১। ভূমিকা।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুনিয়ায় তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছেন।
প্রতিনিধিত্বের দায়িত্বের উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। মহান আল্লাহ যুগে যুগে
নবী রাসুল পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাজিল করেছেন। মানুষের মধ্যে উত্তম চরিত্রের বিকাশ
সাধনের জন্য আসমানী গ্রন্থে সবচেয়ে বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।
নবী-রাসুলদের শিক্ষাদান পদ্ধতিও ছিল বিজ্ঞান সম্মত। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে তারা
মানব জাতির পূণর্গঠনে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। জুময়ার
সালাতে খুতবা প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিক। খুতবার মাধ্যমে মোমেনদেরকে
ইসলামের বুনিয়াদী বিষয়ে জ্ঞান দান করা হয়। জীবন ও জগত সম্বন্ধে পরিস্কার ধারণা
প্রদান করা হয়। মানব চরিত্রের মধ্যে উত্তম নৈতিকতার গুণ সৃষ্টি ও একটি সুন
ভিত্তিক সমাজ গঠনে খুতবা প্রদানে উচ্চ মান বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন।
২। খুতবা শব্দ এর আভিধানিক ও
পারিভাষিক অর্থ
খুতবা আরবী শব্দ এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, বক্তৃতা, ভাষণ, ওয়াজ
ইত্যাদি। আর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, জুমার নামাজের আগে, উভয় ঈদের
নামাজের পরে, হজে আরাফার দিনে মসজিদে নামিরাতে, বিয়ের অনুষ্ঠানে ও বিভিন্ন ইসলামি
অনুষ্ঠানে খলিফার প্রতিনিধি, দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা ইমাম ও খতিব কর্তৃক প্রদত্ত প্রাসঙ্গিক
বক্তৃতা বা ভাষণ। যিনি খুতবা দেন তাঁকে ‘খতিব’ বলা হয়। উপস্থিত
মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর নাম, গুণাবলী, বিধিবিধান, শাস্তি, পুরস্কার
এবং সপ্তাহের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরে বক্তৃতা প্রদান করা। রাসুল (সাঃ) এর
সুন্নত অনুযায়ী খুতবার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর হুকুম আহকাম স্বরণ করা ও করানো। ঈদ ও জুমার খুতবা ওয়াজিব, অন্যান্য খুতবা সুন্নত।
৩। খুতবা প্রদানের ঐতিহাসিক
পটভূমি।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হিজরত করে এসে কুবা পল্লীতে কুলসুম বিনতে হাদাস (রাঃ) এর
ঘরে উঠেন এবং ১৪ রাত সেখানে অবস্থান করেন (আসাহুসসিয়ার)। অতঃপর জুমার দিনে মদীনার
উদ্দেশ্যে রওনা করলে বনু সালেম গোত্রের আতেকাহ মসজিদে ১০০ সাহাবী নিয়ে নামাজ আদায়
করেন ও খুতবা প্রদান করেন। এটিই ছিল রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রথম জুমা ও জুমার দিনে
প্রথম খৃতুবা (আছারুছ সুনান-আল্লামা নিমউই (রঃ), সীরাতুল মোস্তফা-আল্লামা
কান্ধলুবী)।
৪। খুতবা প্রদানের উদ্দেশ্য।
ইসলামী সমাজে মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয় বরং মুসলমানদের সকল
কর্মকান্ডের এবং সকল তৎপরতার কেন্দ্রস্থল। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত
নামাজ জামায়াতে পড়ার মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের সৃষ্টি
হয়। এতে মসজিদ হয়ে ওঠে সকল সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। খুতবা এক্ষেত্রে
যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। জাতি গঠনের মহৎ উপাদান হিসেবে খুতবা সুষ্ঠু সামাজিক ও
সাংস্কৃতিক জীবনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূলতঃ একটি জ্ঞানভিত্তিক
সমাজ গঠনে জনগণকে আল্লাহর হুকুম আহকাম সুরণ করা ও করানো খুতবার মূল উদ্দেশ্য।
খুতবা প্রদানের মাধ্যমে সমাজ থেকে কুফর, শিরক ও যাবতীয় কুসংস্কার দূর করে
সমাজকে গতিশীল রাখা ও খুতবার একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿الجمعة: ٩﴾
ওহে মুসলমানগণ যখন জুমার দিনে সালাতের জন্য আহবান জানানো হয়, তখন তোমরা
দ্রুত আল্লাহর যিকিরের জন্য মসজিদে গমন কর, এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা
তা অনুধাবন করো। (সুরা জুমআঃ ৯)
এখানে যিকির অর্থ খুতবা । যিকির শব্দের অর্থ স্মরন করা বা করানো। হাদিস শরীফে বারংবার খুতকে ওয়াজ বা মাওয়ি বলে অভিহিত করা হয়েছে (আবু দাউদ, আস সুনান, সহীহুত তারগীব)। হাদিস শরীফে জুময়ার দিনে গোসল করে সর্বোত্তম পোষাকে সকাল সকাল মসজিদে গমন করে যথা সম্ভব ইমামের কাছে বসতে এবং ইমাম খুতবা দিতে শুরু করলে সর্বোচ্চ মনোযোগের সাথে নিশ্চুপে নিঃশব্দে তাঁর খুতবা শুনতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদি কেউ খুতবা চলাকালীন সময়ে কোন রকম কথাবার্তা বলে খুতবা শোনার ব্যঘাত ঘটায়, তাহলে তার নামায নষ্ট হওয়ার ও শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে। এ সবই খুতবা প্রদান ও খুতবা শোনার গুরুত্ব প্রকাশ করে।
৫। খতিবের
কতিপয় গুণাবলিঃ
কোরান ও হাদীসের সঠিক পাঠ ও জ্ঞান; মোত্তাকি (তাকওয়া), মুখলিস (ইখলাস), আল্লাহর প্রতি
নির্ভরশীল (তাওয়াক্কুল),
বিজ্ঞ আলেম, ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু, কপটতামুক্ত, সরলমনা, বিনয়ী, সুমিষ্টভাষী, ভদ্র। এ ছাড়া
খতিবের শিক্ষাগত যোগ্যতা,
বয়স,
অবয়ব (সুরত), আখলাক (সিরত), পোশাক-আশাক
ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ।
৬। খুতবার
মধ্যে যেসব বিষয় থাকা সুন্নতঃ
হামদ (আল্লাহর প্রশংসা) দ্বারা শুরু করা, ছানাখানি (গুণগান) করা, শাহাদাতাঈন
(তওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য) পাঠ করা, দরুদ শরিফ পড়া, কোরআনে করিমের
প্রাসঙ্গিক আয়াত তিলাওয়াত করা, সংশ্লিষ্ট হাদিস পাঠ করা, প্রয়োজনীয় মাসআলা বর্ণনা করা, ওয়াজ-নসিহত
বয়ান করা, উপদেশ দেওয়া,
সৎকর্মে উদ্বুদ্ধকরণ ও মন্দ কাজ থেকে
নিরুৎসাহিত করা, মুসলমানদের জন্য দোয়া করা।
৭। খুতবা প্রদানের ভাষা।
খুতবার সময় রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সাধারনত একটি লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।
তিনি সাধারনত উত্তেজিত হয়ে অত্যন্ত আবেগের সাথে নসীহত করতেন। খুতবার শেষে সালাতের
ইকামত দেওয়া হতো। এই ছিল খুতবা প্রদানের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ও সাহাবীগণের
সুন্নত। আমরা এই সুন্নত অনুসরণের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। আর
তা হলো, মহানবী (সাঃ) আরবী ভাষায় খুতবা দিতেন। আমরা অনারব দেশের মানুষের আরবী না
বুঝার কারনে সে যুগের মত খুতবা দিতেও পারছিনা, বুঝতেও পারছিনা। আরবী না জানার
ফলে আমরা বই দেখে খুতবা পড়ি। অপর দিকে আরবী না বোঝার ফলে আমরা খুতবা থেকে কোন
প্রকার উপকার পাচ্ছিনা। এতে খুতবার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। খুতবার মূল
উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর হুকুম আহকাম স্বরন করা ও করানো। এই মাসনুন উদ্দেশ্যের কিছুই
অর্জিত হচ্ছে না। এখন আমরা কিভাবে এর সমাধান করতে পারি? এ
ক্ষেত্রে অনারব দেশ সমূহের আলিমগন মূল ইবাদত ও উপকরণ নির্ধারনের ক্ষেত্রে মতবিরোধ
করেছেন।
ক। যারা মনে করেন যে,
জুমআর খুতবার মূল ইবাদত যিকির ও ওয়াজ অর্থাৎ মুসল্লীগণকে আল্লাহর বিধি-বিধান স্মরন করানো ও উপদেশ প্রদান, ভাষা
উপকরন মাত্র, তারা প্রয়োজনে উপকরনের পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত করেছেন। তারা মুসল্লীদের বুঝানোর
জন্য আরবী খুতবার মধ্যে প্রয়োজন অনুসারে অনারব ভাষা ব্যবহার করতে বলেছেন। কিন্তু
নামাযের আগে বা পরে নিয়মিত আলোচনা নিষেধ করেছেন, কারণ তাতে একটি নতুন রীতি প্রচলন
করা হবে। যা রাসুল (সাঃ) এর যুগে ছিলনা। এর স্বপক্ষে তারা আরো বলেন যে, রাসুল
(সাঃ) আরবীতে নয় মাতৃভাষায় খুতবা দিয়েছেন। কেননা আল্লাহ কোরআনে বলেছেন যে,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا
بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ
لَهُمْ ﴿ابراهيم: ٤﴾
আমি কোন নবীই এমন পাঠাইনি, যে নবী তার জাতির মাতৃভাষায় আমার বাণী তাদের কাছে পৌছায়নি, যাতে করে
সে তাদের কাছে আমার আয়াত পরিস্কার করে বুঝিয়ে বলতে পারে (সুরা ইবরাহিম-৪)।
খ। অন্য আলেমগণ খুতুবীর মধ্যে আরবী শব্দ উচ্চারনকেই মূল ইবাদত মনে করেছেন।
এজন্য তারা মূল খুতবা কে আরবীতে রাখার পক্ষে। তবে আল্লাহর বিধি বিধান সুরণ করা, করানো, উপদেশ
প্রদানের জন্য তাঁরা আরবী খুৎবার আগে অতিরিক্ত
অনুবাদ বা আলোচনা অনুমোদন করেছেন।
গ। আবার কেউ বলেন যে,
জুমআর দিনে জোহরের ৪ রাকাত ফরজের ২ রাকাত জুমার ফরজ নামায ও
অবশিষ্ট ২ রাকাতের বদলে ২টি খুৎবা যা ২
রাকাত সালাতের স্থলবর্তী হওয়ার কারনে আরবীতেই হতে হবে। তবে তাদের এ যুক্তি
সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত নয়।
৮। নৈতিকতার উন্নয়নে খুতবা প্রদানের কৌশল সমূহ।
ক। কুরআন-হাদিস নির্ভর বক্তব্য।
খুতবার সামগ্রিক বক্তব্য উপস্থাপনে কুরআন ও সহীহ হাদিসের উদ্ধৃতি দিতে হবে।
তাহলে বক্তব্যটি অন্যন্ত শক্তিশালী হবে এবং বক্তব্যটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করবে।
এতে শ্রোতাগণ দ্বিধাহীন চিত্তে আমল করতে উৎসাহিত হবে।
খ। সাবলিল ও সহজ ভাষায় খুতবা প্রদান।
খুতবা প্রদানের ক্ষেত্রে জটিল শব্দ ও বাক্য পরিহার করতে হবে। শ্রোতাদের বোধগম্য
ভাষায় খুতবা উপস্থাপন করতে হবে। সহজ সরল ভাষা ব্যবহারে অভ্যস্থ হতে হবে।
গ। আপত্তিকর ও শ্রুতিকটু শব্দ ও ভাষা পরিহার করতে হবে।
মসজিদে ছোট ছোট ছেলে সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ আগমন করে থাকেন। সুতরাং
এমন কোন ভাষা বা শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, যা কোন শ্রেনীর লোককে আঘাত করে।
অবশ্যই অশ্লীল শব্দ পরিহার করে তদস্থলে অত্যন্ত মাঙিতি ও পরিশীলিত শব্দ ও ভাষা
ব্যবহার করতে হবে। কেননা,
এর ব্যত্যয় ঘটলে অনেক সময় ব্রিতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে
পারে।
ঘ। উত্তেজিত না হওয়া।
মহানবী (সাঃ) একজন নবী সাথে সাথে একজন নির্বাহী প্রধান ছিলেন এজন্য তিনি
উত্তেজিতভাবে খুতবা প্রদান করতেন। একজন ইমাম যেহেতু, শুধুমাত্র উপদেশদাতা তাই তাকে
অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নরম ভাষায় খুৎবা দিতে হবে। এতেই ভাল ফলাফল আসবে। তবে হালাল-হারাম
বিষয়ে জোর দিয়ে মতামত দিতে হবে।
ঙ। যুক্তিভিত্তিক বক্তব্য উপস্থাপন।
খুতবার বিষয়বস্তু ও তার বক্তব্য যুক্তি নির্ভর হতে হবে। অযৌক্তিক কিংবা
অবৈজ্ঞানিক বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে।
চ। বাস্তবভিত্তিক ও জীবন ঘনিষ্ঠ বক্তব্য প্রদান।
বাস্তবতা বিবর্জিত ও কল্পনা নির্ভর বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে।
বক্তব্য হতে হবে বাস্তবভিত্তিক ও জীবন ঘনিষ্ঠ, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে স্পর্শ
করে।
ছ। বক্তব্য প্রদানে পারিপার্শ্বিক অবস্থা খেয়াল করা।
খুতবা প্রদানের ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক অবস্থা মাথায় রাখতে হবে। পরিস্থিতির
নাজুকতা উপলব্দি করতে হবে। স্পর্শকাতর বিষয়গুলি বিবেচনায় নিয়ে খুতবা প্রদান
করতে হবে। যাতে কোন নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
জ। কাউকে সরাসরি ইংগিত না করে বক্তব্য প্রদান।
খুতবা প্রদান করতে হবে সাধারন বা ব্যাপকভাবে। কোন ব্যক্তিকে সরাসরি ইংগিত করে
নয়। ব্যক্তিগত ঝাল ঝারা যাবে না। আন্তরিকতাসহ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ভাবধারা নিয়ে
সামগ্রিকভাবে বক্তব্য দিতে হবে। উপস্থিত বুদ্ধির ব্যবহার, হেকমত
তথা স্থান, কাল, পাত্র বুঝে বক্তব্য প্রদান করতে হবে।
ঝ। ৬টি বিষয়ের উন্নয়ন খুতবাতে তুলে
ধরা।
(১)
শিক্ষার উন্নয়ন।
(২)। স্বাস্থ্যের উন্নয়ন।
(৩) সাংস্কৃতিক উন্নয়ন।
(৪) নৈতিক উন্নয়ন।
(৫) অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
(৬) পারিবারিক উন্নয়ন
ঞ। সাহাবীদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরা।
নৈতিকতার উন্নয়নে সাহাবায়ে কেরামদের সংগ্রামী জীবন ও তাদের উন্নত নৈতিক
আদর্শের দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে হবে।
৯। খুতবার
প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ।
খুতবা হওয়া উচিত সমসাময়িক বিষয়াবলির ওপর। যা সমাজের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
যেমন- মাদক, ধূমপান, নারী নির্যাতন,
বাল্যবিয়ে, সুদ,
ঘুষ,
দুর্নীতি দমন, যেনা-ব্যভিচার, সন্তান লালনপালন, নারীর পর্দা
ও পুরুষের পর্দা,
স্বামী স্ত্রীর অধিকার, হালাল-হারামসহ নানা বিষয়ে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কি হচ্ছে আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগের প্রেক্ষাপটে কি হয়েছিল
সেসব বিষয়ে আলোচনা হবে বিষয়ভিত্তিক, কুরআন ও হাদীসের আলোকে এ-থেকে উত্তরণের
উপায়। খতিবগণ খুতবা দিবেন তা হবে পরবর্তী সময়ের কর্মসূচি। বর্তমানে আমাদের আলেমরা এসব
পূর্ণাঙ্গভাবে বলেন না!
১০। খুতবা
দেয়ার পাশাপাশি আলেমদের করণীয়ঃ
আলেমরা হলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতিনিধি, নায়েবে নবী। তিনি আলেমদের জন্য দুটি
আসন রেখে গেছেন। এক নাম্বার হল খেলাফত, যা এখন নেই, কখনও থাকবে
কখনও থাকবে না এটা আলোচনার বিষয় নয়। দ্বিতীয় হল মসজিদের মিম্বর। যে ইমাম বা খতিব মসজিদের
মিম্বরে দাঁড়ান তিনিই রাসূলের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর আল্লাহর রাসূলের নবী হওয়ার আগে-পরে
সবচেয়ে বড় যে গুণ ছিল সেটি হল, তিনি একজন সমাজকর্মী, সমাজসেবক ছিলেন। নবী হওয়ার পর অনেকেই
ঈমান আনেনি কিন্তু সামাজিকভাবে তার থেকে উপকৃত হয়েছেন। এর বড় প্রমাণ হল, হিজরতের রাতে
হজরত আলী (রা.) কে মানুষের রাখা আমানতের জামিনদার হিসেবে রেখে যাওয়া! একজন ইমাম-খতিবের
জন্য সমাজের ছোটখাটো কাজ করা খুবই সহজ। যেমন পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি, স্বামী-স্ত্রীর
দ্বন্দ্ব নিরসনসহ নানা বিষয়ে কাজ করে সমাজের খেদমত করতে পারেন। কেউ যদি কাজ শুরু করেন
তিনি কতটুকু সফল হবেন এটা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে এর মাধ্যমে সমাজে তিনি সম্মানিত
হবেন এটা নিশ্চিত বলতে পারি।
১১। আরব সমাজে
আলেমদের অবস্থান কেমন?
আরব সমাজে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে আলেম-ওলামারা সরকার এবং জনগণের পাশে থাকেন। স্বাস্থ্য
মন্ত্রণালয়ের সবরকম অনুষ্ঠানে ইমাম খতিবদের আমন্ত্রণ করা হয়। আরব সমাজে জাতীয় সমরাস্ত্র
প্রদর্শনীতে অলেমরা স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকেন। এমনকি সেসব দেশে প্রতিটি স্পোর্টস এবং
সাধারণ ক্লাবে একজন করে আলেম থাকেন। তাদের দায়িত্ব হল নামাজ পড়ানো এবং নামাজের আগে
বা পরে সংক্ষেপে মাদক,
নেশা, নারীসহ চরিত্র ধ্বংস করে এমন জিনিস থেকে দূরে থাকার নসিহত করা।
তারা ব্যাপকভাবে সামাজিক কাজে অংশ নেন।
১২। বাংলাদেশের মসজিদগুলোয় নারীদের জন্য নামাজের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই, এ ব্যাপারে কি করণীয়ঃ
মিসরের একজন শিক্ষাবিদ ড. সাইয়্যেদ আস সাফতি, যিনি বাংলাদেশের দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির
শিক্ষক ছিলেন। তিনি কাতারের এক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- ‘বাংলাদেশের মেয়েরা সিনেমা হলে যেতে পারে, মার্কেট, শপিংমল, স্কুল-কলেজ, হাটবাজার, হোটেল -বার, এমনকি তারা
পার্লামেন্টেও গেছেন কিন্তু তাদের শুধু মসজিদ বা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাওয়ার অধিকার
নেই!’ বেচারা দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আমরা কোনো কোনো মসজিদে মেয়েদের ঢোকার ব্যবস্থা করেছিলাম কিন্তু
আলেমরা এমনভাবে বাধা দিয়েছেন যেন আমরা কবিরা গুনাহ করে ফেলেছি। অথচ তারাই মক্কা-মদিনাতে
তাদের স্ত্রী, মেয়েদের নিয়ে এক ইমামের পেছনে নামাজ পড়ছেন!’ তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘মক্কা-মদিনার
মসজিদে যেটা জায়েজ বাংলাদেশে কেন নিষেধ হবে।
১৩। খুতবায়
যেসব বিষয়ে সতর্কতা থাকা উচিতঃ
বিতর্কিত মাসআলা মাসায়েল অপ্রয়োজনীয় অভিনব বিষয়। মুসল্লিদের মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ ও ভুল–বোঝাবুঝি
সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো বিষয়।
উপসংহার।
জুমআর সালাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খুতবা । একটি আধুনিক ও
অজ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মানে খুতবা যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। এ জন্য আমাদের
উচিৎ খুতবার বিষয়বস্তুগুলি যুগোপযোগী করী এবং খুতবা
প্রদানের কৌশলগত উন্নয়ন সাধন করা।
মোঃ উমর ফারুক
গবেষক ও লেখক
০১৭১৭৯৫৪৩৪৭


No comments:
Post a Comment