে রাশিদীন, আহলে বাইত এবং সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-গণের অনুসৃত কল্যাণময় আদর্শ অনুসরণের মধ্যেই নিহিত।

 

সুন্নাতের পরিচয়ঃ

ইসলামী জীবন ব্যবস্থার ভিত্তি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওয়াহী। ওয়াহী দুই প্রকার:

এক-ওয়াহী মাতলু। ওয়াহী মাতলু হল কুরআন মাজীদ।

দুই-ওয়াহী গাইরে মাতলু। সূন্নাহ বা হাদিস হল ওয়াহী গায়রে মাতলু।

 

সূন্নাহ বা হাদিস ও আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে প্রেরিত ওহী। এ প্রসংগে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى (3) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (4)

"আর তিনি মনগড়া কথাও বলেন না। তাতো ওয়াহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়।" - (সূরা নাজমঃ আয়াত ৩-৪)

সুন্নাহ হল হিকমাহঃ আল্লাহ তাআলা কুরআনে সূন্নাহকে হিকমাহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুন্নাহ হল কুরআনের ব্যাখ্যা ও বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ পদ্ধতি। আল্লাহ তাআলা যেমনিভাবে কুরআন নাযিল করার কথা বলেছেন, অনুরূপভাবে হিকমাহ অর্থা সূন্নাহ নাযিল করার কথাও বলেছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, সূন্নাহও আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত ওয়াহী। সুতরাং কুরআন যেমন আল্লাহর ওয়াহী অনুরূপভাবে সূন্নাহও আল্লাহর ওয়াহী। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَأَنزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُن تَعْلَمُ

"এবং আল্লাহ তোমার প্রতি গ্রন্থ ও হিকমাহ অবতীর্ণ করেছেন এবং তুমি যা জানতে না, তিনি তাই তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন।" - (সূরা নিসাঃ আয়াত ১১৩)

 

মুমিনের জীবনে সুন্নাহ-এর ব্যপকতা ও অপরিহার্য্যতাঃ

মানব জাতির ইহ-পরকালীন মুক্তি ও কল্যাণের সনদ হল আল-কুরআন। কুরআনের জীবন্ত মডেল হল রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন। আর সমগ্র মানব সভ্যতায় এর সফল বাস্তবায়নের মডেল হল খুলাফায়ে রাশিদীন ও সাহাবায়ে কিরাম। সুতরাং মুক্তি ও কল্যাণের পথ শুধুমাত্র কুরআন ও রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং খুলাফায়ে রাশিদীন ও সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম-গণের আদর্শ পর্যন্ত ব্যপৃত।

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত প্রসংগেঃ

হযরত মালিক ইবনু আনাস থেকে মুরসালরূপে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

عَن مَالك بن أنس مُرْسَلًا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ رَسُولِهِ «. رَوَاهُ فِي الْمُوَطَّأ»

"আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দুটি জিনিস আঁকড়ে থাকবে,ততক্ষণ পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ।" - (মুয়াত্তা ইমাম মালিকঃ ৩৩৩৮)

 

খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত প্রসংগেঃ

হযরত ইরবায বিন সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

قَالَ: صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا بِوَجْهِهِ فَوَعَظَنَا مَوْعِظَةً بَلِيغَةً ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَأَنَّ هَذِهِ مَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ فَأَوْصِنَا قَالَ: «أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ كَانَ عبدا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ من يَعش مِنْكُم يرى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। অতঃপর আমাদের দিকে ফিরে বসলেন। অতঃপর আমাদেরকে এমন মর্মস্পর্শী ভাষায় উপদেশ দিলেন যে, চক্ষু সমূহ অশ্রুসজল হয়ে গেল এবং হৃদয় সমূহ ভীত-বিহবল হয়ে পড়ল। এমন সময় একজন বলে উঠলো, হে আল্লাহর রাসূল! মনে হচ্ছে এটা যেন বিদায়ী উপদেশ। অতএব আপনি আমাদেরকে আরও বেশী উপদেশ দিন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : "আমি তোমাদেরকে আল্লাহ ভীতির উপদেশ দিচ্ছি। আমি তোমাদের আমীরের আদেশ শুনতে ও মান্য করতে উপদেশ দিচ্ছি যদিও তিনি একজন হাবশী গোলাম হন। কেননা আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা সত্বর বহু মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাতকে এবং সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আকড়ে ধরবে। তাকে কঠিনভাবে ধরবে এবং মাড়ির দাঁত সমূহ দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে। সাবধান! দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টিসমূহ হতে দূরে থাকবে। কেননা (দ্বীনের মধ্যে) যেকোন নতুন সৃষ্টি হল বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআত হল পথভ্রষ্টতা।" - (আহমাদ, আবুদাঊদ, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)

 

মুহাজীর ও আনসারগণের সুন্নাত প্রসংগেঃ

আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

"মুহাজীর ও আনসারদের অগ্রগামী দল আর যারা যথাযথভাবে তাদের অনুসারী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে এমন জান্নাত যার পাদদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত। তারা সেখানে অনন্তকাল থাকবে। এটা হল মহান সফলতা।" - (সূরা তওবাহঃ  আয়াত ১০০)

 

সাহাবাগণের সুন্নাত প্রসংগেঃ

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

وَإِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوا وَمن هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وأصحابي» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ

"বানী-ইসরাইলীগণ বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল আর আমার উম্মাত বিভক্ত হবে তিয়াত্তর দলে, সকলেই জাহান্নামে যাবে, কিন্তু একটি মাত্র দল জান্নাতে যাবে।" সাহাবাগণ (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, এই দল কারা? রসূলুলাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : "যারা আমার ও আমার সাহাবাগণের ছুন্নাতের উপর কায়েম থাকবে।" - (তিরমিযীঃ ২৫৭৮, আবু দাউদ, তারগীবঃ ৪৮)

 

মুমিনের জীবনের কামনা-বাসনা হবে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের নমুনাঃ

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ» رَوَاهُ فِي شَرْحِ السُّنَّةَ

"তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কামনা-বাসনা আমার আনীত আদর্শের অনুবর্তী হবে।"- (শারহুস সুন্নাহ)

হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»

"সেই পবিত্র সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তানের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।" - (সহীহ বুখারীঃ হাদীস নং ১৩)

 

জাহান্নাম থেকে নাজাত ও জান্নাতের পথ হল রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্যঃ

হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

" جَاءَتْ مَلاَئِكَةٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ نَائِمٌ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: إِنَّهُ نَائِمٌ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: إِنَّ العَيْنَ نَائِمَةٌ، وَالقَلْبَ يَقْظَانُ، فَقَالُوا: إِنَّ لِصَاحِبِكُمْ هَذَا مَثَلًا، فَاضْرِبُوا لَهُ مَثَلًا، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: إِنَّهُ نَائِمٌ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: إِنَّ العَيْنَ نَائِمَةٌ، وَالقَلْبَ يَقْظَانُ، فَقَالُوا: مَثَلُهُ كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى دَارًا، وَجَعَلَ فِيهَا مَأْدُبَةً وَبَعَثَ دَاعِيًا، فَمَنْ أَجَابَ الدَّاعِيَ دَخَلَ الدَّارَ وَأَكَلَ مِنَ المَأْدُبَةِ، وَمَنْ لَمْ يُجِبِ الدَّاعِيَ لَمْ يَدْخُلِ الدَّارَ وَلَمْ يَأْكُلْ مِنَ المَأْدُبَةِ، فَقَالُوا: أَوِّلُوهَا لَهُ يَفْقَهْهَا، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: إِنَّهُ نَائِمٌ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: إِنَّ العَيْنَ نَائِمَةٌ، وَالقَلْبَ يَقْظَانُ، فَقَالُوا: فَالدَّارُ الجَنَّةُ، وَالدَّاعِي مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَنْ أَطَاعَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ، وَمَنْ عَصَى مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ، وَمُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرْقٌ بَيْنَ النَّاسِ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘুমন্ত অবস্থায় কিছু সংখ্যক ফিরিস্তা আসলেন, তাদের কেউ বললেন, তিনি ঘুমন্ত, আবার কেউ বললেন: তাঁর চক্ষু ঘুমন্ত কিন্তু অন্তর জাগ্রত। অতঃপর তারা বললেন,তাঁর একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে তোমরা সে দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর, অতঃপর বললেন, তাঁর দৃষ্টান্ত হল ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে সুসজ্জিত করে একটি গৃহ নির্মাণ করল, অতঃপর সেখানে খাওয়ার আয়োজন করল এবং একজন আমন্ত্রণকারী প্রেরণ করল, অতঃপর যে আমন্ত্রণ গ্রহণ করল, গৃহে প্রবেশ করল এবং আয়োজিত খানা খেল। আর যে আমন্ত্রণ গ্রহণ করল না, গৃহেও প্রবেশ করল না এবং আয়োজিত খানাও খেল না। এ দৃষ্টান্ত বর্ণনার পর তারা বললেন: দৃষ্টান্তের ব্যাখ্যা করে দিন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারবেন, কারণ চক্ষু ঘুমন্ত হলেও অন্তর জাগ্রত, তখন তারা ব্যাখ্যায় বললেন, "নির্মিত গৃহটি হল জান্নাত, আর আমন্ত্রণকারী হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অতএব যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য স্বীকার করে, সে যেন প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ তাআলরই আনুগত্য স্বীকার করল। আর যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অমান্য করল, সে যেন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলাকেই অমান্য করল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন মানুষের মাঝে (ন্যায় ও অন্যায়ের) পার্থক্যকারী।" - (বুখারীঃ হাদিস নং ৭২৮১)

 

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

«كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَنْ يَأْبَى؟ قَالَ: «مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الجَنَّةَ [ص:93]، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى»

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "জান্নাত পেতে আগ্রহী নয় এমন ব্যক্তি ছাড়া আমার সকল উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কে এমন ব্যক্তি আছে যে জান্নাতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করবে সে জান্নাতে যাবে, আর যে আমার নাফরমানী করবে ও অবাধ্য হবে, সেই জান্নাতে যেতে অস্বীকার করে।" -(সহীহ বুখারী)

 

বিনা যুক্তিতে সুন্নাত অনুসরণ করতে হবেঃ

হযরত উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তা চুম্বন করে বললেনঃ

عَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَّهُ جَاءَ إِلَى الحَجَرِ الأَسْوَدِ فَقَبَّلَهُ، فَقَالَ: «إِنِّي أَعْلَمُ أَنَّكَ حَجَرٌ، لاَ تَضُرُّ وَلاَ تَنْفَعُ، وَلَوْلاَ أَنِّي رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَبِّلُكَ مَا قَبَّلْتُكَ»

"আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একখানা পাথর মাত্র, তুমি কারও কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমায় চুম্বন করতে না দেখলে কখনো আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।" - (বুখারীঃ হাদিস নং ১৫৯৭)

 

হযরত ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: اتَّخَذَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَاتَمًا مِنْ ذَهَبٍ، فَاتَّخَذَ النَّاسُ خَوَاتِيمَ مِنْ ذَهَبٍ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنِّي اتَّخَذْتُ خَاتَمًا مِنْ ذَهَبٍ» فَنَبَذَهُ، وَقَالَ: «إِنِّي لَنْ أَلْبَسَهُ أَبَدًا»، فَنَبَذَ النَّاسُ خَوَاتِيمَهُم

"নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সোনার আংটি পরতেন। তখন লোকেরাও সোনার আংটি পড়তে লাগল। এরপর (একদিন) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আমি সোনার আংটি পরছিলাম-তারপর তিনি তা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং বললেন : আমি আর কোন দিনই তা পরব না। ফলে লোকেরাও তাদের আংটিগুলো ছুঁড়ে ফেলল।" - (বুখারীঃ হাদিস নং ৭২৯৮)

 

সুন্নাহ অমান্যকারীর সঙ্গে সম্পর্ক কিরূপ হবেঃ

হযরত উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: إِنَّهُ سَيَكُونُ عَلَيْكُمْ أَئِمَّةٌ تَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ بَرِئَ وَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ، فَقِيلَ: يَا رَسُولَ اللهِ أَفَلاَ نُقَاتِلُهُمْ؟ قَالَ: لاَ، مَا صَلَّوْا.

"অচিরেই তোমাদের উপর এমন কতিপয় শাসক হবে যাদের কিছু কাজ (সুন্নাহ অনুযায়ী হওয়ার কারণে) তোমরা পছন্দ করবে আর কিছু কাজ (সুন্নাহ বিরোধী হওয়ার কারণে) অপছন্দ করবে। যে ব্যক্তি অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করবে সে দায়িত্বমুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি এগুলোকে ঘৃণা করবে সেও দায়িত্বমুক্ত হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি এরূপ কাজের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং তার অনুসরণ করবে সে অন্যায়ের ভাগী হবে। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবো না? তিনি বললেন : না, যতক্ষন তারা তোমাদের মাঝে নামাজ কায়েম করে।" - (মুসলিমঃ ৪৬৪৯ ও তিরমিযীঃ ২২৬৫)

 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، أَنَّ قَرِيبًا لِعَبْدِ اللهِ بْنِ مُغَفَّلٍ خَذَفَ، قَالَ: فَنَهَاهُ، وَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ الْخَذْفِ، وَقَالَ: «إِنَّهَا لَا تَصِيدُ صَيْدًا، وَلَا تَنْكَأُ عَدُوًّا، وَلَكِنَّهَا تَكْسِرُ السِّنَّ، وَتَفْقَأُ الْعَيْنَ»، قَالَ: فَعَادَ، فَقَالَ: أُحَدِّثُكَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْهُ، ثُمَّ تَخْذِفُ، لَا أُكَلِّمُكَ أَبَدًا "،

"একদা তার কাছে তার এক ভাতিজা বসা ছিল। সে তখন কংকর নিক্ষেপ করছিল। তিনি তাকে তা থেকে নিষেধ করলেন এবং বললেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজ থেকে নিষেধ করছেন। তিনি আরও বললেন : এতে না শিকার করা হয়, আর না শত্রু পরাভূত হয়, বরং তা দাঁত ভেঙ্গে দেয় অথবা চক্ষু নষ্ট করে দেয়। রাবী বলেন, তার ভাইপো পুনরায় পাথর নিক্ষেপ করলে তিনি [ইবনে মুগাফ্ফাল রা.] বলেন : আমি তোমাকে হাদিস শুনাচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। অথচ এরপরও তুমি কংকর নিক্ষেপ করছ? আমি তোমার সাথে আর কখনও কথা বলব না।" -(মুসলিমঃ হাদিস নং ১৯৫৪)

 

হযরত উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ أَنْ يُصَلِّينَ فِي الْمَسْجِدِ» فَقَالَ ابْنٌ لَهُ: إِنَّا لَنَمْنَعُهُنَّ، فَقَالَ: فَغَضِبَ غَضَبًا شَدِيدًا، وَقَالَ: أُحَدِّثُكَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وتقولُ: إِنَّا لَنَمْنَعُهُنَّ؟

"তোমরা আল্লাহর বান্দীদের (মহিলাদের) মসজিদে সালাত আদায় করতে মানা করো না। তখন ইবনে উমারের এক পুত্র বললেন: আমরা অবশ্যই তাদের নিষেধ করব। রাবী বলেন : এতে তিনি (ইবনে উমার) ভয়ানক রাগান্বিত হয়ে বললেন : আমি তোমার নিকট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিস বর্ণনা করছি, অথচ তুমি বলছ যে, আমরা অবশ্যই তাদের নিষেধ করব?" - (ইবনু মাযাহঃ হাদিস নং ১৬)

 

সুন্নাহ অবহেলাকারীদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনঃ

আবু রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: " لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ، يَأْتِيهِ الْأَمْرُ مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ، أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ، فَيَقُولُ: لَا أَدْرِي، مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ "

"আমি যেন তোমাদের মাঝে কাউকে এমন না পাই, সে তার খাটের উপর ঠেস দিয়ে বসে থাকবে। আর আমি যা আদেশ দিয়েছি অথবা যা থেকে নিষেধ করেছি, তা তার কাছে পৌছলে সে তখন বলবে: এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না, আমরা আল্লাহর কিতাবে যা পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব।" - (ইবনু মাযাহঃ ১৩, আহমদঃ ২৩৮৭৬,আবুদ দাউদঃ ৪৬০৫ ও তিরমিযিঃ ২৬৬৩)

 

যারা সুন্নাহ পূনর্জীবিত করে তাদের জন্য সুসংবাদঃ

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাদিয়াল্লাহ 'আনহু থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

عَنْ عَبْدِ اللهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ الإِسْلاَمَ بَدَأَ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ غَرِيبًا كَمَا بَدَأَ، فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ.

"দ্বীন ইসলাম তো অপরিচিত অবস্থায় যাত্রা শুরু করেছিল এবং অচিরেই অপরিচিত অবস্থায় ফিরে আসবে। সুতরাং সুসংবাদ সেই অপরিচিতদের জন্য।" (তিরমিযীঃ হাদীস নং ২৫৬৬)

الَّذِينَ يُصْلِحُونَ مَا أَفْسَدَ النَّاسُ مِنْ بَعْدِي مِنْ سُنَّتِي.

তাদের পরিচয় প্রসংগে বলা হয়েছে- "যারা আমার ছুন্নাহ মানুষের দ্বারা বিপর্যস্থ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় ইসলাহ বা পূণর্জীবিত করে।" -(তিরমিযীঃ হাদীস নং ২৫৬৭)

 

সুন্নাত জিন্দাকারী রসূলের সাথে জান্নাতে যাবেঃ

হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ، قَالَ لِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا بُنَيَّ، إِنْ قَدَرْتَ أَنْ تُصْبِحَ وَتُمْسِيَ لَيْسَ فِي قَلْبِكَ غِشٌّ لأَحَدٍ فَافْعَلْ ثُمَّ قَالَ لِي: يَا بُنَيَّ وَذَلِكَ مِنْ سُنَّتِي، وَمَنْ أَحْيَا سُنَّتِي فَقَدْ أَحَبَّنِي، وَمَنْ أَحَبَّنِي كَانَ مَعِي فِي الجَنَّةِ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ "বেটা! সকাল-সন্ধ্যায় যদি এমনভাবে থাকতে পার যে, তোমার মনে কারো প্রতি বিদ্বেষ নেই তাহলে এমনভাবেই থাক। বেটা! এটি আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নাতকে যিন্দা করে সে আমাকে ভালবাসে। আর যে আমাকে ভালবাসে সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে।" -(তিরমিযীঃ ২৬৭৮)

 

সুন্নাতকে আঁকড়ে থাকায় একশত শহীদের সওয়াবঃ

হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ تَمَسَّكَ بِسُنَّتِي عِنْدَ فَسَادِ أُمَّتِي فَلَهُ أجر مائَة شَهِيد»

"আমার উম্মাতের বিপর্যয়ের সময় যে আমার ছুন্নাতকে আঁকড়ে থাকবে তার জন্য একশত শহীদের সওয়াব।" - (বায়হাকী)

সুন্নাত অবহেলাকারী রসূলের উম্মাতভূক্ত নয়ঃ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।  তিনি বলেন,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: زَوَّجَنِي أَبِي امْرَأَةً مِنْ قُرَيْشٍ، فَلَمَّا دَخَلَتْ عَلَيَّ جَعَلْتُ لَا أَنْحَاشُ لَهَا، مِمَّا بِي مِنَ الْقُوَّةِ عَلَى الْعِبَادَةِ، مِنَ الصَّوْمِ وَالصَّلَاةِ، فَجَاءَ عَمْرُو بْنُ الْعَاصِ إِلَى كَنَّتِهِ، حَتَّى دَخَلَ عَلَيْهَا، فَقَالَ لَهَا: كَيْفَ وَجَدْتِ بَعْلَكِ؟ قَالَتْ: خَيْرَ الرِّجَالِ أَوْ كَخَيْرِ الْبُعُولَةِ، مِنْ رَجُلٍ لَمْ يُفَتِّشْ لَنَا كَنَفًا، وَلَمْ يَعْرِفْ لَنَا فِرَاشًا، فَأَقْبَلَ عَلَيَّ، فَعَذَمَنِي، وَعَضَّنِي بِلِسَانِهِ، فَقَالَ: أَنْكَحْتُكَ امْرَأَةً مِنْ قُرَيْشٍ ذَاتَ حَسَبٍ، فَعَضَلْتَهَا، وَفَعَلْتَ [ص:9]، وَفَعَلْتَ ثُمَّ انْطَلَقَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَشَكَانِي، فَأَرْسَلَ إِلَيَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَتَيْتُهُ، فَقَالَ لِي: «أَتَصُومُ النَّهَارَ؟» قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: «وَتَقُومُ اللَّيْلَ؟» قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: «لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأُصَلِّي وَأَنَامُ، وَأَمَسُّ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي»

"আমার পিতা একজন কুরাইশি মেয়ের সাথে আমাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। উক্ত মেয়ে আমার ঘরে আসল। আমি নামায রোযা ইত্যাদি এবাদতের প্রতি আমার বিশেষ আসক্তির দরুণ তার প্রতি কোন প্রকার মনোযোগ দিলাম না। একদিন আমার পিতা- আমর ইবনে আস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তার পুত্রবধুর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার স্বামীকে কেমন পেয়েছ? সে জবাব দিল, খুবই ভালো লোক অথবা বললো খুবই ভালো স্বামী। সে আমার মনের কোন খোঁজ নেয় না এবং আমার বিছানার কাছেও আসে না। এটা শুনে তিনি আমাকে খুবই গালাগাল দিলেন ও কঠোর কথা বললেন এবং বললেন, আমি তোমাকে একজন কুরাইশি উচ্চ বংশীয়া মেয়ে বিয়ে করিয়েছি আর তুমি তাকে এরূপ ঝুলিয়ে রাখলে? তিনি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গিয়ে আমার বিরূদ্ধে নালিশ করলেন। তিনি আমাকে ডাকালেন। আমি উপস্থিত হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি দিনভর রোযা রাখ? আমি বললাম হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি রাতভর নামায পড়? আমি বললাম হ্যাঁ। তিনি বললেন, কিন্তু আমি রোযা রাখি ও রোযা ছাড়ি, নামায পড়ি ও ঘুমাই, স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করি। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতের প্রতি আগ্রহ রাখে না সে আমার দলভুক্ত না।" -(মুসনাদে আহমাদঃ ৬৪৪১)

 

হযরত আনাস  রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত।

يَقُولُ: جَاءَ ثَلاَثَةُ رَهْطٍ إِلَى بُيُوتِ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمَّا أُخْبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُّوهَا، فَقَالُوا: وَأَيْنَ نَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَدْ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ، قَالَ أَحَدُهُمْ: أَمَّا أَنَا فَإِنِّي أُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَدًا، وَقَالَ آخَرُ: أَنَا أَصُومُ الدَّهْرَ وَلاَ أُفْطِرُ، وَقَالَ آخَرُ: أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلاَ أَتَزَوَّجُ أَبَدًا، فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيْهِمْ، فَقَالَ: «أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا، أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي»

তিনি বলেন তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের নিকট তার ইবাদতের অবস্থা জানার জন্য আসেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইবাদতের খবর শুনে তারা যেন তার ইবাদতকে কম মনে করলেন। তারা পরস্পর আলাপ করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তুলনায় আমরা কী? আল্লাহ তাআলা তার আগের-পিছের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। তাদের একজন বললেন, আমি সারা রাত সালাত আদায় করবো। দ্বিতীয়জন বললেন, আমি দিনে সিয়াম পালন করবো, আর কখনো তা ত্যাগ করবো না। তৃতীয় জন বললেন, আমি নারী থেকে দূরে থাকব, কখনো বিয়ে করবো না। তাদের এই পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে পড়লেন এবং বললেন, "তোমরা কি এ ধরনের কথাবার্তা বলেছিলে? খবরদার! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশী ভয় করি, তোমাদের চেয়ে বেশী তাকওয়া অবলম্বন করি। কিন্তু এরপরও আমি কোন দিন সিয়াম পালন করি আবার কোন দিন সিয়াম পালন ছেড়ে দিই। রাতে সালাত আদায় করি আবার ঘুমও যাই। নারীদেরকে বিয়েও করি। এটাই আমার পথ। তাই যে ব্যক্তি আমার পথ ছেড়ে দিয়েছে সে আমার (উম্মতের মধ্যে) গণ্য হবে না।"  - (বুখারিঃ হাদিস নং ৫০৬৩)

 

সহীহ হাদীস বনাম সুন্নাতঃ

কোন হাদীস সহীহ হলেই সর্বদা আমলযোগ্য হয় না। আমলযোগ্য হতে হলে সাহাবা, তাবিঈন ও তাবে-তাবিঈনদের মধ্যে নির্ভরযোগ্য এক জামাতের অন্ততঃ আমল থাকতে হবে। এ প্রসংগে আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলী (রহঃ) লিখেছেনঃ "ইমামগণ এবং হাদীস বিশারদ ফকীহগণ কোন একটি হাদীস সহীহ হলে, তার উপর তখনই আমল করেন, যখন কোন সাহাবী, তাবেয়ী অথবা তাদের নির্দিষ্ট কোন একটি দল থেকে হাদীসটির উপর আমলের প্রমাণ পাওয়া যায়। আর সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) যে হাদীসের উপর আমল না করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন, তার উপর আমল করা জায়েয নেই; কেননা তার উপর যে আমল করা যাবে না, সেটা জেনেই তারা হাদীসটি পরিত্যাগ করেছেন।"

 

বিভিন্ন মাযহাবের অনুসরণ মুলতঃ সুন্নাতেরই অনুসরণঃ

ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ "প্রত্যেকের অবগত হওয়া জরুরী যে, মুসলিম উম্মাহের নিকট ব্যাপক ভাবে সমাদৃত ইমামদের কোন ইমামই স্বেচ্ছায় রাসূলের কোন সুন্নাতের বিরোধিতা করেননি। সুন্নাতটি ছোট থেকে ছোট হোক কিংবা বড় থেকে বড়। কেননা তারা সন্দেহাতীত ও নিশ্চিতভাবে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, রাসূল (সঃ) এর অনুসরণ জরুরী এবং রাসূলের কথা ব্যতীত প্রত্যেকের কথাই যেমন গ্রহণ করা যায় আবার প্রত্যাখ্যানও করা যায়। কিন্তু তাদের কারও কাছ থেকে যদি এমন বক্তব্য পাওয়া যায়, যা কোন সহীহ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হয়, তবে বুঝতে হবে তার কাছে অবশ্যই যথার্থ কোন প্রমাণ বা ওজর রয়েছে, যার কারণে তিনি সহীহ হাদীসটি গ্রহণ করেননি।" - [মাজমুউল ফাতাওয়াঃ পৃষ্ঠা-৩০৪]

রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন আল-কুরআনের নির্দেশনা মোতাবেক জীবন গঠনের বাস্তব নমুনা। আর রসূলের সুন্নাত অনুসরণের মডেল হলেন খুলাফায়ে রাশিদীন ও সাহাবায়ে কিরাম। সুতরাং তাদেরই মহান আদর্শে সুন্নাত মোতাবেক জীবন গঠন ও জীবনের সর্বক্ষেত্রে কায়েমের মধ্যেই নিহিত রয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির জন্য আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত।

 

আমাদের দায়িত্ব হল- সমগ্র বিশ্বের মানব জাতিসমূহের কাছে ইসলামের এই মহান বার্তা যথাযথভাবে পৌঁছে দেয়া। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে, আমাদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুগণকে তাঁর পছন্দনীয় মাবহবুব বান্দাগণের অন্তর্ভূক্ত করুন! আ-মী-ন।

No comments:

Post a Comment