Tuesday, September 29, 2020

ইসলামে খেলাধুলা ও বিনোদন

ইসলামে খেলাধুলা ও বিনোদন

 

১।        ভূমিকা। 

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্হা ইসলামের প্রতিটি বিধিবিধান সর্বাধুনিক বাস্তব সম্মত মানবজীবনের সকল দিকের সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা ইসলামে বিদ্যমান রয়েছে ভারসাম্যহীন, অদুরদর্শী মানব কল্যান বিরোধী কোনো বিধি বিধান ইসলাম সমর্থন করেনা খেলা-ধূলা বিনোদনের মত মানুষের প্রকৃতি স্বভাবগত চাহিদার প্রতি ইসলামের একটি নীতি বা আদর্শ রয়েছে কেননা আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এভাবে যে পানাহার যেমন তার দেহের চাহিদা মেটায়, তেমনি খেলাধূলা, আনন্দ-বিনোদন ক্রীড়া-কৌতুক ইত্যাদি তার মনের চাহিদা মেটায়

 

২।        বিনোদন অর্থ 

আমোদ-প্রমোদ, আনন্দ-ফূর্তি খেলাধূলা, খোশগল্প এবং আনন্দ-ফূর্তি এগুলো মানব জীবনের অতি স্বাভাবিক চাহিদা কেননা মানুষ সব সময় একই অবস্হায় থাকতে পারে না দীর্ঘক্ষণ ধরে কঠিন কাজে নিয়োজিত থাকার পর কিছু বিরতির প্রয়োজন হয় আমোদ প্রমোদের মাধ্যমে চিত্তবিনোদনের দরকার হয় আর এতে দেহ- মনের ক্লান্তি- অবসাদ দূরীভূত হয় ক্ষণিকের বিরতির পর দেহ পুনরায় পুরোদ্দমে কাজের জন্য প্রস্তুত হয় নিম্নে‘‘ইসলামে খেলাধূলা বিনোদন’’ বিষয়টির উপর আলোকপাত করা হলো

 

        ইসলামে খেলাধূলা চিত্তবিনোদন 

ইসলামে খেলাধূলা চিত্তবিনোদনের অনুমোদন রয়েছে তবে ঢালাও ভাবে পাইকারী হারে এজাতীয় সবক্ষেত্রে অনুমোদন দেয়া হয়নি নবী (সাঃ) ওসাহাবায়েকেরা মহাসি- ঠাট্রা- মশকরা করতেন খেলা তামাশায় যোগ দিতেন মনকে আনন্দদান করতেন, হৃদয় প্রশান্তি সুখানুভূতির ব্যবস্হা করতেন এবং এর মাধ্যমে নবোদ্দমে কর্মক্ষমতা নিয়ে তাজা হয়ে কাজে ঝাপিয়ে পড়তেন হযরত আলী (রাঃ) বলেছেনঃ

 

অর্থাৎ দেহের ন্যায় মন ক্লান্ত- শ্রান্ত হয়ে পড়ে কাজেই ক্লান্তি শ্রান্তি দূর করার জন্য আশ্চার্য বুদ্ধিমানের কথা বার্তা বল (ইসঃ হালাল হারামের বিধান-পৃঃ৩৯৭) তিনি আর বলেছেনঃ

 

অর্থাৎ হৃদয়কে সময় অবসর মতো শান্তি-সুখ আনন্দ দান কর কেননা হৃদয় অস্বস্তিতাকে অন্ধ বা নিয়ে দেয় (সূত্র-) একবার ঈদের দিনে কয়েকজন হাবশীবালক ঢাল নেজা নিয়ে খেলা করার সময় রাসূল (সঃ) কেদে সংকোচবোধ করায় তিনি তাদের কে লক্ষ্য করে বললেনঃ

 

অর্থাৎতোমরা খেলাধূলা কর, কারণ তোমাদের দ্বীনে কঠোরতা প্রকাশ পাক এটা আমি পছন্দ করিনা (ইসঃ খেলাধূলা চিত্তবিনোদন পৃঃ১৭) আরেকবার ঈদের দিনে কিছু সংখ্যক কিশোরী খেলাধূলা করলে হযরত আবূবকর (রাঃ) তাদেরকে বাধা দিতে চাইলে রাসূল (সাঃ) বললেন

 

অর্থাৎ আবু বকর ওদের ছেড়ে দাও এগুলোতো ঈদের দিন যাতে ইহুদীরা অনুধাবন করতে পারে যে, আমাদের দ্বীনে উদারতা আছে কারণ আমাকে এরূপশরীয়ত দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে চরম শিথিল পন্থাতে মুক্ত ও সহজতর (কোন যুল উম্মাল-১৪/২১৪)

 

হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ রাসূল (সঃ) যখন কোন সাহাবীকে পেরেশান দেখতেন, তখন কৌতুক করে তার মনে আনন্দদান করতেন (মিরকাত-/২১৮)

 

        ইসলাম অনুমোদিত বৈধ খেলাধূলা

রাসূল (সঃ) বলেন, ‘শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট দূর্বল মুমিন অপেক্ষা অধিক প্রিয় (মুসলিম)  তাই যে সব খেলাধূলা মনে আনন্দ সৃষ্টি করে, শরীরে শক্তিবৃদ্ধি এবং যুদ্ধের প্রশিক্ষণ লাভে সহায়তা করে, এধরনের খেলা শরীয়তে জায়েজ এগুলো হচ্ছে-

 

        দৌড় প্রতিযোগিতা               

সাহাবায়েকেরাম এটা করেছেন নবী করীম (সঃ) তা করার জন্য তাদের অনুমতি দিয়েছেন হযরত আলী (রাঃ) দৌড়ে খুব দ্রুত গতি সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন (ইসঃহাঃ আরামের বিধান- পৃঃ৩৯৮)

 

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আয়েশা (রাঃ) এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন আয়েশা (রাঃ) বলেন-

 

অর্থাৎ নবী করীম (সাঃ) দৌড়ে আমার সাথে প্রতিযোগিতা করলেন তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আগে পৌঁছেগেলাম পরে যখন আমার শরীর মোটা হয়ে গেল তখন আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে আমাকে হারিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ এবার সেবারের বদলা নিলাম (আহমদ, আবূদাউদ)

 

        কুস্তিখেলা      

আবূ দাউদ শরীফে বর্ণিত আছেঃ নবী করীম (সাঃ) ‘রুকানা নামক এক জন নাম করা বলিষ্ঠ কুস্তিগীরের সাথে লড়ে ছিলেন তাকে তিনি পরপর তিনবার মাটিতে আছাড় দিয়ে ফেলেছিলেন

ফিকাহবিদগণ হাদীসের ভিত্তিতে মত দিয়েছেন যে, দৌড়ে প্রতিযোগিতা সম্পূর্ণ জায়েজ পুরুষরা একসাথে এদৌড় দিতে পারে পুরুষ মুহরিম মেয়েরা যৌথভাবে কিংবা স্বামী স্ত্রী একত্রে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে

 

        তীরনিক্ষেপ   

তীর নিক্ষেপ খেলা শরীয়াত সম্মত এমনি ভাবে হাতিয়ারসহ প্রত্যেক প্রকারের নিক্ষেপমূলক খেলা বৈধ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন ‘’তোমাদের জন্য তীরন্দীযী শিক্ষা করা কর্তব্য কেননা এটা তোমাদের জন্য একটি উত্তম খেলা’’ (ফিকহু সুন্নাহ ২য় খন্ড পৃঃ৬)

 

রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন আয়াতটি পড়েন, তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সাধ্যমত শক্তি সঞ্চয় কর তখন বলেন, ‘শক্তি হলো তীর নিক্ষেপ’ ‘শক্তি হলো তীর নিক্ষেপ শক্তি হলো তীর নিক্ষেপ (মুসলিম)

 

নবী করীম (সঃ) যখন সাহাবায়েকিমারমকে তীর নিক্ষেপন মশগুল দেখতে পেতেন, তখন তিনি তাদেরকে সর্বতোভাবে উৎসাহিত করতেন বলতেনঃ

 

অর্থাৎতোমরা তীর মারো আমি তোমাদের সঙ্গে রয়েছি (বুখারী)

 

বুখারীও মুসলিম শরিফে বর্ণিত নবী (সাঃ) ইথিওপিয়ার নিগ্রোলোকদেরকে মসজিদে নববীতে যুদ্ধাস্ত্রের খেলা এবং নিজ স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) কেতাদের খেলা দেখার অনুমতি দেন তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, হেইথিও পিয়ারবাসী! তোমরা খেল যখন তারা নবী (সঃ) এর কাছে সমরাস্ত্রের মহড়া দিচ্ছিল তখন ওমর (রাঃ)  আসেন এবং তাদের প্রতি কংকর নিক্ষেপ করেন নবী (সঃ) বলেন, হে ওমার, তাদেরকে খেলতে দাও মসজিদে এজাতীয় সামরিক মহড়ার অনুমতি দিয়ে নবী (সঃ) প্রমান করলেন, ইসলাম ইবাদত জেহাদের প্রস্তুতির সমন্বয়

 

তবে জীবন্ত প্রাণী পশুপাখিকে তীরের টার্গেট বানানো যাবে না একবার হযতর আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) একদল লোককে পশু টার্গেট করে তীর নিক্ষেপ করতে দেখে বলেন, “নবী (সাঃ) প্রাণীকে টার্গেট কারীর উপর অভিশাপ দিয়েছেন (বোখারীওমুসলিম)

নবী কারীম (সাঃ) পশুর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন দৃষ্টিকোন থেকে বলা যায়, আজকাল যে ষাঁড় প্রতিযোগীতা হয়, তাওহারাম (আবূদাউদ,তিরমিযী)

 

        বর্শাচালানো 

তীর নিক্ষেপের ন্যায় বর্শা চালানো এক প্রকার বৈধ খেলা মহানবী (সঃ) মসজিদে নববীতে হাবশীদের খেলার অনুমতি দিয়েছেন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)বলেন: “ঈদের দিন হাবশীরা বর্শা ঢালের খেলা খেলত, সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট আরজ করলাম অথবা তিনি নিজেই বলেলন, তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম হ্যাঁএরপর তিনি আমাকে তাঁর পেছনে এমন ভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন যে, আমার গাল ছিল তাঁর গালের পাশে তিনি তাদের বলছিলেন, চালিয়ে যাও হে বনুআরফিদা (হাবশীদের উপাধী) পরিশেষে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, কিতোমার (দেখা) হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ তিনি বললেন, তাহলে চলে যাও“ (বুখারী, ১ম খন্ড পৃঃ-১৩১) হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা আইনী (রঃ) বলেন, হাদীস থেকে বুঝা যায়, যুদ্ধের অস্ত্রাদি দ্বারা প্রশিক্ষণ লাভের উদ্দেশ্যে খেলা করা বৈধ

 

        ঘৌড়াদৌড়   

ঘৌড়াদৌড় একটি কল্যাণমূলক কাজ ঘোড়া, খচ্ছর, উট গাধা প্রভৃতি জন্তুর উপর সাওয়ার হওয়া এবং প্রতিযোগিতামূলক খেলা করা বৈধ রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ অর্থাৎ ঘোড়ার কপাল কল্যাণে আবদ্ধ (বুখারী) নবী করীম (সঃ) আরো বলেনঃ

 

অর্থাৎআল্লাহর যিকর বিহীন সকল কিছুখেলা-তামাশা উদাসীনতা তবে চারটিজি নিস এর ব্যতিক্রমঃ

 

        দুটো লক্ষ্য বস্তুর মধ্যে টার্গেট করে ব্যক্তির চলা

        ঘোড়া চালানো শিক্ষা দেওয়া

        স্ত্রীর সাথে হাসি-ঠাট্রা করা

        সাঁতার শেখা (তাবরানী)

 

নবী (সঃ) আরো বলেছেনঃ

 

অর্থাৎঘোড়া অথবা তীর নিক্ষেপ অথবা উটের প্রতিযোগিতা ব্যতীত অন্য কোন প্রতিযোগিতা নেই (তিরমিযী,আবূদাউদ, নাসাঈ)

 

হযরত উমর (রাঃ) বলেছেনঃ

 

অর্থাৎতোমাদের সন্তানদের সাঁতারকাটা তীর নিক্ষেপণ শিক্ষা দাও ঘোড়ার পিঠে লম্ফ দিয়ে উঠে শত্রু হয়ে বসতে তাদের অভ্যস্তকর (মুসলিম)

 

হযরত ইবনে উমর (রাঃ) বলেছেনঃ নবী করীম (সঃ) ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছেন যে ঘোড়াটি জয়ী হয়েছে সে প্রতিযোগিতার জন্য পুরস্কারও দিয়েছেন

 

তবে যেসব ঘোড়া জুয়া খেলায় ব্যবহৃত হয় রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে শয়তানী ঘোড়া বলেছেন তার মূল্য গ্রহণ, তাকে ঘাস খাওয়ানো এবং তার পিঠে সারওয়ার হওয়াকে গুনাহ বলেছেন (ইসলামে হালাল হারামের বিধান, পৃষ্ঠা ৪০৩, আহমদ)

 

        শিকারকরা   

শিকার এক ধরনের খেলা এটি একটি উপকারী আনন্দদায়ক খেলা এতে যেমন সামগ্রী মেলে উপার্জন হয়, তেমনি তা ব্যায়াম চর্চা বটে শিকার তীর বল্লম, বন্ধুক, শিকারী কুকুর বা পাখি দ্বারা করা যেতে পারে তবে ইহরাম অবস্হায় হারাম শরীফে শিকার করা জায়েজ নেই

 

        প্রচলিত আরো কিছু খেলাধূলা এর বিধান

 

        তাশ, পাশা, ছক্কা পাঞ্জা চৌদ্দগুটি  

যে খেলায় জুয়া থাকে তা সবই হারাম আর যে খেলায় কোন আর্থিক লাভ বা লোকসান হয়ে থাকে, তাই জুয়া এসব খেলার সাথে জুয়া মিশ্রিত হলে তা সর্ব সম্মতভাবে হারাম আর জুয়া মিশ্রিত না হলে কারো মতে হারাম, আর কারো মতে মাকরুহ যারা হারাম বলেন, তাদের দলিল হচ্ছে রাসূ (সঃ) এর হাদীস তিনি বলেছেন-

 

অর্থাৎ যে লোক পাশা ছক্কা খেলা (বড় টেবিলে গুটি গুটি সদৃশ উপকরণ দিয়ে খেলা) খেলেছে, সে যেন তার হাতকে শুকরের রক্ত মাংসে রঞ্জিত করে(মুসলিম, আবূদাউদ, আহমদ)

 

আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত নবী (সাঃ) বলেছেনঃ

 

অর্থাৎ যে লোক পাশা ছক্কা খেলা খেলেছে, সে আল্লাহ তাঁর রাসূলের নাফরমানী করেছে (আবূ দাউদ, ইবনুমাজাহ, আহমদ) যদি টাকা পয়সার হারজিত শর্ত থাকে তাহলে এসব খেলা হারাম এরূপ শর্ত না থাকলে তাতে কোন ধর্মগত বা স্বাস্হ্য গত উপকারীতা না থাকায় তা মাকরূহ (আহকামে যিন্দেগী, পৃঃ৬১১)

 

        দাবা খেলা  

আরবীতে একে বলা হয় শতরঞ্জ খেলা সম্পর্কে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয় হযরত ইবনে উমর (রাঃ) বলেছেনঃ

 

অর্থাৎদাবা খেলা পাশা-ছক্কা খেলার চেয়ে খারাপ

 

আর হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন-

 

অর্থাৎএই খেলা এক প্রকার জুয়াই (ইসলামে হালাল হারামের বিধান পৃঃ৪০৬)

 

আহকামে যিন্দগীনামক গ্রন্হের ৬১১ পৃঃ লিপিবদ্ধ রয়েছে ‘’ জাতীয় খেলা হারাম কেননা এসবে অনেকক্ষেত্রেই টাকা পয়সার বাজি ধরা হয়ে থাকে, ফলে তা জুয়ার অন্তভুক্ত আর বাজি ধরা না হলে অনর্থক বিধায়তা নিষিদ্ধ’’

 

তবে কোন কোন সাহাবী তাবেরীর মতে- খেলা মুবাহ তথা নির্দোষ জায়েজ কারণ তাতে যথেষ্ট মানসিক চর্চা চিন্তার প্রশিক্ষণ ব্যবস্হা রয়েছে হযরত ইবনে আব্বাস, আবুহুরায়রা, ইবনে সিরীন, হিশাম ইবনে ওরওয়া, প্রমুখগণ মত প্রকাশ করেছেন তবে তারা পর্যায়ে তিনটি শর্ত আরোপ করেছেনঃ

           

        এতে যেন নামাজের বিলম্বনা হয়

        তাতে জুয়া থাকতে পারবে না

        খেলোয়াড়রা খেলার সময় তাদের মুখকে গালি-গালাজ অশ্লীল কথা-বার্তা থেকে বিরত রাখবে আর এসব শর্ত লংঘিত হলে সে খেলা হারাম

 

        ফুটবল ক্রিকেট                  

খেলা শরীরের ব্যায়ামের উদ্দেশ্যে খেললে জায়েজ, যদি সতর খোলানা হয়, অতিরিক্ত সময় বা পয়সা নষ্ট না হয়, যদি নামায ইত্যাদি জরুরী কাজকর্ম ইবাদত নষ্ট না হয় খেলাতে টাকা পয়সার হারজিত শর্ত থাকলে তা নিষিদ্ধ তবে উল্লখ্য যে, যদি শুধু একদিক থেকে পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়, যেমন যে ব্যক্তি নিদিষ্ট কোন কাজ করবে তাকে পুরস্কার দেয়া হবে আর জন্য যদি চাঁদা নেয়া না হয় তাহলে তাতে কোন দোষ নেই আর ক্রিকেট বা ফুটবল খেলায় শারীরিক ক্ষতি বা অঙ্গ হানির আশংকা থাকলে তা নাজায়েজ (আহকামে জিন্দেগী, পৃষ্ঠা৬১২)

 

        কেরাম বোর্ড, ফ্লাস                

ধরনের খেলায় বাজি করা হলে হারাম, অন্যথায় মাকরুহ (আহকামে জিন্দেগী পৃষ্ঠা৬১২)

 

        অন্যান্য আনন্দ বিনোদন তার বিধান      

খেলাধূলার বাইরে আর কিছু বিনোদনমূলক ব্যবস্হা রয়েছে যেমনঃ

 

        কৌতুক রসিকতা                  

ইসলামে কৌতুক রসিকতা জায়েজ যদি তা সত্য হয় এবং মিথ্যার আশ্রয়-প্রশ্রয় না থাকে হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেনঃ

 

সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা কৌতুক করেন? তখন তিনি বললেন, আমি সত্য ছাড়া কিছুই বলিনা (দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম পৃষ্ঠা৬৪৩)

 

মহানবী (সঃ) বলেনঃ

 

অর্থাৎ ধ্বংসতার যে লোকদের হাসাবার জন্য মিথ্যা কথা বলে তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস (তিরমিযী)

 

ইমাম বাগাবী (রঃ) তার সনদে বর্ণনা করেনঃ এক বৃদ্ধা মহিলা নবী করীম (সাঃ) এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে জান্নাতে দাখিল করেন তখন নবী করীম (সাঃ) বললেন হে বৃদ্ধা মহিলা বৃদ্ধাতো জান্নাতে যাবে না একথা শুনে বৃদ্ধা কাঁদতে কাদঁতে ফিরে যেতে লাগলেন নবী করীম (সাঃ) বৃদ্ধার অবস্থা দেখে সাহাবীদেরকে বললেন তাকে জানিয়ে দাও, কেউ বৃদ্ধা অবস্হায় জান্নাতে যাবে না কুরআন মাজীদে ইরশাদহয়েছে-

 

إِنَّا أَنشَأْنَاهُنَّ إِنشَاء -فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا-

 

অর্থাৎ ‘’আমি জান্নাতীমনীগণকে বিশেষ রূপে সৃষ্টি করব আমি তাদেরকে কুমারী বা নিয়ে দেব’’ (সূরা ওয়াকেয়াহ-৩৫-৩৬)

হাদিস থেকে বুঝা যায়, শরীয়তের আওতায় থেকে কৌতুক রসিকতায় কোন দোষ নেই

 

হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ

 

অর্থাৎ রাসূল (সাঃ) আমাদের সাথে মিশতেন এমনকি তিনি আমার এক ছোট্ট ভাইকে বলতেন, হে আবূ উমায়ের তোমার নুগায়র (চড়ুই-এর অনুরূপ লাল ঠোঁট বিশিষ্ট) পাখি কি করেছে? (তিরমিযী )

 

উল্লেখ্য, পাখিটা মরে যাওয়ায় আবূ উমায়ের কে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল, তাই নবীজী মজা করে তাকে একথা বলেছিলেন হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, ছোট বালক কে খেলার জন্য পাখি দেওয়া যায়

 

হযরত আনাস (রাঃ) মহানবী (সঃ) এর কৌতুক সম্পর্কিত আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেন এভাবেঃ ‘’কোন এক ব্যক্তি রাসূল (সঃ) এর নিকট এসে এক টিসা ওয়ারীর জন্তু চান তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, একটি উটনীর বাচ্চা তোমাকে দেব তখন ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমি উটনীর বাচ্চা দিয়ে কী করব? রাসূল (সঃ) বললেন উটকে কি উটনী ছাড়া আর কেউ জন্ম দিতে পারে? (অর্থাৎ, উট যত বড় হোক সে তো কোনো উটনীরই বাচ্চা (শামাইলে তিরমিযী পৃষ্ঠা১৬)

 

ইমাম গাযালী (রঃ) বলেন, যে হাসি-ঠাট্টা বা কৌতুকে অশ্লীলতা নেই তা হালাল তবে অধিক মাত্রায় কৌতুক করা এবং সব সময় তাতে নিয়োজিত থাকা নিষিদ্ধ কারণ অধিক মাত্রার কৌতুক অধিক হাসি-ঠাট্টার উদ্রেক ঘটায় আর অধিক হাসি অন্তর থেকে আল্লাহর স্মরণ ভয় ভীতি দূর করে দেয় আর আল্লাহ বলেছেনঃ

 

فَلْيَضْحَكُواْ قَلِيلاً وَلْيَبْكُواْ كَثِيرًا جَزَاء بِمَا كَانُواْ يَكْسِبُونَ

 

অর্থাৎ অতএব তাদের উচিত কর্ম হাসা এবং বেশি কান্না করা (সূরা আত তাওবা-৮২)

 

        গান বাজনা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান   

যে কাজে সাধারণতঃ মানুষের মন আকৃষ্ট হয়, অন্তর পরিতৃপ্তি প্রশান্তি লাভ করে এবং কর্ণ কুহরে মধু বর্ষিত হয় তা হচ্ছে গান বা সঙ্গীত আর ধরনের অনুষ্ঠানকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলে

 

ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিকোণ হচ্ছে নির্লজ্জতা, কুৎসিত অশ্লীল ভাষা কিং বা পাপ কাজে উৎসাহ উত্তেজনা দানের সংমিশ্রণ না থাকলে তা মুবাহ বা নির্দোষ অনুরূপ যৌন আবেগ উত্তেজনাকর বাদ্য যন্ত্র সংমিশ্রণ না হলে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারে কোন দোষ নেই

 

আনন্দ উৎসব ক্ষেত্রে খুশী সন্তোষ প্রকাশের জন্যে এসব জিনিস শুধু জায়েজই নয়, পছন্দনীয় বটে যেমন ঈদ, বিয়ে, ওলীমা, আকীকা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে এসবের আয়োজন করা যেতে পারে দ্বিধাহীন চিত্তে

 

হযরত আয়েশা (রঃ) বলেছেন, আনসার গোত্রের এক ব্যক্তির সাথে একটি মেয়ের বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল তখন নবী করীম (সঃ) বললেনঃ হে আয়েশা ওদের সঙ্গে আনন্দ স্ফূর্তির ব্যবস্হা কিছু নেই? কেননা আনসাররাতো এগুলো বেশ পছন্দ করে (বুখারী)

 

আর এব্যাপারে সকলেই একমত যে, যে গানের সাথে মদ্যপান চরিত্রহীনতার মতো কোন হারাম জিনিসের সংমিশ্রণ হয়, সে গান হারাম বিষয়ে নবী করীম (সঃ) কঠিন আযাবের দুঃসংবাদশু নিয়েছেন তিনি বলেছেনঃ

 

অর্থাৎ আমার উম্মতের কিছু সংখ্যকলোক মদ্যপান করবে এবং তার আসল নামের পরিবর্তে নতুন ভিন্নতর নাম রেখে দিবে তাদের শীর্ষ দেশে বাদ্য বাজানো হবে, গায়িকারা গান গাইবে আল্লাহ জমিনে তাদের ধ্বসে দেবেন এবং তাদের কতিপয় কে বানর শূকর বানিয়ে দেবেন (ইবনে মাজাহ)

 

বিকৃতিটা আকার- আকৃতিতে আসা জরুরী নয় বিবৃতি মন মানসিকতা দৃষ্টি ভঙ্গির দিক দিয়ে হতে পারে অর্থাৎ মানবদেহের মধ্যে বানরের আত্না মানসিকতা এবং শুকরের রূহু বিরাজ করবে অন্য কথায় তারা আকৃতিতে থাকবে মানুষের মতই কিন্তু প্রকৃতিতে বানর শূকর

 

        সিনেমা, নাটক, বাইস্কোপ ছবি দেখা

সিনেমা থিয়েটার, নাটক, ছায়াছবি প্রভৃতি চিত্তবিনোদনের বড় মাধ্যম এবং শিক্ষার অন্যতম উপাদানতা অস্বীকার করা যায় না সাথে সাথে এটাও বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, আজকাল সিনেমা, নাটক এবং জাতীয় সব কিছু বেহায়াপনা বেলেল্লাপনা ওচরিত্র নষ্টের মাধ্যম এসব ইজ্জত সম্মান হানি যৌন প্রবৃত্তির ব্যবসা কামাই রোজগারের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে এগুলোই হুদী অমুসলিমদের চিন্তা চরিত্রের ফসল যারা ইসলাম মুসলমানদের বিরাট ঈমানী ক্ষতির গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেএসবের মাঝে রয়েছে গায়রে মুহাররম নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ঢলাঢলি, ফালাফালি-যা ইসলামের অনুপম আদর্শ কোনভাবেই সমর্থন করে না প্রিয় নবী (সাঃ) ইরশাদ করেছেন

 

অর্থাৎতোমাদের কারো মস্তকে সুঁচ বিদ্ধ হওয়া কোন বেগানা নারীর স্পর্শ হওয়ার তুলনায় অনেক উত্তম (বায়াহাকী, তিবরানী)

 

আরো উল্লেখ্য যে, এগুলোতে নিম্নোক্ত পা রয়েছে সময় নষ্ট, সম্পদ নষ্ট, স্বভাব চরিত্র নষ্ট, পর্দা নষ্ট, স্বাস্থ্য নষ্ট, ঈমান আলম নষ্ট তাই যদি নারী চরিত্র অশ্লীলতাবাদ দিয়ে শিক্ষামূলক নাটক, ফিল্ম তৈরী করা হয়, তাহলে তাতে এত গুলো পাপ থাকবেনা শুধু জীবের ছবি তোলার পাপ থাকবে আর সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “যারা ছবি আঁকে বা(তোলে)কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিশাস্তি প্রদান করা হবে, আর বলা হবে তোমরা যা এঁকেছ তাতে জীবন দাকরো” (বুখারী হাঃনং-৭০৩৭)

 

আর তাই জীবের ছবি বাদ দিয়ে যদি সু-শিক্ষামূলক ফিল্ম তৈরী করা হয় তাতে কোন পাপ হবে না (আহকামে জিন্দেগী, পৃঃ-৬০২)


       উপসংহার    

পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম একটি সহজসরল শান্তি পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা ইহার প্রতিটি দিক নির্দেশনার লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহ তার রাসূলের সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে দুনিয়ার কল্যাণ আখেরাতের মুক্তি নিশ্চিত করা তাই বাদত, খেলাধূলা কিংবা বিনোদন সকল ক্ষেত্রেই এতে বাড়াবাড়ি সীমা লংঘনের কোন সুযোগ নেই শরীয়াতের গন্ডির ভিতরে থেকে সবই করা যাবে, আর শরীয়ত লঙ্গিত হলে কোনটারই সুযোগ থাকবে না কারণেথার্থই বলা হয়েছেঃ

 

অর্থাৎ, “বাড়া বাড়িকে আমি এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার সামনে প্রকৃত সত্যমার খেয়ে যাচ্ছে, বিনষ্ট হচ্ছে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

No comments:

Post a Comment