Thursday, October 8, 2020

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ
১। ভুমিকাঃ

জঙ্গিবাদ একটি মানবতা বিরোধী অপরাধ। জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ শব্দদ্বয় (Militant, Militancy) এর অনুবাদ। ব্যবহারিকভাবে এগুলো খারাপ অর্থে ব্যবহার হতো না। শাব্দিক বা রূপকভাবে যোদ্ধা, সৈনিক বা যুদ্ধে ব্যবহৃত বস্তু বুঝাতে এ শব্দগুলো ব্যবহৃত হতো । বৃটিশ ইন্ডিয়ার কমান্ডার ইন চিফকে ‘ জঙ্গিলাট’ বলা হতো। (শ্রী শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, সংসদ বাংলা-ইংরেজী অভিধান, পৃ. ৪৬২)


কিন্তু বর্তমানে জঙ্গি বলতে বে-আইনী, সহিংসতা ও খুন-খারাবি বুঝি সুপরিচিত ভাষায় একে বলে (Terrorism) সন্ত্রাস। সন্ত্রাসের লক্ষ্য হলো ইসলামের দোহাই দিয়ে সাময়িক বিজয় ব্যতীত নির্বিচারে সকল বস্তুতে আঘাত করে ভীতি সঞ্চয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা।


কতিপয় কুচক্রী মহল বাংলাদেশর বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে এ জঙ্গিবাদের দাওয়াত দিতে উদগ্রীব রয়েছে। তাই আল-কুরআন ও আল-হাদীসের আলোকে জঙ্গিবাদের ভয়াবহতা ও পরিণতির প্রতি লক্ষ্য রেখে বিষয়টি জন সমক্ষে তুলে ধরা হলো।


২। ইসলামের ইতিহাসে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস

ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞতা ও বিকৃত করণের কারনে ইসলামের নামে উগ্রবাদের সৃষ্টি। প্রাচীন ও মধ্যযুগেও ইসলামের নামে সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্ম ও প্রসারের ঘটনা ঘটেছে। যেমন

ক। ১ম হিজরী শতকে আলী রা. এর আমলে খারেজী সম্প্রদায়।

খ। ৫ম হিজরী শতকে শী’আ মতালম্বী হাশাশীন সম্প্রদায়।

গ। আধুনিক মিশরে জামা‘আতুল মুসলিমীন।

ঘ। আই.এস, জে.এম.বি, হারাকাতুল জিহাদ ইত্যাদি নামে বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদী দলের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।


৩। রাসূলুল্লাহ্ সা. এর ভবিষৎবাণী

মুসলিম উম্মাহর মধ্যে উগ্রতার আবির্ভাবের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ সা. ভবিষৎবাণী করেছেন। عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «يَخْرُجُ فِيكُمْ قَوْمٌ تَحْقِرُونَ صَلاَتَكُمْ مَعَ صَلاَتِهِمْ، وَصِيَامَكُمْ مَعَ صِيَامِهِمْ، وَعَمَلَكُمْ مَعَ عَمَلِهِمْ، وَيَقْرَءُونَ القُرْآنَ لاَ يُجَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ، يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ ك َمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ،

আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সা. -কে বলতে শুনেছি, “ভবিষ্যতে তোমাদের মধ্যে এমন সব লোকের আগমন ঘটবে, যাদের সালাতের তুলনায় তোমাদের সালাতকে, তাদের সাওমের (রোযার) তুলনায় তোমাদের সাওমকে এবং তাদের  আমলের তুলনায় তোমাদের আমলকে নগণ্য মনে করবে। তারা কুরআন পাঠ করবে; কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালীর নিচে প্রবেশ করবে না (অন্তরে প্রবেশ করবে না এবং তা লোক দেখানো হবে।) এরা দ্বীন (ইসলাম) থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনভাবে নিক্ষিপ্ত তীর ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়।” (বুখারী ঃ তা. পা. ৫০৫৮, ৩৩৪৪; আ.প্রঃ ৪৬৮৫; ই.ফা.বা. ৪৬৮৯; মুতাওয়াতির হাদীস, মারফু হাদীস)


আলী রা. এবং আব্দুল্লাহ্ ইবন মাসউদ রা. থেকে বিভিন্ন সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন,

«سَيَخْرُجُ قَوْمٌ فِي آخِرِ الزَّمَانِ، أَحْدَاثُ الأَسْنَانِ، سُفَهَاءُ الأَحْلاَمِ، يَقُولُونَ مِنْ خَيْرِ قَوْلِ البَرِيَّةِ، لاَ يُجَاوِزُ إِيمَانُهُمْ حَنَاجِرَهُمْ، يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ، كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ، فَأَيْنَمَا لَقِيتُمُوهُمْ فَاقْتُلُوهُمْ، فَإِنَّ فِي قَتْلِهِمْ أَجْرًا لِمَنْ قَتَلَهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ»

“শেষ যুগে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হবে যারা হবে অল্পবয়স্ক যুবক, নির্বোধ। তারা সৃষ্টির সবচাইতে শ্রেষ্ঠতম কথা থেকে আবৃত্তি করবে। অথচ ঈমান তাদের গলদেশ অতিক্রম করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমন তীর শিকার ভেদ করে বের হয়ে যায়। তাদেরকে যেখানেই তোমরা পাবে হত্যা করবে। কেননা তাদেরকে হত্যা করলে হত্যাকারীর জন্য কিয়ামত দিবসে প্রতিদান রয়েছে।” (বুখারী ঃ তা. পা. ৩৬১১; আ.প্রঃ ৬৪৪৯; ই.ফা.বা. ৬৪৬১; মুতাওয়াতির হাদীস, মারফু হাদীস)


এখানে ইসলামের নামে, সত্য প্রতিষ্ঠার নামে সন্ত্রাসীকর্মে লিপ্ত ব্যক্তিদের দু’টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছেঃ

বয়সে তরুণ। সমাজের বয়স্ক ও অভিজ্ঞ আলিম ও নেতৃবৃন্দের পরামর্শ এরা মূল্যায়ণ করে না।

খ। এদের বুদ্ধি অপরিপক্ক, দূরদর্শিতার কমতি ও অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে।


রাসূলুল্লাহ্ সা. এর ভবিষৎবাণী বাস্তবায়ণ খারেজী সম্প্রদায়ের আবির্ভাবের মাধ্যমে হয়েছিল। হি. ৩৫ সনে (৬৫৬ খৃঃ) বিদ্রোহীদের হাতে উছমান রা. শহীদ হওয়ার পর আলী রা. দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আলী রা. এর অনুসারীদের কয়েক হাজার তাঁর পক্ষ ত্যাগ করে। এরা বিদ্রাহী বা খারেজী যুবক আবেগী মুসলিম। এরা ইসলামের দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।


৪। ইসলামের নামে উগ্রতার কারণঃ

ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে উগ্রতার পিছনে অন্যতম কারণগুলো নিম্মরূপঃ

১। নিজের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেয়ে অন্যের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব বলে মনে করা। 

এটি আবেগ প্রসূত বিভ্রান্তি গুলোর অন্যতম। নিজের জীবনে পালনীয় ইবাদতগুলোকে ফরজে আইন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব বিষয়ক ইবাদতগুলো ফরযে কিফায়া বা সামষ্টিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু উগ্রতায় লিপ্ত মানুষগুলো চিন্তার বিভ্রান্তির কারণে অন্যের জীবনে দীন প্রতিষ্ঠাকে ফরযে আইন এবং নিজের জীবনে দ্বীন পালনকে ছোট ফরয বা গুরুত্বহীন বলে মনে করে থাকে। আল্লাহ্ তা’আলা মুমিনকে তাঁর নিজের ও নিজের দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাস করবেন, দুনিয়ার অন্য মানুষদের পাপাচার সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করবেন না। সাধ্যমত দাওয়াতের পরও যদি মানুষ তা গ্রহণ না করে সে জন্য তার কোন অপরাধ হবে না। আল্লাহ্ আল কুরআনে বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ ۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ ﴿المائدة: ١٠٥﴾

“হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর তোমাদের নিজেদের দায়িত্ব চিন্তা কর। তোমরা যদি সঠিক পথে থাক, তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” (সূরা মায়িদা, ৬ ঃ ১০৫


সমাজে, রাষ্ট্রে ও বিশ্বে অন্যায়, অনাচার কম-বেশী থাকবেই। মুমিনের দায়িত্ব দাওয়াত দেয়া, প্রচার করা মাত্র। কাউকে হিদায়ত করে ফেলা বা ভাল করা নয়। মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূল সা. কে বলেন,

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ ﴿القصص: ٥٦﴾

“আপনি যকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ্ তা’আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।” (সূরা কাসাস,২৮ ঃ ৫৬) 


আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন,

وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ ﴿يوسف: ١٠٣﴾

“আপনি যতই চান, অধিকাংশ লোক বিশ্বাসকারী নয়।” (সূরা ইউসুফ, ১২ ঃ ১০৩)


ফলাফল লাভের উম্মাদনায় আবেগী মুমিনকে বিপথগামী করে। তারা মনে করে এত ওয়াজ, প্রেষণা কোন কাজে আসছে না বরং জোর করে সব অন্যায় দূর করে ফেলতে হবে। এ জন্যই সহিংসতার পথ বেছে নেয়। অথচ দীন প্রতিষ্ঠার সকল কর্মে অহিংসতা প্রতিরোধ করতে এবং সহিংসতার প্রতিবাদে উত্তম আচরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ (33) وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ ﴿فصلت: ٣٣-۳۴﴾

“সেই ব্যক্তির কথা অপেক্ষা আর কার কথা উত্তম? যে আল্লাহর দিকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে,  নিশ্চয় আমি একজন মুসলিম (আজ্ঞাবহ)। সমান নয় ভাল ও মন্দ। জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন আপনার সাথে যে ব্যক্তির শুত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু।” (সূরা হা-মীম-সিজাদাহ, ৪১ ঃ ৩৩-৩৪)


২। করণীয় ও বর্জনীয়ে মধ্যে পার্থক্য না বুঝা। 

মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যায়ের প্রতিকারের চেষ্টা করবেন। জাগতিক ফলাফল বা নিজের স্বার্থের জন্য নয়। দাওয়াতের জন্য কোন হারাম পথ বেছে নেওয়া শরীয়ত বিরোধী। এতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে পাপ প্রতিষ্ঠা করা হবে। ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে পূণ্য অর্জনের চেয়ে পাপ বর্জন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন,

إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْء فدَعُوه "

“আমি যখন তোমাদেরকে কোন বিষয়ে আদেশ করি, তখন সাধ্যমত তা পালন কর। আর যদি কোন বিষয়ে নিষেধ করি তা থেকে বেঁচে থাক।” (বুখারী ঃ ৭২৮৮, তা.পা. ৭২৮৮, মুসলিম ঃ ১৩৩৭; আহমাদ ঃ ৯৭৮৭; মিশকাত ঃ ২৫০৫, মারফু হাদীস)


ফরজ ইবাদত বিনা ওজরে বা ইচ্ছাকৃতভাবে বর্জন করলে শুধু মাত্র আল্লাহ্র হক নষ্ট হয়, যা আল্লাহ্ তাওবার মাধ্যমে ক্ষমা করবেন।


কিন্তু এ ইবাদত পালনের নামে মানুষের সম্পদ, সম্ভ্রম নষ্ট করলে তা কঠিন হারাম হওয়া ছাড়াও বান্দার হক হওয়ার কারণে তাওবা করলেও আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন না।


বিচার ও জিহাদের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড বা হত্যার ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো বিচারকের ভূলে নিরপরাধীর সাজা হওয়ার চেয়ে অপরাধীর বেঁচে যাওয়া ভাল। অনুরূপভাবে জিহাদের নামে ভ‚লে মানুষকে হত্যা করার চেয়ে জিহাদ না করা অনেক ভাল। জিহাদের শর্ত না পাওয়ায় জিহাদ বর্জন করলে কোনরূপ গোনাহ হবে না। মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধ, সন্ত্রাস বা হানাহানির ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন, 

لِيَكُنْ عَبْد الله المَقْتُوْل وَلَا يَكُنْ عَبْد الله الْقَاتِل

“এরূপ পরিস্থিতিতে মু’মিন নিহত হোক কিন্তু সে যেন হত্যাকারী না হয়।” (আবূ দাঊদ, ৪/১০০; ইবন মাজাহ, ২/১৩১০


৩। ইসলামী শিক্ষার বিকৃত অনুধাবন ও উপস্থাপন। 

ইসলাম বিষয়ক বিভ্রান্তির মূলে রয়েছে জিহাদ। এটাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে বলা হয়, ইসলামই ধর্মের নামে জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধ বৈধ করেছে। আরো বলা হয়ে থাকে যে, ইসলাম তরবারির জোরে প্রচারিত হয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলামে শুধু রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ত¡ ও নিরাপত্তার জন্যই জিহাদ বৈধ করা হয়েছে, ধর্ম প্রচারের জন্য নয়। এমনকি দীন প্রচারের জন্য শক্তি প্রয়োগ ও নিষিদ্ধ। আল্লাহ্ বলেছেন,

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ﴿البقرة: ٢٥٦﴾

“দীনে কোন জবরদস্তি নেই।” (সূরা বাকারা, ২ ঃ ২২৬)


রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন,

مَنْ قَتَلَ نَفْسًا مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الجَنَّةِ، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامًا

“যে ব্যক্তি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি প্রদত্ত কাউকে হত্যা করে, সে ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধ পর্যন্ত শুকতে পারবে না। অথচ তার সুগন্ধ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকে অনুভ‚ত হবে।” (বুখারী ঃ ৬৯১৪, তা.পা. ৩১৬৬, আ.প্র. ৬৪৩৪, ই.ফা.বা. ৬৪৪৬, মারফু হাদীস)


ইসলামে বিধর্মীদের সাথে অভদ্র আচরণ, উপাস্যদের গালাগাল নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ ﴿الأنعام: ١٠٨﴾

“তোমরা তাদেরকে মন্দ বলো না, যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহ্কে ছেড়ে। তাহলে তারা ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহ্কে মন্দ বলবে।” (সূরা আন’আম, ৬ ঃ ১০৮)


৫। ইসলামী বিধানে মানবহত্যা

জীবনের নিরাপত্তা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই ইসলাম সব মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান ও অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করেছে। কিসাস, দিয়াত বা রক্তপণের মতও বিধান রয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا ﴿النساء: ٩٣﴾ 

“যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ্ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।” (সূরা নিসা,৪ ঃ ৯৩)


উক্ত আয়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যার দায়ে পাঁচ পর্যায়ের শাস্তির উল্লেখ রয়েছে। যার একটি আরেকটির চেয়ে ভয়ঙ্কর। জাহান্নাম তথায় চিরস্থায়িত্ব, আল্লাহ্র ক্রোধ, আল্লাহ্র অভিশাপ এবং ভয়ঙ্কর শাস্তি। এর বিপরীতে শতভাগ ফরয জিহাদ পরিত্যাগ করলে এরূপ কাছাকাছি কোন শাস্তির কথা বলা হয় নি। 


উগ্রতার ভয়বহতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন,

وَمَنْ يُشَاقِقْ يَشْقُقِ اللَّهُ عَلَيْهِ يَوْمَ القِيَامَةِ "........، وَمَنِ اسْتَطَاعَ أَنْ لاَ يُحَالَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الجَنَّةِ بِمِلْءِ كَفِّهِ مِنْ دَمٍ أَهْرَاقَهُ فَلْيَفْعَلْ كَأَنَّمَا يَذْبَحُ دَجَاجَةً (كُلَّمَا تَقَدَّمَ لِبَابٍ مِنْ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ، حَالَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ)

“যে ব্যক্তি কাঠিন্য বা উগ্রতার পথ অবলম্বন করবে আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন তার জন্য কাঠিন্যের পথ অবলম্বন করবেন। কেউ যদি কোন হাতের তালুতে রাখার মত সামান্য রক্তও প্রবাহিত করে (যেন সে মুরগী জবাই করছে) তবে সে রক্ত তার ও জান্নাতের মধ্যে বাঁধা (যখনই সে জান্নাতের কোন দরজার দিকে অগ্রসর হবে, তখনই ঐ রক্ত জান্নাতে প্রবেশের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে)। কাজেই যদি কেউ পারে তবে সে যেন এরূপ রক্তপাত থেকে আত্মরক্ষা করে।” (বুখারী, ৬/২৬১৫) 


মুসলিম হত্যার অপরাধ এতই জঘন্য যে, ইসলাম এটিকে নিন্দনীয় ও কুফরী হিসেবে ঘোষণা করেছে। হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ

“মুসলিমকে গালি দেয়া ফিসক (কবিরা গুনাহ) এবং তাকে হত্যা করা কুফরী।” (বুখারী ঃ ৬০৪৪, তা.পা. ৬০৪৪, আ.প্র. ৫৬০৯, ই.ফা.বা. ৫৫০৫, মারফু হাদীস)


ইসলাম মানব হত্যাকারীকে মুসলিম জনগোষ্টীর গন্ডি বহিভর্‚ত হিসেবে বিবেচনা করে। হাদীসে এসেছে,

مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلاَحَ فَلَيْسَ مِنَّا

‘যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে সে আমাদের দলভ‚ক্ত নয়।’ (বুখারী ঃ ৬৮৭৪, তা.পা. ৬৮৭৪, ৭০৭০, আ.প্র. ৬৩৯৫, ই.ফা.বা. ৬৪০৮, মারফু হাদীস)

আল্লাহ্র কাছে একজন মুসলিমের হত্যা গোটা পৃথিবী ধ্বংসের চেয়েও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:لَزَوَالُ الدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ قَتْلِ رَجُلٍ مُسْلِمٍ

“একজন মুমিনের হত্যার চেয়ে দুনিয়া নিঃশেষ হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে অধিকতর সহজ।” (তিরমিযী, ৪/১৬, ১৩৯৫; নাসায়ী; মিশকাত ঃ ৩৪৬২)


ইসলাম মানব হত্যা দমনে হত্যার নির্দেশকারী, উৎসাহদাতাসহ হত্যাকান্ডের সাথে জাড়িত সকলকে দন্ডবিধির আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। ইমাম আবূ হানিফা রহ. ও ইমাম শাফেঈর রহ. এর মতে হত্যাকন্ডে বাধ্যকারীর উপর কিসাসের বিধান কার্যকর হবে। (দ্রঃ বাদাইউস সানাই ফী তারতীবিশ শরীয়্যাহ, খ. ৭, পৃ. ১৭৯)


৬। জঙ্গিবাদ দমনে ধার্মিক মুসলিমের দায়িত্ব

ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ ব্যবহার হচ্ছে বিধায় মুসলিমদের এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশী দায়িত্ব নিতে হবে। জঙ্গিবাদের ধুয়া তুলে সারা বিশ্বে ইসলামী শিক্ষাকে নিন্দিত করার অপচেষ্টা যেমন চলছে, পাশাপাশি ইসলাম প্রচারের নামে ইসলাম নিষিদ্ধ কর্মে লিপ্ত হচ্ছে, অনেকে অজ্ঞতাসারে দীনি আবেগ নিয়ে নাজাতের উদ্দেশ্যে উগ্রতা, খুনখারাবিতে লিপ্ত হয়ে এদেরকে সঠিক জ্ঞান প্রদান, বিকৃতিরোধ আলেম সমাজের দায়িত্ব।


ক. জুমুআর খুতবায় এ বিষয়ে উপস্থাপন। 

জুমুআর আলোচনা সাধারণভাবে মুমিনের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। সকল ব্যক্তিগত ও সামাজিক অপরাধ ও অবক্ষয়ের ন্যায় জঙ্গিবাদ বা উগ্রতা রোধেও ইমামগণ গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারেন। ইমামগণ যদি সামাজিক অন্যায় ও অবক্ষয়ের কথা না বলে যদি শুধু ফজীলত ও গল্পের ওয়াজ করেন তাহলে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে কোন লাভ হবে না। 


খ. ক্রন্দন করা। 

ব্যক্তিগত কষ্টে নিপতিত হলে যেরূপ আল্লাহর কাছে ক্রন্দন করি। তদ্রুপ আবেগ ও বেদনা নিয়ে উম্মতের জন্য ক্রন্দন করা উচিৎ। 


গ. বিচ্ছিন্নতা পরিহার করা। 

ইসলামী দায়ীগণের পারস্পরিক শত্রুতা, দলাদলিতে দীনি দাওয়াত ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আবেগী যুবকগণ মূলধারার আলিমদের ব্যাপারে হতাশা ও কুধারণা পোষণ করে উগ্রতার খপ্পরে পড়ে থাকে। 


ঘ. নিজের কর্মকে সঠিক বলার পাশাপাশি অন্যের কর্মের মূল্যায়ণ করা। 

ইসলামী দাওয়াতের বিভিন্ন পদ্ধতি (শিক্ষা বিস্তার, গণদাওয়াত, রাজনীতি) পরস্পর অবমূল্যায়ণের ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে, আর উগ্রতা ও অবক্ষয় বেড়েছে।


ঙ. দীনের সঠিক দাওয়ত ও বিকৃতরোধ। সকল পতিক‚লতার মধ্যে দীনি দাওয়াত অব্যাহত রাখা এবং দীনের বিকৃতকারীদের চিত্র তুলে ধরে উগ্রতাকে নিস্ক্রিয় করা।


চ. পরস্পর ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতা বর্জন। 

দীনি দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রতিক‚লতার কারণে সমাজের নেতৃবৃন্দ বা আলিম সমাজকে ঘৃণা করা, ইসলামের শত্রæ বলা, ইহুদী-খৃষ্টানদের দালাল, নবী-ওলীগণের দুশমন ইত্যাদি বিশেষণে আখ্যায়িত করে ধর্মীয় উগ্রতাকে উস্কে না দিয়ে পরস্পর সহিষ্ণু প্রদর্শন করা। (যে আমাকে ভাল বলবে আমি তাকে ভালবাসবো) এরূপ মনোভাব বর্জন করতে পারলে উগ্রতা দূরীভ‚ত হবে।


৭। উপসংহার

সকলের প্রচেষ্টা বিশেষ করে আলেম, খতীবদের সুশিক্ষায় সমাজ হতে জঙ্গিবাদ, উগ্রতা দূর হওয়ার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহ্ হক্ক কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু গরম কথা বলার নির্দেশ দেন নি। বিশ্বের অন্যতম খোদাদ্রেীহী তাগুত ফিরাউনের নিকট মুসা আ. ও হারুন আ. -কে প্রেরণ কওে নরম কথার নির্দেশ দিয়ে বলেন,

اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى (۴۳) فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى ﴿طه: ۴۴-٤٣﴾ 

“তোমরা উভয়ে ফেরআউনের কাছে যাও সে খুব উদ্ধত হয়ে গেছে। অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বল, হয়তো সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে।” (সূরা ত্বহা, ২০ ঃ ৪৩-৪৪)


এ যদি হয় কাফেরের সাথে নবী রাসূলগণের প্রতি নির্দেশ, তাহলে যারা কালিমা পড়ে নিজেদেরকে মুসলিম দাবী করেন তাদের সাথে আমাদের কত বিনম্র ও বন্দুসুলভ আচরণ করতে হবে। আল্লাহ্ তা’আলা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত সকলকে জঙ্গিবাদের কবল থেকে হিফাজত করুন এবং সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ বিনির্মানের তাওফীক দান করুন। আমীন !!


গ্রন্থপঞ্জী


এই আলোচনায় সে সকল গ্রন্থ থেকে তথ্য গ্রহণ করা হয়েছে বা উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে সেগুলোর তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলোঃ


১. আলকুরআনুল কারীম। (অনুবাদঃ মুফতি মুহাম্মদ শফি, জিকর এ্যারাবিক সফ্টওয়ার)

২. সহীহ্ বুখারী, মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল (২৬৫ হি.)

৩. সহীহ্ মুসলিম, ইবন হাজ্জাজ (২৬১ হি.)

৪. সুনান তিরমিযী, মুহাম্মাদ ইবন ঈসা (২৭৯ হি.)

৫. সুনান আবূ দাঊদ, সুলাইমান ইবন আশ‘আস (২৭৫ হি.)

৬. সুনান নাসাঈ, আহমদ ইবন শু‘আইব (৩০৩ হি.)

৭. সুনান ইবন মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবন ইয়াযিদ (২৭৫ হি.)

৮. মুসনাদে আহমদ, আহমদ ইবন হাম্বল (২৪১ হি.)

৯. বাইহাকী ফি শু‘আবিল ঈমান, আহমদ ইবন হুসাইন (৪৫৮ হি.)

১০. মিশকাতুল মাসাবীহ, খাতীব তাবরীযী (৭৩০ হি.)

১১. বুলুগুল মারাম মিন আদিল−তিল আহকাম, আহমদ ইবন আলী ইবন হাজার আসকালানি (৮৫২ হি.)

১২. আলবিদাইয়া ওয়ান নিহাইয়া, ইবন কাসীর।

১৩. লিসানুল আরব, ইবন মানযূর। (১৯৯২ খ্রী.)

১৪. আলমাকতাবাহ্ আশ-শামিলাহ্, এ্যারাবিক সফ্টওয়ার, www. Quraner alo.com; www. IslamHouse.com

১৫. সংসদ বাংলা-ইংরেজী অভিধান, শ্রী শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস (১৯৭৯ খ্রী.)

১৬. বাদাইউস সানাই ফী তারতীবিশ শরীয়্যাহ, আলাউদ্দীন আবূ বকর ইবন মাসউদ ইবন আহমদ (১৯৮৬ খ্রী.)

১৭. ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ্ জাহাঙ্গীর রহ. (২০০৯ খ্রী.)

১৮. ইসলামী আইন ও বিচার, বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার (জানু-মার্চ, ২০১৮ খ্রী.)


যে সকল সংকেত ব্যবহার করা হয়েছে।

১. তা.পা. = তাজ পাবলিকেশন।

২. আ.প্র. = তাধুনিক প্রকাশনি।

৩. ই.ফা.বা. = ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

৪. ই.সে = ইসলামিক সেন্টার বাংলাদেশ।


No comments:

Post a Comment