সকল প্রাণীকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
كل نفس ذائقة الموت ثم إلينا رجعون.
অর্থ: “সকল প্রাণীই মরণশীল, তারপর আমার কাছেই তােমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা আনকাবুত ২৯, আয়াত ৫৭)।
একইভাবে অন্যত্র বলা হয়েছে,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ ﴿آلعمران: ١٨٥﴾
অর্থ: “প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানাে হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী।” (সূরা আলে ইমরান ৩, আয়াত ১৮৫)
উপরােক্ত আয়াতদ্বয়ের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে মৃত্যু মানেই জীবনের শেষ নয়, মৃত্যুর পরে আবার আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। মরার পরে কেন আল্লাহ তা'আলার কাছে ফিরে যেতে হবে, তার জন্য আল্লাহ তা'আলা সূরা মুলক -এ বলেছেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ ﴿الملك: ٢﴾
অর্থ: “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন। যাতে করে তিনি তােমাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারেন যে, তােমাদের মধ্যে কর্মে কে শ্রেষ্ঠ ।”(সূরা মূলক ৬৭, আয়াত ২)
যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, মানুষরা সে দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছে তাই আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুর পরে পরীক্ষা করবেন। যারা যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে তারাই হবে কর্মে শ্রেষ্ঠ, আর যারা দায়িত্ব পালন করছে না, তারা হবে ক্ষতিগ্রস্থদের শামিল।
আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা বা তার হুকুম বাস্তবায়ন করা এবং জীবনের যাবতীয় কিছু তার আইন ও বিধান মাফিক পরিচালনা করার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। এ দায়িত্ব সম্পর্কেই মরণের পরে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে।
মৃত্যু এক উপেক্ষিত বাস্তবতা :
আমাদের জীবনের বাস্তবতায় মৃত্যু চরমভাবে উপেক্ষিত। মৃত্যু একটি চরম বাস্তবতা, যা সকলের জীবনে অবশ্যম্ভাবী ঘটবে, কিন্তু তা নিয়ে আমাদের কোন আলােচনা নেই। আমাদের আলােচনার টেবিলে মৃত্যু কখনাে আলােচ্য বিষয় হয় না। আমরা সম্পদ বা অর্থ উপার্জন করার ফন্দিফিকির, পার্থিব জীবনের প্রতিষ্ঠা লাভ কিংবা খেলাধুলা, রাজনীতি, নাটক, সিনেমা ইত্যাদি নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দেই। মৃত্যুর পর যেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে তার প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। প্রত্যেকে মনে করে যে, মৃত্যু এত তারাতারি তাকে ধরবে না। আমাদের আশে পাশে প্রতিনিয়ত যে সকল মানুষ মারা যায়, তারাও মনে করতাে মৃত্যু এত তাড়াতাড়ি তাকে ধরবে না। ভাবখানা এমন এটাকে যত ভুলে থাকা যায় ততই যেন মঙ্গল।
কোন অসুস্থ লােক বা অসুস্থ সন্তান যখন বলে যে বাবা আমি বােধ হয় মরে যাব। বাবা মা তখন আঁৎকে উঠে বলেন- “এমন কথা বলতে নেই।” বাস্তব সত্যকে উপেক্ষা করার কি নিদারুণ ব্যার্থ প্রচেষ্টা। কোন মা বাবা বলে না যে- “হে প্রিয় সন্তান আমাদেরকে অবশ্যই একদিন মরতে হবে, তাই সময় থাকতেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর, পরকালের পাথেয়গুলােকে সঞ্চয় কর। জীবনকে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা কর”।
তাহলে অবশ্যই আমাদের সন্তানদের মধ্যে আল্লাহর খাটি বান্দা হওয়ার জন্য মানসিকতা তৈরি হতাে। আমাদের সমাজে এরূপ ধারণা যে মৃত্যুর কথা চিন্তা করলে মানুষ নিঃস্ক্রীয় হয়ে পড়বে, মৃত্যুর ভয়ে কাজকর্ম বন্ধ করে দিবে। এটা আসলে ভীষণ ভুল ধারণা। বরং মৃত্যুর সঠিক চিন্তা সমাজকে সুন্দরভাবে গঠন করে এবং যিনি মৃত্যু চিন্তা করেন -আল্লাহ তা'আলা তার হায়াতে বরকত দেন। বর্তমানে মানুষ যেভাবে ধান্ধার পিছনে ব্যস্ত হয়ে পরছে, তাতে মৃত্যু চিন্তা মানুষকে সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। পরকালের জন্য নিজকে তৈরি করতে গিয়ে আল্লাহর খাটি বান্দা হিসেবে প্রস্তুত করতে পারে। আমাদের সমাজের একটি প্রচলিত ধারণা যে মানুষের গড় আয়ু ৫০/৬০ বছর।
আমরাও অন্তত ৬০/৭০ বছর তাে বাঁচবই। এর মধ্যে জীবনের সকল কিছু গুছিয়ে নিতে হবে। এ সময়ের মধ্যে বাড়ি, গাড়ি, ভাল বিয়ে, ব্যাংক ব্যালেন্স এগুলাে গুছানােই হচ্ছে প্রধান কাজ। জীবনকে যতটা পারা যায় উপভােগ করে নিতে হবে। আমাদের মধ্যে মৃত্যু চিন্তা থাকলে আমরা কেবলমাত্র ভােগের প্রতিযােগিতায় মত্ত হতাম না। মৃত্যু বিবর্জিত বাস্তবতার জন্যই সমাজে সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি, জনগণের সম্পদ লুটপাট, কালােবাজারী, ছিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ কোন কিছুতেই মানুষ ভয় পায় না। হালাল হারাম কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। জান্নাতের জন্য কোন মােহ নেই। জাহান্নামের জন্য কোন ভয় নেই। এ যেন জাহিলিয়াত সমাজের আর এক নব্য কঠিন বাস্তবরুপ ।
মানুষ কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাবে?
মানব জীবনের তিনটি মৌলিক বিষয় হচ্ছে যে
১. মানুষ কোথা থেকে এখানে এসেছে,
২. এখানে তার কি কাজ এবং এখান থেকে সে কোথায় যাবে।
মানুষের এ বিষয়গুলাে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। এ বিষয়গুলাের উপলদ্ধির উপর নির্ভর করে যে পৃথিবীতে সে তার জীবন কিভাবে পরিচালনা করবে। আজকের সমাজের মানুষেরা, এখানে তার কি কাজ এবং এখান থেকে সে কোথায় যাবে এ বিষয়গুলাে নিয়ে মােটেই মাথা ঘামায় না। সমাজের মানুষেরা দুনিয়াতে আজ যে ব্যবস্থা দ্বারা জীবন পরিচালনা করছেন, সে ব্যবস্থা ‘মানুষ কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাবে' এ সকল বিষয় নিয়ে মােটেই ভাবতে শিখায় না। সমাজের মানুষেরা আজ বস্তুবাদী বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, ফলে ইহজাগতিক বস্তুবাদী বিষয়গুলাে মানুষকে বেশী প্রলুব্ধ করে তােলে। মানুষকে ভাবতে শিখায়, সে এখানে অনেক দিন বাঁচবে, এর মধ্যে বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা, চাকুরী, ভাল বিয়ে, বিদেশ ভ্রমণ, ব্যাংক ব্যালেন্স এবং জীবনকে উপভােগ করাই হচ্ছে প্রধান কাজ। এ ব্যবস্থা মানুষকে শিখায় - জীবন তাে একটাই, এ জীবনে যত বেশী ভােগ করা যায়, যত বেশি ফুর্তি করা যায় এবং যত বেশী সম্পদ অর্জন করা যায়, সেই ততই সফল। এ সফলতার পিছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ নিজের জন্য বেশি সম্পদ উপার্জন করতে চায় এবং এ সম্পদের ব্যবস্থা করতে গিয়ে নিজকে জড়িয়ে ফেলে লাগামহীন প্রতিযােগিতায় ।
ফলে সে ভুলে যায় জীবনের উদ্দেশ্যের কথা, ভুলে যায় দূর্লভ মানবজীবনের আসল দায়িত্ববােধের কথা, ভুলে যায় এখান থেকে যেখানে যেতে হবে সেখানকার জবাবদিহীর কথা।
ইসলাম এমন এক জীবন-ব্যবস্থা, তা জীবনের এ সকল মৌলিক বিষয় নিয়ে মানুষকে ভাবতে শিখায় এবং এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রদান করে। আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং এখানে সে কতদিন থাকবে তা বেঁধে দিয়েছেন। এখানে কি দায়িত্ব পালন করতে হবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এখানকার সময় ফুরিয়ে গেলে তার গন্তব্য কোথায় তা মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন এবং সেখানে তার সকল কাজকর্মের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, এ চরম সত্য সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন।
মৃত্যু মানে জীবনের পরিসমাপ্তি নয় :
আল্লাহ তা'আলা যে জীবন সৃষ্টি করেছেন তার কোন বিনাশ নেই। তিনি জীবনকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। সকল রূহকে সৃষ্টি করে তিনি ‘আলমে আরওয়াহ' বা রূহের জগতে রেখে দিয়েছেন। অতঃপর তিনি সেখান থেকে রূহকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন তার প্রতিনিধি বা খলীফা হিসেবে। খলীফাগণ পৃথিবীতে কি কাজ করবেন তার জন্য দায়িত্ব এবং সময় বেঁধে দিয়েছেন। এ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরে মানুষকে এখান থেকে আর একটি জীবনে ফিরিয়ে নেয়া হবে। পৃথিবী থেকে আর একটি জগতে ফিরিয়ে নেয়ার নাম হয়েছে মৃত্যু। মৃত্যু আসলে জীবনের শেষ নয় ।
জীবনের একটি পর্যায় থেকে আর একটি পর্যায়ে প্রত্যাবর্তন করা মাত্র। এ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে মানুষকে যে জগতে ফিরিয়ে নেয়া হয় তার নাম হচ্ছে ‘আলমে বরযখ'। এখানে সে কিয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন এখানকার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে। কিনা তার জন্য বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। এ বিচারের পরে এ সত্ত্বা অনন্তকাল জান্নাত বা জাহান্নামে অবস্থান করবে।



No comments:
Post a Comment