Friday, October 23, 2020

ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সালাম (আসসালামু আলাইকুম সালাম)-এর ভুমিকা

ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সালাম (আসসালামু আলাইকুম সালাম)-এর ভুমিকা






ভুমিকাঃ

দেখা-সাক্ষাতে একে অন্যকে শুভেচ্ছা-অভিবাদন জানানো মানুষের একটি সহজাত গুণ। মানবসমাজে এ প্রথা চলে আসছে প্রাচীন কাল থেকেই। কোনো কোনো এলাকায় প্রচলন ছিল সম্মানিত ব্যক্তিদেরকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানানোর রীতি। ইসলামপূর্ব যুগে আরবের লোকেরা পরস্পর দেখা-সাক্ষাতে বলতঃ اَنْعِمْ صَبَاحًاতোমার সকাল সুন্দর হোক اَنْعَمَ اللهُ بِكَ عَيْنًاআল্লাহ তোমার চোখ শীতল করুন জাতীয় শব্দ। গুডমর্নিং বা শুভ সকাল তো একালেরও প্রচলিত অভিবাদন। কিন্তু ইসলাম আমাদেরকে দিয়েছে এক অভূতপূর্ব অভিবাদন-রীতিযেমনটি কোনো ধর্মে কিংবা কোনো দেশে প্রচলিত ছিল না। মানের বিচারেও তা অন্যসব কিছু থেকে শ্রেষ্ঠ। ইসলাম আমাদেরকে শিখিয়েছে- দুই মুসলমান যখন মিলিত হয় তখন যেন একে অন্যকে সালাম দেয় অর্থাৎ একজন বলবেআসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ- তোমার ওপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোকঅপরজন বলবেওয়া আলাইকুমুস সালামু ওয়ারাহমাতুল্লাহঃ তোমার ওপরও শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। এভাবে স্থান-কালের বন্ধন থেকে মুক্ত করে একে অন্যের জন্যে আল্লাহর রহমত ও শান্তি কামনাঃ এর চেয়ে উত্তম শুভেচ্ছা আর কী হতে পারে!  এ সালাম আমাদের অহংকারআমাদের স্বকীয়তা।

সালাম যে কেবল অভিবাদন আর শুভ কামনা এমন নয়কিংবা সালাম কেবল মহব্বত-ভালোবাসার প্রকাশই নয়বরং এ সালামের মধ্য দিয়ে ভালোবাসার দাবিটুকুও আদায় করা হয়। একজন আরেকজনের জন্যে প্রার্থনা করেঃ আল্লাহ তোমাকে শান্তি ও নিরাপদে রাখুনতোমার ওপর বর্ষিত হোক পরম করুণাময়ের দয়া ও অনুগ্রহের বারিধারা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে দয়াময় আল্লাহ তোমাকে সবরকমের বিপদ ও শঙ্কা থেকে মুক্ত রাখুন। সাক্ষাতের সঙ্গে সঙ্গে একে অন্যের জন্যে এ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে যেন একথাও মনে করিয়ে দেয়া হয়Ñ আমরা একে অপরের যে সহযোগিতা আর উপকার করতে চাইতা কেবল আল্লাহর ইচ্ছায়ই হতে পারে। এভাবে সালামের মাধ্যমে একে অন্যকে আল্লাহর কথাও মনে করিয়ে দেয়। আর কেউ যখন অন্য কারও জন্যে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রার্থনা করেসে যেন এর ভেতর দিয়ে এ অঙ্গীকারও করে- আমার পক্ষ থেকেও কোনো অনিষ্টতায় তুমি আক্রান্ত হবে না। আমার দিক থেকে তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। পারস্পরিক ভালোবাসার দাবি পূরণের চেয়ে সুন্দর পন্থা আর কী হতে পারে!

 عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَلاَمٍ، قَالَ: لَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ انْجَفَلَ النَّاسُ إِلَيْهِ، وَقِيلَ: قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَجِئْتُ فِي النَّاسِ لأَنْظُرَ إِلَيْهِ، فَلَمَّا اسْتَبَنْتُ وَجْهَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَرَفْتُ أَنَّ وَجْهَهُ لَيْسَ بِوَجْهِ كَذَّابٍ وَكَانَ أَوَّلُ شَيْءٍ تَكَلَّمَ بِهِ أَنْ قَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلاَمَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصَلُّوا وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِسَلاَمٍ.هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ.

প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা.। শুরুর জীবনে ছিলেন ইহুদি। থাকতেন মদীনায়। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত সম্পর্কে তার জানাশোনা ছিল প্রচুর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরতের পর তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। এক হাদীসে তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করলেনবাঁধভাঙা স্রোতের মতোই মানুষ তাঁর দিকে ছুটতে শুরু করল। তারা বলাবলি করতে লাগলরাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চলে এসেছেনরাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চলে এসেছেন। তাঁকে দেখার জন্যে মানুষের ভিড়ের মাঝে আমিও গেলাম। আমি তাঁর চেহারা দেখেই তাঁকে চিনতে পারলাম আর তখনি বুঝতে পারলাম এ চেহারা কোনো মিথ্যুকের চেহারা নয়। সেদিন আমি তাঁকে প্রথম যে কথাটি বলতে শুনেছি তা হল- হে মানুষেরা! তোমরা সালামের বিস্তার ঘটাওমানুষকে খাবার খাওয়াও এবং যখন অন্য মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড়তাহলে তোমরা শান্তিতে ও নির্বিঘ্নে জান্নাতে যেতে পারবে। -জামে তিরমিযীহাদীস ২৪৮৫

 

আভিধানিক অর্থঃ

আরবিতে এর প্রতিশব্দ التحية، التهنئة، الترحيب । আভিধানিক অর্থ হলো- الدعاء للحياة তথা জীবনের জন্য দো’আ করা। ইংরেজিতে- Greeting, Salutation, Welcome (আরবি: السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّه وبركاته একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে শান্তি, প্রশান্তি কল্যাণ, দোয়া, আরাম, আনন্দ, তৃপ্তি ইত্যাদি।

সালাম একটি সম্মানজনক, অভ্যর্থনামূলক, অভিনন্দনজ্ঞাপক, শান্তিময় উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন পরিপূর্ণ ইসলামী অভিবাদন। এটি উল্লেখ্য যে, ‘আস্‌-সালামআল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে একটি অন্যতম নাম এবং জান্নাতের নাম সমূহের মধ্যে একটি জান্নাতের নাম। সালাম আমাদের জীবনে অনেক শান্তি ও সুখ আনে।

 

সালামের উৎপত্তি বা প্রেক্ষাপট

মুসলিমরা বিশ্বাস করে যে আল্লাহ সর্বপ্রথমে প্রথম মানব আদমকে সালামের শিক্ষা দেন। (হাদিস গ্রন্থ-মিশকাত, হাদিস নং-৪৬২৮, অধ্যায়-শিষ্টাচার, অনুচ্ছেদ-সালাম।)

 

4628 -[1] (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ على صورته طوله ذِرَاعًا فَلَمَّا خَلَقَهُ قَالَ اذْهَبْ فَسَلِّمْ عَلَى أُولَئِكَ النَّفَرِ وَهُمْ نَفَرٌ مِنَ الْمَلَائِكَةِ جُلُوسٌ فَاسْتَمِعْ مَا يُحَيُّونَكَ فَإِنَّهَا تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَّتِكَ فَذَهَبَ فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ فَقَالُوا: السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ " قَالَ: «فَزَادُوهُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ»

হাদিসে আছে, আবু হুরায়রাথেকে বর্ণিত হয়েছে রাছূলুল্লাহ মুহাম্মাদ(সাঃ) বলেন আল্লাহ আদম (আঃ)কে সৃষ্টি করে বলেন, যাও ফেরেশতাদেরদলকে সালাম দাও এবং তোমার সালামের কি উত্তর দেয় মন দিয়ে শুন। এটিই হবে তোমার আর তোমার সন্তানদের সালাম। সে অনুযায়ী আদম গিয়ে বলেন, আস্‌সালামু আলাইকুম (অর্থ আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক’)। ফেরেশতারা উত্তর দেন, ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি (অর্থ আপনাদের উপর শান্তি এবং আল্লাহ রহমত বর্ষিত হোক’)। ফেরেশতারা রাহমাতুল্লাহ বৃদ্ধি করেন। (মিশকাত, হাদিস নং-৪৬২৮)

 

সালাম দেওয়া সুন্নত। উত্তর দেওয়া ওয়াজিব

 

অন্যান্য নবীদের জীবনে সালামের প্রচলন

ইব্রাহিম(আঃ) এর ক্ষেত্রে, কুরআনে পাওয়া যায়-

وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَى قَالُوا سَلَامًا قَالَ سَلَامٌ فَمَا لَبِثَ أَنْ جَاءَ بِعِجْلٍ حَنِيذٍ

        এবং অবশ্যই আমার ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে ইব্রাহীমের নিকট এসেছিল। তারা সালাম জানায়। তিনিও সালাম দেন। সূরা হুদ (১১), আয়াত নং-৬৯

অন্যের গৃহে সালাম না দিয়ে প্রবেশ করা নিষেধ

 কুরআন-এ আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ﴿النور: ٢٧﴾

 হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশ করো না,যে পর্যন্ত আলাপ পরিচয় না কর এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম না কর। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম। যাতে তোমরা স্মরণ রাখো। (সূরা নূরঃ ২৭)

 

হাদিসে অন্যের গৃহে গিয়ে তিনবার সালাম দিতে বলা হয়েছে এবং অনুমতি প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। অনুমতি নাদিলে চলে আসতে বলা হয়েছে।  (তিরমিযী)

 

 সালামের বিধান

সালাম দেয়া সুন্নত। আল্লাহ্ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ﴿النور: ٢٧﴾

হে মুমিনগণ, তোমরা নিজদের গৃহ ছাড়া অন্য কারও গৃহে প্রশে করো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নেবে এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম দেবে (সূরা নূরঃ ২৭)

 

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,

«لَا تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَو لَا أدلكم على شَيْء إِذا فعلمتموه تحاببتم؟ أفشوا السَّلَام بَيْنكُم» رَوَاهُ مُسلم

 তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে না, আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি জিনিস বাতলে দেব, যা করলে তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালো বাসবে? তারপর তিনি বললেন, তোমারা বেশি বেশি করে সালামকে প্রসার কর মুসলিম; মিশকাতঃ ৪৬৩১

 

কোনো জামাতকে সালাম দেয়ার ক্ষেত্রে সালাম শব্দটি মারেফা (السلام) বা নাকিরা (سلام) উভয় প্রকারে ব্যবহার করা যাবে। কারণ, হাদিসে উভয় প্রকারের ব্যবহার প্রমাণিত আছে। আল্লামা ইবনুল বান্না রহ. বলেন, সম্ভাষণের সালাম নাকিরা হবে, আর বিদায়ী সালাম মারেফা হবে।

 

জামাতের মধ্য হতে যে কোনো একজনের সালাম দেয়া দ্বারা সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। উত্তম হল জামাতের সবাইকে সালাম দেয়া। কারণ, হাদিসে বলা হয়েছে

«أفشوا السلام بينكم»

অর্থাৎ, তোমরা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে সালামকে প্রসার কর।

 

আর যে সব ক্ষেত্রে সালাম দেয়া মাকরূহ, সে সব ক্ষেত্রগুলোকে আল্লামা গায্যি রহ. কাব্য আকারে উল্লেখ করেন। নিম্নে তার কাব্যগুলো উল্লেখ করা হল:

 سلامك مكروه على من অর্থ: যাদের সালাম দেয়া মাকরূহ

নিম্নে তাদের আলোচনা করা হল:

এরা ছাড়া বাকী যাদের সাথে তোমার দেখা হবে, তাদের সালাম দেয়া সুন্নত ও বৈধ। সালাতরত ব্যক্তি, তিলাওয়াতকারী, যিকিরকারী, হাদিস পাঠদানকারী, খুতবাদানকারী এবং যারা খুতবা শুনায় মগ্ন [তাদের সালাম দেয়া মাকরূহ]। ফিকহ নিয়ে আলোচনাকারী, বিচারক যিনি বিচার কার্যে ব্যস্ত [তাকেও সালাম দেয়া মাকরূহ]। আর যারা ফিকহ নিয়ে গবেষণা করছে তাদেরও তোমরা সালাম দেয়া হতে বিরত থাক, যাতে তারা উপকৃত হয়। মুয়াজ্জিন, ইকামত দানকারি ও পাঠদানকারীদের সালাম দেয়া মাকরূহ। অনুরূপভাবে অপরিচিত যুবতী নারী, [যাদের সালাম দেয়াতে ফিতনার আশংকা থাকে] তাদের সালাম দেয়া কোন ক্রমেই উচিত নয়। যারা দাবা খেলায় মগ্ন তাদের ও তাদের মত লোকদের সালাম দেয়া মাকরূহ। আর যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে খেল-তামাশায় মগ্ন [তাদের সালাম দেয়া যাবে না]। কাফের ও লেংটা লোককে সালাম দেবে না, পেশাব পায়খানায় লিপ্তদের সালাম দেয়া হতে বিরত থাকবে। অনুরূপভাবে খাওয়ায় ব্যস্ত [লোককে সালাম দেবে না], তবে যদি তুমি ক্ষুধার্ত হও এবং জান যে লোকটি তোমাকে ফিরিয়ে দেবে না। অনুরূপভাবে শিক্ষক যিনি লেকচার দেয়ায় ব্যস্ত। মনে রাখবে এ হল, শেষ ব্যক্তি বাকীদের সালাম দেয়াতে তুমি উপকার লাভ করবে।


সালাম প্রদানের ক্ষেত্র

১. কথা শুরু করার পূর্বে:

মহানবী (সা) বলেছেন-السلام قبل الكلام অর্থাৎ কথা বলার পূর্বে সালাম। অপর হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন- إن أولى الناس بالله من بدأ بالسلام অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সেই সর্বোত্তম ব্যক্তি যে প্রথমে সালাম দেয়।

২.সাক্ষাতের সময়:

সালাম দেয়াকে রাসূল (সা) এক মুমিনের জন্য অন্য মুমিনের কর্তব্য বা হক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

للمؤمن على المؤمن ست خصال، يعوده إذا مرض ويشهده إذا مات ويجيبه إذا دعاه ويسلم عليه إذا لقيه ويشمته إذا عطس وينصح له إذا غاب أو شهد.

অত্র হাদিসে এক মুমিনের জন্য অন্য মুমিনের প্রতি ছয়টি কর্তব্য রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হলো- যখন তার সাথে সাক্ষাত হবে, তখন তাকে সালাম দিবে।(সহিহ বুখারি ৫১৭৫)

৩.অন্যের বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনার সময়:

এ ব্যাপারে কুরআনে এসেছে-

(يا أيها الذين آمنوا لاتدخلوا بيوتا غير بيوتكم حتى تستأنسوا وتسلموا على أهلها.)

অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের বাড়ী ব্যতিত অন্য কারো বাড়ীতে অনুমতি ও সালাম প্রদান ব্যতীত প্রবেশ করবে না। পরপর তিনবার সালাম প্রদানের পর অনুমতি না পেলে ফিরে যাওয়াই ইসলামী শিষ্টাচার।[সূরা আন-নূর : ২৭)

৪.আগমন ও প্রস্থানের সময়:

আবু হুরায়রা ও যায়েদ ইবনে সাবিত (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা) বলেছেন-

إذا انتهى أحدكم إلى مجلس فليسلم فإن بدأ له أن يجلس فليجلس ثم إذا قام فليسلم فليست الأولى بأحق من الآخرة.

অর্থাৎ যখন তোমাদের কেউ কোন সমাবেশে পৌঁছে, তখন সে যেন সালাম দেয়। যদি তথায় তার বসার প্রয়োজন হয়, তবে যেন বসে পড়ে। অতঃপর যখন সে প্রস্থানের জন্য দাঁড়ায়, তখন যেন সালাম করে। কেননা, প্রথম সালাম দ্বিতীয় সালামের চেয়ে অধিক হকদার নয়।

৫.নিজের বাড়িতে প্রবেশকালে:

পবিত্র কুরআনে এসেছে:

( فإذا دخلتم بيوتا فسلموا على أنفسكم تحية من عند الله مباركة طيبة.)

অর্থাৎ যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন স্বরূপ সালাম পেশ করবে।

( يا بني إذا دخلت على أهلك فسلم يكون بركة عليك وعلى أهل بيتك).

অর্থাৎ হে বৎস! যখন তোমার বাড়ীতে প্রবেশ করবে, তখন সালাম দিবে। কেননা, তোমার সালাম তোমার ও তোমার পরিবারের লোকদের জন্য বরকতের কারণ হবে।

সালামের উত্তর দেয়ার বিধান:

সালামের উত্তর দেয়া ফরযে কিফায়াহ। যদি উপস্থিত লোক একজন হয়, তবে তাকেই সালামের উত্তর দিতে হবে। উত্তর দেয়া ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ্ তাআলা বলেন,

وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا ﴿النساء: ٨٦﴾

আর তোমাদেরকে যদি কেউ দোয়া করে, তাহলে তোমরাও তার জন্য দোয়া কর; তারচেয়ে উত্তম দোয়া অথবা তারই মত ফিরিয়ে বল। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে হিসাব-নিকাশ গ্রহণকারী। (সূরা নিসা, আয়াত: ৮৬)

 

আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে মারফু হাদিস বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَنْ عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: يُجْزِئُ عَنِ الْجَمَاعَةِ إِذَا مَرُّوا أَنْ يُسَلِّمَ أَحَدُهُمْ وَيُجْزِئُ عَنِ الْجُلُوسِ أَنْ يَرُدَّ أَحَدُهُمْ. رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ [ص:1319] الْإِيمَانِ» مَرْفُوعا. وروى أَبُو دَاوُد وَقَالَ: وَرَفعه الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ وَهُوَ شَيْخُ أَبِي دَاوُدَ

 

যখন কোন জামাত অতিক্রম করে, তখন তাদের থেকে যে কোন একজনের সালাম যথেষ্ট হবে এবং কোন মজলিস হতে যে কোন একজন সালামের উত্তর দিলে তা সকলের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে। আবু-দাউদ; মিশকাতঃ ৪৬৪৮

 

প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম দেয়াকে একজন মুসলমানের অন্যতম সেরা আমল হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা.-এর বর্ণনারাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন- ইসলামের শ্রেষ্ঠ আমল কোনটিরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

تُطْعِمُ الطَّعَامَ وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ، وَعَلَى مَنْ لَمْ تَعْرِفْ.

তুমি মানুষকে খাবার খাওয়াবে আর তোমার পরিচিত-অপরিচিত সকলকেই সালাম দেবে। সহীহ বুখারীহাদীস : ১২

 

সালাম দেয়ার পদ্ধতি:

সালামের সহিহ উচ্চারণ আমাদের সমাজে যেন আজ অনুপস্হিত। আধুনিকতার দৌড়ে কে কতো বিকৃত উচ্চারণ করতে পারে তা নিয়ে যেন চলছে প্রতিযোগিতা। যে উচ্চারণে আমরা সালাম দিচ্ছি, (যেমন সামাইকুম/স্লামালাইকুম/সা-মু আলাইকুম ইত্যাদি) নিজের অজান্তেই তার অর্থ হয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ! কোনোটির অর্থ: আপনার ধ্বংস হউক বা আপনার মৃত্যু হউক।

 

যে ব্যক্তি আগে সালাম দেবে, তার জন্য মোস্তাহাব হল, সে বলবে- السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ

সালাম দেয়ার ক্ষেত্রে বহুবচন শব্দ ব্যবহার করবে। যদিও উপস্থিত ব্যক্তি একজন হয়। আর সালামের উত্তর দাতা এ বলে উত্তর দেবে:

وَعَلَيْكُمْ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ

সালামের উত্তরে واو العطف উল্লেখ করবে। আর মনে রাখবে, সালাম দেয়ার সময় কেউ যদি السَّلَامُ عَلَيْكُمْ এবং উত্তর দেয়ার সময় শুধু وَعَلَيْكُمْ السَّلَامُ বলে, তাতে সালাম আদায় হয়ে যাবে। যখন কোনো একজন মুসলিমকে সালাম দেয়া হল, তারপর তার সাথে যতবার দেখা হবে, ততবার সালাম দেবে। কারণ, হাদিসে সালামকে প্রসার করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন, «أفشوا السلام بينكم» “তোমরা সালামকে প্রসার কর

 

সালামের প্রচলন কীভাবে ঘটানো যায় তার একটি রূপরেখাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন : 

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اتا: «إِذَا لَقِيَ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ فَإِنْ حَالَتْ بَيْنَهُمَا شَجَرَةٌ أَوْ جِدَارٌ أَوْ حَجَرٌ ثُمَّ لَقِيَهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ

যখন তোমরা তোমাদের কোন ভাইয়ের সাথে সাক্ষাত কর, তাকে সালাম দাও। যদি তোমাদের উভয়ের মাঝে কোন গাছ কিংবা পাথর বা দেয়াল বিচ্ছিন্নতা ঘটায়, তারপর আবার দেখা হয়, তাহলে আবারও সালাম দাও


অমুসলিমদেরকে সালাম ও জবাব:

لا تبدؤوا اليهود ولا النصارى بالسلام، فإذا لقيتم أحدهم في طريق فاضطروه إلى أضيقه.

অর্থাৎ তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে সালাম দিওনা। আর তাদের কারো সাথে রাস্তায় সাক্ষাৎ হলে তাদেরকে সংকীর্ণ পথে যেতে বাধ্য করবে। আর যদি কোন মুসলিমকে অমুসলিম সালাম দেয় তাহলে তার জবাব আনাস (রা) বর্ণিত হাদিসের আলোকে দিবে-

أن أصحاب النبي صلي الله عليه وسلم قالواللنبي صلي الله عليه وسلم: إن أهل الكتاب يسلمون علينا فكيف نرد عليهم؟ قال قولوا: وعليكيم ولا يزيد علي ذالك.

অর্থাৎ রাসূল (সা) এর সাহাবীগণ রাসূল (সা) কে বললেন- আহলে কিতাবীগণ আমাদেরকে সালাম দেয় তাদের উত্তর কীভাবে দেব? রাসূল (সা) বললেন- তোমরা বলবে- ‘ওয়া আলাইকুম’ (وعليكم)। এর চেয়ে বেশী বলবে না।

সালামের সুফলঃ

মনে রাখবে, আগে সালাম দেয়া সুন্নত। কারণ, আবু উমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে হাদিস বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,

«إن أولى الناس بالله من بدأهم بالسلام»

নিশ্চয় আল্লাহর নিকট উত্তম ব্যক্তি সে যে মানুষকে আগে সালাম দেয়। বর্ণনায় আবু-দাউদ শক্তিশালী সনদে।

 

শুধু পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতিই নয়সালামের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয় আমাদের আমলনামাও। হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা.-এর বর্ণনারাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে এসে এক ব্যক্তি السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ বলে সালাম দিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের উত্তর দিলেন। লোকটি তখন মজলিসে বসে পড়ল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনদশ (অর্থাৎ তুমি দশ নেকি পেলে)। এরপর আরেকজন এসে السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ বলে সালাম দিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের উত্তর দিলেন। লোকটি তখন মজলিসে বসে পড়ল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনবিশ (অর্থাৎ তুমি বিশ নেকি পেলে)। এরপর তৃতীয় আরেকজন এসে

 السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ  বলে সালাম দিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের উত্তর দিলেন। লোকটি তখন মজলিসে বসে পড়ল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনত্রিশ (অর্থাৎ তুমি ত্রিশ নেকি পেলে)। সুনানে আবু দাউদহাদীস ৫১৯৫

 

সালাম মানুষকে অহংকার থেকে মুক্ত রাখে।

মানুষ যখন বড় হয়তা বয়সের বিবেচনায়ই হোককিংবা যশ-খ্যাতি সম্মান বা অর্থসম্পদের দিক দিয়েই হোকআর পদমর্যাদা ও ক্ষমতা দিয়েই হোকসে চায় তার অধীনস্তরা কিংবা তার চেয়ে ছোট যারা তারা তাকে সম্মান করুক। অন্যদের সম্মানে সে তৃপ্তি পায়। তাই কেউ বড় হয়ে গেলে ছোটদের নিয়ে এ মানসিকতা থাকা স্বাভাবিকÑ আমি কেন তাকে সালাম দেববরং সে আমাকে সালাম দেবে! এ মানসিকতা থেকেই অহংকারের সূচনা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মানসিকতাকেই শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলেছেন। তাঁর বাণী ও শিক্ষা অনস্বীকার্যÑ যে যত বড়ই হোকসামাজিকভাবে যত উচ্চ মর্যাদার অধিকারীই হোকআগে বেড়ে সে যখন অন্য কাউকে সালাম দেবে তখন তার মন থেকে অহংকার বিদায় নিতে বাধ্য।

তবে এজন্যে শর্ত হল আগে সালাম দেয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :

الْبَادِئُ بِالسَّلَامِ بَرِيءٌ مِنَ الْكِبْرِ

যে আগে সালাম দেয় সে অহংকার থকে মুক্ত। Ñশুয়াবুল ঈমানবায়হাকীহাদীস ৮৪০৭

 

মজলিস থেকে ফিরে যাওয়ার সময়, সালাম দেয়া মোস্তাহাব। কারণ আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,

«إِذَا انْتَهَى أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَجْلِسِ، فَلْيُسَلِّمْ فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقُومَ، فَلْيُسَلِّمْ فَلَيْسَتِ الْأُولَى بِأَحَقَّ مِنَ الْآخِرَةِ»

যখন তোমরা কোন মজলিসে গিয়ে পৌছবে তখন তুমি সালাম দেবে। আর যখন তুমি মজলিস শেষ করে মজলিস থেকে উঠে দাঁড়াবে, তখনও সালাম দেবে। প্রথম সালাম শেষের সালাম থেকে অধিক গুরুত্ব বহন করে না। বর্ণনায় আবু-দাউদ ও তিরমিযী এবং ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদিসটি হাসান।

 

বাচ্চাদের সালাম দেয়া মোস্তাহাব।

 প্রমাণ:

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: «أَنَّهُ مَرَّ عَلَى صِبْيَانٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ» وَقَالَ: «كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَفْعَلُهُ»

অর্থ: আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, তিনি বাচ্চাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করেন এবং তাদের সালাম দেন এবং বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামঅনুরূপ করতেন। বুখারি ও মুসলিম।

 

আল্লাহ ভালো জানেন।

 

সালামের আরও কিছু বিধান

১। ছোটরা বড়দের সালাম দেবে, কম লোক বেশি লোককে সালাম দেবে এবং আরোহী ব্যক্তি পায়ে হাটা ব্যক্তিকে সালাম দেবে। কারণ, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,

«ليسلم الصغير على الكبير، والمار على القاعد، والقليل على الكثير» متفق عليه، وفي رواية لمسلم: «والراكب على الماشي».

ছোটরা যেন বড়দের সালাম দেয়, পায়ে হাটা ব্যক্তি যেন বসা ব্যক্তিকে সালাম দেয় এবং কম সংখ্যক লোক যেন বেশি সংখ্যক লোককে সালাম দেয়। বুখারি ও মুসলিম। আর মুসলিমের বর্ণনায় বর্ণিত, “আরোহী ব্যক্তি পায়ে হাটা ব্যক্তিকে সালাম দেবে

 

২। যখন দুই সাক্ষাতকারী পরস্পর সালাম দেয় এবং পরস্পরের সালাম শুনতে পায়, তখন উভয়ের উপরই সালামের উত্তর দেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। আর যখন কোনো এক দল লোক কোনো বসা ব্যক্তি বা বসা লোকদের মজলিসে উপস্থিত হবে, তখন সে প্রথমে তাদের সালাম দেবে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন, «والمار على القاعد» আর যখন কোনো ব্যক্তি দেয়ালের ওপাশ থেকে সালাম দেয়, তখন তার নিকট সালাম পৌছার পর, উত্তর দেয়া ওয়াজিব।

 

৩। আর যখন কোনো ব্যক্তি দূর থেকে চিঠির মাধ্যমে অথবা দূতের মাধ্যমে কাউকে সালাম দেয়, তখন তার নিকট সালাম পৌছার পর সালামের উত্তর দেয়া ওয়াজিব। তবে মোস্তাহাব হল, দূতকেও সালাম দেয়া এবং এ কথা বলা, وعليك وعليه السلام তোমার উপর ও তার উপর সালাম। কারণ, হাদিসে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একজন ব্যক্তি এসে বলল,

 أبي يقرؤك السلام فقال: «عليك وعلى أبيك السلام».

আমার পিতা আপনাকে সালাম দিয়েছে।এ কথা শোনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন, “তোমার উপর এবং তোমার পিতার উপর সালাম

 

৪। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রহ. কে বলা হল, অমুক আপনাকে সালাম দিয়েছে। তখন তিনি বললেন, ‘তোমার উপর ও তার উপর সালাম

 আয়েশা (রা) এর বর্ণিত -

أن النبي صلى الله عليه وسلم قال لها: إن جبريل يقرأ عليك السلام، قالت: وعليه والسلام ورحمة الله.

৫। সালামের সময় হাত উঠানো মূলতঃ কোনো ইসলামি প্রথা নয়-যদিও আজ মুসলমানেরা এটা রেওয়াজে পরিণত করেছে। বস্ততঃ এটা রাজশক্তির সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক আদব ছিল। ইসলামে বরং মুয়ানাকার এবং মুসাফাহার বিধান এসেছে। যাতে পরস্পরের উভয় হাত ধরে বলতে হবে- ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়ালাকুম।

 

৬। যদি কোনো ব্যক্তি বধিরকে সালাম দেয়, তখন মুখে বলবে এবং হাতে ইশারা করবে। আর বোবা ব্যক্তির সালাম দেয়া ও উত্তর দেয়া উভয়টি ইশারা দ্বারা হবে। কারণ, তার ইশারা কথার স্থলাভিষিক্ত। আর নারীদের সালাম দেয়া পুরুষদের পরস্পরের সালামের মতই- কোনো পার্থক্য নাই।

 

৭। একজন পুরুষ অপর পুরুষের সাথে মুসাফাহা করা মুস্তাহাব, অনুরূপভাবে একজন নারী অপর নারীর সাথে মুসাফাহা করা মুস্তাহাব।

প্রমাণ:

আবু খাত্তাব, ক্বাতাদা রহেমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন,

 قلت لأنس: أكانت المصافحة في أصحاب رسول الله e قال: نعم

আমি আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর যুগে মুসাফাহা করার প্রচলন ছিল কিনা? উত্তরে তিনি বলেন, হ্যাঁ, ছিল। বর্ণনায় বুখারিঃ ৬২৬৩

 

বারা ইব্‌ন আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেন,

«ما من مسلمين يلتقيان فيتصافحان إلا غفر لهما قبل أن يفترقا» رواه أبو داود.

যখন দুইজন মুসলিম একত্র হবে এবং একে অপরের সাথে মুসাফাহা করে তখন তারা উভয় বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বে আল্লাহ্ তাআলা তাদের উভয়কে ক্ষমা করে দেন। বর্ণনায় আবু-দাউদ

 

৮। যখন তুমি এমন কোনো একদল লোকের মজলিসে প্রবেশ করবে যেখানে ওলামাগণও উপস্থিত আছে, তখন প্রথমে তাদের সবাইকে সালাম দেবে, তারপর আলেমদের আলাদাভাবে সালাম দেবে; যাতে সাধারণ মানুষ ও আলেমদের মধ্যে পার্থক্য বুঝা যায়। অনুরূপভাবে যদি মজলিসে একজন আলেম থাকে তাকেও আলাদাভাবে সালাম দেবে।

 

সালাম দেয়ার সময় মাথা ঝুঁকানো সম্পূর্ণ অবৈধ, তবে কোলাকুলি করা বৈধ।

প্রমাণ:

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ الرَّجُلُ مِنَّا يَلْقَى أَخَاهُ أَوْ صَدِيقَهُ أَيَنْحَنِي لَهُ؟ قَالَ: لاَ، قَالَ: أَفَيَلْتَزِمُهُ وَيُقَبِّلُهُ؟ قَالَ: لاَ، قَالَ: أَفَيَأْخُذُ بِيَدِهِ وَيُصَافِحُهُ؟ قَالَ: نَعَمْ.

هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ.

এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্য হতে কোন লোক তার অপর ভাই অথবা বন্ধুর সাথে সাক্ষাত করলে, সে কি তার সম্মানে মাথা নিচু করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামনা, তারপর সে বলল, তাকে জড়িয়ে ধরবে কিনা এবং চুমু দেবে কিনা? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন, না, তারপর আবার জিজ্ঞাসা করা হল, তার হাত ধরে তার সাথে মুসাফাহা করবে কিনা? বলল, হ্যাঁ। বর্ণনায় তিরমিযীঃ 2728 এবং তিনি বলেন, হাদিসটি হাসান সহীহ।

 

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قَدِمَ زَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ الْمَدِينَةَ وَرَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَيْتِي فَأَتَاهُ فَقَرَعَ البَابَ، فَقَامَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عُرْيَانًا يَجُرُّ ثَوْبَهُ، وَاللَّهِ مَا رَأَيْتُهُ عُرْيَانًا قَبْلَهُ وَلاَ بَعْدَهُ، فَاعْتَنَقَهُ وَقَبَّلَهُ.

যায়েদ ইব্‌ন হারেসা মদিনায় আগমন করল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামআমার ঘরে ছিল, সে আমার বাড়ীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর নিকট এসে দরজায় আওয়াজ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামতার দিকে উঠে দাঁড়াল, তারপর তার সাথে মুআনাকা করল এবং তাকে চুমু দিল। বর্ণনায় তিরমিযীঃ 2732 এবং তিনি বলেন, হাদিসটি হাসান।

 

আর যখন ঘরে প্রবেশ করবে, তখন সালাম দেয়া সুন্নত। আল্লাহ্ তাআলা বলেন,

 

فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً ﴿النور: ٦١﴾

তবে তোমরা যখন কোন ঘরে প্রবেশ করবে তখন তোমরা নিজদের উপর সালাম করবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতপূর্ণ ও পবিত্র অভিবাদনস্বরূপ। [সূরা নূর, আয়াত: ৬১]

 

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,

يَا بُنَيَّ إِذَا دَخَلْتَ عَلَى أَهْلِكَ فَسَلِّمْ يَكُونُ بَرَكَةً عَلَيْكَ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتِكَ.هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ.

হে বৎস! তুমি যখন ঘরে প্রবেশ করবে, তখন সালাম দাও। তা তোমার জন্য ও তোমার পরিবার পরিজনের জন্য বরকত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বর্ণনায় তিরমিযীঃ 2698 এবং তিনি বলেন, হাদিসটি হাসান।

 

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,

عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِذَا خَرَجَ الرَّجُلُ مِنْ بَيْتِهِ فَقَالَ: بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ يُقَالُ لَهُ حِينَئِذٍ هُدِيتَ وَكُفِيتَ وَوُقِيتَ فَيَتَنَحَّى لَهُ الشَّيْطَانُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وروى التِّرْمِذِيّ إِلى قَوْله: «الشَّيْطَان»

যখন কোন ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এ দোআ পাঠ করে, بسم الله توكلت على الله لا حول ولا قوة إلا بالله তাকে বলা হয়, তোমাকে হেদায়েত দেয়া হয়েছে, তোমাকে বাঁচানো হয়েছে। আর শয়তান তার থেকে দূর হয়ে যায়। বর্ণনায় তিরমিযীঃ 5095, তিনি হাদিসটিকে হাসান আখ্যায়িত করেন, নাসায়ী ও ইবনে হিব্বান; তার সহীহতে।

 

সূনানে আবু দাউদে আবু মালেক আল-আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহুহতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,

 

«إذا ولج الرجل بيته فليقل: اللهم إني أسألك خير المولج وخير المخرج بسم الله ولجنا وبسم الله خرجنا وعلى الله ربنا توكلنا ثم ليسلم على أهله» حديث حسن.

عَنْ أَبِي مَالِكٍ الْأَشْعَرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِذَا وَلَجَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ فَلْيَقُلْ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ الْمَوْلِجِ وَخَيْرَ الْمَخْرَجِ بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا ثُمَّ لْيُسَلِّمْ عَلَى أَهْلِهِ ". رَوَاهُ أَبُو دَاوُد

যখন কোন ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করে, সে যেন এ দোআ পাঠ করে। «اللهم إني أسألك خير المولج وخير المخرج بسم الله ولجنا وبسم الله خرجنا وعلى الله ربنا توكلنا»

হে আল্লাহ! তোমার নিকট উত্তম বাসস্থান চাই এবং উত্তম বের হওয়া চাই। হে আল্লাহ! আমরা আল্লাহর নামে প্রবেশ করলাম এবং আল্লাহর নামে বের হলাম। হে আমাদের রব আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করলাম। তারপর সে তার পরিবার-পরিজনকে সালাম দেবে

 

উপসংহার

সালামকে যদি আমরা এভাবে আমাদের সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারিএবং যদি সালামের মর্ম আমরা আমাদের জীবনে ধারণ করতে পারিতাহলে একদিকে যেমন আমাদের পরকালীন পুঁজি বৃদ্ধি পাবেতেমনি সমাজে বয়ে যাবে আন্তরিকতা আর সম্প্রীতির হাওয়া। আমাদের পার্থিব জীবনও হয়ে ওঠবে শান্তি ও কল্যাণময়।

সালাম দেয়া সুন্নত এবং সালামের জবাবে ওয়া আলাইকুমুস সালাম বলা ওয়াজিব। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সালাম এক অন্যতম অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। 

 

No comments:

Post a Comment