৮
সেপ্টেম্বরঃ বিশ্ব স্বাক্ষরতা দিবস।
ভূমিকা
ইসলামে স্বাক্ষরতা, শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের উপরে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা
হয়েছে এবং একে সকল মুমিন নরনারীর জন্য ব্যক্তিগতভাবে ফরয করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন,
্রطَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍগ্ধ رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ
وَالْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَان ,مشكوة : ২১৮)
“ইলম সন্ধান করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয।” -ইবন মাজাহ; বাইহাকী; মিশকাতঃ ২১৮
জ্ঞানী ও আলিমদের প্রশংসায় আল্লাহ বলেন,
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً
فَأَخْرَجْنَا بِهِ ثَمَرَاتٍ مُّخْتَلِفًا أَلْوَانُهَا ۚ وَمِنَ الْجِبَالِ
جُدَدٌ بِيضٌ وَحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيبُ سُودٌ*وَمِنَ
النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالْأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَٰلِكَ ۗ
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ
غَفُورٌ﴿فاطر: ٢٧-٢٨﴾
“তুমি কি দেখনি আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টিবর্ষণ করেন, অত:পর তদ্দ¡ারা আমি বিভিন্ন বর্ণের ফল-মূল উদগত করি। পর্বতসমূহের মধ্যে
রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথ সাদা, লাল ও নিকষ কালো কৃষ্ণ। অনুরূপ ভাবে বিভিন্ন বর্ণের মানুষ,
জন্তূ, চতু¯পদ প্রাণী রয়েছে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে
জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাময়।” -সূরা ফাতিরঃ ২৭-২৮
এ আয়াতে আলিমদের প্রশংসা করা হয়েছে যে, তাঁরাই আল্লাহকে ভয় করেন। এছাড়া এখানে সৃষ্টির বৈচিত্র ও
সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে জ্ঞানকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, বিজ্ঞান সহ জ্ঞানের সকল শাখাই ইসলামের দৃষ্টিতে পশংসনীয়
জ্ঞান বা ইসলামী জ্ঞান। মানুষের কল্যাণকর সকল শিক্ষাই ইসলামী শিক্ষা। ভাষা, সাহিত্য, চিকিৎসা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল ও জ্ঞান বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়
জ্ঞানার্জন ও শিক্ষা লাভ ইসলামের নির্দেশ। সকল বিষয়ে পয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষজ্ঞ তৈরি করা মুসলিম সমাজের
জন্য ফরযে কিফায়া দায়িত্ব। মুমিনের উপর ফরয আইন বা ব্যক্তিগত ফরয ইবাদত হলো নিজের ঈমান
ও ইসলামকে সংরক্ষণ করার ও প্রয়োজনীয় সকল ইবাদত ও লেনদেন ইসলাম-সম্মতভাবে আদায় করার
জন্য আবশ্যকীয় শরয়ী জ্ঞান অর্জন করা। এরপর মুমিন তার নিজের ও সমাজের চাহিদা অনুসারে জ্ঞানের যে
কোন শাখায় পারদর্শিতা অর্জন করবেন।
০২. শিক্ষার প্রচলিত ধারণা [Conventional Conception of Education]
বাংলা ‘শিক্ষা’ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘শাস’ ধাতু থেকে উদ্ভুত। ‘শাস’ ধাতুর অর্থ হচ্ছে ‘শাসন করা’, ‘নিয়ন্ত্রণ করা’ ইত্যাদি। আবার সাধারণভাবে শিক্ষা ‘বিদ্যা অর্জন বা আহরণ’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এই বিদ্যা শব্দটি
সংস্কৃত “বিদ” ধাতু হতে আগত। এর অর্থ জানা বা জ্ঞান আহরণ করা। শিক্ষা বলতে জ্ঞান অর্জন, শিক্ষণ ও প্রয়োগকরণ এ তিনের সমন্বয়কে
বুঝায়। এছাড়া শিক্ষণ,
পঠন ও লেখনে
দক্ষতা অর্জন শিক্ষার আরেক পরিচয়। সামাগ্রিকভাবে একজন মানুষের বিকশিত হতে যে অপরিহার্য
হাতিয়ার প্রয়োজন তা হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা সৃষ্টিশীল। নতুন নতুন ধারণা ও জ্ঞানের বিকাশে শিক্ষা নিয়তই অবদান রেখে
যাচ্ছে। শিক্ষার প্রয়োজন সর্বজনীন, বিশ্বময়। জীবনধারণের জন্য খাদ্যের প্রয়োজনের মতই শিক্ষা মানুষের
জীবনে অপরিহার্য। শিক্ষা শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Education. যার প্রতিটি অক্ষরকে বিশ্লেষণ করে শিক্ষার এক সামগ্রিক অর্থকে ফুটিয়ে তোলা
হয়েছে। বিশ্লেষণটি
নিম্নরূপঃ
The term EDUCATION stands
for-
E-Enlargement of mind [মনের প্রশস্ততা বা সংকীর্ণতার অবসান]
D-Discipline [শৃংখলা]
U-Universal outlook [সর্বজনীনতা]
C-Characterization [নৈতিক চরিত্র গঠন]
A-Activities [শিক্ষার প্রয়োগ বা কর্মচাঞ্চল্য]
T-Truth worthiness [সত্যানুরাগ]
I-Idealism [আর্দশানুরাগ]
O-Omniscient [প্রজ্ঞার প্রকাশ]
N-Nice tempered [মেজাজের ভারসাম্য]
E-Enlargement of mind [মনের প্রশস্ততা বা সংকীর্ণতার অবসান]
D-Discipline [শৃংখলা]
U-Universal outlook [সর্বজনীনতা]
C-Characterization [নৈতিক চরিত্র গঠন]
A-Activities [শিক্ষার প্রয়োগ বা কর্মচাঞ্চল্য]
T-Truth worthiness [সত্যানুরাগ]
I-Idealism [আর্দশানুরাগ]
O-Omniscient [প্রজ্ঞার প্রকাশ]
N-Nice tempered [মেজাজের ভারসাম্য]
বিশ্লেষণটিকে পরখ করলে দেখা যায়, জীবনের সুকুমারবৃত্তিগুলোকে স্পর্শ করেছে শিক্ষা।
০৩. ইসলামে
শিক্ষার ধারণা [Conception of Education In
Islam]
‘শিক্ষা’ শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে ইসলামী শিক্ষায়
পাঁচটি শব্দ পাওয়া যায় [এছাড়াও আরো থাকতে পারে]ঃ
০১. তারবীয়াহ [تربية]ঃ
তারবীয়াহ [تربية]
শব্দটি উদ্ভুত হয়েছে ربو
শব্দ হতে। ربو
অর্থ : Increase, to
grow, to exceed, to raise, rear, bring up, to educate, to teach, instruct, to
develop, augment এবং তারবীয়াহ [تربية]
অর্থ : Education, up
bringing Instruction, Pedagogy, Breeding, Raising.
০২. তালীম [تعليم]ঃ
তালীম [تعليم]
শব্দটি উদ্ভুত হয়েছে ইলম্ [علم] হতে। তালীম [تعليم] অর্থ: Information, Advice, Instruction, Direction, Teaching, Training,
Schooling, Education, and Apprenticeship.
০৩. তাদীব [تأديب ]ঃ তাদীব [تأديب ] শব্দটি উদ্ভুত
হয়েছে أدب
[আদব] শব্দটি হতে, ‘ [أدب] আদব’ অর্থ : Culture, Refinement, Good breeding, Good, manners,
Social graces, Decorum.
০৪. তাদরীব [تدريب ]ঃ তাদরীব [تدريب ] -এর আভিধানিক
অর্থ : Habitation, Accustoming, Practice, Drill, Schooling,
Training, Coaching, Tutoring.
০৫. তাদরীস [تدريس ]ঃ তাদরীস [تدريس ] শব্দটি উদ্ভুত
হয়েছে দারস [درس]
শব্দটি হতে, তাদরীস-এর আভিধানিক অর্থঃ To study, to learn, to teach, to instruct, to
wipe out, to blot out, to thrash out, tution.
সাধারণভাবে শিক্ষা বলতে আমরা পুঁথিগত বিদ্যাকেই বুঝি। পুঁথিগত বিদ্যার মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন
হয় তাই সাধারণতঃ শিক্ষা বলে বিবেচিত হয়। যিনি যত বেশি পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন করতে পারেন, তিনি তত বেশি
শিক্ষিত বলে সমাজে আদৃত হন। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা লাভের উপায় হচ্ছে জ্ঞানার্জন। এই জ্ঞান অর্জন
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেও হতে পারে, আবার অনানুষ্ঠানিকভাবেও হতে পারে। মানুষকে খাদ্য,
আহার, বাসস্থান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ
এবং হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রকার কলাকৌশল,
জ্ঞান এবং
অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হত। প্রজন্ম হতে প্রজন্মে বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে এ সমস্ত জ্ঞান
এবং অভিজ্ঞতা কনিষ্ঠ ও অনুজদের মাঝে প্রদান করা হত বা তারা অর্জন করে নিত। মানুষের এই সমস্ত
অর্জিত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা - এক প্রকার শিক্ষা। নিরক্ষর চাষী চাষবাস সংক্রান্ত বিষয়ে
পরিপূর্ণ অভিজ্ঞ, নিরক্ষর তাঁতী সুন্দরভাবে তার কাপড় বোনা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, শ্রমিক বিভিন্ন
জিনিষ তৈরি সম্পর্কে, শিল্পী বিভিন্ন প্রকার শিল্পনৈপুণ্য সম্পর্কে অভিজ্ঞ। এরাও এক ধরণের শিক্ষিত। পুঁথিগত বিদ্যা
ছাড়াই এই সমস্ত ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় কাজ-কর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য
সম্পর্কে বয়োজ্যেষ্ঠ ও সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিদের নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করছে। নিরক্ষর [উম্মী]
মানুষের এইসব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার রূপ পরিগ্রহ করে
শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে পুঁথিগত বিদ্যায় স্থান লাভ করেছে। যেমন, শিকারীর পশু শিকারের কলাকৌশল ও
যন্ত্রপাতি, কৃষকের চাষবাস, তাঁতীর বয়ন কাজ, শ্রমিকের শিল্পের কাজ, শিল্পীর নৈপুণ্যের কাজ, জেলের মৎস্য শিকারের কাজ ইত্যাদি। এই সমস্ত লোক
নিরক্ষর হলেও তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, নৈপুণ্য, অধ্যবসায়, ঐকান্তিকতা, বিচারবুদ্ধি ইত্যাদি শিক্ষিতের সমপর্যায়ভুক্ত। ভাষা শেখার আগে
কেউ ব্যাকরণ শেখে না। আগে ভাষা তারপর ব্যাকরণের জন্ম। আগে অনানুষ্ঠানিক জ্ঞানের চর্চা, তারপর তার আনুষ্ঠানিক রূপ প্রকাশ পায়। ‘নিরক্ষর’ শব্দটির আরবী
আভিধানিক অর্থ উম্মী। অক্ষর জ্ঞানহীন। প্রিয় পাঠক, নিরক্ষর হলেই একজন মানুষ প্রজ্ঞাহীন বা শিক্ষাহীন মূর্খ তা বুঝায় না। একইভাবে
অক্ষরজ্ঞান থাকলেই একজন মানুষ প্রজ্ঞাময় হবেন তা যথার্থ নয়। একজন চিকিৎসকের কাছে যদি প্রকৌশলবিদ্যার
প্রাথমিক জ্ঞান জানতে চাওয়া হয় অথবা একজন প্রকৌশলীর কাছে যদি চিকিৎসাবিদ্যার প্রাথমিক
জ্ঞান জানতে চাওয়া হয় তবে উভয়ের অবস্থা যা হবে তাতে চিকিৎসককে প্রকৌশলবিদ্যার জন্য
উম্মী বলা যায় এবং প্রকৌশলীকে চিকিৎসাবিদ্যার জন্য উম্মী বলা যায় অনায়াসে। এভাবে গভীরভাবে
বিশ্লেষণ করলে আমরা প্রত্যেকেই কোন না কোন বিষয়ে উম্মী। নবী (সাঃ) অক্ষরজ্ঞান বিষয়েই শুধু উম্মী ছিলেন,
প্রজ্ঞা ও
বিচক্ষণতা, মানবিকতা ও উদারতা, সুবিচার ও নিরপেক্ষতা, ভ্র“ণ বিজ্ঞান হতে পানি বিজ্ঞান পর্যন্ত
বিজ্ঞানের সকল বিষয়ের বিচারে তিনি আজও অতুলনীয়। তাঁর প্রতি নাযিলকৃত আল কুরআন বিজ্ঞানময়। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আপনাকে
আল-কুরআন দেয়া হয়েছে প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞের নিকট হতে।” [আল কুরআন যে প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নাযিলকৃত; নবী (সাঃ)-এর রচিত নয় তাঁর উম্মী হওয়াই এর প্রমাণ
এবং তিনি নিজ উদ্যেগে মানবজাতির জন্য কোন বিধান রচনার প্রয়াস চালাননি।] তাঁর প্রতি
নাযিলকৃত জীবনবিধানের মুগ্ধতায় বিংশ-একবিংশ শতাব্দীর বহু মনীষী নানা প্রশংসাসূচক
মন্তব্য করেছেন। বহু নারী-পুরুষ ইসলামকে স্বেচ্ছায় বরণ করে নিচ্ছেন। আল্লাহ, তাঁর [নবী (সাঃ)] সম্পর্কে বলছেন, “তিনিই [আল্লাহ তা’য়ালা]
উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য হতে, যে তাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁর [আল্লাহর] আয়াতসমূহ;
তাদেরকে পবিত্র
করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমাত; ইতিপূর্বে তো এরা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে এবং তাদের
অন্যান্যদের জন্যেও যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” অর্থাৎ একজন উম্মী বা নিরক্ষর মানুষকে আল্লাহ মনোনীত করলেন
কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়ার জন্য। একজন প্রকৃত শিক্ষিত ব্যক্তি সেই-ই যিনি নিজে কোন্ বিষয়ে
উম্মী এবং কোন্ বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন সে সম্পর্কে সচেতন। যিনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও বিজ্ঞ তিনি
ব্যবসায়িক বিষয়েও বিজ্ঞ হবেন এমনটি ভাবার যৌক্তিক কোন কারণ নেই। স্বতঃসিদ্ধও নয়। ব্যবসা বিষয়ে
জ্ঞান না থাকা সত্তে¡ও যিনি ব্যবসা পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেন তিনি কার্যতঃ মূর্খতার পরিচয় দেন। এতে ব্যবসার নামে
হয় জগাখিচুড়ি। নষ্ট হয় আমানাতদারী। নিজেকে সবজান্তা ভাবার সমস্যা এখানেই। যে বিষয়ে যিনি উম্মী তিনি সে বিষয়ে
উম্মীর সহজ স্বীকৃতি দেয়াই প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের পরিচয়। আর যে ব্যক্তি আমানাতদারী ও সুবিচার
জ্ঞানে উম্মী অর্থাৎ যার আমানাতদারী ও সুবিচার জ্ঞানের অভাব রয়েছে তার ব্যবসা -
রাজনীতি যে কোন কাজে পরিচালকের ভূমিকা নেয়া মানে সে কাজে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। তাই দায়িত্ব
পালনের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জনের বিষয়টি আল্লাহ তা’য়ালা গভীর গুরুত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “বল, যারা জানে ও যারা
জানে না তারা কি সমান?” আল্লাহ আরো বলেন, “তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং [ঈমানদারদের মধ্য
হতে] যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন।” কুরআনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে শিক্ষা
বিষয়ে আল্লাহ যা বলেছেন,
তাতে শিক্ষা বিষয়ে
ইসলামের দার্শনিক ও প্রায়োগিক উভয়দিকই প্রতিফলিত হয়েছে। কুরআনের কিছু বাছাইকৃত আয়াত হতে নিম্নে
তা তুলে ধরা হলঃ
ক. শিক্ষা হল স্রষ্টাকে চেনা ও অজানাকে জানাঃ
আল্লাহ বলেন, “পাঠ কর তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন- সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক হতে। পাঠ কর, আর তোমার
প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না।”
খ. শিক্ষা হল জীবন-জগতের পরিচয় জানাঃ
আল্লাহ বলেন, “আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, অতঃপর আদম সকল ফেরেশতাদের সম্মুখে তা
প্রকাশ করলেন এবং আল্লাহ বললেন, ‘এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ ফেরেশতারা বলল, ‘আপনি মহান, পবিত্র। আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া
আমাদের তো কোন জ্ঞানই নেই। বস্তুতঃ আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়।”
গ. শিক্ষা হল আল্লাহর দানঃ
আল্লাহ বলেন, “ যা তিনি ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত¡ করতে পারে না।”
“......আল্লাহ তাকে [দাউদ আ.] রাজত্ব ও হিকমাত দান করলেন এবং যা তিনি ইচ্ছা করলেন তা তাকে
শিক্ষা দিলেন। ”
“...... তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবহিত।”
“.......আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমাত অবতীর্ণ করেছেন এবং তুমি যা জানতে না তা তোমাকে
শিক্ষা দিয়েছেন, তোমার প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ রয়েছে।”
ঘ. শিক্ষা হল জ্ঞানের সৃষ্টি ও বৃদ্ধিঃ
“........এবং বল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।’”
ঙ. শিক্ষা হল জ্ঞান বিতরণ বা হিকমাত প্রশিক্ষণ দেয়াঃ
“তিনিই [আল্লাহ তা’য়ালা] উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য হতে, যে তাদের নিকট
আবৃত্তি করে তাঁর [আল্লাহর] আয়াতসমূহ; তাদেরকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমাত; ইতিপূর্বে তো এরা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে
এবং তাদের অন্যান্যদের জন্যেও যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি। আল্লাহ পরাক্রমশালী,
প্রজ্ঞাময়।”
চ. শিক্ষা হল বিশেষ জ্ঞানঃ
“অতঃপর তারা সাক্ষাত পেল আমার বান্দাদের মধ্যে একজনের, যাকে আমি আমার নিকট হতে অনুগ্রহ দান
করেছিলাম ও আমার নিকট হতে শিক্ষা দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান।”
ছ. শিক্ষা হল বোধশক্তিসম্পন্ন হওয়াঃ
“ ......... এবং বোধশক্তিসম্পন্নেরা ব্যতীত অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।”
জ. শিক্ষা হল বিশ্বাস অর্জনের সাহসঃ
“........... আমি যা তোমাদেরকে বলব তা, আমার প্রতিপালক আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন
তা হতে বলব। যে সম্প্রদায় আল্লাহকে বিশ্বাস করে না ও আখিরাতে অবিশ্বাসী আমি তাদের মতবাদ বর্জন করেছি।”
ঝ. শিক্ষা হল মুসলিম হিসেবে মৃত্যুঃ
“হে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর ¯্রষ্টা! আপনিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম
হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন।”
ঞ. শিক্ষা হল প্রতিরক্ষা ও কৃতজ্ঞতাঃ
‘আর আমি তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা তোমাদের
যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে; সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না ?’
০৪. শিক্ষার সর্বজনীন প্রকার [ Universal Types of Education]
শিক্ষার প্রকার বলতে শিক্ষা অর্জনের উপায়কে বুঝায়। সর্বজনীনভাবেই শিক্ষা অর্জনের প্রকার
দুইটিঃ
ক. অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাঃ
শিক্ষা বৎসর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, টেক্সট বই, শিক্ষা কারিকুলাম, গ্রেড পদ্ধতি এবং বিভিন্ন শিক্ষাস্তর বর্জিত শিক্ষাই
অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত। একজন প্রাজ্ঞ শিক্ষকের সযতেœ গড়ে ওঠে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আবহ। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর কাছে আসহাবে
সুফফার শিক্ষা গ্রহণ ছিল অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সক্রেটিসের তত্ত¡াবধানে প্লেটোর
এবং প্লেটোর তত্ত¡বধানে এরিস্টটলের বিকাশ, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার দৃষ্টান্ত। অনানুষ্ঠানিক শিক্ষায় কোন সনদ বিতরণ নেই। অনানুষ্ঠানিক
শিক্ষায় ছকবাধাঁ কারিকুলামের পরিবর্তে চলমান স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় শিক্ষাকে
উপস্থাপন করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীর মনে প্রতিটি শিক্ষা হয়ে ওঠে ব্যবহারিক দৃষ্টান্তপূর্ণ। প্লেটো এবং
এরিস্টটলের মত, কবি নজরুল ইসলাম ও কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার এ উপমহাদেশের দুই
দিকপাল।
খ. আনুষ্ঠানিক শিক্ষাঃ
শিক্ষা বৎসর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, টেক্সট বই, শিক্ষা কারিকুলাম, গ্রেড পদ্ধতি এবং বিভিন্ন শিক্ষা
স্তর নির্ভর শিক্ষাই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত। সরকারী-বেসরকারী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই
আনুষ্ঠানিক শিক্ষার দৃষ্টান্ত। আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় বিভিন্ন শিক্ষা স্তর শেষে মেধা
স্বীকৃতিস্বরূপ সনদ বিতরণ করা হয়।
০৫. ইসলামে শিক্ষার প্রয়োজন [ Needs of Education In Islam]
আনুষ্ঠানিক হোক বা অনানুষ্ঠানিক হোক মানুষের জীবনে শিক্ষার প্রয়োজন মৌলিক। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও
চিকিৎসার মত শিক্ষাও মানুষের মৌলিক চাহিদার একটি। তবে অন্যান্য মৌলিক চাহিদার সাথে শিক্ষার
চাহিদার একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা মানুষের শারিরীক প্রয়োজনকে পূরণ করে। আর শিক্ষা আসল
মানুষটির প্রয়োজন পূরণ করে। বিষয়টি আমরা এভাবে বুঝতে পারি - যখন কোন মানুষ
মারা যায়, তখন আমরা বলি অমুকের লাশ। আর এই লাশের চোখ, কান, নাক, জিহবা শারীরিক সব কিছুই বিদ্যমান থাকে। শুধু অমুক নেই বা আসল মানুষটিই নেই। সে মানুষটি তার সকল শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা সহ অথবা
তার সকল ধরণের মূর্খতাসহ চিরতরে হারিয়ে গেছে। শরীরের ভেতর আসল মানুষটির জন্যই শিক্ষার
প্রয়োজন। মানুষ হিসেবে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যই শিক্ষা দরকার। শিক্ষা ছাড়া
মানুষের মত বাঁচার কোন উপায় নেই। আল্লাহ বলেন, ‘যাদের চক্ষু ছিল অন্ধ আমার নিদর্শনের প্রতি এবং যারা শুনতেও
ছিল অক্ষম।’ আল্লাহ এখানে আসল মানুষের অন্ধত্ব ও বধিরতা তুলে ধরেছেন, শারীরিক অন্ধত্ব বা বধিরতা নয়। আসল মানুষের
অন্ধত্ব ও বধিরতা দূর করার জন্যই শিক্ষার প্রয়োজন অনিবার্য। তা নাহলে মানুষ ও পশুর মাঝে প্রকৃতপক্ষে
কোন পার্থক্যই থাকেনা। কোন জাতি যদি শিক্ষার এই মৌলিক চাহিদা পূরণে অক্ষম হয় তবে সে জাতি জংলী জাতি
বা অমানবিক বা পাশবিকতায় পরিচালিত জাতি হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে। তাই শিক্ষাকে কোন
অবস্থাতেই বিলাসী সেবা অর্জনের পর্যায়ে আনা যাবেনা, একে সহজলভ্য করতে হবে। যাতে করে মানুষ
শিক্ষার মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়। আর শিক্ষাকে সহজলভ্য করতে রাষ্ট্রের ব্যাপক ভূমিকা রাখার
অবকাশ রয়েছে।
ক. শিক্ষার সর্বজনীন বা সাধারণ উদ্দেশ্য :
১. পরিপূর্ণ জীবন যাপনের যোগ্যতা অর্জন।
২. নৈতিক চরিত্র অর্জন।
৩. বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধ অর্জন।
৪. বৃত্তি গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন।
৫. পরিবেশ ও সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে চলার
যোগ্যতা অর্জন।
৬. সামাজিক নেতৃত্বের বা পরোপকারের যোগ্যতা
অর্জন।
৭. সমাজের সংস্কারমূলক ক্ষেত্র চিহ্নিত করার
যোগ্যতা অর্জন।
৮. ভারসাম্যপূর্ণ এবং পরমতসহিষ্ণু
দৃষ্টিভংগি অর্জন।
৯. ইহলৌকিক ও পরলৌকিক জীবন সম্পর্কে
ধারণা অর্জন।
১০. জ্ঞানভিত্তিক পরিশীলিত আচরণ করার যোগ্যতা
অর্জন ।
শিক্ষার উপকরণ
অক্ষরজ্ঞান ছাড়াও শ্রবণ ও দর্শনের মাধ্যমেও জ্ঞানার্জন করা যায়। তবে স্বাভাবিকভাবে
জ্ঞান অর্জনের জন্য অক্ষরজ্ঞান বা স্বাক্ষরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে কুরআনে
ঘোষণা করা হয়েছে। এজন্য কলম বা অক্ষরজ্ঞানকে জ্ঞানের মূল বাহন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ বলেন,
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ *خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ
عَلَقٍ *اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ *الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ﴿العلق: ٤-١﴾
“পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা
মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।” -সূরা আলাকঃ ১-৪
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) স্বাক্ষরতা ও শিক্ষার অতন্ত গুরুত্ব দিতেন। বদরের যুদ্ধে কিছু
কাফির যোদ্ধা বন্দী হয়, যারা লেখাপড়া জানতেন। স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) নির্দিষ্ট সংখ্যক
মুসলিম শিশু-কিশোরের লেখাপড়া শেখানোর বিনিময়ে তাদেরকে মুক্তি প্রদানের ব্যবস্থা
করেন। -মুসনাদে আহমদ,
খ. ৪, পৃ. ৪৭
উপরের আয়াত থেকে আমরা দেখেছি যে, শিক্ষা গ্রহণের মূলনীতি হবে প্রতিপালকের নামে। অর্থাৎ জ্ঞানের
সকল শাখার মহান স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ও সৃষ্টির কল্যাণের জন্য হতে হবে।
শিক্ষার গুরুত্ব
শিক্ষিত মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ ও বিশ্বাস সঞ্জীবিত করতে না পারলে কখনোই
দুর্নীতি, স্বার্থপরতা ও হানাহানিমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। এজন্য জ্ঞানের সকল শাখার মধ্যে ধর্মীয়
শাখায় পারদর্শিতা অর্জনকে ইসলামে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এ জ্ঞান মানুষকে
যেমন বিশ্বাস ও কর্মে পূর্ণতা দেয়, তেমনি সমাজের মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, কর্ম, সততা ও মানবমুখিতা সৃষ্টির যোগ্যতা
প্রদান করে। রাসূলুল্লাহ্
(সাঃ) বলেন,
عَنْ مُعَاوِيَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ
عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ(مُتَّفَقٌ
عَلَيْهِ, مشكوة-১/৭০-২০০)
“আল্লাহ যার মঙ্গলের ইচ্ছা করেন তাকেই দীনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ প্রদান করেন।”-বুখারী, খ. ১, পৃ. ৩৭
দীনের সঠিক জ্ঞান অর্জন বা ইলম শিক্ষা মুমিনের উপর প্রথম ফরয। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ ﴿محمد: ١٩﴾
“জেনে রাখুন, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই।” -সূরা মুহাম্মদঃ ১৯
এ আয়াত থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, ঈমানের আগে ইলম ফরয। কিভাবে ঈমান আনতে হবে এবং কিভাবে ঈমান বিশুদ্ধ হবে তা
প্রথমে আমাদেরকে জানতে হবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য দীনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা
ফরয। ঈমানের পরে ইলমই
হলো আল্লাহর নিকট মর্যাদা
বৃদ্ধির প্রথম উপায়। ঈমান এবং ইলম এর দ্বারাই আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ্ বলেন,
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا
الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ﴿المجادلة: ١١﴾
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ্ তাদের মর্যাদা উচচ করে দিবেন। আল্লাহ্ খবর রাখেন যা
কিছু তোমরা কর।” -সূরা মুজাদালাহ্ঃ ১১
অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে ইলম শিক্ষার সাওয়াব ও মর্যাদা বেশী। এ স¤পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন,
عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ: ্রفَضْلُ الْعِلْمِ خَيْرٌ مِنْ فَضْلِ الْعِبَادَةِ (المستدرك علي
الصحيين للحاكم-১/১৭১-৩১৭)
“ইবাদতের ফযীলতের চেয়ে ইলমের ফযীলত অধিক উত্তম।”-আল মুস্তাদরাক হাকীম খ. ১, পৃ ১৭১
শিক্ষার ফজীলত
ইলম শিক্ষা করার জন্য পথে চলা, হাঁটা, কষ্ট করা ইত্যাদিও ইবাদত। এগুলোর মর্যাদা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বেশি। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)বলেন,
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ
طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا
رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ وَإِنَّ الْعَالِمَ يسْتَغْفر لَهُ من فِي السَّمَوَات
وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالْحِيتَانُ فِي جَوْفِ الْمَاءِ وَإِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ
عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ عَلَى سَائِرِ
الْكَوَاكِبِ وَإِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ
الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا وَإِنَّمَا وَرَّثُوا
الْعِلْمَ فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ ". (رَوَاهُ أَحْمَدُ
وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِي, مشكوة-১/৭৪-২১২)
কোনো টাকা-পয়সা দীনার-দিরহামের উত্তরাধিকারী রেখে যান নি। তাঁরা শুধু ইলমm“যদি কেউ ইলম
শিক্ষার মানসে কোনো পথে চলে, তবে আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। ফিরিশতাগণ ইলম শিক্ষার্থীর এই কর্মের
প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তার জন্য তাদের পাখনাগুলো বিছিয়ে দেন। আলিমের জন্য আসমান
এবং জমিনের সকলেই ক্ষমা প্রার্থনা করে এমনকি পানির মধ্যে মাছও তাদের জন্য ক্ষমা
প্রার্থনা করে। তারকারাজির উপরে চাঁদের যেমন মর্যাদা, ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত আবিদের উপরে আলিমের মর্যাদা তেমনই। আলিমরাই হচ্ছেন
নবীদের উত্তরাধিকারী। নবীরা এর উত্তরাধিকারী
রেখে যান। কাজেই যে ব্যক্তি ইলম গ্রহণ করল, সে নবীদের উত্তরাধিকার থেকে একটি বড় অংশ গ্রহণ করল।” -আহমদ; তিরমিযী; আবূ দাঊদ; ইবন মাজাহ;
দারেমী; মিশকাতঃ ২১২
ইলম শিক্ষার উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করলে, আলিমের নিকট গমণ করলেও একই রূপ সওয়াব ও
মর্যাদা পাওয়া যাবে বলে বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)আরো বলেন,
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمْ
قَالَ: ্রمَنْ غَدَا إِلَى الْمَسْجِدِ لَا يُرِيدُ إِلَّا أَنْ يَتَعَلَّمَ
خَيْرًا أَوْ يَعْلَمَهُ، كَانَ لَهُ كَأَجْرِ حَاجٍّ تَامًّا حِجَّتُهُগ্ধ (المعجم الكبير للطبراني
: ৭৪৭৩,صحيح ابن حبان : ৮৭)
“যদি কোনো ব্যক্তি সকাল বা দ্বিপ্রহরের পূর্বে মসজিদে গমন করে, তার গমনের একমাত্র
উদ্দেশ্য হয় (ইমামের খুতবা থেকে) কোনো ভাল কিছু শিক্ষা করা অথবা শিক্ষা দেওয়া,
তবে সেই ব্যক্তি
একটি পরিপূর্ণ হজ্জের সাওয়াব লাভ করবে।”-সহীহ ইবন হিব্বানঃ ৮৭; তাবারানীঃ ৭৪৭৩
অন্য হাদীসে তিনি বলেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ
عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: ্রمَنْ جَاءَ مَسْجِدِي هَذَا،
لَمْ يَأْتِهِ إِلَّا لِخَيْرٍ يَتَعَلَّمُهُ أَوْ يُعَلِّمُهُ، فَهُوَ
بِمَنْزِلَةِ الْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ،(ابن ماجة-১/৮২-২২৭)
“যে ব্যক্তি আমার মসজিদে আগমন করবে, তার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে কোনো বিষয় শিক্ষা করা বা শিক্ষা দেওয়া,
সেই ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায়
জিহাদকারী মর্যাদা লাভ করবেন।” -ইবন মাজাহ, খ. ১, পৃ. ৮২
অন্য হাদীসে তিনি সাহাবী আবূ যার (রাঃ)কে বলেন,
آيَةً مِنْ كِتَابِ اللَّهِ، خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ تُصَلِّيَ مِائَةَ
رَكْعَةٍ، وَلَأَنْ تَغْدُوَ فَتَعَلَّمَ بَابًا مِنَ الْعِلْمِ، عُمِلَ بِهِ أَوْ
لَمْ يُعْمَلْ، خَيْرٌ مِنْ أَنْ تُصَلِّيَ أَلْفَ رَكْعَةٍগ্ধ (ابن ماجة-১/৭৯-২১৯)
“তুমি যদি কুরআনের একটি আয়াত শিক্ষা কর, তবে তা তোমার জন্য একশ রাক‘আত নফল সালাত আদায়
করার থেকেও উত্তম। আর যদি তুমি ইলমের একটি অধ্যায় শিক্ষা কর, আমলকৃত অথবা আমলকৃত নয় তবে তা তোমার জন্য
এক হাজার রাক‘আত সালাত আদায় থেকেও উত্তম।” -ইবন মাজাহ, খ. ১, পৃ. ৭৯
অন্যকে শিখালে ইলম-এর সাওয়াব চক্রবৃদ্ধিহারে বৃদ্ধি পায় এবং ইলমের সাওয়াব
মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকে। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন,
مَنْ عَلَّمَ عِلْمًا فَلَهُ أَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهِ، لَا يَنْقُصُ
مِنْ أَجْرِ الْعَامِلِগ্ধ (ابن ماجة-১/৮৮-২৪০)
“যদি কেউ কোনো ইলম শিক্ষা দেয়, তবে সেই শিক্ষা অনুসারে যত মানুষ কর্ম করবে সকলের সমপরিমাণ
সাওয়াব ঐ ব্যক্তি লাভ করবে, কিন্তু এতে তাদের সাওয়াবের কোনো ঘাটতি হবে না।” -ইবন মাজাহ,
খ. ১, পৃ. ৮৮
আমাদের সকল নেক আমল মৃত্যুর সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ইলমের সাওয়াব মৃত্যুর পরেও
অব্যাহত থাকে। রাসূলুল্লাহ্
(সাঃ) বলেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ
صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ
عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أوعلم ينْتَفع بِهِ
أوولد صَالح يَدْعُو لَهُ (رَوَاهُ مُسلم ,مشكوة-১/৭১-২০৩)
“যখন কোনো আদম-সন্তান মৃত্যুবরণ করে তখন তার সকল কর্ম বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তিনটি কর্মের
সাওয়াব সে অব্যাহতভাবে পেতে থাকে: প্রবাহমান দান (সাদকায়ে জারিয়া), উপকারী ইলম এবং
নেককার সন্তান যে তার জন্য দু‘আ করতে থাকে।”-মুসলিম, খ. ১. পৃ. ১২৫৫; মিশকাতঃ ২০৩
শিক্ষার মূল উৎস
ইসলামী ইলমের মূল উৎস হলো কুরআন ও হাদীস। এ জন্য প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো,
কুরআন কারীম পাঠ
করা এবং তার অর্থ অনুধাবন করা। মহান আল্লাহ্ কুরআনে বারংবার কুরআন কারীম বুঝে পড়তে এবং তা থেকে শিক্ষা
গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআন পাঠের পাশাপাশি প্রত্যেক মুসলিমকেই যথাসাধ্য বেশি
বেশি সহীহ হাদীসের গ্রন্থ পাঠ করে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সুন্নাত জানতে ও মানতে হবে। কুরআন-হাদীসের অনুবাদ পাঠ করব নিজেদের
ঈমান-আমল পরিশুদ্ধ করতে এবং সামান্য হলেও কুরআন ও হাদীসের নূর গ্রহণ করতে। এগুলো পড়লেই
ইসলামের সবকিছু জানা হয় না। এগুলো অবশ্যই পড়তে হবে। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ আলিমদের
মুখ ও লেখা থেকেও শিখতে হবে।
যারা পরবর্তী যামানার গল্প কাহিনী বা অলৌকিক কিচ্ছা অথবা জাল হাদীস নির্ভর
ওয়ায করেন বা বই পুস্তক লিখেন তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: ্রسَيَكُونُ فِي آخِرِ أُمَّتِي
أُنَاسٌ يُحَدِّثُونَكُمْ مَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُمْ، وَلَا آبَاؤُكُمْ،
فَإِيَّاكُمْ وَإِيَّاهُمْগ্ধ(رَوَاهُ مُسلم)
“শেষ যুগে আমার উম্মতের কিছু মানুষ তোমাদেরকে এমন সব হাদীস বলবে যা তোমরা বা
তোমাদের পিতা-পিতামহগণ কখনো শুনেনি। খবরদার! তোমরা তাদের থেকে সাবধান থাকবে।” -মুসলিম, খ. ১, পৃ. ১২, হাঃ ৬
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ
اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রكَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ
يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سمعগ্ধ . رَوَاهُ مُسلم ,مشكوة-১/৫৫-১৫৬)
“একজন মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বর্ণনা করবে।” -মুসলিম, খ. ১, পৃ. ১০
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আরো বলেন,
عَن سَمُرَة بن جُنْدُب وَالْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ قَالَا: قَالَ رَسُولُ
اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَنْ حَدَّثَ عَنِّي بِحَدِيثٍ
يَرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبِينَগ্ধ (رَوَاهُ
مُسلم ,مشكوة-১/৭০-১৯৯)
“যে ব্যক্তি আমার নামে কোনো হাদীস বলবে এবং তার মনে সন্দেহ হবে যে, হাদীসটি মিথ্যা,
সেও একজন
মিথ্যাবাদী।” -মুসলিম, খ. ১, পৃ. ৯
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আরো বলেন,
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى
اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: ্রمن تَقول عَليّ مالم أَقُلْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِগ্ধ( رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي دَلَائِل النُّبُوَّة ,مشكوة : ৫৯৪০)
“আমি যা বলিনি সে কথা যে আমার নামে বলবে (আমার নামে মিথ্যা বলবে) তার আবাস্থল
জাহান্নাম।” -বাইহাকী; মিশকাতঃ ৫৯৪০
১২. শিক্ষায়
শিক্ষকের ভূমিকা [Teacher’s Role in Education]
শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাক্রম ও শিক্ষা পরিকল্পনাকে বাস্তবে
রূপদান করেন শিক্ষকগণ। শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষার এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। ব্যাপক অর্থে যিনি তাঁর অর্জিত শিক্ষা ও
অভিজ্ঞতা ফলপ্রসূতার সাথে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করতে পারেন তিনিই প্রকৃত
শিক্ষক। একজন শিক্ষকের ভূমিকা ও প্রভাব অনেক সময় জাতীয় ও ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করতে
পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে উন্নত সভ্যতা ও বিশ্ব শান্তির সহায়ক হতে পারে। মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন তেমনি এক তুলনাহীন শিক্ষক। যার প্রভাব সকল
জাতীয় ও ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করেছে। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর দৃষ্টিতে মহানবী (সাঃ)-এর জীবন ও কর্ম গোটা মানব জাতির সম্পদ,
শুধু মুসলিমদের নয়। তাঁর ভাষায়,
“I have read sir Abdullah Suhrawardy’s collections of the sayings of the
Prophet with much interest and profit. They are among the treasures of mankind,
not merely Muslims.”
শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকের ভূমিকা নিম্মরূপ
:
১২.১ নির্দেশনা দান।
১২.২ উৎসাহ দান।
১২.৩ ব্যাখ্যা দান।
১২.৪ পেশা বা বৃত্তি নির্বাচনে সহায়তা দান।
১২.৫ মূল্যবোধ পরিবেশন বা উপস্থাপন।
১২.৬ পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন।
১২.৭ সমন্বয় সাধন।
১৩. ইসলামে
একজন আদর্শ শিক্ষক [An Ideal Teacher In Islam]
আদর্শ শিক্ষক একটি বিস্তৃত ধারণা। আদর্শ শব্দটি শিক্ষকের অগ্রে বা পূর্বে স্থান পাওয়ায় এরূপ
অবস্থার অবতারণা হয়। আদর্শ শব্দটি আমাদের সমাজে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। আদর্শ শিক্ষক কে? এ উপলব্ধির জন্য ‘আদর্শ’ কে হবেন সে বিষয়ে ঐকমত্য প্রয়োজন। ‘আদর্শ’ শব্দটির আভিধানিক
অর্থ হল ‘অনুসরণীয় নমুনা” বা Exemplary character। অর্থাৎ এমন একটি নমুনা, যা সম্পূর্ণ এবং
খুবই উপযুক্ত সকল মানুষের, সকল সময়ে, সকল কাজে অনুসরণের জন্য। সার্বিক অর্থে আদর্শ হল, এমন একটি নমুনা,
যা মানুষ সৃষ্টির
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনে সকল মানুষের সকল প্রয়োজন পূরণে অনুসরণীয় ও
অনুকরণীয়।
আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেন, “তোমাদের জন্য অরশ্যই আল্লাহ্ রাসূলের [জীরনের] মধ্যে অনুসরেণযোগ্য উত্তম আদর্শ রয়েছে,
যে আল্লাহ্ তায়ালার সাক্ষাত
প্রত্যাশী ও আখিরাতকে ভয় করে এবং যে বেশি পরিমণে আল্লাহ্ তা’য়ালাকে স্মরণ করে।”
আল্লাহ্ তায়ালা আরো বলেন, “তিনিই [আল্লাহ্] উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য হতে,
যিনি তাদের
[মানুষের] কাছে আল্লাহ্ তা’য়ালার আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনান; তাদের পবিত্র করেন এরং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমাত; ইতোপূর্বে তো তারা
ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।”
আয়াত দুটো থেকে সুস্পষ্টভাবেই উপলব্ধ হয় যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) একমাত্র অনুসরণীয় আদর্শ। আর তাঁকে
অনুসরণকারী শিক্ষকই হলেন আদর্শ শিক্ষক এবং একজন আদর্শ শিক্ষকের কাজ প্রধানত চারটিঃ
১৩.১ মানুষের নিকট আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন তুলে ধরে মানুষকে আল্লাহ্ তায়ালা সম্পর্কে
সঠিক ধারণা প্রদান করা।
১৩.২ মানুষদেরকে পবিত্রকরণ অর্থাৎ অজ্ঞানতা ও
কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করে জীবন ও জগতের প্রকৃত সত্য জ্ঞানের আলোকে মানুষের
চরিত্রকে পুনর্গঠন। মানুষের মধ্যে সু-স্বভাবের চর্চা ও লালন এবং কু-স্বভাব নিয়ন্ত্রণ ও বর্জনের
মাধ্যমে ইহকালীন শান্তিময় জীবন-যাপন ও পরকালীন জীবনে আল্লাহ্ তায়ালার কঠিন আযাব থেকে মুক্তির
ব্যবস্থা করা।
১৩.৩ কিতাব শিক্ষা অর্থাৎ নাযিলকৃত কুরআনে উলেখিত
যে কোনো জ্ঞানের বিষয়ে গভীর মর্ম উপলব্ধি করতে সহায়তা করা।
১৩.৪ হিকমাত শিক্ষা, অর্থাৎ অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের কৌশল বা
প্রযুক্তির শিক্ষা দান করা যার মাধ্যমে মানুষ বস্তুজগতকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে
সক্ষম হবে এবং দক্ষতার সাথে [Efficiently] আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হবে।
আয়াতের পর্যালোচনান্তে বলা যায় আদর্শ শিক্ষক হলেন তিনি, যিনি আদর্শতম শিক্ষক মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে অনুসরণ করে সূচারুরূপে উপরে বর্ণিত
দায়িত্বগুলো পালন করেন। আর কোনো নাস্তিক, মুশরিক ও মুনাফিক যেহেতু মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে আদর্শ বলে বিশ্বাস করে না এবং অনুসরণও করে না তাই কোন
নাস্তিক, মুশরিক ও মুনাফিক কখনো আদর্শ শিক্ষক হতে পারে না। একজন আদর্শ শিক্ষকের কাছে ছাত্র, অভিভাবক ও সমাজের
প্রত্যাশা অনেক। যে প্রত্যাশা পূরণ না হলে হতাশা আছড়ে পড়ে। নিম্মে উলেখযোগ্য কিছু প্রত্যাশা তুলে ধরে হলঃ
ক. যথার্থ আদর্শিক জ্ঞানে মণ্ডিত হবেন।
খ. নিজস্ব ধর্মীয় দর্শন ও অন্যান্য জীবন
দর্শন সম্পর্কে জ্ঞান রাখবেন।
গ. আদর্শের ভিত্তিতে আল্লাহর অনুগত বান্দাহ হিসেবে ছাত্রদেরকে গড়ে
তুলবেন।
ঘ. প্রতিটি পাঠ আদর্শের সােেথ সম্পৃক্ত করে
পড়াবেন।
ঙ. আদর্শ বিরুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি খণ্ডন করতে
সক্ষম হবেন।
চ. সুন্দর চারিত্রিক গুণাবলী ও ব্যবহারের
মাধ্যমে নিজস্ব আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করবেন।
ছ. কথা ও কাজের মধ্যে মিল রাখবেন।
জ. আদর্শ প্রচারে কুশলী ও সাহসী হবেন।
ঝ. ইবাদাতের পড়হপবঢ়ঃ নিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের
কল্যাণকে সামনে রেখে শিক্ষাদানে ব্রতী হবেন।
১৫. ইসলামে শিক্ষার ভূমিকা [জড়ষব ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ ওহ ওংষধস]
দেহ ও মন দিয়ে আল্লাহ্ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং মানুষের শিক্ষাব্যবস্থায় দেহ ও মনের প্রয়োজন পূরণ হয়,
দেহ ও মনের
পরিপূর্ণ বিকাশ হয়, সে ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দেহ ও মন উভয়টির প্রয়োজন না মিটলে শিক্ষা মানুষকে
একদেশদর্শীরূপে গড়ে তোলে। বস্তুবাদী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিলে মানুষ পশুর চেয়েও নিæমানের আচরণে বেড়ে
ওঠে। আবার শুধু মনের বা
আধ্যাত্মিক জাতীয় অর্থাৎ শুধু ঊর্ধ্ব জগত বিষয়ে শিক্ষাকে প্রাধান্য দিলে মানুষ
বাস্তব জীবনে কোন কাজেই লাগেনা। বাস্তব জীবন পরিচালনায় সামান্যতম কোনো অবদান রাখতে সক্ষম হয়
না। একমাত্র ইসলামী
শিক্ষাই এই উভয়ের সমন্বয় করে মানুষের দেহ ও মনের পরিপূর্ণ বিকাশের সহায়ক হবার
যোগ্যতা রাখে। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ইসলামী শিক্ষা মানব সমাজে নিম্মোক্ত ভূমিকা রেখে যায়ঃ
১. মানুষের দেহ ও মনের চাহিদা যথার্থভাবে
পূরণ করে।
২. সৎ, চরিত্রবান ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে।
৩. মানুষকে তার স্রষ্টা আল্লাহর সাথে পরিচিত করে।
৪. মানুষের ইহকালীন শান্তি [রাজনৈতিক,
অর্থনৈতিক,
সামাজিক ইত্যাদি
সকল ধরণের সমস্যার সমাধান দিয়ে ] ও পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত করে।
৫. মানুষের মাঝে পারস্পরিক মমত্ববোধ ও
ভালোবাসা সৃষ্টি করে।
৬. আল্লাহর বিশাল সৃষ্টি প্রাকৃতিক শক্তির গূঢ়
রহস্য উদ্ভাবন ও কলাকৌশল আবিস্কার করে মানবতার কল্যাণ সাধন করে।
৭. মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে বা
থাকতে সহায়তা করে।
৮. হক্কুল্লাহ এবং হক্কুল ইবাদ বা স্রষ্টা ও সৃষ্টির
প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে।
৯. জাগতিক শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে
ভারসাম্যমূলক জীবন গড়তে সহায়তা করে।
মানুষকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে অকুতোভয় করে তোলে।
১৬. ইসলামী শিক্ষার বৈশিষ্ট্য [Features of Islamic Education]
ক. কল্যাণকর জ্ঞান মাত্রই ইসলামীঃ
আল্লাহর কাছে মুমিনদের স্বপ্নের চাওয়া, “হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে দুনিয়ার কল্যাণ দান করুন। আর পরকালের
কল্যাণও। আর আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন”
আবু উমামাহ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “ ..... অবশ্যই আল্লাহ্, তাঁর ফেরেশতাগণ, আসমান ও পৃথিবীর অধিবাসীবৃন্দ, এমন কি গর্তের পিঁপড়া, এমনকি পানির মাছ ঐ
ব্যক্তির জন্য দুআ করতে থাকে যে ব্যক্তি লোকদেরকে কল্যাণকর জ্ঞান শিক্ষা দেয়।”
আল্লাহ্ ও রাসূল (সাঃ) জ্ঞানকে
দুনিয়াবী ও ইসলামী এভাবে কোনো পার্থক্য করেননি। কল্যাণকর জ্ঞান মাত্রই ইসলামী। তা দুনিয়ার হোক বা
আখিরাতের কল্যাণ হোক।
খ. মূর্খতার অবসান ও ইসলামের যর্থাথ জ্ঞান অর্জনঃ
আল্লাহ্ বলেন, “ বল, যারা জানে আর যারা জানেনা তারা কি সমান?” আল্লাহ্ আরো বলেন, “তারা কি দেশ ভ্রমণ করেনি? তাহলে তারা
জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয় ও শ্র“তিশক্তিসম্পন্ন শ্রবণের অধিকারী হতে পারতো। বস্তুত চক্ষু তো
অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে বক্ষস্থিত হৃদয়। ”
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন, “সকল মুসলিমের জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করা ফারয”
উসমান ইবনু আফফান (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন, “তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে
আলকুরআন শেখে এবং অপরকে তা শেখায়।”
একজন মুসলিমের মূর্খের মত জীবন পরিচালনার অবকাশ নেই। হৃদয়কে অন্ধ রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে
অসভ্যতা। আল্লাহর আদেশ অমান্যের
শামিল। নিজের হৃদয়কে
জ্ঞান দিয়ে আলোকিত করে একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে মুমিনকে সমাজে কল্যাণময় ভুমিকা
রেখে যেতে হয়।
গ. জ্ঞানের মূল উৎস আল্লাহ্ তা’য়ালা একমাত্র নির্ভুল জ্ঞানের
অধিকারীঃ
আল্লাহ্ বলেন, “হে নবী বলুন, আল্লাহই সমস্ত জ্ঞানের মালিক।” আল্লাহ্ আরো বলেন, “গোপন-প্রকাশ্য, দৃশ্য-অদৃশ্য, মূর্ত-বিমূর্ত সব কিছুর জ্ঞান তাঁর কাছে রয়েছে এবং একমাত্র
তাঁরই কাছে আছে।”
আল্লাহ্ বলেন, “তাঁর জ্ঞাত বিষয়ের কেনো কিছুই মানুষ নিজের আয়ত্বাধীন করতে পারেনা, তবে তিনি যতটুকু
চান তা ব্যতীত।”
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল
আস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন, “আমার কাছ থেকে একটি কথা শিখে থাকলেও লোকদের নিকট তা পৌঁছাও।”
জীবনের প্রয়োজনে যত প্রকার বিদ্যা শিক্ষা করতে হয় তা সবই ওহীর দৃষ্টিকোণ বা
ইসলামী দৃষ্টিকোণ হতে শিক্ষা নিতে হবে, দিতেও হবে। কারণ একমাত্র আল্লাহ্ তা’য়ালাই নির্ভুল জ্ঞানের অধিকারী ।
ঘ. শুধু আল্লাহর ইবাদাত ও প্রতিনিধিত্বের যোগ্যতা
অর্জনঃ
আল্লাহ্ বলেন, “আমি জ্বীন ও মানুষকে
সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদাতের জন্য।” আল্লাহ্ আরো বলেন, “আর স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে খালিফা
সৃষ্টি করছি।”
সকল ধরণের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামের সাথে মানব রচিত বিধানের তুলনামূলক
আলোচনার মাধ্যমে
ইসলামের যৌক্তিকতা
ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের যোগ্যতা অর্জন করে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর যর্থাথ প্রতিনিধিত্ব করা। এ লক্ষ্যে
শিক্ষাব্যবস্থার উচ্চস্তরে মুসলিম বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, শাসক, বিচারক, অর্থনীতিবিদ, সেনাপতি ও রাষ্ট্রদূত সহ উন্নতমানের
মুফাস্সির, মুহাদ্দিস, ফকীহ্ ও মুজতাহিদ সৃষ্টির উপযোগী কারিকুলাম তৈরি করা।
ঙ. পরমতসহিষ্ণুতাঃ
আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেন, “তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার প্রসারে সহযোগিতা কর। পাপাচার ও সীমা লংঘনের কাজে সহযোগিতা
করোনা।”
মহানবী (সাঃ) বলেছেন,
‘‘যে ব্যক্তি কোন
চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করল সে জান্নাতের ঘ্রাণও ভোগ করতে পারবে না। অথচ জান্নাতের
সুঘ্রাণ ৪০ বছরের দূরত্ব হতেও অনুভব করা যাবে।’
নিছক ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে অমুসলিমদের হত্যা করা, আক্রমণ করা বৈধ নয়। এছাড়া অমুসলিমদের সাথে আলোচনা বা
তর্ক-বিতর্ক অনুষ্ঠানে ইসলামের আপত্তি নেই। কিন্তু তা হতে হবে ভদ্রজনোচিত পন্থায়। পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য
দিয়ে। হৃদয়গ্রাহী যুক্তি
প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেন,
“আহলে কিতাবের সাথে
তর্ক-বির্তক করতে হলে একমাত্র ভদ্রজনোচিত পন্থায় তা কর।” অমুসলিমদের সাথে অভদ্র ও অশোভন আচরণকে
ইসলাম অনুমোদন দেয়নি। বৈধ করেনি। এমনকি ইসলামের পরিপন্থী আকীদা বিশ্বাস পোষণ করার জন্য তাদেরকে গালিগালাজ করারও
অনুমতি দেয়নি। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন,
“যারা আল্লাহ্ তা’য়ালাকে ছাড়া
অন্যান্য উপাস্যের পূজা করে, তাদেরকে গালি দিও না। তাহলে তারা শত্র“তা ও অজ্ঞতা বশতঃ আল্লাহকে গালি দেবে। ”
চ. পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা গবেষণা করাঃ
আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনাবলী
রয়েছে বোধশক্তিসম্পন্ন লোকের জন্য, যারা দাড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা
করে ও বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি, আপনি পবিত্র, আপনি আমাদের জাহান্নামের আযাব হতে রক্ষা
করুন।’ ”
আল্লাহ্ আরো বলেন, “তুমি কি দেখ না, আল্লাহ্ আসমান হতে বৃষ্টিপাত করেন; এবং আমি এর সাহায্যে নানা রঙের ফল বের করি। আর পাহাড়ের মধ্যে
আছে নানা রঙের পথ - সাদা, লাল ও নিকষ কালো। মানুষ, জীব-জন্তু ও গৃহপালিত পশুগলোরও রয়েছে নানা রঙ। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে
যারা জ্ঞানী তারাই তাঁকে ভয় করে; আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল।”
পৃথিবী ও মহাবিশ্বে বিরাজমান বহু সংখ্যক সৃষ্টির দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ
করেছেন আল্লাহ্ তা’য়ালা, যাতে মানুষ তা
নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে। আর চিন্তা-গবেষণা করে আল্লাহর এসব সৃষ্টির তাৎপর্য উপলব্ধিকারীরাই
বলতে সক্ষম হয়, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি, আপনি পবিত্র।’
ছ. মানবতার মুক্তির জন্য চিন্তাঃ
আল্লাহ্ বলেন, “আমি কি তোমার জন্য তোমার বক্ষ প্রশস্ত করিনি? আর আমি নামিয়ে দিয়েছি তোমার থেকে তোমার
বোঝা, যা তোমার পিঠ ভেঙ্গে দিচ্ছিল।”
আল্লাহ্ বলেন, “আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।”
আল্লাহ্ আরো বলেন, “ভালো কাজ এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হল
যে ঈমান আনে আল্লাহ্, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্তে¡ও নিকটাত্মীয়গণকে,
ইয়াতীম, অসহায়, মুসাফির ও
প্রার্থনাকারীকে এবং বন্দিমুক্তিতে এবং যে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং যারা অঙ্গীকার করে তা
পূর্ণ করে, যারা ধৈর্যধারণ করে কষ্ট ও দুর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে। তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকী।”
জাহিলিয়াত তথা মূর্খতার যুগে নৃশংসতাই ছিল মানবতার সংজ্ঞা। সাধারণ মানুষের
দুঃখ-দুর্দশা নবী (সাঃ)-এর হৃদয়কে
ক্ষতবিক্ষত করেছিল। সমাধানের প্রত্যাশায় তার হৃদয়টা হয়ে পড়েছিল
ভারাক্রান্ত। অধিক শোকে পাথর। লাঘবহীন ভারী এক কষ্টের বোঝা তাঁকে ক্রমাগত যন্ত্রণাক্লিষ্ট করছিলো। মানুষের মুক্তির
দিশার জন্য উচাটন মনে আল্লাহ্ নাযিল করলেন কুরআন। মানবজাতির মুক্তির সনদ।
জ. অহংকার নয়, বিনয় ও নম্রতাঃ
মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে নবী (সাঃ)-এর দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রাম সফল হবার পর বিজয় প্রাক্কালে আল্লাহ, রাসূল (সাঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন বিনয়ের এবং ক্ষমা
প্রার্থনার। আল্লাহ বলেন, “যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়
আসবে এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে দেখবে, তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ
তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো, তিনি তো তাওবা কবুলকারী।”
আল্লাহ আরো বলেন, “ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না; তুমি তো কখনই পদভারে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং
উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বতপ্রমাণ হতে পারবে না।”
ঝ. অনুমান নয়, জ্ঞান ও যাচাই
আল্লাহ বলেন, “যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না; চক্ষু, কর্ণ, হৃদয় - এসব প্রত্যেকটির সম্পর্কে কৈফিয়ত
তলব করা হবে।”
আল্লাহ আরো বলেন, “হে মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী তোমাদের নিকট কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, পাছে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো স¤প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে বসো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের
জন্য তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়।”
মুসলিম মাত্রই জ্ঞান নির্ভর আচরণ করতে হবে। অন্ধত্ব ও মূর্খতা মুসলিমদের জন্য শোভনীয়
নয়।
ঞ. তাত্ত্বিক নয়, ব্যবহারিকঃ
আল্লাহ বলেন, “মু’মিনদের দুই দল দ্ব›েদ্ব লিপ্ত হরে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে;
আর তাদের একদল অপর
দলের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করলে, যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করবে,
যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে
ফিরে আসে - যদি তারা ফিরে আসে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে ফায়সালা করবে এবং সুবিচার
করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে
ভালবাসেন।”
আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, তোমার ভাইকে সাহায্য কর। সে যালিম হোক কিংবা মাযলুম। একজন বললো,
হে আল্লাহর রাসূল, মাযলুমকে আমরা
সাহায্য করবো এটা তো বুঝলাম কিন্তু যালিমকে আমরা কেমন করে সাহায্য করবো?
তিনি বললেন,
“তুমি তার
[যালিমের] হাত শক্ত করে ধরে রাখবে।”
ইসলাম তাত্তি¡ক কোনো দর্শন নয়; ইসলাম ব্যবহারিক জীবনের বাস্তব নির্দেশনা। প্রয়োজনে যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছে ইসলাম;
তবে কোনো
অবস্থাতেই সুবিচারকে উপেক্ষা করে নয়।
ইসলামী শিক্ষার বৈশিষ্ট্যের আলোকে শিক্ষিত হওয়া এবং এ শিক্ষার আলোকে একটি জাতি
গড়ে তোলায় সবার অংশ গ্রহণের ফলেই কাংখিত পৃথিবীর স্বপ্ন পূরণ হতে পারে। এ কাজে একজন অপর
জনের খুঁত ও দোষকে উপেক্ষা করে প্রত্যেকের ইতিবাচক দিকটিকে উৎসাহিত করা এবং
প্রত্যেকের নিজ মেধা ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করা।
১৭. ইসলামী শিক্ষার ভিত্তি [Bases of Islamic Education]
ইসলামী শিক্ষার মূল ভিত্তিগুলো হলঃ
১. তাওহীদঃ
মানুষের ইবাদাত পাবার যোগ্যতা ও অধিকার একমাত্র এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহরই আছে।
২. রিসালাতঃ
আল্লাহ মানব জাতিকে সত্য পথ দেখাবার জন্য বিধানসহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন।
৩. আখিরাতঃ
এ পৃথিবীর পরবর্তী জীবনে পৃথিবীর সমুদয় কর্ম সম্পর্কে জবাবাদিহি করতে হবে এবং
তার ভিত্তিতে শাস্তি ও পুরস্কার প্রদান করা হবে।
৪. খিলাফাতঃ
এ পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ মুতাবিক তাঁরই বিধান ব্যক্তিক, সামষ্টিক ও আন্তর্জাতিক জীবনে বাস্তবায়ন
করবে।
৫. বিশ্বভ্রাতৃত্বঃ
পৃথিবীর সকল মানুষ আদম (আ) ও হাওয়ার (রা) সন্তান। এজন্য তারা পরস্পর ভাই ভাই। কৃত্রিম কোন কারণে
মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করা যাবেনা।
৬. ব্যক্তি-স্বাধীনতাঃ
মানুষ স্বাধীন ভাবে জন্ম গ্রহণ করে এবং স্বাধীন ভাবে একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার বান্দা
হিসেবে জীবন যাপন করবে।
৭. মৌলিক অধিকারঃ
অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণ হওয়া।
৮. সৎকাজের আদেশ ও
অসৎ কাজের নিষেধঃ
সৎকাজে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা।
উপসংহার
নিরক্ষতার অভিশাপ জাতির জন্য একটি কলংক। এর থেকে পরিত্রানের উপায় হচ্ছে শিক্ষা গ্রহণ করা। সুশিক্ষাই জাতির
মেরুদন্ড। কুশিক্ষা থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। তাহলে সঠিক শিক্ষার উপকারীতা আমাদের সমাজে সফলতা বয়ে আনবে।



No comments:
Post a Comment