Saturday, October 3, 2020

জঙ্গিবাদ ও ইসলাম

১। ভূমিকাঃ

বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে বর্তমান সময়ে এক আলোচিত ও সমালোচিত শব্দ হচ্ছে জঙ্গিবাদ। বাংলাদেশের মত এক মধ্যপন্থি শান্তি প্রিয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে জোর পূর্বক ইসলাম কায়েমের নামে একদল বিপথগামী, বোমা হামলা, সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ড ঘটিয়ে বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তী চরমভাবে ক্ষুন্ন করার প্রয়াস পাচ্ছে। যা কখনোই ইসলাম সমর্থন করে না। যারা জঙ্গিবাদী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরছে তারা মূলতঃ ইসলামের শ্বাশত মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন চরমপন্থি বা ধর্মীয় উগ্রপন্থি। এরা কখনোই প্রকৃত ধার্মিক নয়। বরং এরা ইসলামের প্রাথমিক যুগে আবির্ভুত খারিজীদের আধুনিক সংস্করন মাত্র।


২। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস

জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ শব্দদ্বয় ইংরেজী Militant, Militancy-এর অনুবাদ। এক সময় এই শব্দগুলি যোদ্ধা, ধর্মযোদ্ধা, বীরযোদ্ধা, বিজয়ী সেনানায়ক বুঝাতে ব্যবহৃত হতো। বৃটিশ ইন্ডিয়ার কমান্ডার ইন চিফকে ‘ জঙ্গিলাট’ বলা হতো। 


মাইক্রোফট এনকার্টা অভিধানে মিলিট্যান্ট বা জঙ্গি শব্দের অর্থে বলা হয়েছে,

Aggressive: extremely active in the defense or support of a cause often to the point of extremism.

‘আগ্রাসী, কোনো বিষয়ের পক্ষে বা সমর্থনে চরমভাবে সক্রিয় যা প্রায়শ চরমপন্থা পর্যন্ত পৌঁছায়।’


মূলকথা হচ্ছে, ‘জঙ্গি’ শব্দটির অর্থ যুদ্ধ, যোদ্ধা যাই হোক না কেন বর্তমানে তা ব্যবহৃত হচ্ছে যারা ইসলামের নামে বা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে উগ্রতা, অস্ত্রধারণ, সহিংসতা বা খুনাখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে তাদের সম্পর্কে।’


৩। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের আত্মপ্রকাশ

জঙ্গিবাদ বা চরমপন্থা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই এই সমস্যা বিরাজমান। জঙ্গিবাদকে আমরা দেশীয় প্রেক্ষাপটে আলোচনা করলে দেখতে পাই যে, এদেশে সর্ব প্রথম ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মাধ্যমে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে রমনা বটমূলে, তারপরে ময়মনসিংহে সিনেমা হলে, গাইবান্ধায় যাত্রা প্যান্ডেলে, ২০০৫ সালে ১৭ আগষ্ট একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা হামলা, শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে আক্রমন, ২০১৬ সালে ১ জুলাই গুলশান হলি আর্টিজানে ভয়াবহ আক্রমন ইত্যাদি। এগুলো ছিল জঙ্গিবাদীদের বড় ধরনের হামলা। এছাড়া সারাদেশে জঙ্গিরা ছোট বড় আরো অসংখ্য আক্রমন ও বোমরা হামলা চালিয়েছে।


৪। কী উদ্দেশ্যে জঙ্গিরা আক্রমন করছে?

জঙ্গিদের প্রদত্ব জবানবন্দি থেকে ব্যহ্যত জানা যায় যে, তারা এ দেশে দ্বীন কায়েম করতে চায়। এই উদ্দেশ্যেই তারা একের পর এক শান্তি প্রিয় নিরিহ জন সাধারণের উপর হামলা পরিচালনা করছে। কিন্তু তাদেরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে কুরআন সুন্নাহর কোন পৃষ্টায়  বলা হয়েছে যে, দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করে হত্যা কান্ড ঘটিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে? তখন তারা এর সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। আসলে তাদের দাবী ও চিন্তাধারা বিভ্রান্তকর। তাদের এই সন্ত্রাসী তৎপরতার ফলে দেশ ও জাতি কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা তুলে ধরছি।


ক। দেশকে ব্যর্থ, অকার্যকর ও বন্ধুহীন রাষ্ট্রে পরিণত করা

বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশের মাটিতে রয়েছে আল্লাহ্ প্রদত্ব অনেক মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। আছে রপ্তানী যোগ্য পোশাক শিল্প। আরো আছে অনেক অর্থকরী ফসল। দেশেকে নিয়ে সারা বিশ্বের রয়েছে ব্যপক আগ্রহ। সুতরাং দেশ যখন উন্নয়ণের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলছে, তখন এদেশকে ব্যর্থ, অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য একটি বিপথ গামী চরম পন্থি ধর্মান্ধ গোষ্টি তাদের জঙ্গিবাদী কর্ম-কান্ডের মাধ্যমে দেশকে বহির্বিশ্বে বন্ধুহীন করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।


খ। দেশকে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করা

ক্ষমতাধর সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর একটি অপকৌশল হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের কোনো দেশকে করতলগত করতে, সেই দেশে তারা চরম পন্থি, জঙ্গিবাদীদের মদদ দিয়ে সহায়তা করে। পরবর্তীতে তাদের দমনের নামে সেখানে তারা হস্তক্ষেপ করে। জঙ্গিবাদীরা সাম্রাজ্যবাদীদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে মূলত দেশ ও জাতীর সর্বনাস করে। যখন তারা বুঝতে পারে তখন তাদের আর করার কিছুই থাকেনা।


গ। ইসলাম ও মুসলিম জাতির ভাবমূর্তী ধ্বংস করা

এদেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলিম। বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। শত শত বৎসর যাবত এদশে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ শান্তি পূর্ণভাবে বসবাস এবং স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ একটি মধ্যপন্থি মুসলিম দেশ হিসাবে সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছে কিন্তু পরিতাপের বিষয় জঙ্গিসন্ত্রসাীরা এদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিপজ্জনক রাষ্ট্র হিসাবে প্রমান করার জন্য তাদের অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। আরো পরিতাপের বিষয় হচেছ, তাদের এই ধংসাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একদিকে ইসলামী অনুভ‚তিকে ব্যবহার করছে অপরদিকে তারা ইসলাাম সম্পর্কে অজ্ঞ, অশিক্ষিত তরুন যুবকদের ভ‚ল বুঝিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনায় কাজে লাগাচ্ছে। এর ফলে যেমন ইসলাম ও মুসলিম জাতি ক্ষতি গ্রস্ত হচ্ছে তেমনি এদেশের মুসলমানদের ভাবমুর্তি ও মর্যাদা খর্ব হচ্ছে। কলুষিত হচ্ছে মুসলিম জাতি স্বত্বা।


ঘ। মুসলমানদের অগ্রযাত্রা ব্যহত করা

ইতিহাস প্রমান করে মুসলিম জাতীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার লক্ষ্যে শত্রুরা গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদেরকে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত করেছে। তাদের মিশনকে সফল করতে মুসলমানদের মধ্যে গুপ্তচর নিয়োগ করেছে, যারা লেবাসে পোষাকে এবং বাহ্যিক কর্মকান্ড ও আচার-আচরনে মুসলিম সেজে মুসলিম সমাজে মিশে গিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। যুগে যুগে এসব মুনাফিকদের দ্বারাই ইসলাম ও মুসলমানদের অপুরনীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এদেশের জঙ্গিবাদীরাও ঠিক একই ভ‚মিকা পালন করে চলছে।


৫। জিহাদ ও জঙ্গিবাদের মধ্যে পার্থক্য

জিহাদ ও জঙ্গিবাদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। প্রকৃতি, তাৎপর্য, অর্থ ও ভাব, কারণ ও প্রকারভেদ, ফলাফল ও উদ্দেশ্য সব দিক দিয়েই পার্থক্য রয়েছে। জিহাদ একটি মহৎ ইবাদাত। আর জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস হারাম ও নিন্দনীয়। জঙ্গি তৎপরতার ফলে মানুষের মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা বৈরিতা, হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। শান্তিকামী মানুষের জীবন যাত্রাকে ব্যহত করে। দেশের উন্নতি অগ্রগতি ব্যহত করে। অথচ জিহাদের মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়। অনাচার অবিচার দূরিভ‚ত হয়। সুতরাং জিহাদ ও জঙ্গিবাদ কখনোই এক বিষয় নয়। উভয়ের মাঝে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য।


৬। ইসলামরে দৃষ্টিতে জঙ্গিবাদ

ইসলাম সর্বদাই উদারতা, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, সহাবস্থান ও সহনশীলতার ধর্ম। ইসলাম কোনরূপ অশান্তি, অস্থিরতা, অসহনশীলতা, অসহিষ্ণনতা, অনাচার, অরাজকতা পছন্দ করে না। ইসলামের মহত্ব ও মাহাত্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞরাই শুধু ইসলাম ও জঙ্গিবাদকে এক করে গুলিয়ে ফেলে। যা সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন। ইসলামের সোনালী ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি দিক্ষেপ করলে সহজেই প্রতিয়মান হয় যে, ইসলামের প্রচার প্রসার কখনোই হত্যা-সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্ভর ছিলনা, বরং ভালবাসা ও ইনসাফ দিয়ে মানুষের মন জয় করে ইসলাম মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ ﴿البقرة: ١٩١﴾

‘বিপর্যয় বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়ে গুরুতর।’ 

তিনি আরো বলেন,

وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ ﴿القصص: ٧٧﴾

‘পৃথিবীতে তোমরা অশান্তি বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। নিশ্চয় আল্লাহ্ বিপর্যয় সৃষ্টি কারীদের ভালোবাসেননা।’ 

তিনি আরো বলেন, 

وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا ﴿الأعراف: ٥٦﴾

‘পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পুনরায় এতে অশান্তি দাঙ্গা হাংগামা সৃষ্টি করো না।’ 


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা: এর বর্ণাট্য ও ঘটনা বহুল জীবনের বিভিন্ন কেত্রে সন্ত্রাস বিরোধী কর্ম পন্থা ও মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। তার কর্মই তো তাকে শান্তির মহান দূতের মর্যাদায় ভ‚ষিত করেছে। যেমন-


ক। নবুয়্যত প্রাপ্তির পূর্বে তিনি স্থানিয় যুবকদের সাথে নিয়ে হিলফুল ফুযুল বা কল্যাণের শপথ নামে এক সামাজিক আন্দোলনের সুচনা করেছিলেন যার মূল কথাছিল সমাজের অনাচার অবিচার দূর করে শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করা।


খ। নবুয়্যত প্রাপ্তির পর সত্যের বাণী প্রচার করতে গিয়ে তাকে সীমাহীন নিপীড়ন নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তাকে শারিরীকভাবে আঘাত করা হয়েছে তিনি প্রতিঘাত না করে ধৈর্য্যরে সাথে সকল বৈরী পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন।


গ। হিজরত করে মদীনায় পৌছে সকলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ব প্রথম ভাষনে তিনি হানাহানি ভেদাভেদ ভুলে শান্তির বানী প্রচারের পরামর্শ দান করে বলেন, ‘হে লোক সকল তোমরা রহমানের দাসত্ব কর, মানুষকে খাদ্যদান কর, সালাম তথা শান্তির বানীর প্রচলন ঘটাও, তাহলে নিরাপদে জান্নাতে যেতে পারবে।’ 


ঘ। হিজরতের পর মহানবী সা: মদীনায় বসবাসরত সকল ধর্মের অনুসারীদের নিয়ে এক ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ‘মদীনা সনদ’ প্রনয়ন করেন। যাতে তিনি স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেন যারা বিদ্রোহ করবে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে তাদেরকে কঠোর ভাবে প্রতিহত করা হবে। 


ঙ। মক্কা বিজয়ের পর তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ওয়াহশী, হিন্দা, সাফওান এর মত মৃত্যদন্ড প্রাপ্তদের শুধু ক্ষমাই করেননি বরং তাদের নিজে শান্তির ধর্মে স্থান করে দিয়েছেন। বর্তমান কালে কেউ শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখলে তাকে শান্তিতে নোবল পুরস্কার পদান করা হয়। অথচ শান্তি প্রতিষ্টায় মহানবী সা: যে অবদান রেখেছেন তা শতবার নোবল পাওয়ার যোগ্য। সুতরাং সেই শান্তির দূত মুহাম্মাদ সা: এর অনুসারী দাবীদার কেউ কি হত্যা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সাথে জড়াতে পারে?


৭। ইসলামে চরম পন্থা ও বাড়াবাড়ী নিষিদ্ধ

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের অন্যতম কারণ হচ্ছে চরমপন্থা ও ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ী করা। একে সীমালংঘনও বলা হয়। রাসূলুল্লাহ্ সা: বলেন,

اياكم والغلو في الدين

‘তোমরা দ্বীন ইসলামে চরম পন্থা ও বাড়াবাড়ী হতে অবশ্যই বিরত থাকবে।’ 

তিনি আরো বলেন,

هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُونَ

‘চরমপন্থিরা ধ্বংস হয়েছে।’ 

তিনি আরো বলেন,

فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ، وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِّرِينَ

‘তোমাদের পাঠানো হয়েছে সহজ করার জন্য কোনো বিষয়কে কঠিন করার জন্য তোমাদের পাঠানো হয়নি।’ 


রাসূলুল্লাহ্ সা: এর নীতি ছিল, যে কোনো দুইটি বিষয়ের মধ্যে সহজটিকে গ্রহন করা। তিনি বলেন,

্রفَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّيগ্ধ

 ‘যে আমার আদর্শ থেকে মুখ ফিরিেিয় নিবে সে আমার অনুসারী নয়।’ 

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا

فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا ﴿المائدة: ٣٢﴾

‘যে ব্যক্তি কাউকে কোনো হত্যার পরিবর্তে কিংবা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি ছাড়া কোনো মানুষকে হত্যা করবে। সে যন সকল মানুষকে হত্যা করলো। আর যে কারো প্রাণ রক্ষা করলো সে যেন সকল মানুষের প্রাণ বাঁচালো।’ 

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন,

وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ

وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا ﴿النساء: ٩٣﴾ 

‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ্ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’ 

রাসূলুল্লাহ্ সা: বলেছেন,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ

‘মুসলিমকে গালি দেয়া ফিসক (কবিরা গুনাহ) এবং তাকে হত্যা করা কুফরী।’ 

রাসূলুল্লাহ্ সা: আরো বলেন,

مَنْ قَتَلَ نَفْسًا مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الجَنَّةِ، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامًا

‘যে ব্যক্তি নিরাপত্তার প্রতিশ্রæতি প্রাপ্ত কোনো অমুসলিমকে হত্যা করে, সে ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবেনা। অথচ তার সুগন্ধি চল্লিশ বৎসরের দূরত্ব থেকে অনুভ‚ত হবে।’ 


৮। ইসলামে আত্মঘাতী হামলা অবৈধ

আত্মহত্যাকারীর পরিণাম জাহান্নাম। এমনকি ধর্মের নামেও যদি সে ধর্ম যুদ্ধে অংশ নিয়ে আত্ম হত্যা করে তবুও রাসূলুল্লাহ্ সা: তাকে জাহান্নামী বলেছেন।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ﴿البقرة: ١٩٥﴾

‘আর তোমরা নিজেদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিওনা। মানুষের সাথে সদাচরণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সদাচরণ কারীদেরকে ভাল বাসেন।’ 


অত্র আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা আত্মহত্যাকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এ সম্পর্কে অনেক হাদীসও বর্ণিত হয়েছে। যাতে আত্মহত্যাকে হারাম করা হয়েছে।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا ﴿النساء: ٢٩﴾

‘আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করোনা। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের প্রতি দুয়ালু।’ 


সুতরাং আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে এটাকে সৎকাজ বলে বাহ বা নেওয়ার প্রচেষ্টা কিংবা ধ্বংসাত্মক কাজে আত্ম হত্যা করে তাকে আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ বলে আখ্যায়িত করে শাহাদাত লাভের ধারণা যারা করে তারা মূলতঃ চরমভাবে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

হযরত যুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ্ রা. বলেন রাসূলুল্লাহ্ সা: বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি আঘাতের ব্যথা দুঃসহ বোধ করায় আত্ম হত্যা করে। আল্লাহ্ তার সম্পর্কে বলেন, আমার বান্দা আমার নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই নিজের জীবনের ব্যাপারে দ্রæত ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করলাম। 


ছাবিত ইবনু যাহহাক রা. রাসূলুল্লাহ্ সা: থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি লৌহাস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করে। জাহান্নামে তাকে লৌহাস্ত্র দ্বারা সর্বক্ষণ শাস্তি দেয়া হবে। 


সুতরাং ধর্মের নামে এসব আত্মঘাতি বোমা হামলাকারীরাও জাহান্নামে একই ভাবে আত্মহত্যা করতে থাকবে এবং তারা সেখানে চিরদিন অবস্থান করবে।


৯। শেষ কথা

ইসলাম এক বিশ্বজনীন মানবতার ধর্ম। এর চিরন্তন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানুষের অন্তর জয় করার মাধ্যমে তার অন্তরে স্থান করে নেয়া। জোর পূর্বক কোনো কিছুই কখনোই স্থায়িত্ব লাভ করে না। সুতরাং বল প্রয়োগ করে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার যে ভুল পন্থা বিপথগামী জঙ্গিবাদীরা গ্রহন করেছে তার শেষ পরিণতি কখোনই মঙ্গলজনক নয়। আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের ও তাদের শুভ বুদ্ধি দান করুন।



সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

এই রচনায় সে সকল গ্রন্থ থেকে তথ্য গ্রহণ করা হয়েছে বা উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে সেগুলোর তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলোঃ


১. আলকুরআনুল কারীম। (অনুবাদঃ মুফতি মুহাম্মদ শফি, জিকর এ্যারাবিক সফ্টওয়ার)

২. সহীহ্ বুখারী, মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল (২৬৫ হি.)

৩. সহীহ্ মুসলিম, ইবন হাজ্জাজ (২৬১ হি.)

৪. সুনান তিরমিযী, মুহাম্মাদ ইবন ঈসা (২৭৯ হি.)

৫. মুসনাদে আহমদ, আহমদ ইবন হাম্বল (২৪১ হি.)

৬. মিশকাতুল মাসাবীহ, খাতীব তাবরীযী (৭৩০ হি.)

৭. আলবিদাইয়া ওয়ান নিহাইয়া, ইবন কাসীর।

৮. লিসানুল আরব, ইবন মানযূর। (১৯৯২ খ্রী.)

৯. সংসদ বাংলা-ইংরেজী অভিধান, শ্রী শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস (১৯৭৯ খ্রী.)

১০. ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ্ জাহাঙ্গীর রহ. (২০০৯ খ্রী.)


No comments:

Post a Comment