যুদ্ধাবস্থায় নামায
মোঃ উমর ফারুক
ভুমিকাঃ
আধ্যাত্মিক শক্তি ও বিশ্বাস মানুষের যে কোন কাজে মনোবল বৃদ্ধি ও সফলতা অর্জনে সহায়তা করে। নামাায আধ্যাত্মিক চেতনা সৃষ্টিকারী আমল। যে কোন কাজে মনোবল বৃদ্ধি ও সফলতা অর্জনে এর ভুমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হযরত নবী করীমের (সঃ) জীবনে দেখা য়ায় তিনি সৈনিকদের নিয়ে যুদ্ধাবস্থায় নামায পড়তেন। হাদীছ ও ফিকাহতে এই নামাযকে বলা হয়েছে সালাতুল খাওফ বা ভয়ের নামায। যুদ্ধাবস্থায় নামায আধ্যাত্মিক চেতনারই গুরুত্ব প্রমাণ করে।
কোরআনে বর্ণিত صلوة الخوف বিবরণঃ
রাসুল (সঃ) অধিকাংশ যুদ্ধে صلوة الخوف আদায় করেন। তবে কোন কোন যদ্ধেصلوة কাযাও করেছেন। প্রসংগতঃ খন্দকের যুদ্ধে صلوة العصر কাযার করার কথা উলেখযোগ্য। عن علي (رض) يا رسول الله (ص) قال يوم الخندق حبسنا عن صلوة الوسطي وصلوة العصر مالا الله بيوتهم وقبورهم نارا- রাসুলের (সঃ) صلوة الخوف আদায় প্রশঙ্গে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে”
فَإِنْ خِفْتُمْ فَرِجَالًا أَوْ رُكْبَانًا فَإِذَا أَمِنتُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَمَا عَلَّمَكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ ﴿البقرة: ٢٣٩﴾
অতঃপর যদি তোমাদের কারো ব্যাপারে ভয় থাকে, তাহলে পদচারী অবস্থাতেই পড়ে নাও অথবা সওয়ারীর উপরে। তারপর যখন তোমরা নিরাপত্তা পারে, তখন আল্লাহকে স্মরণ কর, যেভাবে তোমাদের শেখানো হয়েছে, যা তোমরা ইতপূর্বে জানতে না। (বাকারা ২ঃ আয়াত নং ২৩৯
অন্যত্র صلوة الخوف এর ভিন্ন পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে।(৪ঃ১০২-১৩)
وَإِذَا كُنتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلَاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ مِّنْهُم مَّعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ فَإِذَا سَجَدُوا فَلْيَكُونُوا مِن وَرَائِكُمْ وَلْتَأْتِ طَائِفَةٌ أُخْرَىٰ لَمْ يُصَلُّوا فَلْيُصَلُّوا مَعَكَ وَلْيَأْخُذُوا حِذْرَهُمْ وَأَسْلِحَتَهُمْ وَدَّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ تَغْفُلُونَ عَنْ أَسْلِحَتِكُمْ وَأَمْتِعَتِكُمْ فَيَمِيلُونَ عَلَيْكُم مَّيْلَةً وَاحِدَةً وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِن كَانَ بِكُمْ أَذًى مِّن مَّطَرٍ أَوْ كُنتُم مَّرْضَىٰ أَن تَضَعُوا أَسْلِحَتَكُمْ وَخُذُوا حِذْرَكُمْ إِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا ﴿النساء: ١٠٢﴾
যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকেন, অতঃপর নামাযে দাড়ান, তখন যেন একদল দাড়ায় আপনার সাথে এবং তারা যেন স্বীয় অস্ত্র সাথে নেয়। অতঃপর যখন তারা সেজদা সম্পন্ন করে, তখন আপনার কাছ থেকে যেন সরে যায় এবং অন্য দল যেন আসে, যারা নামায পড়েনি। অতঃপর তারা যেন আপনার সাথে নামায পড়ে এবং আতœরক্ষার হাতিয়ার সাথে নেয়। কাফেররা চায় যে, তোমরা কোন রূপে অসতর্ক থাক, যাতে তারা একযোগে তোমাদেরকে আক্রমণ করে বসে। যদি বৃষ্টির কারণে তোমাদের কষ্ট হয় অথবা তোমরা অসুস্থ হও তবে স্বীয় অস্ত্র পরিত্যাগ করায় তোমাদের কোন গুনাহ নেই এবং সাথে নিয়ে নাও তোমাদের আত্মরক্ষার অস্ত্র। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের জন্যে অপমানকর শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। (সূরা নিসা, আয়াত-১০২)
হাদীসে বর্ণিত সালাতুল খওফের বিবরণঃ
হাদীসে صلوة الخوف এর বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে রাসূল (সাঃ) এ সালাত বিভিন্ন পদ্ধতিতে আদায় করেছেন। তিনি জীবনে ২৪ বার صلوة الخوف পড়েছেন। তাই কেউ কেউ صلوة الخوف এর ২৪টি নিয়ম বর্ণনা করেছেন। কারো কারো মতে ৬টি নিয়মের উলেখ আছে। সবগুলোর মধ্যে ২টি নিয়মই প্রধান। এই নিয়মগুলোর মধ্যে কোনটা উত্তম তা নিয়ে ইমামদের মধ্যে মত পার্থক্য আছে।
প্রথম পদ্ধতিঃ
ক। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও ইমাম মুহাম্মদের (রঃ) মতে , ইমাম সৈনিকদের দুটো দলে বিভক্ত করবেন, প্রথম দল নিয়ে প্রথম রাকাত পড়বেন, এরপর প্রথম দল দ্বিতীয় দলের জায়গায় চলে যাবে। দ্বিতীয় দল এসে ইমামের সঙ্গে দ্বিতীয় রাকাতে শরীক হবে। দ্বিতীয় রাকাত শেষ হতেই দ্বিতীয় দল প্রথম দলের স্থলে চলে যাবে। এবার প্রথম দল ইমামের সঙ্গে শরীক হয়ে লাহেক এর ন্যায় নামাজ শেষ করবে। নামাজ শেষে প্রথম দল দ্বিতীয় দলের স্থানে চলে যাবে। দ্বিতীয় দল এসে মাসবুক এর ন্যায় নামায শেষ করবে। (সবগুলো বর্ণনা বুখারী, তিরমীযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহর বর্ণনা সূত্রে সাহল ইবনে আবু হাছমা রাঃ থেকে বর্ণিত আছে)
দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ
খ। ইমাম মালেকের (রঃ) মতে, ইমাম প্রথম দল নিয়ে দুরাকাতই পড়বেন তবে প্রথম দলটা শুধু তাশাহুদ পড়ে সালাম ফিরাবে এবং দ্বিতীয় দলকে নামাযের জন্য প্রেরণ করবে। দ্বিতীয় দল এসে ইমামের সংগে নামাযে শরীক হবে। ইমাম সালাম ফিরাবার সাথে সাথে দ্বিতীয় দল মাসবুকের ন্যায় নামায শেষ করবে।
তৃতীয় পদ্ধতিঃ
গ। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এর মতে, ইমাম প্রথম দলের সাথে প্রথম রাকাত পড়বেন এবং দ্বিতীয় দলের জন্য অপেক্ষা করবে। এ দিকে প্রথম দল নিজেরাই বাকী রাকাত পুরো করে দ্বিতীয় দলকে মুক্ত করবে। দ্বিতীয় দল এসে ইমামের সাথে দ্বিতীয় রাকাতে শরীক হবে এবং মাসবুকের ন্যায় নামায শেষ করবে।
চতুর্থ পদ্ধতিঃ
ঘ। এ পদ্ধতি তখনই সম্ভব যখন শত্রু কিবলার দিকে থাকে। পদ্ধতিটা হচ্ছে, দুই দলই ইমামে পিছনে ইকতেদা করবে এবং সকলে উমামে সাথে রুকু করবে। কিন্তু সিজদার সময় সামনের দলটিই শুধু সিজদা করবে। পিছনের দলটি দাড়িয়ে থাকবে। সামনের দদের সিজদার শেষে দাড়াবার পর পিছনের দলটি নিজোরাই সিজদা করবে এবং উঠে দাড়াবে। এবার পিছনের দল সামনে যাবে এবং সামনের দল পিছনে আসবে। এরপর পূর্বের রাকাতের ন্যায় দ্বিতীয় রাকাত পুরা করবে।
পঞ্চম পদ্ধতিঃ
ঙ। এ পদ্ধতিটি খুবই সহজ। পদ্ধতিটি হচ্ছে, একই ইমাম পৃথক ভাবে দুদলের দু জামায়াতে নামায পড়াবেন।
৬ষ্ঠ পদ্ধতিঃ
এ পদ্ধতিটি হচ্ছে, ইমাম একত্রে চার রাকাত নামায পড়বেন। কিন্তু দুদল পৃথকভাবে দুরাকাত করেই পড়বে। (আবু দাউদ)
صلوة الخوف এর বাধ্যবাধকতাঃ
ক। খন্দকের যুদ্ধসহ কোন কোন যুদ্ধে রাসূল (সঃ) সালাত কাযা করেন। এই প্রেক্ষিতে ইমাম ও মুহাককিকীনের কেউ কেউ বলেন বর্তমানে صلوة الخوف বাধ্যবাধকতা নেই। এটা রাসুলের জন্য খাস ছিল। কোরআনে বর্ণিত ধারা ও প্রকৃতি দ্বারাও এই ধারণা অনুভূত হয়। এ সালাতে রাসুলের উপস্থিতির শর্ত আছে। তাই তার তিরোধানের পর এ সালাতোর প্রয়োজন নেই । তাছাড়া যুদ্ধাবস্থায় সালাত পূর্নাঙ্গ পদ্ধতিতে পড়ার বাধ্যবাধকতা না থাাকার কথাও কোরআনের বর্ণনার ধারায় অনুমিত হয়। এই মত পোষণ কারিদের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ) এর নাম সবিশেষ উলেখযোগ্য।
খ। অধিকাংশ উলামা মহোদয়ের মতে সালাতুল খাওফের বাধ্যাবাধকতা আজও অব্যাহত আছে। তাদের মতে শত্রু বা অন্য কিছুর ভয়ে নিয়মিত পন্থায় সালাত আদায় করতে না পারলে যে দিকে সম্ভব সেদিকে ফিবে, একসাথে পড়তে না পারলে বিভিন্ন জামায়াতে বিভক্ত হয়ে, তাও সম্ভবপর না হলে একা পড়বে। নিয়মানুযায়ী রুকু সিজদা দিতে না পারলে ইশারায় দেবে তবু সালাত পড়বে।কোরআনে সফরের বা প্রবাসের উলেখ থাকলেও আবাসেও এরূপ অবস্থায় সৃষ্টি হলে এরুপেই সালাত পড়বে।
গ। ইমাম আওযায়ী বলেন, অবস্থা যদি এমন হয় যে, বিজয় আসন্ন কিন্তু শত্রুর ভয়ে সেনাসদল নামায পড়তে সক্ষম হচ্ছেনা, তাহলে সবাই একাকী ইশারায় নামায আদায় করবে। কিন্তু ইশারায় আদায় করা সম্ভব না হলে যুদ্ধশেষ না হওয়া পর্যন্ত বিলম্বিত করবে। এরপর নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি হলে দুরাকাত নামায পড়ে নেবে। দুরাকাত পড়ার সুযোগ না হলে অন্ততঃ এক রাকাত পড়ে নেবে।
ঘ। মানুষের পক্ষ থেকে বিপদাশংকার কারণে صلوة الخوف পড়া যেমন জায়েয,তেমনভাবে বাঘ- ভালুক , অজগর ইত্যাদির ভয় থাকে এবং সালাতের সময়ও সংকীর্ণ হয় তাহলে তখনও صلوة الخوف পড়া জায়েয। কারণ কোরআনের বর্ণনার ধারায় যে কোন প্রক্রিয়ায় সালাত পড়ার ধারণা পাওয়া যায়।
মাসাইল
১। ভয়কালীন নামাযের যে গুকুম তা সেই অবস্থার জন্য প্রযোজ্য যখন শত্রুর আক্রমণের আশংকা আছে বটে, কিন্তু কার্যত যুদ্ধ বাধেনি। যুদ্ধের অবস্থায় যখন যেভাবে সম্ভব হয় সেইভাবে নামায পড়ার অনুমতি আছে।
২। ভয়কালীন নামায যদি মাগরিবের হয় তাহলে ইমাম প্রথম দলের সাথে দু’রাকাত এবং দ্বিতীয় দলের সাথে এক রাকাত আদায় করবে। এতে প্রথম দল নিজে নিজে এক রাকাত আদায় করবে এবং দ্বিতীয় দল নিজে নিজে দু’রাকাত আদায় করবে।
উপসংহারঃ
আধ্যাতিœক চেতনা সজীবিত করা ও রাখা নামাযের অন্যতম উদ্দেশ্য। যুদ্ধাবস্থায় নামাযের বিধান তার যথার্থ প্রমাণ। বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতি ছাড়াও ভিন্ন প্রক্রিয়ায় ইবাদত করাকেও সালাত বলা হয় তা উক্ত আয়াত দ্বারা অনুমিত হয়।



জাযাকাল্লাহ
ReplyDelete