| আলাপ চারিতায় ইসলাম |
ভূমিকা
মানবজাতির প্রতিটি ব্যক্তি মনের ভাব অপরের কাছে প্রকাশ করার বিষয়ে ইসলামে সুনিপুণ দিকনির্দেশনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের খোশগল্প, মতবিনিময়, তর্কবিতর্ক, টেলিভিশনে টকশো, গ্লে¬াবাইজেশন-এর যুগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে গড়ে উঠা নেট ফ্রেন্ড ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আলাপচারিতায় ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কতিপয় নীতিমালা সংক্ষিপ্তাকারে উলেখ করব ইনশাআল্লাহ।
১। নিয়ত ও উদ্দেশ্য সঠিক হওয়া।
আমাদেরও আলাপচারিতার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে হবে সত্যে উপনীত হওয়া, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। কেননা, সঠিক নিয়ত ও উদ্দেশ্যে নিহিত রয়েছে অনেক পুণ্য। যেমন নিয়তের ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রإِنَّمَا الْأَعْمَال بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لكل امْرِئ مَا نَوَىগ্ধ (مُتَّفق عَلَيْهِ ,مشكوة-১/১-১)
‘‘প্রত্যেক কাজই নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়তের উপর প্রতিদান পাবে।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত-খ. ১, পৃ. ১, হা ১
উদ্দেশ্য সঠিক হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
لَّا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِّن نَّجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا ﴿النساء: ١١٤﴾
‘‘তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে মঙ্গল নিহিত থাকে না; কিন্তু যে শলা-পরামর্শ দান খয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে কিংবা মানুষের মধ্যে সন্ধিস্থাপন কল্পে করতো তা স্বতন্ত্র। যে একাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আমি তাকে বিরাট ছওয়াব দান করব।’’ -সূরা নিসা ঃ ১১৪
২। সদা সত্য কথা বলা।
কেননা, মিথ্যা বলা হলো খারাপ স্বভাব এবং সত্য কথা বলা হলো উত্তম স্বভাব। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ ﴿التوبة: ١١٩﴾
‘‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।’’-সূরা তাওবা ঃ ১১৯
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنِ اِبْنِ مَسْعُودٍ - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رَسُولُ اَللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - { عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ, فَإِنَّ اَلصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى اَلْبِرِّ, وَإِنَّ اَلْبِرَّ يَهْدِي إِلَى اَلْجَنَّةِ, وَمَا يَزَالُ اَلرَّجُلُ يَصْدُقُ, وَيَتَحَرَّى اَلصِّدْقَ, حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اَللَّهِ صِدِّيقًا, وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ, فَإِنَّ اَلْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى اَلْفُجُورِ, وَإِنَّ اَلْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى اَلنَّارِ, وَمَا يَزَالُ اَلرَّجُلُ يَكْذِبُ, وَيَتَحَرَّى اَلْكَذِبَ, حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اَللَّهِ كَذَّابًا } (متفق عليه ,مشكوة-৩/৪৫-৪৮২৪)
‘‘সত্য মানুষকে সদাচরণের দিকে পথ প্রদর্শন করে। আর মিথ্যা মানুষকে খারাপের দিকে পথ প্রদর্শন করে.....................।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত-খ. ৩, পৃ. ৪৫, হা ৪৮২৪
৩। জ্ঞানলব্ধ কথা বলা।
যে বিষয়ে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক করবে, সেসব বিষয়ের প্রমানাদি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা রাখবে। যাতে সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করা যায় এবং প্রয়োজনে প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়। যেসব বিষয়ে জ্ঞান নেই সেসব বিষয়ে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে আল্লাহর ভর্ৎসনা অনিবার্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
هَا أَنتُمْ هَٰؤُلَاءِ حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُم بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تُحَاجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُم بِهِ عِلْمٌ ۚ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُون ﴿آلعمران: ٦٦﴾
‘‘শোন! ইতঃপূর্বে তোমরা যে বিষয়ে কিছু জানতে, তাই নিয়ে বিবাদ করতে। এখন আবার যে বিষয়ে তোমরা কিছুই জান না, সে বিষয়ে কেন বিবাদ করছ..................... ?’’ -সূরা আলে ইমরান ঃ ৬৬
৪। শরীয়তের মূলনীতির পরিপন্থী বিষয়ে আলোচনা না করা।
কথাবার্তা হবে শরীয়তের গন্ডির ভিতরে, যাতে অযাচিত আচরণ ও কথাবার্তা প্রকাশ না পায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ ۖ فَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ ﴿آلعمران: ٣٢﴾
‘‘বলুন, আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য প্রকাশ কর। বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ কাফিরদেরকে ভালোবাসেন না।’’ -সূরা আলে ইমরান ঃ ৩২
আলাপচারিতায় কোন প্রকার বাকবিতন্ডা দেখা দিলে শরীয়তের নীতিমালার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। যেমন আলাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿النساء: ٥٩﴾
‘‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি প্রত্যার্পন কর যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং উত্তম ব্যাখ্যা।’’ -সূরা নিসা ঃ ৫৯
৫। বিনয় প্রদর্শন করা।
কেউ কোন প্রকার গর্ব ও অহংকার করবে না এবং নিজেকে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করবে না। কেননা অহংকার ও গর্ব করা ইসলামের চরিত্র নয়। আর এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
َعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রلَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنَ كِبْرٍগ্ধ (رواه مسلم ,مشكوة-৩/১০৭-৫১০৮)
‘‘যার অন্তরে ক্ষুদ্র পরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’’ -মুসলিম; মিশকাত-খ. ৩, পৃ. ১০৭, হা ঃ ৫১০৮
৬। কথা বলার ক্ষেত্রে শালিনতা বজায় রাখা।
কথা বলার ক্ষেত্রে অশ¬−ীল শব্দ পরিহার করা, সুন্দর শ্র“তিমধুর কথা বলা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا ﴿البقرة: ٨٣﴾
‘‘তোমরা লোকদের সাথে উত্তম কথা বল।’’ -সূরা বাক্বারা ঃ ৮৩
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
والكلمة الطّيبَة صَدَقَة (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
‘‘উত্তম কথা হলো সদকা (উত্তম কথা বললে সদকা করার পুণ্য পাওয়া যাবে)।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ১৮৯৬
৭। ন্যায় অন্যায়ের দৃষ্টিপাত করা।
আলাপচারিতার সময় অন্যায় কাজে সহযোগিতা ও অন্যায়কারীকে সাহায্য করা যাবে না। বরং যে কোন বিষয়ে কথা বললে উক্ত বিষয়ে সত্যে উপনীত হতে হবে এবং অন্য মুসলিমদেরকে উক্ত কাজ পালনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যাতে প্রত্যেকেই আল্লাহর কাছ থেকে উত্তম প্রতিদান পেতে পারে।
৮। ইনসাফ ও ন্যায়ের পরাকাষ্ঠা দেখানো।
প্রতিপক্ষের প্রতি অন্যায়-অবিচার না করা এবং মিথ্যা কথা দিয়ে তাকে ঘায়েল না করা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ ﴿النحل: ٩٠﴾
‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা ন্যায় ও উত্তম কাজের নির্দেশ দেন।’’ -সূরা নাহল ঃ ৯০
তিনি আরো বলেন,
وَأَقْسِطُوا ۖ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿الحجرات: ٩﴾
‘‘তোমরা ইনসাফ কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ইনসাফকারীদেরকে ভালোবাসেন।’’ -সূরা হুজুরাত ঃ ৯
৯। মুহাব্বত-ভালোবাসা প্রদর্শন করা।
আলোচনাকারী ও তার্কিকদের মাঝে কোন বিষয়ে মতানৈক্য থাকলেও তারা একে অপরের প্রতি মুহাব্বত-ভালোবাসা প্রদর্শন করবে। কেননা, ইসলামী শরীয়তে মু’মিনদেরকে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
্রيَا مَعْشَرَ النَّاسِ لَنْ تُؤْمِنُوا وَلَنْ تَكُونُوا مُؤْمِنِينَ حَتَّى تُحِبُّوا গ্ধ (مجمع الزوائد ومنبع الفوائد-৯/ ৪৩৭- ১৫৪৭৫)
‘‘হে লোকসকল! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা ঈমান আনয়ন কর এবং ততক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা একে অপরকে ভালোবাসো।’’মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খ. ৯, পৃ.৪৩৭, হা ঃ ১৫৪৭৫ া
১০। উভয়ের মাঝে ধৈর্য, স্থিরতা থাকা অত্যাবশ্যক।
অপরের কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করা এবং উত্তর দেয়ার জন্য তাড়াহুড়ো না করা। প্রতিপক্ষের বলা শেষ হলে কথায় তাৎপর্য বুঝে-সুঝে তারপর উত্তর দিতে মনস্থ করা। আর এটাই হলো ইসলামী চরিত্র। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আশাজ্জ (রাঃ)-কে বলেন, ‘‘তোমার মধ্যে দু‘টি উত্তম গুন রয়েছে, যা আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন। তা হলো, ধৈর্য ও স্থীরতা।’’ -মুসলিম
১১। রাগ বা ক্রোধ সংবরণ করা।
আলাপচারিতার সময় উভয়ের কর্তব্য হলো ক্রোধ সংবরণ করা। ক্রোধ পরিহার করে চলাই হলো ইসলামী আদর্শ। যেমন হাদীস শরীফে উলেখ রয়েছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوْصِنِي، قَالَ: ্রلاَ تَغْضَبْগ্ধ فَرَدَّدَ مِرَارًا، قَالَ: ্রلاَ تَغْضَبْগ্ধ (رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ ,مشكوة-৩/১৪১৩- ৫১০৪)
“জনৈক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -কে এসে বললেন আমাকে নসীহত করুন। তিনি ﷺ বললেন, ‘‘রাগ করো না। এটা তিনি তিনবার বললেন।’’-বুখারী; মিশকাত-খ. ৩, পৃ. ১৪১৩, হা ঃ ৫১০৪
অন্য আরেক হাদীসে আছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ্রلَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِগ্ধ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ ,مشكوة-৩/১৪১৩- ৫১০৫)
‘‘কুস্তাকুস্তিতে জয়লাভ করা বাহাদুরীর পরিচয় নয়। বাহাদুর হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজের ক্রোধকে দমন করতে পারে।’’ -বুখারী ঃ ৬১১৪; মুসলিম ঃ ২৬০৯; মিশকাত-খ. ৩, পৃ. ১৪১৩, হা ঃ ৫১০৫
১২। ক্ষমার দৃষ্টি অবলম্বন করা।
কেউ যদি কারো প্রতি অন্যায় আচরণ করে বা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে তাহলে তার উচিত তাকে ক্ষমা করে দেয়া। কেননা, অপরকে ক্ষমা করা ও তার প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন হলো একটি উত্তম গুণ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا ۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴿النور: ٢٢﴾
‘‘তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষ ত্র“টি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা কর না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন ? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।’’ -সূরা নূর ঃ ২২
১৩। তার্কিকদের উভয়ের কথা হবে স্পষ্ট ও বোধগম্য।
তার্কিকদের উভয়ের কথা হবে স্পষ্ট ও বোধগম্য। যে শুনবে সে যেন ভালোভাবে বুঝতে পারে। যেমন আয়িশা (রাঃ) বলেন, ‘‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর কথা ছিল একটি শব্দের থেকে আরেকটি শব্দ পৃথক। যেই শুনত সেই বুঝতে পারত।’’ -আবূ দাঊদ
১৪। জিহবাকে সংযত করা।
প্রত্যেক ব্যক্তি তার জিহবাকে হিফাযত করবে। এমন কথা বলবে না যে , সে আল্লাহর বিরাগভাজনে পরিণত হয়। শরীয়ত বহির্ভূত কথা বললে কাল হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে হিসাব দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَسْكُتْগ্ধ (بخاري : ৬৪৭৬)
‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান আনল সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ৪২৪৩
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন,
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أضمنْ لَهُ الجنَّةَগ্ধ )رَوَاهُ البُخَارِيّ(
‘‘যে ব্যক্তি তার জিহবা ও গুপ্তাঙ্গের ব্যাপারে হিফাযতের যিম্মাদারী নিল, আমি তার জন্য জান্নাতের যিম্মাদারী নিলাম।’’ -বুখারী; মিশকাত ঃ ৪৮১২
১৫। তার্কিক তার কথায় অটল থাকবে।
নিজেও কোন প্রমাণ ছাড়া কথা বলবে না এবং অন্যের কথাও প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করবে না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘‘মানুষ মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে।’’-মুসলিম
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ ﴿الحجرات: ٦﴾
‘‘হে মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত ঃ তোমরা কোন স¤প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।’’ -সূরা হুজুরাত ঃ ৬
১৬। অশ্রাব্য কথা ও গালিগালাজ থেকে বিরত থাকা।
যেমন হাদীসে উলেখ আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘‘মু’মিন কাউকে কথা দিয়ে আঘাত করে না, কাউকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে না।’’ -মুসনাদে আহমদ
১৭। আলাপচারিতার সময় অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা না করা।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ , ﴿الحجرات: ١٢﴾
‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ্।’’ -সূরা আল হুজুরাত ঃ ১২
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ্রإِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ، (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
‘‘তোমরা কুধারণা থেকে ঁেবচে থাকো। কেননা, কুধারণা হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট মিথ্যা কথা।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ৫০২৮
১৮। অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মনে করে ঠাট্টা-মশকারা ও বিদ্র“প না করা।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمٌْ ﴿الحجرات: ١١﴾
‘‘হে মুমিনগণ! কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।’’ -সূরা হুজুরাত ঃ ১২
১৯। নিজেই নিজের প্রশংসা ও স্ততিবাক্য না গাওয়া এবং নিজের গুণাবলীর কথা নিজে বলে না বেড়ানো।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَلَا تُزَكُّوا أَنفُسَكُمْ ۖ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ ﴿النجم: ٣٢﴾
‘‘অতএব তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। তিনি ভাল জানেন কে সংযমী ?’’ -সূরা নাজম ঃ ৩২
২০। নিজের জ্ঞান-গরিমা, বাকপটুতা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রবৃত্তির অনুসরণ না করা।
স্বীয়গুণে খুশি হওয়া মানে হলো লা“নার পথ অবল¤¦ন করা। আর এমন ব্যক্তিদেরকে আল্লাহ সাহায্য করেন না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ ۙ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ ۙ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُم مُّدْبِرِينَ ﴿التوبة: ٢٥﴾
‘‘আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন অনেক ক্ষেত্রে এবং হোনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের প্রফুল− করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্তে¡¡ও তোমাদের জন্যে সংকুচিত হয়েছিল। অতঃপর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।’’ -সূরা তাওবা ঃ ২৫
২১। প্রতিপক্ষের প্রতি দয়াশীল হওয়া এবং নিজে জয়লাভ করার জন্য কঠোরতা অবল¤¦ন না করা।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنْ جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রلاَ يَرْحَمُ اللَّهُ مَنْ لاَ يَرْحَمُ النَّاسَগ্ধ (مُتَّفق عَلَيْهِ)
‘‘যে ব্যক্তি অন্যের প্রতি দয়া দেখায় না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া দেখান না।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ৪৯৪৭
২২। আলাপচারিতার সময় গোমড়ামুখো না থেকে হাস্যোজ্জ্বল থাকা।
যেমন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রتَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيك صَدَقَةগ্ধ )رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ(
‘‘তোমার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তোমার মুচকি হাসি হলো সদকা।’’-তিরমিযী; মিশকাত ঃ ১৯১১
২৩। কথোপকথনের সময় খারাপ চিন্তাধারা ও কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা কারো কাছ থেকে প্রকাশ পেলে তা প্রসার না করা বরং তা গোপন করা।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِগ্ধ (ابن ماجه : ২৫৪৪)
‘‘যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষত্র“টি গোপন করবে, আল্লাহ তার দোষত্র“টি দুনিয়া ও আখিরাতে গোপন করবেন।’’ -ইবন মাজাহ ঃ ২৫৪৪
২৪। আলাপচারিতার সময় কারো গীবত না করা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ ﴿الحجرات: ١٢﴾
‘‘তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে ? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই কর।’’ -সূরা হুজুরাত ঃ ১২
২৫। কথকের (বক্তার) কথাকে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা।
আর এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর স্বভাব।
২৬। জয়লাভের জন্য নিজের মতের প্রতি অন্ধ পক্ষপাতিত্ব না করা। বরং আলোচনার মাধ্যমে সত্য পথ ও মত গ্রহণ করা।
২৭।প্রতিপক্ষের মত শরীয়তের বিরুদ্ধে হলে তা প্রমাণাদি উপস্থাপনের মাধ্যমে খন্ডন করা এবং সঠিক মত পেশ করা।
২৮। হৃদয়গ্রাহী শ্র“তিমধুর শব্দ ব্যবহার করা যাতে প্রতিপক্ষ সত্য গ্রহণে আগ্রহান্বিত হয়।
২৯। অনর্থক কথাবার্তা বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কথার উপর আলোচনা সংক্ষিপ্ত রাখা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘‘মানুষের ইসলাম গ্রহণের একটি উত্তম গুণ হলো তারা অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকবে।’’ -তিরমিযী
৩০। আলাপচারিতার সময় প্রতিপক্ষকে অথবা আলাপে জড়িত নয় এমন ব্যক্তিদেরকে কষ্ট না দেয়া।
বিষয়টির সারাংশ
ইসলামী দৃষ্টিতে কথা বলার নিয়ম-কানুন বা আদব জেনে নিন:
১। কম কথা বলা উত্তম। সত্য বলা ওয়াজিব, মিথ্যা বলা হারাম।
২। সাধারণভাবে আস্তে কথা বলাই উত্তম। তবে বড় মজলিসের প্রয়োজন অনুপাতে জোরে কথা বলা যাবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জোরে কথা বলা ভালো নয়।
৩। নিজের চেয়ে অধিক বয়স এবং অধিক জ্ঞানসম্পন্ন লোকদের কথা বলতে অগ্রাধিকার দেওয়া আদব।
৪। তাহকীক বা তদন্ত ব্যতীত কথা বলা অন্যায়। যে কোন কথা শুনেই তাহকীক-তদন্ত ব্যতিত তা বর্ণনা করা মিথ্যার শামিল।
৫। যে কথায় ঝগড়া এবং তর্ক সৃষ্টি হয়, তা বলা অন্যায়।
৬। নিজের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোন খবর বা প্রতিশ্রুতিমূলক কথা বললে ইনশাআল্লাহ বলতে হবে।
৭। বড়দের সঙ্গে আদব রক্ষা করে কথা বলতে হবে।
৮। বড়দেরকে সম্মানজনক সম্বোধন করে কথা বলা আদব।
৯। কাউকে কাফের, ফাসেক, মালাউন, আল্লাহর দুশমন, বেঈমান ইত্যাদি বলে সম্বোধন করা নিষেধ।
১০। নিজের ভাঙ্গা ভাঙ্গা অভিজ্ঞতার কথা বলবে না, এতে শ্রোতাদের মনে বিরক্তির উদ্রেক হয়।
১১। আত্মপ্রশংসা অর্থাৎ নিজের প্রশংসা নিজে করা নিষেধ। এটা গোনাহে কবীরা।
১২। অতিরিক্ত ঠাট্টা মজাক না করা ভালো। এতে প্রভাব, লজ্জা-শরম ও পরহেজগারী কমে যায়।
১৩। যে শব্দ বা ভাষা খারাপ উদ্দেশ্যে এবং খারাপ অর্থে ব্যবহার করা হয় সেটা পরিহার করা কর্তব্য।
১৪। চিন্তা করে কথা বলতে হবে। বিনা চিন্তায় কথা বললে অনেক সময় মিথ্যা হয়ে যায়।
১৫। কথা সংক্ষেপ বা দীর্ঘ হবে না অর্থাৎ যতটুকু কথা বললে প্রয়োজন অনুযায়ী ততটুকু বলতে হবে।
১৬। চাটুকারিতামূলক কথা অর্থাৎ কারও তোষামোদ করে কথা বলা যাবে না।
১৭। কোন প্রয়োজনের কথা পূর্বে বলে থাকলে আবার সেটা পুনরাবৃত্তি করার ক্ষেত্রে পূর্ণ কথা বলতে হবে। পূর্ণ কথা না বললে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে।
১৮। কারও বক্তব্য শেষ হওয়ার পূর্বেই তার কথা কেটে মাঝখানে কথা না বলা আদব।
১৯। নিজের কথায় ভুল হলে সেটা স্বীকার করে নেয়া এবং অপব্যাখ্যায় না যাওয়া আদব।
২০। ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রেও উপরোক্ত আদবগুলো রক্ষা করতে হবে।
উপসংহার
কথা বলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জীবনের সব ক্ষেত্রেই কথা বলতে হবে নিয়ম-কানুন ও আদব রক্ষা করে। কোন মজলিস হোক, পারিবারিক হোক, রাস্তাঘাটে হোক কথা বলতে হবে আদবের সঙ্গে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের কবুল করুন। আমিন!!!!!


No comments:
Post a Comment