Saturday, September 26, 2020

১০ ই মুহাররমঃ আশুরাঃ আশুরার তাৎপর্য, ফজীলত, করণীয় ও বর্জণীয়।

১০ ই মুহাররমঃ আশুরা

১০ ই মুহাররমঃ আশুরাঃ  আশুরার তাৎপর্য, ফজীলত, করণীয় ও বর্জণীয়।


আশুরার তাৎপর্য, ফজীলত, করণীয় ও বর্জণীয়।


ভূমিকা

মুহাররম একটি মহান বরকতময় মাস। হিজরী সনের প্রথম মাস। এটি “আশহুরে হুরুম” তথা হারামকৃত মাস চতুষ্টয়ের অন্যতম। ইসলামী শরী‘য়াতে এ সব মাসে সকল প্রকার পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত থাকতে ও অধিক নেক আমল করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। হাদীসে এ চার মাসের মধ্যে মুহাররম মাসকে বিশেষভাবে মর্যাদা প্রদান করে একে আল্লাহর মাস বলে আখ্যায়িত করেছে। সুতরাং “মুহাররম মাসের তাৎপর্য ও আশুরার ফযীলতের” ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আজকের আলোচনা।


দিন, মাস ও বছরের সৃষ্টি। 

এ প্রসংগে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 

وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ آيَتَيْنِ ۖ فَمَحَوْنَا آيَةَ اللَّيْلِ وَجَعَلْنَا آيَةَ النَّهَارِ مُبْصِرَةً لِّتَبْتَغُوا فَضْلًا مِّن رَّبِّكُمْ وَلِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ ۚ وَكُلَّ شَيْءٍ فَصَّلْنَاهُ تَفْصِيلًا ﴿الإسراء: ١٢﴾

“আমি রাত্রি ও দিনকে দু’টি নিদর্শন করেছি। অতঃপর নি®প্রভ করে দিয়েছি রাতের নিদর্শন ও দিনের নিদর্শনকে দেখার উপযোগী করেছি, যাতে তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ কর এবং যাতে তোমরা স্থির করতে পার বছরসমূহের গণনা ও হিসাব এবং আমি সব  বিষয়কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।’’ -সূরা বনী ইসরাঈল ঃ ১২

আল্লাহ তা‘আলা মুহাররম মাস সম্পর্কে বলেন,

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ ۚ ﴿التوبة: ٣٦﴾

“নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও মাসসমূহের গণনায় বারটি, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও পৃথিবী (জমীন) সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত (দ্বীন) বিধান; সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজেদের প্রতি কোন অত্যাচার করো না।’’ -সূরা তাওবা ঃ ৩৬

সাহাবী আবূ বাকরাহ (রাঃ)-এর সূত্রে নবীজী (সাঃ) বলেন, 

عَنْ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: خَطَبَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ النَّحْرِ قَالَ: ্রإِنَّ الزَّمَانَ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ثَلَاثٌ مُتَوَالِيَاتٌ ذُو الْقَعْدَةِ وَذُو الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَগ্ধ (مُتَّفق عَلَيْهِ)

আল্লাহ তা‘আলা যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন, সে দিন থেকে সময় যেরূপ আবর্তিত হচ্ছিল আজও তা সেরূপে আবর্তিত হচ্ছে। বছর হলো বারোটি মাসের সমষ্টি, এর মধ্যে চারটি মাস অতি সম্মানিত। তিনটি পর্যায়ক্রমিক “জিলক্বদ, জিলহজ্জ ও মুহাররম। আর (চতুর্থটি হলো) জুমু‘আদাস সানি ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব-ই-মুযার।’’-বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ২৬৫৯

আশুরার নামকরণ 

মুহররমকে মুহররম বলে অভিহিত করা হয়েছে কারণ এটি অতি সম্মানিত। অর্থাৎ মুহাররামের দশ তারিখকে বলা হয় আশুরা। আশুরা শব্দটি আরবী

‘আশারা’’ শব্দ থেকে উৎপত্তি, এর অর্থ দশম। আল্লাহর বাণী, 

﴿فَلا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ﴾ ﴿التوبة: ٣٦﴾

“তোমরা এতে নিজেদের উপর কোন জুলুম করো না।’’ অর্থাৎ এ সম্মানিত মাস সমূহে তোমরা কোনো অন্যায় করো না। কারণ এ সময়ে সংঘটিত অন্যায় ও অপরাধের পাপ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশিও মারাত্মক।’’ -সূরা তাওবা ঃ ৩৬

কাতাদাহ (রাঃ) অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “মহান আল্লাহ নিজ সৃষ্টি হতে খাঁটি ও উৎকৃষ্টলোক বাছাই করেছেন; ফেরেশতাকুল হতে কতক বিশেষ ফিরিস্তাকে। অনুরূপ মানুষ থেকেও বাছাই করেছেন অনেক রাসূল। কথা-বার্তা হতে বাছাই করেছেন তাঁর জিকিরকে। আর জমিন হতে বাছাই করেছেন মসজিদ সমূহকে। মাসসমূহ থেকে বাছাই করেছেন রমজান ও সম্মানিত মাস চতুষ্টয়কে। দিনসমূহ হতে বাছাই করেছেন জুমু’আর দিনকে আর রাত্রসমূহ থেকে লাইলাতুল কদরকে। সুতরাং আল্লাহ যাদের সম্মানিত করেছেন তোমরা তাদের সম্মান প্রদর্শন কর। আর বুদ্ধিমান লোকদের মতে, প্রতিটি বস্তুকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হয় মূলত: সেসব জিনিসের মাধ্যমে যেসব দ্বারা আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন।’’-তাফসির ইবন কাছীর, -সূরা তাওবা ঃ ৩৬

মুহররম মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোজার ফজীলত 

হাদীসে এসেছে,

َعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রأَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمِ وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِগ্ধ (رَوَاهُ مُسلم)

“আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “রমযানের পর সর্বোত্তম সিয়াম হলো আল্লাহর মাস মুহাররম (মাসের সিয়াম) এবং ফরয ছালাতের পরে সর্বোত্তম ছালাত হ’ল রাতের নফল ছালাত অর্থাৎ তাহাজ্জুদের ছালাত।’’ -মুসলিম ঃ ১৯৮২, মিশকাত ঃ ২০৩৯

আশুরার সিয়ামের (রোযা) ফজীলত

আব্দুল্লাহ্ ইবন আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَحَرَّى صِيَامَ يَوْمٍ فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِهِ إِلَّا هَذَا الْيَوْمَ: يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَهَذَا الشَّهْرُ يَعْنِي شَهْرَ رَمَضَان (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

“আমি নবী করীম (সাঃ) -কে সিয়াম রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখিনি যত দেখেছি এ আশুরার দিন এবং এ মাস অর্থাৎ রমজান মাসের সিয়ামের প্রতি।’’- বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ২০৪০

আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,

وَصِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُগ্ধ (رَوَاهُ مُسلم)

‘আশূরা বা ১০ই মুহাররমের সিয়াম আমি আশা করি আল্লাহর  নিকটে বান্দার বিগত এক বছরের (ছগীরা) গোনাহের কাফফারা হিসাবে গণ্য হবে।’’ - মুসলিম ঃ ১৯৭৬; মিশকাত ঃ ২০৪৪

ইতিহাসে আশুরা বা আশুরার তাৎপর্য 

 আবূ মূসা আশ‘আরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে যে, 

عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: كَانَ أَهْلُ خَيْبَرَ يَصُومُونَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، يَتَّخِذُونَهُ عِيدًا وَيُلْبِسُونَ نِسَاءَهُمْ فِيهِ حُلِيَّهُمْ وَشَارَتَهُمْ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রفَصُومُوهُ أَنْتُمْগ্ধ (مسلم)

‘‘খায়বর অধিবাসীরা (ইহুদীরা) আশূরার দিনকে ঈদের দিন হিসাবে মান্য করত। এ দিন তারা তাদের স্ত্রীদের অলংকার ও উত্তম পোষাকাদি (ব্যাজ) পরিধান করাতো। সুতরাং সে দিন তোমরা রোযা রাখ।’’ -মুসলিম ঃ ১১৩১

আব্দুল্লাহ্ ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ المَدِينَةَ فَرَأَى اليَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ: ্রمَا هَذَا؟গ্ধ، قَالُوا: هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى، قَالَ: ্রفَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْগ্ধ، فَصَامَهُ، وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ (مُتَّفق عَلَيْهِ)

“নবী করিম (সাঃ) যখন মদীনায় হিজরত করে দেখতে পেলেন ইয়াহুদীরা আশুরার দিন সিয়াম পালন করছে। নবীজী (সাঃ) জানতে চাইলেন কেন তারা এ দিনে সিয়াম রাখে? তারা বলল, এটি একটি ভাল দিন। এ দিনে বনী ইসরাঈলকে আল্লাহ তা‘আলা তাদের দুশমনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই মুসা (আঃ) সিয়াম পালন করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, মুসাকে অনুসরণের ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে (আদর্শের) অধিক হকদার। অতঃপর তিনি এ দিনে সিয়াম পালন করেছেন এবং অন্যদেরকে রাখার আদেশ দিয়েছেন।’’-বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ২০৬৭

সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় বলা হয়েছে, { هذا يوم عظيم } “ এটি একটি মহান দিন।”

ইমাম আহমদ সামান্য বর্ধিতাকরে বর্ণনা করেছেন, 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِأُنَاسٍ مِنَ الْيَهُودِ قَدْ صَامُوا يَوْمَ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ: ্রمَا هَذَا مِنَ الصَّوْمِ؟গ্ধ قَالُوا: هَذَا الْيَوْمُ الَّذِي نَجَّى اللَّهُ مُوسَى وَبَنِي إِسْرَائِيلَ مِنَ الْغَرَقِ، وَغَرَّقَ فِيهِ فِرْعَوْنَ، وَهَذَا يَوْمُ اسْتَوَتْ فِيهِ السَّفِينَةُ عَلَى الْجُودِيِّ، فَصَامَ نُوحٌ وَمُوسَى شُكْرًا لِلَّهِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى، وَأَحَقُّ بِصَوْمِ هَذَا الْيَوْمِগ্ধ ، فَأَمَرَ أَصْحَابَهُ بِالصَّوْمِ

“এটি সেই দিন যাতে নূহ (আঃ)-এর কিশতি (নৌকা) জুদি পর্বতে স্থির হয়েছিল, তাই নূহ (আঃ) আল্লাহর  শুকরিয়া আদায়ার্থে সেদিন সিয়াম পালন করেছিলেন।” -আহমদ ঃ ৮৭১৭ 

আশুরার সিয়াম পূর্ব হতেই প্রসিদ্ধ ছিল এমনকি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নুবুওয়্যাত প্রাপ্তির পূর্বে জাহেলী যুগেও আরব সমাজে তার প্রচলন ছিল।

عَنْ عَائِشَةَ رضى الله عنها قَالَتْ كَانَتْ قُرَيْشٌ تَصُومُ عَاشُورَاءَ فِى الْجَاهِلِيَّةِ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَصُومُهُ فَلَمَّا هَاجَرَ إِلَى الْمَدِينَةِ صَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ فَلَمَّا فُرِضَ شَهْرُ رَمَضَانَ قَالَ مَنْ شَاءَ صَامَهُ وَمَنْ شَاءَ تَرَكَهُ * (مسلم)

“আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, জাহেলী যুগে কুরাইশরা আশুরার সিয়াম পালন করত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও এ সিয়াম পালন করতেন। মদীনায় হিজরতের পরেও তিনি এ রোযা পালন করেছেন এবং অন্যদেরকে এ সিয়াম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু (২য় হিজরী সনে) যখন রমদান মাসের সিয়াম ফরয হলো তখন তিনি বললেন, যার ইচ্ছা আশুরার এ সিয়াম রাখবে এবং যার ইচ্ছা ছেড়ে দিবে।’’ -বুখারী ঃ ২০০২; মুসলিম


আশুরার সাথে তাসুআ‘র (১০ ই মুর্হারমের সাথে ৯ অথবা ১১ তারিখে) সিয়াম মুস্তাহাব 

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, 

{حِينَ صَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ". قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ }.(مسلم)

“যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আশুরার সিয়াম রাখলেন এবং (অন্যদেরকে) সিয়াম রাখার নির্দেশ দিলেন। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! এটিতো এমন দিন, যাকে ইহুদী ও নাছারাগণ (বড় জ্ঞান করে) সম্মান জানায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘আগামী বছর (এদিন আসলে) বেঁচে থাকলে ইনশাআল্লাহ আমরা ৯ই মুহাররম সহ সিয়াম রাখব’। রাবী (বর্ণনাকারী)বলেন, কিন্তু পরের বছর মুহাররম আসার আগেই তাঁর ওফাত (মৃত্যু) হয়ে যায়।’’ -মুসলিম ঃ ১১৩৪

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত অন্য এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেন, 

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রصُومُوا يَوْمَ عَاشُورَاءَ , وَخَالِفُوا الْيَهُودَ , صُومُوا قَبْلَهُ يَوْمًا , أَوْ بَعْدَهُ يَوْمًاগ্ধ (صحيح ابن خزيمة)

“তোমরা আশূরার দিন সিয়াম রাখ এবং ইয়াহুদীদের খেলাফ কর। তোমরা আশূরার সাথে তার পূর্বে একদিন বা পরে একদিন সিয়াম পালন কর’।   -সহীহ ইবন খুযাইমা ঃ ২০৯৫

ইমাম শাফেঈ ও তাঁর সাথীবৃন্দ, ইমাম আহমদ, ইমাম ইসহাক প্রমুখ বলেছেন, “আশুরার সিয়ামের ক্ষেত্রে দশম ও নবম উভয় দিনের সিয়াম মুস্তাহাব। কেননা, নবী করীম (সাঃ) দশ তারিখ সিয়াম পালন করেছেন এবং নয় তারিখ সিয়াম পালন করার নিয়ত করেছেন।

আশূরার ছিয়ামের সাথে হুসাইন ইবন আলী (রাঃ)-এর জন্ম বা মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই। হুসাইন (রাঃ)-এর জন্ম মদীনায় ৪র্থ হিজরীতে এবং মৃত্যু ইরাকের ক‚ফা নগরীর নিকটবর্তী কারবালায় ৬১ হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর মৃত্যুর ৫০ বছর পরে হয়।  

মোট কথা মুহাররমের এ সময়ে শুধুমাত্র এক দিন বা দু’দিন নফল সিয়াম ব্যতীত আর কোন ইবাদত বা আনুষ্ঠানিকতার উলে­খ নেই। শাহাদতে হুসাইনের নিয়তে সিয়াম পালন করলে ছওয়াব পাওয়া যাবে না; বরং বিদ‘আত হবে। 

আশুরায় উদযাপিত বিদ‘আত সমূহ 

আশুরায়ে মুহাররম আমাদের দেশে শোকের মাস হিসাবে আগমন করে। শী‘আ, সুন্নী সকলে মিলে অগণিত র্শিক ও বিদ‘আতে লিপ্ত হয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়। আশুরার দিন লোকেরা সুরমা লাগানো, গোসল করা, মেহেদি লাগানো, মুসাফাহা করা, খিচুড়ি রান্না করা, আনন্দ উৎসবসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে থাকে। তারা হুসাইন (রাঃ)-এর কল্পিত কবর তৈরী করে রাস্তায় তা‘যিয়া বা শোক মিছিল করে। ঐ কল্পিত কবরে হুসাইন (রাঃ)-এর রূহ হাযির হয় এ ধারণা পোষণ করে তাকে সালাম করা হয়। তার সামনে মাথা ঝুঁকানো হয়। সেখানে সিজদা করা হয়, মনোবাঞ্ছা পূরণ করার জন্য প্রার্থনা করা হয়। মিথ্যা শোক প্রদর্শন করে বুক চাপড়ানো হয়, বুকের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়। ‘হায় হোসেন’ ‘হায় হোসেন’ ইয়া আলী! বলে মাতম করা হয়। রক্তের নামে লাল রং ছিটানো হয়। রাস্তা-ঘাট বিভিন্ন সাজে সাজানো হয়। লাঠি-তীর-বল−ম নিয়ে যুদ্ধের মহড়া দেওয়া হয়। হোসায়নের নামে কেক ও পাউরুটি বানিয়ে ‘বরকতের পিঠা’ বলে বেশী দামে বিক্রি করা হয়। হুসাইন (রাঃ)-এর নামে ‘মোরগ’ পুকুরে ছুঁড়ে যুবক-যুবতীরা সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঐ ‘বরকতের মোরগ’ ধরার প্রতিযোগীতায় মেতে ওঠে। সুসজ্জিত অশ্বারোহী দল মিছিল করে কারবালা যুদ্ধের মহড়া দেয়। কালো পোশাক পরিধান বা কালো ব্যাজ ধারণ করা হয়।

এমনকি অনেকে শোকের মাস ভেবে এ মাসে বিবাহ-শাদী করা অন্যায় মনে করে থাকেন। ঐ দিন অনেকে পানি পান করা এমনকি শিশুর দুধ পান করানোকেও অন্যায় মনে করেন। উগ্র শী‘আরা কোন কোন ‘ইমাম বাড়া’তে আয়েশা (রাঃ)-এর নামে বেঁধে রাখা একটি বকরীকে লাঠিপেটা করে ও অস্ত্রাঘাতে রক্তাক্ত করে বদলা নেয় ও উল্লাসে ফেটে পড়ে। তাদের ধারণা মতে আয়েশা (রাঃ)-এর পরামর্শক্রমে আবূ বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর অসুখের সময় জামা‘আতে ইমামতি করেছিলেন ও পরে খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে কারণে ‘আলী (রাঃ) খলীফা হ’তে পারেননি (নাঊযুবিল্লাহ)। উমর (রাঃ), ওছমান (রাঃ), মু‘আবিয়া (রাঃ), মুগীরা ইবন শো‘বা (রাঃ) প্রমুখ প্রথম সারির ছাহাবীকে এ সময় বিভিন্নভাবে গালি দেওয়া হয়।

এ ছাড়াও রেডিও-টিভি, পত্র-পত্রিকা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একথা বুঝাতে চেষ্টা করে যে, আশুরায়ে মুহাররমের মূল  বিষয় হ’ল শাহাদাতে হুসাইন (রাঃ) বা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা। এটাকে ‘হক ও বাতিলের’ লড়াই হিসাবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করা হয়। হুসাইন (রাঃ)-কে ‘মা‘ছূম’ (নিস্পাপ) ও ইয়াযীদকে ‘মাল‘ঊন’ (অভিশপ্ত) প্রমাণ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে।


সেখানে আলোচনা করা হয়, হুসাইন (রাঃ) কারবালায় কেন শহীদ হয়েছিলেন, তার শাহাদাতের জন্য কে দায়ী? উত্তরে বলা হয় যে, হুসাইন (রাঃ) অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদে অবর্তীণ হয়েছেন, তিনি ইয়াজীদের জুলুম, দু ঃশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, তিনি রাজতন্ত্র উৎখাত করার এবং গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। এর থেকে বাগধারা পর্যন্ত রটে গেছে,‘‘ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালাকে বা’দ’’ অর্থ্যাৎ কারবালার পর ইসলাম জিন্দা হয়। অথচ কারবালার ঘটনার ৫০ বছর পূর্বেই ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে এবং ওয়াহীর আগমন বন্ধ হয়ে গেছে।  সুতরাং বলা যায় এ ব্যাখ্যাগুলোর একটিও সঠিক নয়। প্রকৃত সত্য এসব থেকে অনেক দূরে। 

আশূরা উপলক্ষ্যে প্রচলিত উপরোক্ত বিদ‘আতী অনুষ্ঠানাদির কোন অস্তিত্ব এবং অশুদ্ধ আক্বীদা সমূহের কোন প্রমাণ ছাহাবায়ে কেরামের যুগে পাওয়া যায় না। আল্লাহ  ব্যতীত কাউকে সিজদা করা যেমন হারাম, তা‘যিয়ার নামে ভুয়া কবর যেয়ারত করাও তেমনি মূর্তিপূজার শামিল।

এতদ্ব্যতীত কোনরূপ শোকগাঁথা বা মর্সিয়া অনুষ্ঠান বা শোক মিছিল ইসলামী শরী‘আতের পরিপন্থী। অনুরূপভাবে সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ হ’ল ছাহাবায়ে কেরামকে গালি দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেন, ‘তোমরা আমার ছাহাবীগণকে গালি দিয়ো না। কেননা (তাঁরা এমন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী যে,) তোমাদের কেউ যদি ওহোদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ অর্থাৎ সিকি ছা‘ বা তার অর্ধেক পরিমাণ (যব খরচ)-এর সমান ছওয়াব পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না’।  অধিকন্তু ঐ সব শোক সভা বা শোক মিছিলে বাড়াবাড়ি করে সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার পার্থক্য মিটিয়ে দিয়ে হুসাইন (রাঃ)-এর কবরে রূহের আগমন কল্পনা করা, সেখানে সিজদা করা, মাথা ঝুঁকানো, প্রার্থনা নিবেদন করা ইত্যাদি পরিস্কারভাবে শিরক।


বিদ‘আতের সূচনা 

আব্বাসীয় খলীফা মুত্বী‘ ইবন মুক্বতাদিরের সময়ে (৩৩৪-৩৬৩হি ঃ/৯৪৬-৯৭৪ খৃ ঃ) তাঁর কট্টর শী‘আ আমীর আহমাদ ইবন বূইয়া দায়লামী ওরফে ‘মুইযযুদ্দৌলা’ ৩৫১ হিজরীর ১৮ই যিলহজ্জ তারিখে বাগদাদে ওছমান (রাঃ)-এর শাহাদত বরণের তারিখকে তাদের হিসাবে খুশীর দিন মনে করে ‘ঈদের দিন’ (عيد غدير خم) হিসাবে ঘোষণা করেন। শী‘আদের নিকটে এ দিনটি পরবর্তীতে ঈদুল আযহার চাইতেও গুরুত্ব পায়। অতঃপর ৩৫২ হিজরীর শুরুতে ১০ই মুহাররমকে তিনি ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করেন এবং সকল দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেন ও মহিলাদেরকে শোকে চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে, রাস্তায় নেমে শোকগাঁথা গেয়ে চলতে বাধ্য করেন। শহর ও গ্রামের সর্বত্র সকলকে শোক মিছিলে যোগদান করতে নির্দেশ দেন। শী‘আরা খুশী মনে এ নির্দেশ পালন করে। কিন্তু সুন্নীরা চুপ হয়ে যান। পরে সুন্নীদের উপরে এ ফরমান জারি করা হলে ৩৫৩ হিজরীতে উভয় দলে ব্যাপক সংঘর্ষ বেধে যায়। ফলে বাগদাদে তীব্র নাগরিক অসন্তোষ ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয়। বলা বাহুল্য বাগদাদের সুন্নী খলীফার শক্তিশালী শী‘আ আমীর মুইয্যুদ্দৌলার চালু করা এ বিদ‘আতী রীতির ফলশ্র“তিতে আজও ইরাক, ইরান, পাকিস্তান ও ভারত সহ বিভিন্ন মুসলিম এলাকায় আশূরার দিন চলছে শী‘আ-সুন্নী পরস্পরে গোলযোগ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। 


হক ও বাতিলের লড়াই

কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা যেকোন নিরপেক্ষ মুমিনের হৃদয়কে ব্যথিত করে। কিন্তু তাই বলে এটাকে হক ও বাতিলের লড়াই বলে আখ্যায়িত করা চলে কি? যদি তাই করতে হয়, তবে হোসায়েন (রাঃ)-কে কূফায় যেতে বারবার নিষেধকারী এবং ইয়াযীদের (২৭-৬৪হিঃ) হাতে আনুগত্যের বায়‘আত গ্রহণকারী বাকী সকল ছাহাবী (রাঃ)-কে আমরা কি বলব? যাঁরা হোসায়েন (রাঃ) নিহত হওয়ার পরেও কোনরূপ প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি। মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর মৃত্যুর পরে ঐ সময়ে জীবিত প্রায় ৬০ জন ছাহাবীসহ তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ পরবর্তী খলীফা হিসাবে ইয়াযীদের হাতে বায়‘আত গ্রহণ করেন। 

হুসাইন (রাঃ) ও আব্দুল্লাহ ইবন যুবায়ের (রাঃ) দু’জনেই মদীনা থেকে মক্কায় চলে যান। সেখানে ক‚ফা থেকে দলে দলে লোক এসে হুসাইন (রাঃ)-কে ক‚ফায় যেয়ে তাদের আনুগত্যের বায়‘আত গ্রহণ করতে অনুরোধ করতে থাকে। ক‚ফার নেতাদের কাছ থেকে ১৫০টি লিখিত অনুরোধ পত্র তাঁর নিকটে পৌঁছে। 

তিনি স্বীয় চাচাতো ভাই মুসলিম ইবন আক্বীল (রাঃ)-কে কূফায় প্রেরণ করেন। সেখানে ১২ থেকে ১৮ হাজার লোক হুসাইন (রাঃ)-এর পক্ষে মুসলিম-এর হাতে আনুগত্যের বায়‘আত গ্রহণ করে। মুসলিম ইবন আক্বীল (রাঃ) সরল মনে হুসাইন (রাঃ)-কে কুফায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে পত্র পাঠান। সেই পত্র পেয়ে হুসাইন (রাঃ) হজ্জের একদিন পূর্বে সপরিবারে মক্কা হ’তে কুফা অভিমুখে রওয়ানা হন। হুসাইন (রাঃ)-এর আগমনের খবর জানতে পেরে কুফার গভর্ণর নু‘মান ইবন বাশীর (রাঃ) জনগণকে ডেকে বিশৃংখলা না ঘটাতে উপদেশ দেন। কোনরূপ কঠোরতা প্রয়োগ করা হ’তে তিনি বিরত থাকেন। ফলে কুচক্রীদের পরামর্শে তিনি পদচ্যুত হন ও বছরার গভর্ণর ওবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদকে একই সাথে কুফার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রথমে মুসলিম ইবন আক্বীলকে গ্রেফতার করে হত্যা করেন। তখন সকল কুফাবাসী হুসাইন (রাঃ)-এর পক্ষ ত্যাগ করে। ইতিমধ্যে হুসাইন (রাঃ) কুফার সন্নিকটে পৌঁছে যান। ইবন যিয়াদ প্রেরিত সেনাপতি তখন তাঁর গতিরোধ করে। সমস্ত ঘটনা বুঝতে পেরে হোসায়েন (রাঃ) তখন ইবন যিয়াদের নিকটে নিম্নোক্ত তিনটি প্রস্তাবের যেকোন একটি মেনে নেওয়ার জন্য সন্ধি প্রস্তাব পাঠান। ১. আমাকে সীমান্তে— কোন এক স্থানে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। ২. মদীনায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। 

৩. আমাকে ইয়াযীদের হাতে হাত রেখে বায়‘আত গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হোক। 

সেনাপতি আমর ইবন সা‘দ ইবন আবী ওয়াককাছ উক্ত প্রস্তাব সমূহ মেনে নিলেও দুষ্টমতি ইবন যিয়াদ তা নাকচ করে দেন ও প্রথমে ইয়াযীদের পক্ষে তার হাতে বায়‘আত করার নির্দেশ পাঠান। হুসাইন (রাঃ) সঙ্গত কারণেই তা প্রত্যাখ্যান করেন ও সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। ফলে তিনি সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজে‘ঊন)।

উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, কারবালার ঘটনাটি ছিল নিতান্তই রাজনৈতিক মতবিরোধের একটি দুঃখজনক পরিণতি। এ মর্মান্তিক ঘটনার জন্য মূলতঃ দায়ী ছিল বিশ্বাসঘাতক কুফাবাসীরা ও নিষ্ঠুর গভর্ণর ওবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ নিজে। কেননা ইয়াযীদ কেবলমাত্র হুসায়নের আনুগত্য চেয়েছিলেন, তাঁর খুন চাননি। হুসাইন (রাঃ) সে আনুগত্য বিষয়েও প্রস্তুত ছিলেন। ইয়াযীদ স্বীয় পিতার অছিয়ত অনুযায়ী হুসাইন (রাঃ)-কে সর্বদা সম্মান করেছেন এবং তখনও করতেন। ইবন কাছীর বলেন, ইতিপূর্বে হুসাইন (রাঃ) আব্দুল−াহ ইবন উমর, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবন যুবায়ের, আবূ আইয়ূব আনছারী (রাঃ) প্রমুখ খ্যাতনামা ২৯ ছাহাবীগণের সাথে ইয়াযীদের সেনাপতিত্বে ৪৯ মতান্তরে ৫১ হিজরীতে রোমকদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের অভিযানেও অংশগ্রহণ করেছেন। 

ইমাম গাযালী (৪৫০-৫০৫ হিঃ) বলেন, ‘হুসাইন (রাঃ)-কে তিনি হত্যা করেননি, হত্যা করার হুকুম দেননি, হত্যা করায় খুশীও হননি। এমনকি ওবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ প্রেরিত সেনাদলের নেতা উমর ইবন সা‘দ সহ বহু সৈন্য হোসায়েন (রাঃ)-কে হত্যার ঘোর বিরোধী ছিলেন। এক পর্যায়ে অন্যতম সেনাধ্যক্ষ কূফার বীর সন্তান হোর ইবন ইয়াযীদ পক্ষ ত্যাগ করে ইবন যিয়াদ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে নিহত হন। অতএব ইবন যিয়াদের কঠোর নির্দেশ ও শিমার ইবন যিল-জাওশান-এর নিষ্ঠুরতাই ছিল এ হত্যাকাণ্ডের জন্য মূলতঃ দায়ী। 

যখন হুসাইন (রাঃ)-এর ছিন্ন মস্তক ইয়াযীদের সামনে রাখা হয়, তখন তিনি কেঁদে উঠে বলেছিলেন, ‘ওবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদের উপরে আল্লাহ পাক লা‘নত করুন! আল্লাহর কসম যদি হুসায়েনের সাথে ওর রক্তের সম্পর্ক থাকত, তাহলে সে কিছুতেই ওঁকে হত্যা করত না’। তিনি আরও বলেন যে, ‘হুসায়েনের খুন ছাড়াও আমি ইরাকীদেরকে আমার আনুগত্যে রাযী করাতে পারতাম’। 

ইয়াযীদ ইবন মু‘আবিয়াহ (রাঃ)-এর চরিত্র সম্পর্কে হুসাইন (রাঃ)-এর অন্যতম বৈমাত্রেয় ছোট ভাই ও শী‘আদের খ্যাতনামা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিইয়াহ (রাঃ) বলেন, ‘আমি তাঁর মধ্যে ঐ সব  বিষয় দেখিনি, যেসবের কথা তোমরা বলছ। অথচ আমি তাঁর নিকটে হাযির থেকেছি ও অবস্থান করেছি এবং তাঁকে নিয়মিতভাবে ছালাতে অভ্যস্ত ও কল্যাণের আকাংখী দেখেছি। তিনি ‘ফিক্বহ’ বিষয়ে আলোচনা করেন এবং তিনি সুন্নাতের অনুসারী’।  


মৃত্যুকালে মু‘আবিয়া (রাঃ) ইয়াযীদকে হুসাইন (রাঃ) সম্পর্কে অছিয়ত করে বলেছিলেন ‘যদি তিনি তোমার বিরুদ্ধে উত্থান করেন ও তুমি তাঁর উপরে বিজয়ী হও, তাহ’লে তুমি তাঁকে ক্ষমা করবে। কেননা তাঁর রয়েছে রক্ত সম্পর্ক, যা অতুলনীয় এবং রয়েছে মহান অধিকার’।  

ইবন আসাকির স্বীয় ‘তারীখে’ ইয়াযীদ-এর মন্দ স্বভাবের বর্ণনায় যে সব উদ্ধৃতি পেশ করেছেন, সে সম্পর্কে ইবন কাছীর বলেন, ‘ইয়াযীদের মন্দ স্বভাব সম্পর্কে ইবন আসাকির বর্ণিত উক্তি সমূহের সবগুলোই জাল। যার একটিও সত্য নয়। 

মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মৃত্যু কালে ইয়াযীদের শেষ কথা ছিল, ‘হে আল্লাহ! আমাকে পাকড়াও করো না ঐ বিষয়ে যা আমি চাইনি এবং আমি প্রতিরোধও করিনি এবং তুমি আমার ও ওবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদের মধ্যে ফায়ছালা কর’। 

ইযায়ীদ স্বীয় আংটিতে খোদাই করেছিলেন, ‘আমি ঈমান এনেছি আল্লাহর  উপরে যিনি মহান’।  


হুসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাতে আহলে সুন্নাতের অবস্থান 

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত হুসাইন (রাঃ)-এর মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু তাতে বাড়াবাড়ি করে শী‘আদের ন্যায় ঐদিনকে শোক দিবস মনে করে না। দুঃখ প্রকাশের ইসলামী রীতি হ’ল ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘ঊন’ পাঠ করা (বাক্বারাহ ১৫৫-৫৬) ও তাঁদের জন্য দু‘আ করা।

বনী ইস্রাঈলের অসংখ্য নবী নিজ কওমের লোকদের হাতে নিহত হয়েছেন। মুসলমানদের প্রাণপ্রিয় খলীফা উমর (রাঃ) মসজিদে নববীতে ফজরের ছালাতরত অবস্থায় মর্মান্তিক ভাবে আহত হয়ে পরে শাহাদাত বরণ করেছেন। ওছমান গণী (রাঃ) ৮৩ বছরের বৃদ্ধ বয়সে নিজ গৃহে কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় পরিবারবর্গের সামনে নিষ্ঠুরভাবে শহীদ হয়েছেন। আলী (রাঃ) ফজরের জামা‘আতে যাওয়ার পথে অতর্কিতে আক্রান্ত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁকে তাঁর হত্যাকারী এবং বিরোধীরা ‘কাফের’ ও ‘আল্লাহর নিকৃষ্টতম সৃষ্টি’ বলতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি।’’ -আল-বিদায়াহ ৭/৩৩৯)। যদিও হোসায়েন (রাঃ)-কে তাঁর হত্যাকারীরা কখনো ‘কাফের’ বলেনি।’’ -বুখারী হা/৩৭৫৩; মিশকাত হা/৬১৩৬ ‘নবী পরিবারের মর্যাদা’ অনুচ্ছেদ।

শী‘আ চক্রান্তের ফাঁদে সুন্নীগণ

শী‘আ লেখকদের অতিরঞ্জিত লেখনীতে বিভ্রান্ত হয়ে যেমন বহু ইতিহাস লিখা হয়েছে, তেমনি ‘বিষাদ সিন্ধু’-র ন্যায় সাহিত্য সমূহের মাধ্যমে বহু কল্পকথাও এদেশে চালু হয়েছে। বঙ্গদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতায় বহু বৎসর যাবৎ শী‘আদের অবস্থান থাকার কারণে হুসাইন ও কারবালা নিয়ে অলৌকিক সব কল্পকাহিনী এদেশের মানুষের যেমন মগযে বদ্ধমূল হয়ে আছে। এর কারণ এই যে, শী‘আদের আক্বীদা মতে ‘ইমাম’গণ নবীগণের ন্যায় মা‘ছূম বা নিষ্পাপ। হুসাইন (রাঃ) তাদের অনুসরণীয় বারো ইমামের অন্যতম। তাদের ভ্রান্ত আক্বীদা মতে নবীগণের ন্যায় ‘ইমাম’গণ আল্লাহ পক্ষ হ’তে মনোনীত হন। পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বিশুদ্ধ আক্বীদা মতে ছাহাবীগণ ‘মা‘ছূম’ বা নিষ্পাপ নন এবং তাঁরা নবীগণের সমপর্যায়ভুক্ত নন। অতএব সুন্নী আলেম ও বিদ্বানগণের উচিত হবে শী‘আদের সূক্ষ্ণ চতুরতা হ’তে সাবধান থাকা; যেন আমাদের ভাষার মাধ্যমে তাদের ভ্রান্ত আক্বীদার প্রচার না হয়।

আশূরায়ে মুহাররম ও আমাদের করণীয়

হাসান (রাঃ) (৪৯হিঃ)-কে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। -আল-বিদায়াহ ৮/৪৪। আশারায়ে মুবাশশারাহ্র অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্ব ত্বালহা ও যুবায়ের (রাঃ) মর্মান্তিকভাবে শহীদ হন। তাঁদের কারু মৃত্যু হুসাইন (রাঃ)-এর মৃত্যুর চাইতে কম দুঃখজনক ও কম শোকাবহ ছিল না। কিন্তু কারু জন্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করে মাতম করার ও সরকারী ছুটি ঘোষণা করে শোক দিবস পালন করার কোন রীতি কোন কালে ছিল না। ইসলামী শরী‘আতে এগুলো নিষিদ্ধ। সুতরাং সর্বদা আমাদের করণীয় হলো ইয়াযীদ-কে আমরা কখনোই ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলব না। বরং সকল মুসলমানের ন্যায় আমরা তার মাগফিরাতের জন্য দু‘আ করব।


উপসংহার

আমাদেরকে কারবালার ঘটনা সম্পর্কে সকল প্রকার আবেগ ও বাড়াবাড়ি হ’তে দূরে থাকতে হবে এবং আশূরা উপলক্ষে প্রচলিত শিরক ও বিদ‘আতী আক্বীদা-বিশ্বাস ও রসম-রেওয়াজ হ’তে বিরত থাকতে হবে। সাথে সাথে নিজেদের ব্যক্তি জীবন ও বৈষয়িক জীবন এবং সর্বোপরি আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিখুঁত ইসলামী ছাঁচে ঢেলে সাজাবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দিন। -আমীন!!

No comments:

Post a Comment