ব্যক্তি, বস্তু ও তথ্যের নিরাপত্তায়
ইসলামের দিকনির্দেশনা

কারণ ইসলাম এমন কতগুলো বিধানের সমষ্টি যা পালনে মানুষ
শান্তি ও নিরাপদে বসবাস করতে পারে ইহকাল ও পরকালে। ব্যক্তি ও সমাজ, ব্যষ্টি ও সমষ্টি পৃথিবীতে বাস করতে যে
বিবেচনা, অন্যের হিতে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হওয়ার যে প্রেরণা, এ
জগতে ও আখেরাতে কল্যাণময় অনুশীলন ও পরিণতির সম্ভাবনাময় উৎসাহ ও উজ্জীবনে যে
একনিষ্ঠতা মনুষ্যজীবনে সাফল্য এনে দেওয়ার বিধিবদ্ধ নিয়ম-শৃঙ্খলা উপস্থাপন করে
তাই-ই হলো ইসলাম। সেজন্যই
আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন,
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার। আল্লাহর
কাছে অধিক প্রিয় সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের (সৃষ্টির) প্রতি দয়ালু।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের মধ্যে সে-ই শ্রেষ্ঠ যে মানুষের
উপকার করে।’ উপকার একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, শান্তি
প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তাবিধান থেকেই যার গন্তব্য শুরু।
দেশে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সংঘাতমুক্ত
সমাজের প্রয়োজনে ইসলামের শান্তিপ্রিয় ও জনহিতকর কল্যাণকামী নৈতিক আদর্শের চর্চা
এখন সময়ের দাবি। মানুষের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও জানমালের
নিরাপত্তা বিধানে ইসলাম অনন্য কালজয়ী আদর্শ। ইসলামে
সন্ত্রাস,
জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থার কোনো স্থান নেই। ইসলামের
যুদ্ধনীতি প্রতিরক্ষামূলক, আক্রমণাত্মক নয়, এমনকি প্রতিশোধমূলকও নয়। রাসুলুল্লাহ
(সা.) কখনো একজন নিরপরাধ মানুষকে প্রকাশ্যে বা গুপ্তহত্যা করেননি। শত
অত্যাচার ও নির্মম নির্যাতন সহ্য করেও তিনি কখনো বাড়াবাড়ি, কঠোরতা বা
গোঁড়ামির পরিচয় দেননি, বরং দীন প্রচারের ক্ষেত্রে চরমপন্থা অবলম্বনের বিরুদ্ধে
ইসলামের সুমহান আদর্শ সমরনীতি ঘোষণা করেছেন,
ইসলাম ইচ্ছাকৃতভাবে মানবসন্তানকে হত্যা করা কঠোর ভাষায় নিষিদ্ধ করেছে। নিরপরাধ
জনগণকে গুলি করে, বোমা মেরে বা যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগে হত্যা করা, পুড়িয়ে
মারা বা প্রাণহানি ঘটানো ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অন্যায়ভাবে
নরহত্যা,
মানুষের জানমালের ক্ষতিসাধন, ভূপৃষ্ঠে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয়
সম্পদ বিনষ্ট করাকে কবিরা গুনাহ আখ্যায়িত করে এর ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ
তাআলা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন,
সমাজজীবনে বিশৃঙ্খলা, হানাহানি ও সন্ত্রাস দমনে শান্তির ধর্ম ইসলাম কঠোর
দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধে কঠিন শাস্তি আরোপ
করেছে। ইসলামের আলোকে যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচলিত
আইনে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের উপযুক্ত ন্যায়বিচার করা হয়, তাহলে আর
কেউ নাশকতা, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে সাহস পাবে না। পবিত্র
কোরআনে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকাণ্ডকে মহা অপরাধ সাব্যস্ত করে কঠোর শাস্তির বিধান
ঘোষিত হয়েছে,
বর্তমান বেসামাল পরিস্থিতিতে সারা দেশে অবরোধে যেভাবে জনদুর্ভোগ, নিরাপত্তাহীনতা, নাশকতা, নৃশংসতা, ফেতনা-ফাসাদ ও সন্ত্রাসবাদ চলছে, সর্বস্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনাচার, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে, এতে যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম ব্যাঘাত হচ্ছে, তেমনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে জননিরাপত্তার ব্যাঘাত ঘটছে। যেসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী দুর্বৃত্ত বিভিন্ন স্থানে নানা পর্যায়ে সন্ত্রাস, বোমাবাজি, গুপ্তহত্যা ও প্রকাশ্য দিবালোকে নরহত্যা, অপহরণ, হামলাসহ ধর্মবিরোধী মানবতাবিবর্জিত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, বাস্তবিকই তারা ইসলামের মর্মবাণীর সঙ্গে সম্পর্কহীনই বটে। জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী এসব ফেতনা-ফাসাদ প্রতিরোধে কথা ও কলমের জিহাদ অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা, সমাজে ফেতনা-ফাসাদ, মানবিক বিপর্যয়,
নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করাকে হত্যার চেয়েও জঘন্যতম অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
মানবাধিকার মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকার। জানমালের নিরাপত্তার অধিকার ছাড়া মানুষ শান্তিতে বসবাস ও নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে না। এ জন্য ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের অনিবার্য পরিণতিতে নির্মম হত্যাকাণ্ড, অমানবিকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় ঘৃণা ব্যক্ত করা,
জোরালো প্রতিবাদ জানানো, জনগণের জানমাল রক্ষায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে সম্মিলিত প্রতিরোধ বা মানববন্ধন গড়ে তোলা যায় এবং সংগ্রামী সচেতন মানুষের সেটাই করণীয়। তাই শিগগির সম্ভব দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ও জনকল্যাণার্থে মানবতার ঐক্য ও শান্তিপূর্ণ সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টিতে বিবদমান দলমত ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই।
যে কোন যুদ্ধ/সংস্থার/সংগঠনের সফলতার জন্য শত্রু সম্পর্কিত গোয়েন্দা
তথ্যের/কার্যক্রমের ভ‚মিকা সর্বাধিক। ইসলামের
বিভিন্ন যুদ্ধ এমনকি সামরিক ইতিহাস থেকে বিভিন্ন যুদ্ধের জয়-পরাজয় বিশ্লেষন করলে
দেখা যায় যে, এক দিকে যেমন শত্রু সম্পর্কিত সঠিক তথ্যের
অভাবে অস্ত্র ও জনবলে অধিকতর শক্তিশালী হওয়া সত্তে¦ও অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী সেনাবাহিনীর নিকট পরাজয় স্বীকার
করতে হয়েছে, অপরদিকে তেমনি
সকল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করে অনেক ক্ষুদ্র সেনাসদল ও অপেক্ষাকৃত
বৃহৎ দলের উপর জয়ী হয়েছে। শক্তি যত বেশী থাকুক শত্রু সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় সঠিক
তথ্যাদি জানা না গেলে শক্তি সঠিক ব্যবহার করা যায় না। ফলে শক্তির
অপচয় হয়। শুধু তাই নয় সংস্থা বা সংগঠনের মাঝে বিরাট বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। আলোচ্য
প্রবন্ধে তথ্যের নিরাপত্তায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াশ প্রকাশ
পাব।
তথ্যের সংগা।
তথ্য এর ইংরেজী প্রতিশব্দ হচ্ছে নিম্নরূপঃ
1. Fact Provided or learned about something
or some one.
অর্থ্যাৎ ঘটনা সরবরাহ
অথবা কোন ব্যক্তি বা ব¯তু স¤পর্কে অবগত হওয়া।
2. Knowledge of specific event or
situations that has been gathered.
3. The
Communication on reception of knowledge or intelligence knowledge obtain from
investigation study on instruction.
অর্থ্যাৎ কোন বিষয় সম্পর্কে যোগাযোগ স্থাপন অথবা অনুসন্ধানকৃত
বিষয় সম্পর্কে চুড়ান্ত দিক নির্দেশনা সরবরাহ করা। আমরা জানি, সামরিক বাহিনীর স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতি
অনেকাংশে নির্ভর করে এই বাহিনীতে কর্মরত প্রতিটি সদস্যের আমানতদারিতাকৃত
অংঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল,
আল্লাহভীতি সর্বোপরি দেশের প্রতি, সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা। কারণ একজন
সেনাসদস্য খুব ভাল করেই জানেন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের খরব, ইউনিটের খবর তথা তথ্য। সেক্ষেত্রে
যদি উলেখিত গুনাবলি একজন সেনা সদস্যের মধ্যে না থাকে, তাহলে সে অনায়াসেই অভ্যন্তরীন তথ্য
বাহিরে প্রকাশ করে দিতে পারে। কারণ ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায় রাসুল (সাঃ)
এর সময়ের বিভিন্ন যুদ্ধের পরিকল্পনা ইসলামী সমাজের গোপন পরামর্শ গোপন তথ্য রাসুল
(সঃ) এরই মজলিসে বসা কতিপয় কপট মুনাফিক চরিত্রের লোকের মাধ্যমে শত্রুর নিকট পৌঁছে
যেত। ফলে মুসলমানদের সাথে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ত এবং পারস্পারিক ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি
হয়। এসব চরিত্রের লোকদের মুখোস উম্মুচন করে মহান আল্লাহ বলেন,
নেতাদের সাথে একান্তে
সাক্ষাৎ করে তখন বলে, আমরা তোমাদের
সাথে রয়েছি আমরাতো মুসলমানদের সাথে উপহাস করি মাত্র"।
আজো আমাদের সমাজে
আমাদের সশস্থ বাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা এ ধরনের চরিত্রের লোক রয়েছে। ইসলামিক
ষ্কলারগন এদেরকে মুনাফিক হিসেবে চিহি“ত করেছেন।
إِذَا
حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا اؤتمن خَان
বিভিন্ন ভাবে তথ্য সংগ্রহ করা যায় যেমনঃ
(১) প্রত্যক্ষ
যোগাযোগঃ সংস্থা/সংগঠন
কর্তৃক নিয়োজিত বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে।
(২) পর্যবেক্ষন।
(৩) গোপনে
গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা।
উলিখিত ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টি ভঙ্গ হচ্ছে। আমরা জানি
রাসুল (সঃ) বিভিন্ন যুদ্ধের প্রাক্কালে তার বিশ্বস্থ সহচরদের সমন¡য়ে গঠিত টিম তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষন করার জন্য প্রেরণ করতেন।
ইতিহাস বিখ্যাত
ইসলামের প্রথম সিদ্ধান্তকারী যুদ্ধ, বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে শত্রু বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষনের
জন্য একদল সাহাবীকে প্রেরণ করেছিলেন। তাদের প্রদত্ত সঠিক প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি
করেই রাসুল (সঃ) যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করেন এবং আল্লাহর প্রত্যক্ষ মদদে মুসলমানগণ
সংখ্যায় কম হলেও বেশী সংখ্যক শত্র“ বাহিনীর বিরুদ্ধে জয় লাভ করে। (আররাহিকুল মাখতুম, সীরাতে ইবনে হিশাম)
তথ্য সরবরাহকারী/সংগ্রহকারীদের যোগ্যতা। তথ্য সরবরাহকারী এবং সংগ্রহকারীদের যোগ্যতার
উপরই নির্ভর করে তথ্যের নিরাপত্তা। যেমনঃ
ক। দক্ষতা।
খ। আনুগত্য।
গ। বিশ্বাস যোগ্যতা।
ঘ। প্রয়োজনীয় স্থানান্তর।
ঙ। যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ।
চ। আল্লাহভীতি।
একমাত্র আল্লাহভীতিই পারে তথ্যের সঠিক নিরাপত্তা বিধান করতে। যেমনঃ কালামে
পাক মহান আল্লাহ বলেন
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا
الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ
তথ্যের নিরাপত্তা
বিধানের চেয়ে ষ্পষ্ট বক্তব্য আর কি হতে পারে ? যেখানে আল্লাহ রাব্বুল আলআমিন সঠিক তথ্যকে গোপন করতে সম্পূর্ণরুপে নিষেধ
করে দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আমরা
হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রাক্কালনের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরতে পারি। ইবনে ইসহাক
বলেন রাসুল (সঃ) তাঁর উদ্দেশ্য জানানোর জন্য খাররাশ বিন উমাইয়া খাযায়ীকে নিজের উটে
ছড়িয়ে মক্কায় কোরায়শের কাছে পাঠালেন। কিন্তু রাসুল (সঃ) এর সেই উটটাকে তারা হত্যা
করলো। তারা খাররাশকে ও হত্যা করতে চেয়েছিলো। কিন্তু আহাবিশীয়রা তা
করতে দেয়নি বরং তাকে রসুল (সঃ) এর কাছে ফিরে আসতে দিয়েছিলো।
পরবর্তীতে রাসুল (সঃ) হযরত ওসমান ইবনে আককানকে আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য কোরায়েশ
নেতার কাছে এই বার্তা দিয়ে পাঠালেন যে, তিনি কোন যুদ্ধ বিগ্রহের উদ্দেশ্য নয়। বরং পবিত্র
কাবার যিয়ারত ও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্তে এসেছেন।
ইবনে ইসহাক বলেন, অতঃপর হযরত ওসমান (রাঃ) মক্কা চলে গেলেন। সেখানে আব্বান
বিন সাঈদ ইবনুল আস তার সাথে সাক্ষাত করলো এবং তাকে আশ্রয় দিলো। হযরত ওসমান
(রাঃ) তার কাছে রাসুল (সঃ) এর বার্তা পৌঁছালেন। বার্তা
পৌঁছানোর পর তারা হযরত ওসমান কে বললো, তুমি যদি কাবা শরীফ তাওয়াফ করতে চাও, তাওয়াফ করো। হযরত ওসমান
রাঃ বললেন, রাসুল (সঃ)
তাওয়াপ না করা পর্যšত আমি করবোনা। এদিকে রাসুল
(সঃ) ও সাহাবীদের কাছে খবর পৌছলো যে, হযরত ওসমান রাঃ কে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তা
ঘটেনি। অথচ সাহাবীগন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কারণ এখানে
তথ্যগত ভুল ছিলো।
তথ্যের নিরাপত্তা বিধানে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব।
তথ্যের নিরাপত্তা বিধানে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন কালামে
পাকে মহান আল্লাহ বলেন,
বিশেষভাবে ফাসেকের উলেখ
করার কারণ এই যে, তার সম্পর্কে
মিথ্যার ধারনা প্রবল হয়ে থাকে। ফাসেকের কথা উলেখ করার আর একটি কারণ এই যে, মুসলিম সমাজে ও সংগঠনে প্রচারিত কোন খবর
নিয়ে যেন সন্দেহের সৃষ্টি না হয়। এমনটি হলে তার তথ্য প্রকাশে অচল অবস্থার সৃষ্টি
হবে। বস্তুত মোমেনদেরকে দলে মৌলিক আকাংখিত জিনিস হলো তার সদস্যদের বিশ্বস্ততা এবং
তাদের প্রচারিত খবরের বিশ্বাস যোগ্যতা । শুধুমাত্র ফাসেকই
সন্দেহজনক আকারে যতক্ষন তার খবর (তথ্য) প্রমানিত না হয়। ইসলামী সমাজ ও
সংগঠন/সংস্থার কাছে যখন কোনো তথ্য পৌঁছবে তখন তার প্রশাসন উক্ত খরচ গ্রহন ও
বর্জনে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে। ফাসেকের তথ্যের ভিত্তিতে কোন পদক্ষেপ গ্রহন
তাড়াহুডা করবে না। যাতে অজ্ঞতা বশতঃ কারো বিরুদ্ধে অন্যায় ও
অবিচারমুলক পদক্ষেপ গৃহীত না হয় এবং পরিনামে আল্লাহর ক্রোধোদ্দীপক কাজ করে
অনুশোচনা করতে না হয়।
প্রেক্ষাপট।
বহুসংখ্যক মোফাসসের উলেখ করেছেন যে, এ আয়াত ওলীদ বিন ওকবার উপলক্ষে নাযিল হয়েছে। রাসুল (সঃ)
তাকে বনু মুসতালেকের
যাকাত আদায় করে আনার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
ইবনে কাসীর বলেন, ওলীদ ফিরে এসে জানালো যে, বলুন মুসতালিক মুসলমানদের বিরুদ্ধে
যুদ্ধ করার প্র¯তুতি নিচ্ছে
(কাতাদার মতে তারা ইসলাম ও ত্যাগ করেছে বলে সে জানিয়েছিলো) পরবর্তীতে রাসুল (সঃ)
তাদের কাছে খালিদ বিন ওলীদকে পাঠালেন এবং তাকে আদেশ দিলেন, যেন তিনি তাঁড়াহুড়া না করেন বরং ধীর¯িহরভাবে সত্যত্য যাচাই করেন। খালেদ তাদের
কাছে রাতের বেলায় পৌঁছলেন এবং তার প্রধান প্রধান সহচরদেরকে তাদের কাছে পাঠালেন। তারা ফিরে এসে
খালেদকে জানালো যে, গোত্রটি
ইসলামের উপর অবিচল আছে এবং তারা তাদের আযান ও নামাজ শুনেছে। সকাল বেলা
খালিদ নিজে গিয়ে যা দেখলেন। তাতে অবাক হয়ে গেলেন।
তিনি রাসুল (সঃ) এর
কাছে ফিরে এসে প্রকৃত ব্যাপার জানা গেল। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাষিল
করলেন। কাতাদা (রাঃ) বলেছেন যে, রসুল (সঃ)
বলতেন ধৈয্যের সাথে সত্যতা যাচাই করা আল্লাহর প্রেরণা থেকে উদ্ভুত কাজ আর তাড়াহুড়া করা শয়তানের প্ররোচীত
কাজ। (ইবনে কাসীর)।
এখানে বক্তব্য ব্যাপক ও সর্বাত্বক। ফাসেকের তথ্য প্রমান সাপেক্ষে আর সৎ মোমেন বিশ¡াসযোগ্য। কেননা
মোমেনদের ক্ষেত্রে এটাই ¯¦াভাবিক ও মুল
কথা। কাসেকের তথ্য ব্যতিক্রম, আর সৎ লোকের
খবর বিশ¡াস করা সত্যতা যাচাই
করার নীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল। কেননা, সৎ লোক সঠিক খবরের অন্যতম উৎস।
সকল তথ্য ও সকল তথ্য
দাতার সন্দেহ প্রকাশ করা মুসলমানদের সমাজে প্রচলিত বিশ¡স্থতার সাধারণ নীতির পরিপন্থী এবং তাতে
সমাজের সাধারণ জীবনযাত্রা অচল
হয়ে যেতে বাধ্য। ইসলাম সাধারণ জীবনযাত্রা ব্যহত না করে তাকে তার
স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেয়ার পক্ষপাতী। সে যে সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কড়াকড়ি আরোপ করে, তা কেবল তার নিরাপত্তার জন্যেই করে। তাকে একেবারে
অচল করে দেয়ার জন্য নয়। খবরের তথ্যের সুত্র ও উৎস স¤পর্কে সাধারণ নীতি ও ব্যতিক্রমী নীতির
মুল কথা এটাই। তথ্যের নিরাপত্তা বিধান স¤পর্কে রাসুল (সঃ) বলেছেন ভুল তথ্য
পরিবেশনকারীকে রাসুল সাঃ মিথ্যাবাদী সাব্যস্থ করেছেন যেমন,
আলোচনার সারনির্বাসে
এসে বলতে পারি যে, তথ্যের
নিরাপত্তায় কুরআন ও হাদীস থেকে যা
আলোচনা করা তা যদি
আমরা বাস্থবায়ন করতে পারি তাহলে আমাদের সংস্থা/সংগঠনে শান্তি, শৃংখলা ও স্থীতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
ব্যক্তি, পরিবার ও
সমাজজীবনে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও সহিংসতাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে; মানবতাবিরোধী সব ধরনের অন্যায় হত্যাযজ্ঞ, রক্তপাত, অরাজকতা ও অপকর্ম প্রত্যাখ্যান করেছে; সৎ কর্মে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে
এবং জুলুম-নির্যাতনমূলক কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ, দলমত-নির্বিশেষে মানুষের পারস্পরিক
সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চেতনা এবং অর্থনৈতিক দর্শন ও অপরাধ দমন কৌশল
ইসলামকে দিয়েছে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা। কিন্তু
শান্তির ধারক-বাহক জনগণের বিরুদ্ধে সর্বদাই অশান্তিকামী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী
দুর্বৃত্তরা খড়্গহস্ত থাকে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,
দেশে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সংঘাতমুক্ত সমাজের প্রয়োজনে ইসলামের শান্তিপ্রিয় ও জনহিতকর
কল্যাণকামী নৈতিক আদর্শের চর্চা এখন সময়ের দাবি। মানুষের
সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও জানমালের নিরাপত্তা বিধানে ইসলাম অনন্য কালজয়ী আদর্শ। ইসলামে
সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও
চরমপন্থার কোনো স্থান নেই। ইসলামের যুদ্ধনীতি প্রতিরক্ষামূলক, আক্রমণাত্মক নয়, এমনকি প্রতিশোধমূলকও নয়। রাসুলুল্লাহ
(সা.) কখনো একজন নিরপরাধ মানুষকে প্রকাশ্যে বা গুপ্তহত্যা করেননি। শত অত্যাচার ও
নির্মম নির্যাতন সহ্য করেও তিনি কখনো বাড়াবাড়ি, কঠোরতা বা গোঁড়ামির পরিচয় দেননি, বরং দীন প্রচারের ক্ষেত্রে চরমপন্থা
অবলম্বনের বিরুদ্ধে ইসলামের সুমহান আদর্শ সমরনীতি ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা কখনো আগে অস্ত্র উত্তোলন
কোরো না বা অস্ত্রের ভয়ভীতিও প্রদর্শন কোরো না।’
ইসলাম ইচ্ছাকৃতভাবে মানবসন্তানকে হত্যা করা কঠোর ভাষায় নিষিদ্ধ করেছে। নিরপরাধ জনগণকে
গুলি করে, বোমা মেরে বা
যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগে হত্যা করা, পুড়িয়ে মারা বা প্রাণহানি ঘটানো ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ
নয়। অন্যায়ভাবে নরহত্যা, মানুষের
জানমালের ক্ষতিসাধন, ভূপৃষ্ঠে
ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করাকে কবিরা গুনাহ আখ্যায়িত করে এর
ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন,
মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে ‘দুনিয়া ধ্বংস
করে দেওয়ার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণিত কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিজি)
সমাজজীবনে বিশৃঙ্খলা, হানাহানি ও
সন্ত্রাস দমনে শান্তির ধর্ম ইসলাম কঠোর দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং সন্ত্রাসী
দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধে কঠিন শাস্তি আরোপ করেছে। ইসলামের
আলোকে যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচলিত আইনে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের উপযুক্ত ন্যায়বিচার
করা হয়, তাহলে আর কেউ নাশকতা, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে সাহস
পাবে না। পবিত্র কোরআনে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকাণ্ডকে মহা অপরাধ সাব্যস্ত করে কঠোর
শাস্তির বিধান ঘোষিত হয়েছে,
বর্তমান বেসামাল পরিস্থিতিতে সারা দেশে অবরোধে যেভাবে জনদুর্ভোগ, নিরাপত্তাহীনতা, নাশকতা, নৃশংসতা,
ফেতনা-ফাসাদ ও সন্ত্রাসবাদ চলছে, সর্বস্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনাচার,
অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে, এতে যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম ব্যাঘাত হচ্ছে, তেমনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে জননিরাপত্তার
ব্যাঘাত ঘটছে। যেসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী দুর্বৃত্ত বিভিন্ন
স্থানে নানা পর্যায়ে সন্ত্রাস,
বোমাবাজি, গুপ্তহত্যা ও
প্রকাশ্য দিবালোকে নরহত্যা, অপহরণ, হামলাসহ ধর্মবিরোধী মানবতাবিবর্জিত
ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, বাস্তবিকই তারা ইসলামের মর্মবাণীর সঙ্গে সম্পর্কহীনই বটে। জনদুর্ভোগ
সৃষ্টিকারী এসব ফেতনা-ফাসাদ প্রতিরোধে কথা ও কলমের জিহাদ অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা, সমাজে ফেতনা-ফাসাদ, মানবিক বিপর্যয়, নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি
করাকে হত্যার চেয়েও জঘন্যতম অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
মানবাধিকার মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকার। জানমালের
নিরাপত্তার অধিকার ছাড়া মানুষ শান্তিতে বসবাস ও নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে না। এ জন্য
ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের অনিবার্য পরিণতিতে নির্মম হত্যাকাণ্ড, অমানবিকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে তীব্র
ভাষায় ঘৃণা ব্যক্ত করা, জোরালো
প্রতিবাদ জানানো, জনগণের জানমাল
রক্ষায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে সম্মিলিত প্রতিরোধ বা মানববন্ধন গড়ে তোলা যায় এবং
সংগ্রামী সচেতন মানুষের সেটাই করণীয়। তাই শিগগির সম্ভব দেশের জাতীয় নিরাপত্তার
স্বার্থে ও জনকল্যাণার্থে মানবতার ঐক্য ও শান্তিপূর্ণ সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টিতে
বিবদমান দলমত ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে সংলাপের
কোনো বিকল্প নেই।
x
ইসলাম শান্তি ও
নিরাপত্তা ও সার্বজনিন জীবনার্শ
শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে ইসলামের ধারণা দুনিয়ার অন্যসব ধর্ম, মতবাদ ও দার্শনিক নীতি থেকে ভিন্ন। কারণ ইসলাম ছাড়া অন্য বিরাজমান ধর্মগুলো শুধু উপাসনানির্ভর। আর মতবাদগুলো ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। এগুলো শুধু জাগতিকতানির্ভর। আর ইসলাম হলো ইহকাল ও পরকালকেন্দ্রিক একে অন্যের সঙ্গে জড়িত, একে অন্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেজন্য মুসলমান দোয়া করার সময় বলে,
وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
‘হে প্রতিপালক! দুনিয়ার কল্যাণ দান করুন
এবং দান করুন আখেরাতের কল্যাণ এবং মুক্তিদান করুন জাহান্নামের আজাব ও শাস্তি থেকে।’ সূরা আল বাকারা, আয়াত ২০১।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ ﴿الحجرات: ١٣﴾
‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক নর ও এক নারী থেকে। আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে; যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো।’ সূরা আল হুজুরাত, আয়াত ১৩।
আল্লাহতায়ালা ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবার প্রতিপালক ও রিজিকদাতা। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবতার কল্যাণ করাকে মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন। আগে থেকেই জিলকদ, জিলহজ, মহররম, রজব এ চার মাস সম্মানিত মাস হিসেবে পরিগণিত হতো। এ মাসগুলোয় যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। সে সময় ‘উকাজ’ মেলায় বেচাকেনা, ঘোড়দৌড়, জুয়া খেলা, কাব্যপাঠের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। একবার এ মেলায় প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধ হারবুল ফিজার নামে খ্যাত। ফিজার যুদ্ধের বীভৎস দৃশ্য কিশোর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয়ে দাগ কাটে। তিনি তাঁর প্রতিকারের উদ্দেশ্যে সে বয়সেই একটি শান্তিসংঘ গঠন করেন। এ সংঘের অন্যতম সদস্য ছিলেন তার কনিষ্ঠ চাচা জুবাইর। ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে এ সংগঠন গঠিত হয়। সংগঠনের সদস্যরা এই বলে শপথ নিলেন যে,
১. আমরা দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করব।
২. অত্যাচারীর হাত থেকে নিরীহ মজলুমদের রক্ষা করব এবং জুলুম ও জালিমকে দমন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
৩. দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের সহায়তায় সর্বদা সচেষ্ট থাকব।
৪. বিদেশি লোকদের জানমাল ও মানসম্ভ্রম রক্ষা করতে চেষ্টা করব। শান্তি ও নিরাপত্তাবিধানের জন্য কোরআনুল কারিমে আল্লাহতায়ালা স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক ও ব্যবহারের নির্দেশনা তথা সৃষ্টির ওপর স্রষ্টার হকের বর্ণনার পর দুনিয়ায় আগমনের যার বাহ্যিক মুখ্য অবদান রয়েছে তথা পিতা-মাতাসহ দুনিয়ায় যত ধরনের মানুষের সঙ্গে সংশ্রব হবে সবার সঙ্গে সৎ ও সদয় ব্যবহারের জন্য নির্দেশ দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন,
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا
‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও কোনো কিছুকে তাঁর শরিক করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সৎ ও সদয় ব্যবহার কর।’ সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৬।
ব্যক্তি ও বস্তু (জান-মালের নিরাপত্তা)
মানুষের
মৌলিক মানবাধিকারের প্রাথমিক বিষয় তার জানমালের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার অধিকার। অন্যকে
নিরাপদ রাখা ও বাঁচতে দেওয়া নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে অন্যতম—এটি
ইসলামের শিক্ষা। ইসলাম বিশ্বজনীন শান্তি, সম্প্রীতি
ও মানবজাতির জন্য কল্যাণকামী পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ‘ইসলাম’ অর্থ
আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও
সামাজিক জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা অর্জন। ধর্মপ্রাণ
মুসলমানের পরিচয় তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ
الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ
عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ»
‘প্রকৃত
মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।’ (বুখারি ও
মুসলিম)
তাই
পৃথিবীতে সত্য ও ন্যায়নীতির বাস্তব প্রতিফলনের মাধ্যমে সমাজজীবনে শান্তিশৃঙ্খলা
প্রতিষ্ঠা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বজায় রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরিহার্য
কর্তব্য এবং
ইমানি দায়িত্ব। সুতরাং মানবসমাজে কোনো রকম নাশকতা, অশান্তি
সৃষ্টি,
নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, সংঘাত, হানাহানি, উগ্রতা, বর্বরতা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা
ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ
তাআলা ঘোষণা করেছেন,
وَلَا
تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا
‘দুনিয়ায়
শান্তি স্থাপনের পর এতে বিপর্যয় ঘটাবে না।’ (সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ৫৬)
ব্যক্তি, পরিবার ও
সমাজজীবনে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও সহিংসতাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে; মানবতাবিরোধী
সব ধরনের অন্যায় হত্যাযজ্ঞ, রক্তপাত, অরাজকতা ও অপকর্ম প্রত্যাখ্যান করেছে; সৎ কর্মে
সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে এবং জুলুম-নির্যাতনমূলক কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ, দলমত-নির্বিশেষে
মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চেতনা এবং অর্থনৈতিক দর্শন
ও অপরাধ দমন কৌশল ইসলামকে দিয়েছে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা। কিন্তু
শান্তির ধারক-বাহক জনগণের বিরুদ্ধে সর্বদাই অশান্তিকামী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী
দুর্বৃত্তরা খড়্গহস্ত থাকে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা
হয়েছে,
وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا ۚ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ
‘তারা
দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, আল্লাহ ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত
ব্যক্তিদের ভালোবাসেন না।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৬৪)
‘তোমরা
কখনো আগে অস্ত্র উত্তোলন কোরো না বা অস্ত্রের ভয়ভীতিও প্রদর্শন কোরো না।’
مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي
الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا
أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
‘নরহত্যা বা
দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা হেতু ব্যতীত কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব
মানুষকে হত্যা করল; আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষের
প্রাণ রক্ষা করল।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৩২)
মানুষের
জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا
بِالْحَقِّ
‘আল্লাহ যার
হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তোমরা তাকে হত্যা কোরো না।’ (সূরা বনি
ইসরাইল,
আয়াত: ৩৩)
হাদিস
শরিফে বর্ণিত আছে যে ‘দুনিয়া ধ্বংস করে দেওয়ার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণিত কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিজি)
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَن يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا
خَطَأً ۚ وَمَن قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَأً فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ
مُّسَلَّمَةٌ إِلَىٰ أَهْلِهِ إِلَّا أَن يَصَّدَّقُوا ۚ فَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ
عَدُوٍّ لَّكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ ۖ وَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُم مِّيثَاقٌ فَدِيَةٌ
مُّسَلَّمَةٌ إِلَىٰ أَهْلِهِ وَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةً مِّنَ
اللَّهِ ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
মুসলমানের কাজ নয় যে, মুসলমানকে হত্যা
করে; কিন্তু ভুলক্রমে। যে ব্যক্তি মুসলমানকে ভূলক্রমে হত্যা করে, সে একজন মুসলমান
ক্রীতদাস মুক্ত করবে এবং রক্ত বিনিময় সমর্পন করবে তার স্বজনদেরকে; কিন্তু যদি তারা ক্ষমা করে দেয়। অতঃপর যদি নিহত ব্যক্তি তোমাদের শত্রু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয়, তবে মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে এবং যদি সে তোমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ
কোন সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয়, তবে রক্ত বিনিময় সমর্পণ করবে
তার স্বজনদেরকে এবং একজন মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে। অতঃপর যে ব্যক্তি না পায়, সে আল্লাহর কাছ থেকে গোনাহ
মাফ করানোর জন্যে উপর্যুপুরি দুই মাস রোযা রাখবে। আল্লাহ, মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا
مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ
وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا
যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা
করে, তার শাস্তি
জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। (সূরা আন-নিসা, আয়াত:
৯২-৯৩)
তথ্যের নিরাপত্তা
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَىٰ شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ
"আর তারা যখন ঈমানদারদের
সাথে মিশে, তখন বলে আমরা
ঈমান এনেছি আবার যখন তাদের শয়তানদের (সুরা বাকারা-১৪)
রাসুল (সঃ) বলেছেন
মুনাফিকদের চিহ“ বা আলামত
তিনটি যথাঃ যখন কথা বলে মিথ্যা,
আমানতের খিয়ানত করে এবং প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করে। (মিশকাত ৫৫;-মুসলিম তিরমিযি)
তথ্য সংগ্রহের পন্থা।
"তোমরা সত্যের সাথে মিথ্যাকে মিশ্রন করোনা এবং জেনে শুনে সত্য (তথ্য) কে গোপন
করোনা"( সুরা বাকারা-৪২)।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ ﴿الحجرات: ٦﴾
"হে ঈমানদার ব্যক্তিরা
যদি কোনো দুষ্ট প্রকৃতির লোক তোমাদের কছে কোনো তথ্য নিয়ে আসে, তবে তোমরা তার সত্যতা পরখ করে দেখবে
(কখনো যেন আবার এমন না হয়) না জেনে তোমরা কোনো একটি সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেললে
এবং অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের ব্যাপারে তোমাদেরই অনুতপ্ত হতে হলো" (সুরা আল
হুজুরাত-৬)।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রكَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سمعগ্ধ . رَوَاهُ مُسلم
হযরত হাফস ইবনে আমের
(রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুল (সঃ) বলেছেন কারো মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, যে শ্রবন করে তার সঠিকতার যাচাই বাছাই
না করে তা বলে বেড়ায়। (মুসলিম; তিরমিযী;
মিশকাতঃ ১৫৬ )।
وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ ﴿المائدة: ٦٤﴾
‘তারা দুনিয়ায়
ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, আল্লাহ
ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের ভালোবাসেন না।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৬৪)
مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
‘নরহত্যা বা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা হেতু ব্যতীত কেউ কাউকে হত্যা করলে সে
যেন দুনিয়ার সব মানুষকে হত্যা করল; আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষের
প্রাণ রক্ষা করল।’ (সূরা
আল-মায়িদা, আয়াত: ৩২)
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তোমরা তাকে হত্যা
কোরো না।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৩)
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَن يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَأً ۚ وَمَن قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَأً فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُّسَلَّمَةٌ إِلَىٰ أَهْلِهِ إِلَّا أَن يَصَّدَّقُوا ۚ فَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ عَدُوٍّ لَّكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ ۖ وَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُم مِّيثَاقٌ فَدِيَةٌ مُّسَلَّمَةٌ إِلَىٰ أَهْلِهِ
‘কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়, তবে ভুলবশত করলে তা স্বতন্ত্র।...কেউ
ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার
প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লানত
করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯২-৯৩)


No comments:
Post a Comment