১। ভুমিকাঃ
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ, সার্বজনীন ও ভারসাম্যপূণ জীবন ব্যবস্থার নাম। এর বৈশিষ্ট্য
হচ্ছে মধ্যমপন্থা,
মিতাচার, সংযমশীলতা, সরলতা, সহজীকরন ইত্যাদি। কাজেই আল-কুরআনের আওতায় গড়া এ জীবন
ব্যবস্থায় কোন বাড়াবাড়ি করার সুযোগ নেই। মধ্যম পন্থা অবলম্বন করাই ইসলামের
নির্দেশ। মুমিনের জীবনের সকল কাজের মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকা একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহ
তা‘আলা মুসলিম জাতিকে সকল কর্মকান্ডে মধ্যমপন্থী হিসেবে অভিহিত
করে বলেন,
كَذَلِكَ
جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ ﴿البقرة: ১৪৩﴾
“এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি- যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলির জন্যে।” -সূরা বাক্বারাঃ
১৪৩
অতএব ‘মধ্যমপন্থা
অবলম্বন’
সম্পর্কে ইসলামের দিক নির্দেশনা কি? তা আজ আলোচনা করব ইনশাল্লাহ।
২। মধ্যমপন্থার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাঃ
ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন
করতে বলেছে। কারণ মধ্যমপন্থা অবলম্বন মানব চরিত্রের একটি বিশেষ গুন। জীবনকে
সফল করে তুলতে হলে এই বৈশিষ্টের বিশেষ গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জীবন চলার
ক্ষেত্রে চাল-চলনে, কথা-বার্তায়, আচার-ব্যবহারে, ইবাদত-বন্দেগী
এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন অত্যন্ত বাস্তব সম্মত একটি বিষয়। কেননা একজন
মানুয়ের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মধ্যমপন্থা অবলম্বনই সফলতার প্রধান কারণ।
মধ্যম বা মাঝামাঝি পন্থা অবলম্বন করা, কোন কাজে ও কথায় সীমা লংঘন না করা, বাড়াবাড়ি না করা এবং মাত্রাতিরিক্ত কিছু না করা। ইংরেজীতে
একটি প্রবাদ আছে,
“Eccess of any thing very bad” অতিরিক্ত সব কিছুই খারাপ। আরবীতে
প্রবাদ বাক্য আছে, خَيْرُ الْاُمُوْرِ اَوْسَطُهَا “মধ্যমপন্থাই হচ্ছে সর্বোত্তম।”
কোন কাজে একদিকে ঝুকে পড়লে অন্যদিকের অপরিহার্য
বিষয় আদায়েও অসুবিধা হতে পারে। এ কারনে ইসলাম জীবনের উপর চরম কঠোরতা আরোপ করতে নিষেধ করেছে। মূলত মধ্যমপন্থা
অবলম্বন না করার কারনেই এ কঠোরতা আসে। সাথে সাথে আল্লাহ মানুষের প্রতি কঠিন কোন বিধান আরোপ করেননি। বরং সহজ
বিধান আরোপ করেছেন। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে,
يُرِيدُ
اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ ﴿البقرة: ١٨٥﴾
“আল্লাহ তোমাদের জন্যে তার বিধানকে সহজ করতে চান। কঠিন করা
তার উদ্দেশ্য নহে।’’ -সূরা বাকারাঃ ১৮৫
হাদীস শরীফে এসেছে,
عَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ
عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রإِنَّ الدِّينَ
يُسْرٌ وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلَّا غَلَبَهُ فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا
وَاسْتَعِينُوا بِالْغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَيْءٍ مِنَ الدُّلْجَةِগ্ধ (رَوَاهُ
الْبُخَارِيُّ ,مشكوة : ১২৪৬)
“আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সাঃ) বলেন, “আল্লাহর
দ্বীন সহজ,
যে কোন ব্যক্তি এ দ্বীনকে কঠিন বানাবে
তার উপর তা চেপে বসবে। কাজেই মধ্যম ও ভারসাম্যপূর্ণপন্থা অবলম্বন কর। আর সুখবর
গ্রহণ কর এবং সকাল সন্ধ্যায় ইবাদত করে আল্লাহর সাহায্য চাও।” -বুখারী; মিশকাতঃ ১২৪৬
একজন মুমিনকে এ দুনিয়াতে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য
পালন করতে হয়। সুতরাং কোন একটি কর্তব্য নিয়ে বেশী বাড়াবাড়ি করলে নিশ্চিত অন্য
দায়িত্ব ও কর্তব্যের ক্ষতি হতে পারে। এ কারনে ইসলাম প্রতিটি কাজে এমন পন্থা অবলম্বন করতে নির্দেশ
দিয়েছে যাতে প্রতিটি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা যায়। ইসলামের
পূর্বের অন্যান্য ধর্মব্যবস্থার মতো ইসলামে নেই কোন কঠোরতা, অসম্পূর্ণতা, অপূর্ণতা।
৩। মধ্যমপন্থার পরিচয়ঃ
মধ্যমপন্থার আরবী প্রতিশব্দ হলো القصد আল-কাসদু, الوسط আল-ওয়াসাতু। যার বাংলা
শাব্দিক অর্থ হলো-মধ্যবর্তী হওয়া, মধ্যমপন্থী
হওয়া, উত্তম, শ্রেষ্ঠ, উপকারী, ন্যায়পরায়নতা, ইনসাফ ইত্যাদি। এদের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) বলেন, ‘আমল (নফল)-এর ক্ষেত্রে হ্রাস-বৃদ্ধি বা অতিরঞ্জণ ও সংকোচনের
মধ্যবর্তী অবস্থা।”
ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (রহঃ) বলেন, ‘সরল পথে চলা, বাড়া-বাড়ি
ও শৈথিল্যের মধ্যবর্তী হওয়া। আর মধ্যমপন্থার মূল হচ্ছে সোজা পথে চলা, যেমন মহান আল্লাহ বলেন,
وَعَلَى
اللَّهِ قَصْدُ السَّبِيلِ وَمِنْهَا جَائِرٌ (سورة النحل-৯)
“সরল পথ আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে এবং পথগুলোর মধ্যে কিছু বক্র পথও
রয়েছে।” -সূরা নাহলঃ
৯
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
" يَا أَيُّهَا النَّاسُ عَلَيْكُمْ بِالْقَصْدِ
" . ثَلاَثًا
“হে লোকসকল! তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা মধ্যমপন্থা
অবলম্বন কর। তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর।” -ইবনে মাজাহঃ
৪২৪১
মোটকথা মধ্যমপন্থা অর্থ হচ্ছে দুইটি বিপরীত মতের
মধ্যবর্তী মত। যেমনঃ- ‘নরমপন্থা
ও চরমপন্থা’
এ মতের মধ্যবর্তী মতই হলো “মধ্যমপন্থা”।
৪। চরিত্র মাধুর্যে মধ্যমপন্থাঃ
ক। চালচলনে
মধ্যমপন্থাঃ
মানুষের চাল-চলনে অনেক সময় গর্ব-অহংকার প্রকাশ
পায়। যা ইসলাম নিষেধ করেছে। আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
وَلَا
تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ
طُولًا ﴿الإسراء: ٣٧﴾
“পৃথিবীতে দম্ভভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয়
তুমি তো ভূপৃষ্ঠকে কখনই বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত সমান হতে
পারবে না।” -সুরা বনি
ইসরাঈলঃ ৩৭
পক্ষান্তরে এ ব্যাপারে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ
দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَاقْصِدْ
فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ﴿لقمان:
١٩﴾
“পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কন্ঠস্বর নীচু কর। নিঃসন্দেহে
গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।” -সুরা লোকমান,ঃ ১৯
এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
عَنْ
عَبْدِ اللهِ بْنِ سَرْجِسَ الْمُزَنِيِّ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ قَالَ: السَّمْتُ الحَسَنُ، وَالتُّؤَدَةُ وَالاِقْتِصَادُ جُزْءٌ مِنْ أَرْبَعَةٍ
وَعِشْرِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ. (ترمزى-২০১০)
“আব্দুল্লাহ ইবন সারজিস মুযানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (সাঃ)
বলেছেন,
সুন্দর চাল-চলন, ধীরস্থিরতা এবং মধ্যমপন্থা হল নুবুওয়্যাতের চব্বিশ ভাগের এক
ভাগ।” -তিরমিযীঃ
২০১০; মিশকাতঃ ৫০৫৯
অন্য হাদীসে এসেছে,
عَبْدُ
اللَّهِ بْنُ عَبَّاسٍ، أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ্রإِنَّ الْهَدْيَ الصَّالِحَ، وَالسَّمْتَ
الصَّالِحَ، وَالِاقْتِصَادَ جُزْءٌ مِنْ خَمْسَةٍ وَعِشْرِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِগ্ধ(ابوداؤد -৪৭৭৬)
“আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেন, সৎভাবে
চলা, উত্তম চরিত্র এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা নুবুওয়্যাতের পঁচিশ
ভাগের এক ভাগ।” -আবূ দাঊদঃ ৪৭৭৬; মিশকাতঃ
৫০৬০
খ। কথাবার্তায় মধ্যমপন্থাঃ
কথাবার্তায় কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার জন্যও আল্লাহ
তা‘আলা নির্দেশ দিয়ে বলেন,
يَا
أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ
وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ
وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ (سورة الحجرات-২)
“মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো
না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচুস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের
কর্ম নিস্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না।” -সুরা হুজরাতঃ
২
হাদীসে এসেছে,
عَنْ
جَابِرٍ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ مِنْ
أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ
أَخْلاَقًا، وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ
القِيَامَةِ الثَّرْثَارُونَ وَالمُتَشَدِّقُونَ وَالمُتَفَيْهِقُونَ، قَالُوا: يَا
رَسُولَ اللهِ، قَدْ عَلِمْنَا الثَّرْثَارُونَ وَالمُتَشَدِّقُونَ فَمَا الْمُتَفَيْهِقُونَ؟
قَالَ: الْمُتَكَبِّرُونَ. (ترمزى-২০১৮ , الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان)
“জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) বলেছেন,
তোমাদের মধ্যে যার চরিত্র ও ব্যবহার
ভাল সে ব্যক্তি আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং কিয়ামত দিবসে সে আমার সবচেয়ে নিকট অবস্থান
করবে। আর আমার নিকট তোমাদের মধ্যে সবচে ঘৃণ্য ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে
যারা আমার থেকে দূরে থাকবে সেই ব্যক্তিরা হল, যারা (ছারঝারূন)
অনর্থক বক বক করে,
যারা (মুতাশাদ্দিকুন) উপহাস করে এবং
যারা মুতাফায়হিকুন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছারঝারূন
ও মুতাশাদ্দিকুন তো আমরা জানি কিন্তু মুতাফায়হিকুন কারা? তিনি বললেন যারা অহংকার করে।” -তিরমিযীঃ
২০১৮; মিশকাতঃ ৪৭৯৭, ৪৭৯৮
অন্য হাদীসে এসেছে,
عَنْ
أَبِي الدَّرْدَاءَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ্রإِنَّ أَثْقَلَ شَيْءٍ
يُوضَعُ فِي ميزانِ الْمُؤمن يومَ الْقِيَامَة خُلُقٌ حسنٌ وَإِنَّ اللَّهَ يُبْغِضُ
الْفَاحِشَ الْبَذِيءَগ্ধ . رَوَاهُ
التِّرْمِذِيُّ ,مشكوة-৩/১৪০৯-৫০৮১)
“আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী করীম
(সাঃ) বলেছেন,
কেয়ামতের দিন মুমিনের আমলনামায় সুন্দর
আচরণের চেয়ে অধিক ভারী আমল আর কিছুই হবে না। যে ব্যক্তি অশ্লীল ও কটু কথা বলে বা
অশোভন আচরণ করে তাকে আল্লাহ ঘৃনা করেন।’’ -তিরমিযীঃ ২০০২; মিশকাতঃ
৫০৮১
গ। আচার আচরণে মধ্যমপন্থাঃ
মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা আচার-ব্যবহারে
বিনয়ী ও নম্র হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
عَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ্রالْمُؤْمِنُ غِرٌّ كَرِيمٌ
وَالْفَاجِرُ خَبٌّ لَئِيمٌ(رَوَاهُ
أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ ,مشكوة : ٥٠٨٥)
“মুমিন ব্যক্তি সদয় ও ভদ্রস্বভাবের হয়ে থাকে, আর পাপীষ্ঠ ব্যক্তি প্রতারক ও নীচ প্রকৃতির হয়ে থাকে।” -আহমদ; তিরমিযীঃ ১৯৬৪; আবূ দাঊদঃ
৪৭৯০; মিশকাতঃ ৫০৮৫
অন্য হাদীসে আরো এসেছে,
عَنْ
مَكْحُولٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রالْمُؤْمِنُونَ هَيِّنُونَ
لَيِّنُونَ، كَالْجَمَلِ الْأَنِفِ، إِنْ قِيدَ انْقَادَ، وَإِنْ أُنِيخَ عَلَى صَخْرَةٍ
اسْتَنَاخَগ্ধ رَوَاهُ
الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان
“মাকহুল (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) বলেছেন,
ঈমানদারগণ নাকে রশি লাগানো উটের ন্যায়
সরল, সহজ ও কোমল স্বভাবের হয়। যখন তাকে
টানা হয়,
তখন সে চলে। আর যদি
তাকে পাথরের উপর বসাতে চাওয়া হয়, তাহলে সে
তার উপর বসে পড়ে।” -বাইহাকীঃ ৭৭৭৭; মিশকাতঃ
৫০৮৬
يَا
أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي
اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ
عَلَى الْكَافِرِينَ ﴿المائدة: ٥٤﴾
“হে মুমিনগণ, তোমাদের
মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ
এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে
তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাকে ভালবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে
এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে।” -সুরা মায়েদাঃ ৫৪
আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ
(সাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন,
فَبِمَا
رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا
مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ(سورة
ال عمران-১৫৯)
“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে
আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা
আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা
করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন ।” -সুরা আলে
ইমরানঃ ১৫৯
হাদীসে এসেছে,
عَنْ
عِيَاضِ بْنِ حِمَارٍ، أَنَّهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ: ্রإِنَّ
اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَبْغِيَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ،
وَلَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍগ্ধرَوَاهُ مُسلم- مشكواة-৪৮৫৮)
“আয়ায ইবন হিমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) বলেন,
আল্লাহর আমার নিকট অহী পাঠিয়েছেন যে, তেমরা পরস্পরের সাথে বিনয় ও নম্র আচরণ করো, এমনকি কেউ কারো উপর গৌরব করবে না এবং একজন আরেকজনের উপর বাড়াবাড়ি
করবে না।” -মুসলিমঃ
২৮৬৫; মিশকাতঃ ৪৮৫৮
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিনয় ও নম্রতার পুরস্কার সম্পর্কে
বলেন,
্রوَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ
إِلَّا رَفَعَهُ اللهُগ্ধ رَوَاهُ
مُسلم
“কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করলে
আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।” -মুসলিমঃ ২৫৮৮; মিশকাতঃ
১৮৮৯
পক্ষান্তরে দাম্ভিক-অহংকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন
না। এ মর্মে তিনি বলেন,
وَلَا
تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا
يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ ﴿لقمان: ١٨﴾
“অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে
পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” -সুরা লোকমানঃ
১৮
ঘ। মানুষের সাথে মেলামেশায় মধ্যমপন্থাঃ
মানুষের সাথে মেলামেশায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা
আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে স, শিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র এবং
শালীনদের সাথে সংশ্রব রাখাই উত্তম। অসৎ, অভদ্র, অশালীন, অশিক্ষিত
ও মূর্খদের সাহচর্য পরিহার করা বা তাদের থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
خُذِ
الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ (سورة الأعراف-১৯৯)
“আর ক্ষমা করার অভ্যস গড়ে তোল, সৎকাজের
নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাক।” -সুরা আল
আ’রাফঃ ১৯৯
হাদীসে এসেছে,
عَنْ
عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ: أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِمَنْ يَحْرُمُ عَلَى النَّارِ أَوْ بِمَنْ تَحْرُمُ
عَلَيْهِ النَّارُ، عَلَى كُلِّ قَرِيبٍ هَيِّنٍ سَهْلٍ. (رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ -২৪৮৮)
“আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ (রাঃ)
থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আমি কি
তোমাদের এ বিষয়ে জানাব না যে, কোন লোক
জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম অথবা কার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম? জাহান্নামের আগুন এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য হারাম, যে লোকদের নিকটে বা তাদের সাথে মিলেমিশে থাকে, যে কোমলমতি, নরম মেজায
ও বিনম্র স্বভাববিশিষ্ট।” -আহমদ; তিরমিযীঃ
২৪৮৮; মিশকাতঃ ৫০৮৪
অন্য হাদীসে আরো এসেছে,
عَنْ
أَبِي مُوسَى، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: " إِنَّمَا
مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ، وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ، كَحَامِلِ الْمِسْكِ، وَنَافِخِ
الْكِيرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ: إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ،
وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً، وَنَافِخُ الْكِيرِ: إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ
ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةً "(مُتَّفق عَلَيْهِ بخارى-৫৫৩৪)
“আবূ মুসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, সৎ বা উত্তম
সঙ্গী এবং অসৎ বা খারাপ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মিশক আম্বর
ওয়ালা ও হাপর ওয়ালার ন্যায়। মিশক আম্বর ওয়ালা তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে
কিছু ক্রয় করবে অথবা তার নিকট থেকে তুমি সুগন্ধি লাভ করবে। আর হাপর
ওয়ালা তোমার বস্ত্র জ্বালিয়ে দেবে কিংবা তার নিকট থেকে তুমি দুর্গন্ধ পাবে।” -বুখারীঃ
৫৫৩৪; মুসলিম; মিশকাতঃ
৫০১০
ঙ। আবেগ-অনুভুতির ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থাঃ
আবেগ, অনুভুতি, ভালবাসা-ঘৃণা, বন্ধুত্ব-শত্রুতা
ইত্যাদির ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থী হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালবাসায়
সীমাতিক্রম করা বা শত্রুতার ক্ষেত্রে সীমালংঘন করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে
ঝগড়া-বিবাদের ক্ষেত্রে পাপাচারে লিপ্ত হওয়াও নিষিদ্ধ; বরং এ ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বনই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
يَا
أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا
يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ
لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ﴿المائدة:
٨﴾
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে
অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার
কর। এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে
ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয়
আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।” -সূরা মায়েদাহঃ ৮
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
عَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ، أُرَاهُ رَفَعَهُ، قَالَ: أَحْبِبْ حَبِيبَكَ هَوْنًا مَا عَسَى
أَنْ يَكُونَ بَغِيضَكَ يَوْمًا مَا، وَأَبْغِضْ بَغِيضَكَ هَوْنًا مَا عَسَى أَنْ
يَكُونَ حَبِيبَكَ يَوْمًا مَا. (ترمذي)
‘‘কাউকে ভালবাসতে ভারসাম্যতা বজায় রাখ। কেননা, হয়ত সে কোন দিন তোমার ঘৃণার পাত্র হয়ে যাবে। আর কাউকে
ঘৃণা করলেও ভারসাম্যতা বজায় রাখ। কেননা, হয়ত সে
কোনদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে।’’ -তিরমিযীঃ ১৯৯৭
৫। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থাঃ
ইসলামী শরী‘আত এ ক্ষেত্রে
মধ্যমপন্থী ও ন্যায়নিষ্ঠ অর্থব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। ইসলামী
শরী‘আতে একদিকে ধন-সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য জ্ঞান করতে নিষেধ করা হয়েছে; অপরদিকে সম্পদ বন্টনের নিষ্কলুষ নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছে। যাতে কোন
মানুষ জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত না থাকে এবং কেউ সমগ্র সম্পদ এককভাবে
কুক্ষিগত করে না রাখে।
ক। দান-সাদকায়
মধ্যমপন্থাঃ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلَا
تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ
مَلُومًا مَّحْسُورًا ﴿الإسراء: ٢٩﴾
“এবং তুমি তোমার হাত একেবারে গলার সাথে বেঁধে রেখ না। আবার হাত
একেবারে খুলেও দিবে না। তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হবে। অর্থাৎ
দানের বেলায়ও মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে হবে।’’
-সূরা বনী ইসরাঈলঃ ২৯
খ। ব্যয় বা খরচে মধ্যমপন্থাঃ
অতিরিক্ত ব্যয় করলে ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময় অর্থকড়ির
সংকট দেখা দিতে পারে। তাই ব্যয়ের ক্ষেত্রে কার্পণ্যও নয়, অতিরিক্ত ব্যয়ও নয়। বরং মধ্যমপন্থা গ্রহনের নীতি রাখা
হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَالَّذِينَ
إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا
﴿الفرقان: ٦٧﴾
“এবং যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও
করে না;
বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যমপন্থায়।’’ -সূরা ফুরকানঃ
৬৭
আবার আল্লাহ মানুষকে খেতে ও পান করতে বলেছেন, কিন্তু অপচয় বা অপব্যয় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,
يَا
بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا
تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ (سورة الأعراف-৩১)
“হে বনী-আদম। তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও। খাও ও পান
কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।” -সুরা আ’রাফঃ ৩১
তিনি আরো বলেন,
وَلَا
تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا (২৬) إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا
إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا (২৭) (سورة
الإسراء-২৬-২৭)
“কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয়
অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” -সুরা বনি
ইসরাঈলঃ ২৬-২৭
নবী করীম (সাঃ) বলেন,
عَنْ
عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ
صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রكُلُوا، وَتَصَدَّقُوا، وَالْبَسُوا
فِي غَيْرِ إِسْرَافٍ، وَلَا مَخِيلَةٍগ্ধ رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيُّ
وَابْنُ مَاجَه
“আমর ইবন শো‘আইব থেকে
পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা পানাহার
করো, দান-খয়রাত করো এবং পরিধান করো যাবত না তার সাথে অপব্যয় ও অহংকার যুক্ত হয়।” -আহমদঃ ৬৬৫৬, ৬৬৬৯; নাসাঈঃ
২৫৫৯; ইবন মাজাহঃ ৩৬০৫; মিশকাতঃ
৪৩৮১
ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে পরিকল্পিত
জীবন যাপন করলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া এবং সঞ্চয় করা সম্ভব। সম্পদ সঞ্চয়ের
সুফল নিম্মরূপ:
১. অর্থনেতিক সমৃদ্ধি আনায়ন করে।
২. ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে সুখ শান্তি আনে।
৩. বিপদে আপদে সঞ্চিত অর্থ বড়ই কাজে লাগে এবং হতাশা
কমায়।
৪. সঞ্চিত অর্থ মানসিক প্রশান্তির কারণ।
৫. সঞ্চিত সম্পদ পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের অর্থনৈতিক
নিশ্চয়তা বিধান করে।
৬. সমাজে সম্মান ও প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ে।
৭. ভবিষ্যত প্রজম্মের শিক্ষা দীক্ষার ক্ষেত্রে
বিশাল সহায়ক ভ‚মিকা পালন করে।
৮. সামজে জনহিতকর কাজে লাগে।
৯. একজনের অর্থ অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা
করে।
১০. সমাজ ও রাষ্টের অর্থনৈতিক কাঠামো মজবুত হয়।
১১. মুলত সঞ্চিত অর্থ দিয়ে হজ্ব, যাকাত, দান খয়রাত
সহ অনেক আল্লাহর সন্তুষ্টি মূলক কাজ করা সম্ভব।
৬। সামাজিক ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থাঃ
সমাজের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, সেখানে পেশী শক্তির প্রাবল্য বিদ্যমান। পূর্ববর্তী
সম্প্রদায়গুলো
একদিকে মানবাধিকারের প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করেনি; ন্যায়-অন্যায়ের
তো বালাই ছিল না। নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাউকে যেতে দেখলে তাকে নিপীড়ন ও
হত্যা করে তার সর্বস্ব লুটে নেয়াকেই বড় কৃতিত্ব মনে করত। জনৈক ব্যক্তির
চারণভূমিতে অন্যের উট প্রবেশ করে কিছু ক্ষতি সাধন করায় গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ বেধে যায়, যা চলে শতাব্দীকালব্যাপী। এতে নিহত
হয় অসংখ্য মানুষ। নারীদের মৌলিক অধিকার প্রদান তো দূরের কথা, তাদের জীবিত থাকার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হতো না। কোথাও প্রচলিত
ছিল শৈশবেই তাদের জীবন্ত সমাহিত করার প্রথা। অপরদিকে এরূপ নির্বোধ দয়ার্দ্রতারও
প্রচলন ছিল যে,
ক্ষতিকর পোকা-মাকড় হত্যা করাকেও অবৈধ
জ্ঞান করা হতো। জীব হত্যাকে তো দস্তুর মতো মহাপাপ বলে সাব্যস্ত করা হতো। আল্লাহর
হালালাহকৃত প্রাণীর গোশত ভক্ষণকে অন্যায় মনে করা হতো।
কিন্তু মুসলিম উম্মাহ ও তাদের শরী‘আতে এসব বাড়াবাড়ির অবসান ঘটানো হয়েছে। তারা মানুষের
সামনে মানবাধিকারকে তুলে ধরেছে। কেবল শান্তি ও সন্ধির সময়ই নয়; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে, জিহাদের
ময়দানেরও প্রাণবিনাশী শত্র“র অধিকার
সংরক্ষণে সচেতনতা শিক্ষা দিয়েছে। অপরদিকে প্রত্যেক কাজের জন্য নির্ধারিত সীমা লংঘন করাকে অপরাধ
সাব্যস্ত করা হয়েছে। ব্যাক্তিস্বার্থ ও নিজ অধিকারের ব্যাপারে ক্ষমা, মার্জনা ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অপরের অধিকার
প্রদানে যত্মবান হওয়ার নীতি শিক্ষা দিয়েছে।
وَيُؤْثِرُونَ
عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَٰئِكَ
هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴿الحشر: ٩﴾
“নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের
কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।” -সূরা হাশরঃ
৯
৭। ইবাদতের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থাঃ
কোন কোন মানুষ অত্যাধিক পরহেযগারিতা অর্জন করতে
গিয়ে অধিক ইবদত করতে প্রবৃত্ত হয়ে অনেক সময় সাধ্যাতীত কাজ করার চেষ্টা করে। অথচ ইসলাম
এটা সমর্ধন করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَاتَّقُوا
اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنْفِقُوا خَيْرًا لِأَنْفُسِكُمْ
وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (سورة التغابن-১৬)
“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আলাহ্কে ভয়
কর, শোন, আনুগত্য
কর এবং ব্যয় কর। এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। যারা মনের
কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।” -সুরা তাগাবুনঃ
১৬
কেননা আল্লাহ মানুষের উপর তার সাধ্যের বাইরে কোন
বিধান চাপিয়ে দেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
لَا
يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ﴿البقرة: ٢٨٦﴾
“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না।” -সূরা বাক্বারাঃ
২৮৬
অতএব অতিরঞ্জিত কোন কিছু না করে কুরআন-হাদীসে যতটুকু
করার নির্দেশ রয়েছে ততটুকুই অবিরত করতে হবে যদিও তা পরিমানে অল্প হয়। হাদীসে
এসেছে,
وَكَانَ
أَحَبُّ الْعَمَلِ إِلَيْهِ مَا دَامَ عَلَيْهِ الإِنْسَانُ وَإِنْ كَانَ يَسِيرًا
(نسائى)
“আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় আমল হল সেটুকু যা মানুষেরা নিয়মিত আদায়
করতে পারে,
যদিও তা পরিমানে তুচ্ছ হউক।” -নাসাঈঃ
১৬৫২
্রاكْلُفُوا مِنَ الْعَمَلِ مَا
تُطِيقُونَ؛ فَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَمَلُّ حَتَّى تَمَلُّوا، وَإِنَّ
أَحَبَّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَدْوَمُهُ وَإِنْ قَلَّগ্ধ(نسائى)
“তোমরা তোমাদের সামর্থ মোতাবেক ইবাদতে পরিশ্রম করবে। কেননা, আল্লাহ তায়ালা (সওয়াব দিতে) ক্লান্ত হন না বরং তোমরাই (ইবাদত
করতে) ক্লান্ত হয়ে পর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রিয় আমল হল তা, যা নিয়মিত করা হয় যদিও তা পরিমানে কম হোক।” -নাসাঈঃ
৭৬২
মানুষের শারীরিক শক্তি-সামর্থ অনুযায়ী ইবাদত করতে
হবে। এমনকি সালাতের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে না পারলে বসে আদায় করবে, বসে সক্ষম না হলে শুয়ে আদায় করবে। কিন্তু
এক্ষেত্রে বাড়াবিাড়ি গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন হাদীসে এসেছে,
্রصَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ
تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ، فَعَلَى جَنْبٍগ্ধ (بخارى-১১১৭)
“দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে। যদি এতে
সক্ষম না হও তাহলে বসে বসে সালাত পড়বে। আর তাতেও সম্ভব না হলে শুয়ে শুয়ে সালাত আদায় করবে।” -বুখারীঃ
১১১৭
ইবাদতে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে নিম্মোক্ত
হাদীসটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
عَنْ
أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ جَاءَ ثَلَاثَة رَهْط إِلَى بيُوت
أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ
النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا أخبروا كَأَنَّهُمْ تقالوها
فَقَالُوا وَأَيْنَ نَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ
غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ قَالَ أحدهم أما أَنا فَإِنِّي
أُصَلِّي اللَّيْل أبدا وَقَالَ آخر أَنا أَصوم الدَّهْر وَلَا أفطر وَقَالَ آخر أَنَا
أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوَّجُ أَبَدًا فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ
عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيْهِمْ فَقَالَ: ্রأَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ
كَذَا وَكَذَا أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ لَكِنِّي
أَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ
عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ منيগ্ধ (مُتَّفق
عَلَيْهِ ,مشكوة : ১৪৫)
“আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তিনজন লোক নবী (সাঃ)-এর স্ত্রীগনের বাড়ীতে এসে নবী (সাঃ)-এর
ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তখন তাদেরকে এ সম্পর্কে বলে দেয়া হলো, তারা এটাকে নিজেদের জন্য কম মনে করল। তারা বলতে
লাগল, নবী (সাঃ)-এর তুলনায় আমরা কোথায় ? আল্লাহ তো তাঁর পূর্বের ও পরের ত্র“টি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদের একজন
বলল, আমি চিরকাল সারারাত নামাযরত থাকব। আর একজন
বলল, আমি স্ত্রীদের কাছ থেকে দূরে থাকব এবং কখনও বিয়ে করব না। এমন সময়
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের কাছে তাশরীফ আনলেন। তিনি বললেন, তোমরা কি এরুপ কথা বলেছ ? আল্লাহর
শপথ ! তোমাদের চেয়ে আমি আল্লাহকে বেশী ভয় করি এবং বেশী তাকওয়া অবলম্বন করি। কিন্তু
আমিতো রোজাও রাখি,
খানাও খাই। নামায পড়ি
আবার ঘুমাই এবং ঘর-সংসারও (বিয়ে-শাদী) করি। (এটাই সুন্নাত নিয়ম) যে ব্যক্তি আমার
সুন্নাত (নিয়ম) পালন করবে না, সে আমার
দলভূক্ত নয়।” -বুখারীঃ
৫০৬৩; মুসলিম; মিশকাতঃ
১৪৫
৮। উপসংহারঃ
উল্লেখিত আল-কুরআনুল কারীম ও আল-হাদীসের উদ্ধৃতি
থেকে বোঝা যায় যে,
মুমিনের সকল কাজ হবে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের
মাধ্যমে। এতে যেমন কোন বাড়াবাড়ি থাকবে না, তেমনি থাকবে না সীমালংঘনও। কেননা মানব
জীবনে চরমপন্থা যেমন দূষণীয় তেমনি সীমালংঘনও বর্জনীয়। মুমিনের
সকল কাজ নম্রতা,
ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার মাধ্যমে
সম্পন্ন হতে হবে,
যার উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি
ও মানবকল্যাণ। যাতে মানবতার জন্য কোন অমঙ্গল ও অকল্যাণ থাকবে না। যার মাধ্যমে
ইসলামের আদর্শ হবে সমুন্নত, যে আদর্শ
দেখে অমুসলিমরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে। আর এটাই মুমিনের একমাত্র ব্রত হওয়া
উচিত। আসুন আমরা সকলে বিষয়টির উপর সঠিকভাবে আমল করার চেষ্টা করি। তাহলে আমাদের
দুনিয়া এবং পরকাল সুন্দর হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সকল কাজে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের তাওফিক দান করুন। -আমীন!!



No comments:
Post a Comment