Sunday, November 8, 2020

২১ নভেম্বরঃ সশস্ত্র বাহিনী দিবস। ইসলামের আলোকে একতা, শৃংখলা, নেতৃত্ব ও আনুগত্য।

        


        

ভূমিকাঃ

 ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় একতা ও শৃঙ্খলার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামী জীবন বিধানের প্রতিটি কর্মকান্ড একতা ও শৃঙ্খলার উপর প্রতিষ্ঠিত। নামাজ, রোজা, হজ্ব, জাকাত ইত্যাদি কর্মকান্ড ঐক্য ও শৃঙ্খলার সাথে আদায় করতে হয়। আলাদা আলাদা ভাবে ইট-সিমেন্ট দিলে ইমারত তৈরী হয়না, অনুরূপ মানুষের একা ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন চলতে পারেনা। মানুষ সামাজীক জীব, সমাজে চলতে হলে মানুষকে একতাবদ্ধ হয়ে এবং শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে জীবন যাপন করতে হবে। সুতরাং মানব জীবনে একতা ও শৃঙ্খলা অপরিহার্য্য। 

 

একতার সংজ্ঞাঃ

একতা শব্দের ইংরেজী হচ্ছে Unity আরবীতে الاعتصام বলা হয়। কোন মহৎ উদ্দেশ্যকে সম্পন্ন করতে সংঘবদ্ধভাবে যে কাজ করা হয় তাকে একতা বলে।

 

শৃঙ্খলার সংজ্ঞাঃ

শৃঙ্খলা শব্দের ইংরেজী হচ্ছে উরংপরঢ়ষরহব অর্থ নিয়ম-নীতি। নিয়ম-নীতি ছাড়া আল্লাহর কোন সৃষ্টি চলেনা। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা ইত্যাদি এক বিশেষ নিয়ম-নীতিতে চলে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَسَخَّرَ لَكُمُ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ دَائِبَيْنِ وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ ﴿ابراهيم: ٣٣﴾

তিনি তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন সূর্যকে এবং চন্দ্রকে সর্বদা এক নিয়ম-নীতিতে এবং রাত ও দিনকে তোমাদের কাজে লাগিয়েছেন। (সূরা ইব্রাহীম-৩৩)

 

শৃঙ্খলা

শৃঙ্খলা

শৃঙ্খলা রক্ষা করা যে কোন কর্মসূচী সফল হবার অনত্যম প্রধান শর্তএমন অনেক দর্শন রয়েছে যেখানে কর্তৃপক্ষের যে কোন সিদ্ধানের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করা কর্মচারীদের রীতি বলে পরিগণিতপক্ষান্তরে ইসলামের শিক্ষা হলো- কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া অধীনদের জন্য জরুরীমহানবী () বলেছেন, ‘একজন হাবশী গোলামকেও যদি তোমাদের আমীর করা হয়, তাহলে তোমরা তার আনুগত্য করবেআনুগত্যের অভাব ও বিশৃঙ্খলার ফলে অনেক পরিকল্পনা ভেস্তে যায় শৃঙ্খলাবোধের কল্যাণ স্বল্প সরঞ্জামেও অনেক দুরূহ কাজ সম্পন্ন করা যায়ইসলামে সে শিক্ষাই দেয়া হয়েছেঅবশ্য কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় কর্তৃপক্ষের জন্য কুরআন-হাদীসের মূলনীতি অনুসরণ অপরিহার্যনেতৃত্ব নির্বাচনের সময় ইসলাম বিষয়ে জ্ঞানের দিকটি বিশেষভাবে বিবেচনার বিষয়

 

একতা ও শৃঙ্খলার উপকারীতাঃ

একতা ও শৃঙ্খলা মানব জীবনে সফলতা আনে, প্রত্যেকটি মানুষ সফলতা আশা করে। একাধিক কাজ পৃথকভাবে করার চেয়ে একতার মাধ্যমে ও শৃঙ্খলার সাথে খুব সহজেই শেষ করা যায়। একটি লাঠি অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের দ্বারা ভেঙ্গে যেতে পারে, কিন্তু যখন অনেক লাঠি একসাথে থাকে তখন ভাঙ্গা কঠিন। একটি জাতি কখনই হতাশাগ্রস্ত হয় না যখন তারা সংঘবদ্ধ হয়ে ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে থাকে। মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর দ্বীনকে ধারণ করার জন্য আল কোরানে নির্দেশ প্রদান করেছে।

 

অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা দূর্যোগ বয়ে আনেঃ

মানব সমাজে অনৈক্য দূর্যোগ ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। একতার অভাবে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় যা কাম্য নয়। আজকের পৃথিবীতে আমরা অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার উদাহরণ দেখতে পাই, ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া সহ বিভিন্ন রাষ্টে। এ সকল রাষ্ট থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।

এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ۖ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴿الأنفال: ٤٦﴾

আর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রাসূলের। তোমরা পর¯পরে বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। সুতরাং তোমরা ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা  ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।’’ (সূরা আনফালঃ ৪৬)

 

একতা ও শৃঙ্খলার ভিত্তিঃ

একতার ভিত্তি হচ্ছে সহানুভূতি, পারস্পরিক সহায়তা, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং দেশপ্রেম এগুলো মানবীয় গুণ। ঐ গুণগুলো মানব জীবনে একটি গভীর সম্পর্ক তৈরী করে এবং ঐক্যের সাথে একে অপরে কাজ করে। হাদীসে এসেছে-

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ لاَ يَجْمَعُ أُمَّتِي، أَوْ قَالَ: أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، عَلَى ضَلاَلَةٍ، وَيَدُ اللهِ مَعَ الجَمَاعَةِ، وَمَنْ شَذَّ شَذَّ إِلَى النَّارِ (صحيح حاكم-৩৯০-ترمزى-২১১৩-شرح السنه-১০৫)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- একতাবদ্ধতার উপর আল্লাহর হাত (রহমত) রয়েছে। যে ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন হয়, সে বিচ্ছিন্নভাবেই দোযখে যাবে। (তিরমিজি-২১১৩ ই.সে, ছহীহ হাকেম-৩৯০,শরহুস সুন্নাহ-১০৫)

 

একই আত্মা থেকে মানব জাতির উৎপত্তিঃ

আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে এক আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মানব জাতির সৃষ্টির ব্যাপারে বলেন,

وَهُوَ الَّذِي أَنشَأَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ فَمُسْتَقَرٌّ وَمُسْتَوْدَعٌ ۗ قَدْ فَصَّلْنَا الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَفْقَهُونَ ﴿الأنعام: ٩٨﴾

তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। অনন্তর একটি হচেছ তোমাদের স্থায়ী ঠিকানা ও একটি হচেছ গচ্ছিত স্থল। নিশ্চয় আমি প্রমাণাদি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি তাদের জন্যে, যারা চিন্তা করে।’’ (সূরা আনআমঃ৯৮)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন-

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا (نساء-১)

হে মানব সমাজ। তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙিগনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের  নিকট যাচনা করে থাক এবং আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসা-১)

 

মানব জীবনে একতা ও শৃঙ্খলার গুরুত্বঃ

সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষ সামাজিক জীব। তারা একাকী বসবাস করতে পারে না। তারা নির্ভর করে একে অপরের উপর। সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করা ছাড়া জীবন উপভোগ্য হতে পারে না। একতা বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন

ক। পারিবারিক জীবনে একতা।

খ। সামাজিক জীবনে একতা।

গ। জাতিয় পর্যায়ে একতা।

ঘ। সামরিক জীবনে একতা।

 

ইসলামের দৃষ্টিতে একতা ও শৃঙ্খলাঃ

মানুষ যখন অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হয়ে এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে মনগড়াভাবে চলে তখন আল্লাহ তাআলা সে জাতির জন্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেন। নবী-রাসূলগণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের বাণী দিয়ে একতা ও শৃঙ্খলায় নিয়ে আসেন। তারই ধারাবাহিকতায় ইসলাম মানুষকে সংঘবদ্ধ হতে আদেশ দিয়েছে। কারণ একতা ছাড়া, শৃঙ্খলা ছাড়া মানুষ সাফল্য অর্জন করতে পারে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا-﴿آل‌عمران: ١٠٣﴾

 আর তোমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (দ্বীনকে) সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পর¯পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (সূরা আলে ইমরান-১০৩)

হাদীসে এসেছে-

عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ خَطَبَنَا رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِينَا فَقَالَ عَلَيْكُمْ بِالجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالفُرْقَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الِاثْنَيْنِ أَبْعَدُ، مَنْ أَرَادَ بُحْبُوحَةَ الجَنَّةِ فَلْيَلْزَمُ الجَمَاعَةَ، [حكم الألباني] : صحيح (ترمزي-২১৬৫-احمد-১৭৭)

عَنِ السَّائِبِ بْنِ مِهْجَانٍ، مِنْ أَهْلِ الشَّامِ مِنْ أَهْلِ إِيلِيَاءَ، وَكَانَ قَدْ أَدْرَكَ أَصْحَابَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَدِيثٍ ذَكَرَهُ، قَالَ: لَمَّا دَخَلَ عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ الشَّامَ حَمِدَ اللهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ وَوَعَظَ وَذَكَّرَ، وَأَمَرَ بِالْمَعْرُوفِ، وَنَهَى عَنِ الْمُنْكَرِ ثُمَّ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ فِينَا خَطِيبًا كَقِيَامِي فِيكُمْ فَأَمَرَ بِتَقْوَى اللهِ وَصِلَةِ الرَّحِمِ وَصَلَاحِ ذَاتِ الْبَيْنِ وَقَالَ: " عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ؛ فَإِنَّ يَدَ اللهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ، وَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الِاثْنَيْنِ أَبَعْدُ،-(بيهقي-১০৫৭৪)

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- তোমরা অবশ্যই একতাবদ্ধ হয়ে থাকবে, বিচ্ছিন্ন হবেনা। একা থাকলে শয়তান তোমার সাথী হবে, তোমাকে অনেক দূরে নিয়ে যাবে। যে ব্যক্তি জান্নাতের সর্বোত্তম স্থান কামনা করে সে যেন একতাবদ্ধ হয়ে থাকে। (তিরমিজি-২১১১ ই.সে, আহমদ-১৭৭, ছহীহ হাকেম-৩৯০)

 

মানব জাতি একই সম্প্রদায়েরঃ

আল্লাহ মানব জাতি সম্পর্কে বলেন,

كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً ﴿البقرة: ٢١٣﴾

সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভূক্ত।’’ -সূরা বাকারাঃ ২১৩

 

একতা আল্লাহর আশির্বাদ স্বরূপঃ

 মুহাম্মদ (সাঃ) মানব জাতিকে একত্রিত হতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,

عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রالْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ، وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌগ্ধ (السنة لابن ابي عاصم-৯৩-مسند الشهاب القضائ-১৫-كنز العمال-৯/১৫৩-২০২৪২)

হজরত নোমান বিন বশির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন -রাসূল (সাঃ) বলেছেন; “একতা আল্লাহর আশির্বাদ স্বরূপ আর বিচ্ছিন্নতা শাস্তি স্বরূপ ।’’সুন্নাতু লি ইবনুল আছেম-৯৩, মুসনাদে শিহাব ক্বাদায়ী-১৫, কানযুল উম্মালঃ ২০২৪২)

 

সংঘবদ্ধ জীবনে রয়েছে আল্লাহর রহমতঃ

আল্লাহ তাআলা তাদের সাহায্য করেন যারা সংঘবদ্ধ হয়ে তার আদেশ অনুসরণ করে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,

عَنْ عَرْفَجَةَ بْنِ شُرَيْحٍ الْأَشْجَعِيِّ قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْمِنْبَرِ يَخْطُبُ النَّاسَ، فَقَالَ: ্রإِنَّهُ سَيَكُونُ بَعْدِي هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ، فَمَنْ رَأَيْتُمُوهُ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ، أَوْ يُرِيدُ يُفَرِّقُ أَمْرَ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَائِنًا مَنْ كَانَ فَاقْتُلُوهُ، فَإِنَّ يَدَ اللَّهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ يَرْكُضُগ্ধ [حكم الألباني] صحيح الإسناد (نسائي-৪০২০)

عَنْ أُسَامَةَ بْنِ شَرِيكٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:  يَدُ اللَّهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ (وَالتِّرْمِذِيّ-২১১২,النسائي : ৪০৩২)

আল্লাহর দয়া ও রহমত হয় সংগবদ্ধ জীবনে।’’ (তিরমিজি-২১১২ ই.সে, নাসাঈঃ৪০৩২)

عَنْ زَكَرِيَّا بْنَ سَلَّامٍ يُحَدِّثُ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ رَجُلٍ قَالَ: انْتَهَيْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَقُولُ: ্রأَيُّهَا النَّاسُ، عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ، وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ، أَيُّهَا النَّاسُ، عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ، وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَগ্ধ ، ثَلَاثَ مِرَارٍ،احمد-২৩১৪৫)

রাসূল (সাঃ) বলেছেন- হে মানব সকল! তোমরা সংঘবদ্ধ জীবন যাপন করবে, বিচ্ছিন্ন হবেনা। রাবি বলেন তিনি তিনবার একথা বললেন। (মুসনাদে আহমদ-২৩১৪৫)

عَن الحارِثِ الْأَشْعَرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " آمُرُكُمْ بِخَمْسٍ اللَّهُ أَمَرَنِي بِهِنَّ،: بِالْجَمَاعَةِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَالْهِجْرَةِ وَالْجِهَادِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَإِنَّهُ مَنْ خَرَجَ مِنَ الْجَمَاعَةِ قِيدَ شِبْرٍ فَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ إِلَّا أَنْ يُرَاجِعَ وَمَنْ دَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ فَهُوَ مِنْ جُثَى جَهَنَّمَ وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ ". رَوَاهُ أَحْمد-২২৯১০- وَالتِّرْمِذِيّ-৩৫২৫- بيهقي-৭০৯০-مشكاة- ৩৬৯৪ -[৩৪] (صَحِيح)

হারেছ আশআরী (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছি, যা আল্লাহ আমাকে আদেশ দিয়েছেন- (১) একতাবদ্ধ হয়ে থাকবে,(২) নির্দেশ মানবে,(৩) আনুগত্য করবে---------। (তিরমিজি-৩৫২৫ ই.সে, আহমদ-২২৯১০, বায়হাকী-৭০৯০)

 

পবিত্র কুরআনে একতা ও শৃঙ্খলার নির্দেশনাঃ

আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন একত্রিত হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এবং অশান্তি সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে। আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বলেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ ﴿آل‌عمران: ١٠٣﴾

আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পর¯পর বিচিছন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স¥রণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পর¯পর শত্রু ছিলে অত:পর আল্লাহ তোমাদের মনে স¤প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পর¯পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অত:পর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শন সমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হিদায়াত প্রাপ্ত হতে পার।’’ (সূলা আলে ইমরানঃ ১০৩)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ ﴿القصص: ٧٧﴾

পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা ক্বাসাস-৭৭)

الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ ﴿البقرة: ٢٧﴾

(বিপথগামী ওরাই) যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ পাক যা অবিচ্ছিন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা ছিন্ন করে, আর পৃথিবীর বুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ওরা যথার্থই ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা বাক্বারা-২৭)

وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَٰئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ ﴿الرعد: ٢٥﴾

যারা আল্লাহর অঙ্গীকারকে দৃঢ় ও পাকা-পোক্ত করার পর তা ভঙ্গ করে, আল্লাহ যে সম্পর্ক বজায় রাখতে আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, ওরা ঐ সমস্ত লোক যাদের জন্যে রয়েছে অভিসম্পাত এবং ওদের জন্যে রয়েছে কঠিন আযাব। (সূরা রাদ-২৫)

وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴿الأعراف: ٨٥﴾

পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না। এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। (সূরা আরাফ-৮৫)

وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ ﴿المائدة: ٦٤﴾

আল্লাহ অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা মায়েদা-৬৪)

تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ﴿القصص: ٨٣﴾

এই পরকাল আমি তাদের জন্যে নির্ধারিত করি, যারা দুনিয়ার বুকে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায় না। মুত্তাকীদের জন্যে শুভ পরিণাম। (সূরা ক্বাসাস-৮৩)

বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের শাস্তির ব্যপারে আল্লাহ বলেন-

إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴿المائدة: ٣٣﴾

যারা আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্যে পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। (সূরা মায়েদা-৩৩)

 

সামরিক জীবনে একতা ও শৃঙ্খলাঃ

আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَانٌ مَّرْصُوصٌ ﴿الصف: ٤﴾

আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সীসা গালানো প্রাচীর।’’ সূরা সাফঃ ৪

وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِن قَبْلُ وَفِي هَٰذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَاعْتَصِمُوا بِاللَّهِ هُوَ مَوْلَاكُمْ فَنِعْمَ الْمَوْلَىٰ وَنِعْمَ النَّصِيرُ ﴿الحج: ٧٨﴾

তোমরা আল্লাহর জন্যে শ্রম স্বীকার কর যেভাবে শ্রম স্বীকার করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে পছন্দ করেছেন এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোন সংকীর্ণতা রাখেননি। তোমরা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের ধর্মে কায়েম থাক। তিনিই তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন পূর্বেও এবং এই কোরআনেও, যাতে রসূল তোমাদের জন্যে সাক্ষ্যদাতা হয় এবং তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলির জন্যে। সুতরাং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে ঐক্যবদ্ধভাবে ধারণ কর। তিনিই তোমাদের মালিক। অতএব তিনি কত উত্তম মালিক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী। (সূরা হাজ্ব-৭৮)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا خُذُوا حِذْرَكُمْ فَانفِرُوا ثُبَاتٍ أَوِ انفِرُوا جَمِيعًا ﴿النساء: ٧١﴾

 হে ঈমনাদারগণ! নিজেদের অস্ত্র তুলে নাও এবং পৃথক পৃথক সৈন্যদলে কিংবা সমবেতভাবে বেরিয়ে পড়। (সূরা নিসা-৭১)

 

একতা ও শৃঙ্খলার উদাহরণঃ

(ক) বদরের যুদ্ধের উদাহরণ; আনুগত্য, একতা ও শৃঙ্খলার কারণে বিজয়।

(খ) ওহুদের যুদ্ধের উদাহরণ; আনুগত্যহীনতা ও বিশৃঙ্খলার কারণে বিপর্যয়। আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের এর নেতৃত্বে  ৪০ জনের তীরন্দাজ বাহীনির বিশৃঙ্খলার কারণে বিপর্যয়।

(গ) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সম্মিলিত অংশ গ্রহণে বিজয়।

উপসংহারঃ

পরিশেষে বলতে হয়,ব্যক্তিগত, পারিবারীক, সামাজিক ও রাষ্টীয় জীবনে একতা ও শৃঙ্খলার কোন বিকল্প নাই। কবির ভাষায় বলতে হয়; ‘ছোট ছোট বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।  

 

নেতৃত্বের সংজ্ঞা

একটি জাতির নিরাপত্তা ও কল্যাণ অনেকাংশেই নির্ভর করে নেতৃত্বের উপর। নেতৃত্ব বলতে আমরা বুঝি এমন কার্যক্রমকে যার দ্বারা কোন একটি গ্রুপকে (দলকে) নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানোর চেষ্টা করা হয়। একজন নেতা তার পদমর্যাদা যাই হোক না কেন তিনি আদেশ প্রদানের মাধ্যমে এ ধরণের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। একজন নেতা সাধারণতঃ নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রে প্রেষণা এবং অনুপ্রেরণার কথা বিবেচনায় রেখে থাকেন।

 

নেতৃত্বের গুরুত্ব

মানুষের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলীর পরিপূর্ণতা আসে স্বভাবজাত গুণাবলী ও অর্জিত গুণাবলীর সংমিশ্রণের ফলে। সমাজের নেতা হন কম সংখ্যক ব্যক্তি কিন্তু তাদের অনুসারী হন অনেক বেশি। নেতা যেদিকে চলেন সাধারণ মানুষ অনুসন্ধান ছাড়াই তাদেরকে অনুসরণ করে থাকে। নেতার একটি ভুলের কারণে বিরাট জনতাকে ধ্বংসের অতল তলে নিক্ষেপ করে থাকে। তাই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জগতের সাফল্যের জন্য সঠিক নেতৃত্বের অনুসরণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নেতাদের দায়িত্ব সাধারণ মানুষদেরকে বিপথে পরিচালিত না করে সঠিক পথে পরিচালিত করা। নয়ত বিচার দিনে তারা সাধারণ মানুষের অভিযোগের মুখোমুখি হবেন এবং কঠিন শাস্তির জন্য বিবেচিত হবেন। এ কথাটি আল-কুরআনে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন

يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا * وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا * رَبَّنَا آَتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا ﴿الأحزاب: ٦٦-٦٨﴾

যেদিন অগ্নিতে তাদের মুখমণ্ডল ওলট পালট করা হবে,সেদিন তারা বলবে, হায় ! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রসূলের আনুগত্য করতাম। তারা আরও বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের কথা মেনেছিলাম, অতঃপর তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদেরকে মহা অভিসম্পাত করুন।’’ -সূরা আহযাবঃ ৬৬-৬৮

আল্লাহর প্রতি আনুগত্যহীন নেতৃত্ব সমাজের নৈতিক কাঠামো ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে বিনষ্ট করে দেয়। এ অবস্থা থেকে বাঁচা তখনই সম্ভব যখন সমাজের ঐসব লোক, যারা সমাজের গণ্যমান্য এবং ইহার রাজনৈতিক ও চিন্তার ক্ষেত্রে দিকনির্দেশ করে থাকে, তারা কোন বিশেষ বিশ্বাস ও নীতিবোধ দ্বারা পরিচালিত হয় এবং কোন মূল্যের বিনিময়েই উহাকে পরিত্যাগ করতে রাজি থাকে না। এসব আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচারী নেতাদেরকে তাদের ধন-স¤পদ ও পার্থিব উন্নতি আল্লাহর ক্রোধানল হতে বাঁচবার নিশ্চয়তা দেয় না। অসৎ নেতৃত্বের অনুসারীরা আল্লাহর রোষানল থেকে বেঁচে যাবে এমন ধারণা ঠিক নয়। উভয় দলই পাপিষ্ঠ। এরশাদ হচ্ছে,

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَن نُّؤْمِنَ بِهَٰذَا الْقُرْآنِ وَلَا بِالَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ ۗ وَلَوْ تَرَىٰ إِذِ الظَّالِمُونَ مَوْقُوفُونَ عِندَ رَبِّهِمْ يَرْجِعُ بَعْضُهُمْ إِلَىٰ بَعْضٍ الْقَوْلَ يَقُولُ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لَوْلَا أَنتُمْ لَكُنَّا مُؤْمِنِينَ* قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لِلَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا أَنَحْنُ صَدَدْنَاكُمْ عَنِ الْهُدَىٰ بَعْدَ إِذْ جَاءَكُم ۖ بَلْ كُنتُم مُّجْرِمِينَ* وَقَالَ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا بَلْ مَكْرُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِذْ تَأْمُرُونَنَا أَن نَّكْفُرَ بِاللَّهِ وَنَجْعَلَ لَهُ أَندَادًا ۚ وَأَسَرُّوا النَّدَامَةَ لَمَّا رَأَوُا الْعَذَابَ وَجَعَلْنَا الْأَغْلَالَ فِي أَعْنَاقِ الَّذِينَ كَفَرُوا ۚ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿سبإ: ٣٣- ٣١﴾

কাফেররা বলে, আমরা কখনও এ কুরআনে বিশ্বাস করব না এবং এর পূর্ববর্তী কিতাবেও নয়। আপনি যদি পাপিষ্ঠদেরকে দেখতেন, যখন তাদেরকে তাদের পালনকর্তার সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তারা পরস্পর কথা কাটাকাটি করবে। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, তারা অহংকারীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মুমিন হতাম। অহংকারীরা দুর্বলকে বলবে, তোমাদের কাছে হিদায়াত আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে বাধা দিয়েছিলাম ? বরং তোমরাই তো ছিলে অপরাধী। দুর্বলরা অহংকারীদেরকে বলবে, বরং তোমরাই তো দিবারাত্রি চক্রান্ত করে আমাদেরকে নির্দেশ দিতে যেন আমরা আল্লাহকে না মানি এবং তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত করি। তারা যখন শাস্তি দেখবে, তখন মনের অনুতাপ মনেই রাখবে। বস্তুত আমি কাফেরদের গলায় বেড়ী পরাব। তারা সে প্রতিফলই পাবে যা তারা করত।’’-সূরা সাবাঃ ৩১-৩৩

তবে আল-কুরআনের প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে সমাজের বিপর্যয় ও অন্যায় অনাচারের জন্য অধিকতর দায়ী সমাজের বিত্তবান ও নেতারা। যেমন এরশাদ হচ্ছে,

وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُم بِهِ كَافِرُونَ * وَقَالُوا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالًا وَأَوْلَادًا وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ ﴿سبإ: ٣٥- ٣٤﴾

কোন জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করা হলেই তার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলতে শুরু করেছে, তোমরা যে  বিষয়সহ প্রেরিত হয়েছ, আমরা তা মানি না। তারা আরও বলেছে, আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধ সুতরাং আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না।’’ -সূরা সাবাঃ ৩৪-৩৫

আলকুরআন তাদের এ দাবির প্রতিবাদ করে যে, যেহেতু তারা স¤পদ, ক্ষমতা ও সংখ্যাধিক্যের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ, কাজেই কোন রকম শাস্তি থেকে তারা নিশ্চিতরূপে মুক্ত। এ পরিপ্রেক্ষিতে আল-কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে,

وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُم بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ عِندَنَا زُلْفَىٰ إِلَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا وَهُمْ فِي الْغُرُفَاتِ آمِنُونَ ﴿سبإ: ٣٧﴾

তোমাদের ধন-স¤পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করবে না। তবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, তারা তাদের কর্মের বহুগুণ প্রতিদান পাবে এবং তারা সুউচচ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।” -সূরা সাবাঃ ৩৭

যারা দীর্ঘকালব্যাপী পার্থিব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মালিক থাকে, তাদের মধ্যে আধ্যাতিœক অন্ধত্ব ব্যাপকাভাবে বিস্তার লাভ করে। স¤পদ ও ক্ষমতার প্রমোদ তাদেরকে সদাচার ন্যায় পরায়ণতা ও যুক্তির দাবির প্রতি বধির করে দেয়। তাদেরকে এটা বিশ্বাস করানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য যে, তারা যে পথ অনুসরণ করছে, তা শেষ পর্যন্ত তাদেরকে পার্থিব ও আধ্যাতিœক ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। যে সমস্ত লোক এমন ধরনের নেতৃত্বের অধীনে জীবন পরিচালনা করতে গিয়ে পথভ্রষ্ট হল তারা পরকাল দিবসে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলবে,

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا رَبَّنَا أَرِنَا الَّذَيْنِ أَضَلَّانَا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ نَجْعَلْهُمَا تَحْتَ أَقْدَامِنَا لِيَكُونَا مِنَ الْأَسْفَلِينَ ﴿فصلت: ٢٩﴾

কাফেররা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক। যেসব জ্বিন ও মানুষ আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে দেখিয়ে দাও, আমরা তাদেরকে পদদলিত করব, যাতে তারা যথেষ্ট অপমানিত হয়।’’ -সূরা হা-মীম সাজদাহঃ ২৯

 

আল-কুরআনের এসব আয়াত থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়ে থাকে যে দুর্নীতিপরায়ণ নেতৃত্বের কারণে একটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্য নেমে আসে। জাতীয় দুর্ভাগ্যের একটি মারাত্মক কারণ হচ্ছে ক্রটিপূর্ণ ও দুর্নীতিপরায়ণ নেতৃত্বের উত্থান এবং জনসাধারণ কর্তৃক উহা মেনে নেয়া। আল-কুরআনের মতে যে কোন প্রকার পাপ ও অন্যায় কাজের বিস্তাররোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব রয়েছে জাতীয় নেতৃবৃন্দের উপরই। যদি এতে তারা ব্যর্থ হন, তবে তারা যে সমাজের মধ্যমণি উহার নৈতিক অধঃপতনের দায়িত্ব তাদেরকেই বহন করতে হবে। একটি জাতির অধঃপতন ও ধ্বংস ঠেকাতে পারে সমাজের নেতা ও মুরব্বীরা। এটা তাদেরই দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, যখন জাতির মধ্যে কেউ পাপ কাজ করে এবং তার থেকে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী তাকে বাধা প্রদান না করে, তবে শাস্তি তাদের সবাইকে গ্রাস করে ফেলবে। তাই জাতির সংরক্ষণে সমাজের দায়িত্বশীলদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। নয়ত তাকেও পরকালে বহুগুণ আজাবের সম্মুখীন হতে হবে।

 

নেতৃত্বের ধরণ

আমাদের সমাজে দুধরণের নেতৃত্ব বিদ্যমান। গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব ও স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব। গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলতে বুঝায় যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। অপরদিকে স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলতে যে নেতৃত্বে শুধু মাত্র নেতার দৃষ্টিভঙ্গি, ইচ্ছা বা মতামত প্রতিফলিত হয় তাকে বুঝায়। ইসলামী আইনে প্রত্যেক জাতির অথবা দেশের জন্য একজন নেতা নির্বাচন করা ওয়াজিব। যেমন মুহাম্মদ (সাঃ) -এর ইন্তিকালের পর তার সাহাবী কর্তৃক আবূ বকর (রাঃ)-কে প্রথম খলীফা নির্বাচন করা হয়। অথচ তখনও তাঁকে দাফন করা হয় নাই।

 

নেতৃত্বের জন্য আল্লাহর বিধান

আল্লাহ তাআলা তাদেরকেই নেতৃত্ব দান করেন যে নেতৃত্ব দানের জন্য উপযুক্ত। মূলতঃ যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং এ বিশ্বাসবোধ থেকে সৎ কাজ করবে তাদেরকে এর পুরস্কার স্বরূপ নেতৃত্বের মত সম্মানজনক দায়িত্ব প্রদান করা হবে। এ প্রসংগে আল-কুরআনে উলে­খ করা হয়েছে,

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا ۚ يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ﴿النور: ٥٥﴾

তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছšদ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।’’ -সূরা নূরঃ ৫৫

আল্লাহ তাআলা নেতাদের উপর কিছু অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব অর্পন করেছেন। সেগুলো হলোঃ সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত প্রদান করা, সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ইত্যাদি। এ কাজগুলো পালন করতে ব্যর্থ হলে তাকে পরবর্তী জীবনে শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,

الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ ﴿الحج: ٤١﴾                

তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত।’’ -সূরা হজ্জঃ ৪১

 

 

জাতির উত্থান এবং পতন নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল

যে কোন জাতির উত্থান এবং পতন নির্ভর করে নেতৃত্বের উপর। যদি নেতৃত্বের মধ্যে খোদাভীরুতা, বিশ্বস্ততা, প্রজ্ঞা এবং জনকল্যাণমূলক মানসিকতা ইত্যাদি গুণাবলী বিদ্যমান থাকে তবে সে জাতি সমৃদ্ধি লাভ করবে। যদি নেতার চরিত্র ভালো হয় তবে তার অধীনস্তদের চরিত্রও ভালো হয়। নতুবা এর উল্টোটি হয়।

 

ভালো নেতৃত্বের গুণাবলী

খোদাভীতি

যার অন্তরে খোদাভীতি আছে তিনি কখনো অন্যায় কাজ করতে পারেন না। একজন সৎ নেতার মনে সব সময়ই এ ভয়টি থাকবে। তিনি সব কিছুর জন্য আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবেন। এ ধরনের মানসিকতা তাকে সকল অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকতে সাহায্য করবে।

 

বিশ্বস্ততা বা আমানতদারীতা

যে কোন নেতার জন্যেই অন্যায়ভাবে তার অধীনস্তদের প্রাপ্য অধিকার এবং আমানতের খিয়ানত করা গুরুতর অন্যায়। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ ۚ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا﴿النساء: ٥٨﴾

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায় ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয় আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।’’ -সূরা নিসাঃ ৫৮

 

চরিত্রবান মানুষ হওয়া

একজন নেতা অবশ্যই উত্তম চরিত্রের অধিকারী হবেন। চরিত্রহীন নেতা সব সময়ই নিজেকে স্বীয় স্বার্থের জন্য ব্যস্ত রাখেন। সে নিজেকে কখনোই দেশ ও জাতির স্বার্থে নিয়োজিত করতে পারে না।

 

ধন সম্পদের প্রতি অনাসক্তি

ধন সম্পদের প্রতি আসক্তি মানুষকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। যদি কোন নেতা ধন সম্পদের প্রতি আসক্ত হন, তবে তিনি সরকারী সম্পদের অপব্যবহার করবেন যার ফলশ্রতিতে দেশ ও জাতির ধ্বংস ত্বরান্বিত করবে। তাছাড়া টাকার লোভ মানুষকে সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বিরত রাখবে। কাজেই ধন সম্পদের প্রতি যার লোভ আছে তার পক্ষে সৎ নেতা হওয়া সম্ভব নয়।

 

সৎ হওয়া

সমাজে শান্তি ও শৃংখলা স্থাপনের জন্য ন্যায়পরায়ণতা একটি অপরিহার্য  বিষয়। একজন নেতা তার অধীনস্তদের প্রতি ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ ۚ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا﴿النساء: ٥٨﴾

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায় ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয় আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।’’ -সূরা নিসাঃ ৫৮

অন্য আয়াতে উলে­খ রয়েছে,

إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ ۚ وَلَا تَكُن لِّلْخَائِنِينَ خَصِيمًا ﴿النساء: ١٠٥﴾

নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়াঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না।’’ -সূরা নিসাঃ ১০৫

 

শান্ত ও ধীরস্থীর হওয়া

একজন আদর্শ নেতার বৈশিষ্ট্য হলো তিনি যে কোন বিপদের মূহুর্তে বিচলিত বা ধৈর্য্যহীন না হয়ে বরং অত্যন্ত দৃঢ় চিত্তে ধৈর্য্যরে সাথে সমস্যার মোকাবেলা করবেন। তিনি কোন কিছু না ভেবেই দ্রত কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে বরং ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

 

নেতৃত্বের যোগ্যতা

নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা ছাড়া নেতৃত্ব দান কখনো সম্ভব নয়। যে যত বেশি যোগ্যতা অর্জন করবে সে তত ভালো ভাবে নেতৃত্বদানে সক্ষম হবে। একজন সৎ নেতা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তার অধীনস্তদের পরিচালনা করেন এবং তাদের কল্যাণ ও উন্নতি কামনা করেন।

 

আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা

আল-কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলাই হলেন সকল ক্ষমতার উৎস। মানুষ হলো আল্লাহর প্রতিনিধি। যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনার মাধ্যমে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবেন। এ প্রসংগে আল্লাহ তাআলা বলেন,

هُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ فِي الْأَرْضِ ۚ فَمَن كَفَرَ فَعَلَيْهِ كُفْرُهُ ۖ وَلَا يَزِيدُ الْكَافِرِينَ كُفْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ إِلَّا مَقْتًا ۖ وَلَا يَزِيدُ الْكَافِرِينَ كُفْرُهُمْ إِلَّا خَسَارًا ﴿فاطر: ٣٩﴾

তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে স্বীয় প্রতিনিধি করেছেন। অতএব যে কুফুরী করবে তার কুফুরী তার উপরই বর্তাবে। কাফেরদের কুফুর কেবল তাদের পালনকর্তার ক্রোধই বৃদ্ধি করে এবং কাফেরদের কুফুর কেবল তাদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।’’ -সূরা ফাতিরঃ ৩৯

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ ۗ إِنَّ رَبَّكَ سَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴿الأنعام: ١٦٥﴾

তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং একে অন্যের উপর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, যাতে তোমাদের কে এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন, যা তোমাদেরকে দিয়েছেন। আপনার প্রতিপালক দ্রæত শাস্তি দাতা এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু। ’’ -সূরা আনআমঃ ১৬৫

 

শান্তি শৃংখলা বজায় রাখা

সমাজে শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখা প্রত্যেক নেতার অপরিহার্য কর্তব্য। শান্তি ও শৃংখলার অভাবে সমাজে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। ফলে সমাজের উন্নতি ও সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে ইসলামে যুদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ ۖ فَإِنِ انتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ ﴿البقرة: ١٩٣﴾

আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিন্ঠিত হয়। অত:পর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোন জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)।’’ -সূরা বাক্বারাঃ ১৯৩

 

প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা

প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার ও সম্মান রক্ষা করা সৎ নেতার কর্তব্য। মানুষ হিসেবে যদিও সবাই সমান, তথাপি স্বাভাবিকভাবেই জ্ঞানী ও ধার্মিক লোকেরা অধিক মর্যাদাশীল। তাই সৎ নেতার কর্তব্য হলো মানুষের মৌলিক অধিকার ও সম্মান যথাযথ নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,

قل هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ ﴿الزمر: ٩﴾

বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না ; তারা কি সমান হতে পারে ? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।’’ -সূরা যুমারঃ ৯

إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ ﴿الحجرات: ١٣﴾

নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।’’ -সূরা হুজুরাতঃ ১৩

 

পথভ্রষ্টদের পথ দেখানো

 মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন একজন ন্যায় পরায়ণ, সৎ ও আদর্শ নেতা। আল্লাহ তাআলা তাকে পথভ্রষ্ট মানুষদেরকে সঠিক পথের নির্দেশনার জন্য প্রেরণ করেছেন। তিনি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার মাধ্যমে পৃথিবীর সকল নেতার কাছে অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

 

উপসংহার

একটি সমাজ সুশৃংখলভাবে পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজন একতার। একতাবদ্ধভাবে চলার জন্য প্রয়োজন শৃংখলা ও নেতৃত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে একতাবদ্ধ জীবন যাপন চলা এবং সঠিক নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জনের তাওফীক দান করুন। -আমীন!!

 

 

আনুগত্য

 

ভূমিকা

ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আজ মূল্যবোধ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে সমাজে বিশৃঙ্খলা। বাড়ছে মারামারি, খুন-খারাবি, রাহাজানি। নষ্ট হচ্ছে সমাজে আনুগত্যের ভারসাম্য। এটা আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নাফরমানী। ফলে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্য লাভ করতে পারে না।

 

আনুগত্যের পরিচয়

আনুগত্য অর্থ মান্য করা, আদেশ নিষেধ পালন করা। উপরন্তু কোন কর্তৃপক্ষের ফরমায়েশ অনুযায়ী কাজ করা। কুরআন ও হাদীসে এর বিপরীত ভাবার্থ হচ্ছে নাফরমানী করা, হুকুম অমান্য করা। প্রকৃত ইতায়াত বা আনুগত্য হচ্ছে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ তাআলার যাবতীয় হুকুম মেনে চলা। এটাই মানুষের একমাত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ প্রসংগে আল্লাহ্ তাআলা কুরআনে বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿النساء: ٥٩﴾

হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।সূরা নিসাঃ ৫৯

আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আনুগত্য শর্তহীন এবং নিরঙ্কুশ। আর আমীর (শাসক) বা বিচারকের আনুগত্য শর্ত সাপেক্ষ এবং আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কর্তৃক প্রদত্ত সীমারেখার মধ্যে সীমিত। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَمَنْ يُطِعِ الْأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي وَمَنْ يَعْصِ الْأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِيগ্ধ (متفقٌ عَلَيْهِ ,مشكوة-২/৩৩৪-৩৬৬১)

যে আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহরই আনুগত্য করল, আর যে আমার হুকুম অমান্য করল সে আল্লাহ্রই হুকুম অমান্য করল। আর যারা আমার (রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিযুক্ত অথবা তার আনুগত্যকারী) আমীরের আনুগত্য করল, সে আমার আনুগত্য করল এবং যারা আমার আমীরের আদেশ অমান্য করল সে প্রকৃতপক্ষে আমারই আদেশ অমান্য করল।” -বুখারী ও মুসলিম; মিশকাতঃ ৩৬৬১

উলুল আমর এর অর্থ

আভিধানিক অর্থে সে সমস্ত লোক, যাদের হাতে কোন বিষয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত থাকে। মুফাছছিরদের অভিমত, যাদের মধ্যে আবূ হুরাইরাসহ বিভিন্ন সাহাবা (রাঃ) বলেন, সে সমস্ত লোক যাদের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত, তাদেরকে উলুল আমর বলা হয়। এছাড়া উলুল আমর দ্বারা উলামা ও শাসক উভয় শ্রেণীকেই বঝায়, কারণ নির্দেশ দানের ব্যাপারটি তাদের উভয়ের সাথেই সম্পর্কিত।

 

ইসলামের সাথে আনুগত্যের স¤পর্ক

ইসলাম ও আনুগত্য অর্থের দিক দিয়ে এক ও অভিন্ন। তদ্রুপ দ্বীন ও ইতায়াত অর্থের দিক দিয়ে পর¯পর ওতপ্রোতোভাবে জড়িত। যেমন ইসলাম শব্দের অর্থ আনুগত্য বা আতœসমর্পন, ইতায়াত শব্দের অর্থও তাই। এভাবে দ্বীন শব্দের ৪টি অর্থ রয়েছে তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আনুগত্য। সুতরাং আমরা বলতে পারি ইসলামই আনুগত্য অথবা আনুগত্যই ইসলাম। যার মধ্যে আনুগত্য নেই সে ইসলামের যত বড় অনুসারী হোক না কেন তার মধ্যে দ্বীন নেই, ইসলাম নেই।

 

আনুগত্যের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা

সমাজ ও রাষ্ট্র নামক যন্ত্রকে সুন্দর সচল রাখার লক্ষ্যে আজ প্রয়োজন শ্রেণীভেদে একে অপরের মূল্যায়ন ও মূল্যবোধ সৃষ্টির বাস্তবায়নস্বরূপ আনুগত্য প্রদর্শন করা। আলকুরআনুল কারীম ও হাদীসের যথার্থ জ্ঞান যাদের থাকে তারা কখনোই আনুগত্যের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বলেছেন,

فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ ﴿الشعراء: ١٠٨﴾

অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।” -সূরা শুআরাঃ ১০৮

এখানে আল্লাহকে ভয় ও তার পছন্দনীয় পথে জীবন চলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য অপরিহার্য করেছেন।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন,

إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿النور: ٥١﴾

মুমিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের দিকে তাদেরকে আহবান করা হয়, তখন তারা বলে: আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম। তারাই সফলকাম।” -সূরা আন-নূরঃ ৫১

 

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ۗ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا﴿الأحزاب: ٣٦﴾

আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন মত প্রকাশের ক্ষমতা নেই। যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।” -সূরা আহযাবঃ ৩৬

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রالسَّمعُ والطاعةُ على المرءِ المسلمِ فِيمَا أحب وأكره مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَগ্ধ (متفقٌ عَلَيْهِ ,مشكوة-২/৩৩৪-৩৬৬৪)

নেতার আদেশ শোনা ও মানা অপরিহার্য কর্তব্য। তাই সে আদেশ তার পছন্দনীয় হোক আর অপছন্দনীয় হোক তবে হ্যাঁ যদি আল্লাহ্র নাফরমানীমূলক কোন কাজের নির্দেশ হয় তবে সেই আদেশ শোনা ও মানার কোন প্রয়োজন নেই।” -বুখারী; মুসলিম; মিশকাতঃ ৩৬৬৪

হাদীসে আছে, উবাদা ইবন ছামিত  বলেন,

عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ: بَايَعْنَا رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِي الْعُسْرِ وَالْيُسْرِ وَالْمَنْشَطِ وَالْمَكْرَهِ وَعَلَى أَثَرَةٍ عَلَيْنَا وَعَلَى أَنْ لَا نُنَازِعَ الْأَمْرَ أَهْلَهُ وَعَلَى أَنْ نَقُولَ بِالْحَقِّ أَيْنَمَا كُنَّا لَا نَخَافُ فِي اللَّهِ لَوْمَةَ لَائِمٍ (مُتَّفَقٌ عَلَيهِ ,مشكوة-২/৩৩৫-৩৬৬৬)

আমরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি (কয়েকটি বিষয়ের তা হচ্ছে) (১) নেতার আদেশ মান্য করতে হবে-দুঃসময়ে হোক বা সুসময়ে হোক, খুশীর মুহুর্তে বা অখুশীর মুহুর্তে। (২) নিজের তুলনায় অপরের সুযোগ সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। (৩) নেতার সাথে বিতর্কে জড়ানো যাবে না, তবে নেতার আদেশ যদি প্রকাশ্য কুফুরীর শামিল হয় এবং সে ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে যথেষ্ট দলিল প্রমাণ থাকে তাহলে ভিন্ন কথা। (৪) যেখানে যে অবস্থাই থাকি না কেন হক কথা বলতে হবে। আল্লাহর পথে কোন নিন্দুকের ভয় করা চলবে না।” -বুখারী; মুসলিম; মিশকাতঃ ৩৬৬৬

কুরআন ও হাদীসের আলোকে আনুগত্যের যে গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা আমরা জানতে পারি, মানুষের জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমনকি প্রাণী জগতেও এর বাস্তবতা ও যথার্থতার প্রমাণ মিলে। একটি পরিবার, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও দেশ সব কিছুই নির্ভর করে আনুগত্যের উপর।

 

আনুগত্যহীনতার পরিণাম

আনুগত্যহীনতার পরিণাম স¤পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ ﴿محمد: ٣٣﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র আনুগত্য কর, রাসূলের (সাঃ) আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট করো না।” -সূরা মুহাম্মদঃ ৩৩

উক্ত আয়াত নাযিলের পরিবেশের প্রতি লক্ষ্য রেখে বলা যায় যে, আনুগত্যহীনতা সমস্ত নেক আমল বিনষ্ট করে দেয়। নবী করীম (সাঃ)-এর পিছনে জামাতের সাথে যারা সালাত পড়েছে তাদেরকে যখন যুদ্ধে যেতে বলা হল, তখন এক দল লোক সে নির্দেশ অমান্য করল, তাদের সমস্ত আমল ধুলোয় মিশে গেল। তাদেরকে মুনাফিক নামে অবিহিত করা হল।

আল্লাহ্ তাআলা বলেন,

يَحْلِفُونَ لَكُمْ لِتَرْضَوْا عَنْهُمْ ۖ فَإِن تَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَىٰ عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ﴿التوبة: ٩٦﴾

তারা তোমার সামনে কসম খাবে যাতে তুমি তাদের প্রতি রাযী হয়ে যাও। অতএব, তুমি যদি রাযী হয়ে যাও তাদের প্রতি, তবুও আল্লাহ্ তা'আলা রাযী হবেন না, এ নাফরমান লোকদের প্রতি।” -সূরা তাওবাঃ ৯৬

এ আয়াতে বুঝা গেল আনুগত্যহীনতার পরিণামে আল্লাহর রেজামন্দি থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: ্রمَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ فَمَاتَ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً (رواه مسلم- ,مشكوة-২/৩৩৫-৩৬৬৯)

যে আনুগত্যের গন্ডি থেকে বের হয়ে যায়, এবং জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অতপর মৃত্যু বরণ করে, তার মৃত্যু হয় জাহিলিয়্যাতের মৃত্যু। ” -মুসলিম

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন,

 عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ كَرِهَ مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا فَلْيَصْبِرْ فَإِنَّهُ مَنْ خَرَجَ مِنْ السُّلْطَانِ شِبْرًا مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً (متفقٌ عَلَيْهِ)

কেউ তার আমীরের মধ্যে অপছন্দনীয় কাজ দেখতে পেলে সে যেন সবর করে (আনুগত্য পরিহার না করে) কেননা, যে (ইসলামী) কর্তৃপক্ষের আনুগত্য থেকে এক বিঘত পরিমাণে সরে যায় বা বের হয়ে যায়, তার মৃত্যু জাহিলিয়্যাতের মৃত্যু হবে। ” -বুখারীঃ ৭০৫৩; মুসলিমঃ ১৮৪৯

 

আনুগত্যের দাবী

ইসলামের আনুগত্য তাকেই বলা যাবে, যার মধ্যে ভক্তি, শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা, স্বতস্ফূর্ততা, প্রেরণা ও নিষ্ঠা থাকে। কোন প্রকারের কৃত্রিমতা বা সংশয় থাকবে না। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন,

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿النساء: ٦٥﴾

অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অত:পর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতার স্থান হবে না এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।”-সূরা নিসাঃ ৬৫

মুনাফিকদের কৃত্রিমতার আনুগত্য স¤পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে,

وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِنْ أَمَرْتَهُمْ لَيَخْرُجُنَّ ۖ قُل لَّا تُقْسِمُوا ۖ طَاعَةٌ مَّعْرُوفَةٌ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ﴿النور: ٥٣﴾

তারা দৃঢ়ভাবে আল্লাহ্র কসম খেয়ে বলে যে, আপনি তাদেরকে আদেশ করলে তারা সবকিছু ছেড়ে বের হবেই। বলুন: তোমরা কসম খেয়ো না। আনুগত্যের  বিষয়টি প্রসিদ্ধ (¯পষ্ট), তোমরা যা কিছু কর নিশ্চয় আল্লাহ্ সে বিষয়ে জ্ঞাত। ” -সূরা নূরঃ ৫৩

 

আনুগত্যের পূর্ব শর্ত

কুরআন ও হাদীসে যেখানে আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে সেখানেই প্রথমে শ্রবণ করার কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,

عَن الحارِثِ الْأَشْعَرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " آمُرُكُمْ بِخَمْسٍ: بِالْجَمَاعَةِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَالْهِجْرَةِ وَالْجِهَادِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَإِنَّهُ مَنْ خَرَجَ مِنَ الْجَمَاعَةِ قِيدَ شِبْرٍ فَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ إِلَّا أَنْ يُرَاجِعَ وَمَنْ دَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ فَهُوَ مِنْ جُثَى جَهَنَّمَ وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ "(رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ ,مشكوة-২/৩৪১-৩৬৯৪)

আমি তোমাদের পাঁচটি জিনিসের নির্দেশ দিচ্ছি (১) জামায়াতের (সংঘবদ্ধ জীবন) (২) শুনার (শ্রবণ করার) (৩) আনুগত্য করার (৪) হিজরত করার এবং (৫) জিহাদ করার.................।” -তিরমিযী; আহমদ; মিশকাতঃ ৩৬৯৪

আদিষ্ট বিষয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। অ¯পষ্ট থাকলে দায়িত্বশীল ব্যক্তির নিকট আলাপ করে বুঝাতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ বিষয়ে দুআয় বলেছেন,

اللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَأَلْهِمْنَا اتِّبَاعَهُ، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلًا، وَأَلْهِمْنَا اجْتِنَابَهُ (شرح مذاهب اهل السنة لابن شهير : ৩৮)

হে আল্লাহ! আামাদের সত্য  বিষয়কে সত্য হিসাবে দেখান, আর তাওফিক দেন তার অনুসরণ করার। আর বাতিলকে বা অসত্যকে খারাপ জানার তাওফীক দিন এবং তা হতে বিরত থাকার ব্যবস্থা করুন।” -শরাহ মাজাহিবু আহলিস সুন্নাহ্ লি ইবন শাহীরঃ ৩৮

 

আনুগত্যের পথে অন্তরায়  বিষয়সমূহ

(১) আখিরাতের জীবনের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেয়া। যেমন আল্লাহ্ তাআলা কুরআনে বলেছেন,

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا ﴿الأعلى: ١٦﴾

বস্তূত: তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছ।” -সূরা আলাঃ ১৬

(২) নিজ নিজ দায়িত্বের যথার্থ অনুভূতির অভাব।

(৩) সিদ্ধান্তের গুরুত্ব স¤পর্কে সঠিক চেতনার অভাব।

(৪) গর্ব, অহংকার, আত্মম্ভরিতা। এটা শয়তানের চরিত্র।

وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ ﴿لقمان: ١٨﴾

অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” -সূরা লোকমানঃ ১৮

(৫) সংশয়ের প্রবণতা।

 

আনুগত্যের পরিবেশ সৃষ্টি করা

নিম্মোক্ত  বিষয়গুলো আনুগত্যের পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম;

(ক) সকল পর্যায়ের দায়িত্বশীল তথা কমান্ডারগণ আল্লাহ্ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হুকুম পালন করবে।

(খ) দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ কর্মের মাধ্যমে আদর্শ স্থাপন করবে।

(গ) অধঃস্তনদের মঙ্গলের জন্য দুআ করা।

 

উপসংহার

আনুগত্য প্রদর্শন করা বা করার প্রতি মন-মানসিকতা নমনীয় রাখা সচ্চরিত্রের একটি নমুনা। তবে ইসলাম কখনো অন্ধ আনুগত্যের আদেশ দেয়নি বরং ইসলাম সৎ কর্মের ক্ষেত্রে আনুগত্য চেয়েছে। সৎ কর্মের সীমার বাইরে ইসলামের বক্তব্য হচ্ছে সুস্পষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ﴿المائدة: ٢﴾

গুনাহ ও আল্লাহ নির্ধরিত সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে পর¯পরের সহযোগি হয়ো না।” -সূরা মায়িদাঃ ২

 

No comments:

Post a Comment